বিআইবিএম অষ্টমবারের মতো বার্ষিক
ব্যাংকিং সম্মেলনের আয়োজন করছে আজ থেকে,
অর্থাৎ নভেম্বর ২৭ থেকে। যথারীতি দুদিনের এ
আয়োজনের উদ্বোধন করছেন বিআইবিএমের গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের
গভর্নর ফজলে কবির। দেশ ও বিদেশ থেকে,
প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত ৯০টি প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ
এবং পরবর্তীতে জমাকৃত ৭০টি প্রবন্ধের মধ্য থেকে ২৫টি এ সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য
নির্বাচন করা হয়েছে। এছাড়া প্রথম ও দ্বিতীয় দিন বিষয়ভিত্তিক দুটি মূল প্রবন্ধ
উপস্থাপিত হবে।
প্রথম দিনের নির্বাচিত ১২টি প্রবন্ধ
দুটি বিষয়ভিত্তিক সেশনে ভাগ করা হয়েছে। যার মূল প্রতিপাদ্য হলো, বাংলাদেশের
সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত পরিস্থিতি ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনা। অষ্টমবারের মতো এ রকম
আয়োজনের সুযোগ পাওয়া বিআইবিএমের জন্য উদ্দীপনার এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য
অত্যন্ত আনন্দের। ১৯১১ সালে এ আয়োজনের জন্য আমার প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনা তত্কালীন
বিআইবিএম ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছিল। তার পর থেকে এ
আয়োজনে আমাদের আমন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সাড়া দিয়ে আসছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত।
সময়ের বিবর্তনে বাংলাদেশের ব্যাকিং
খাত প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়েছে। সংখ্যা বেড়েছে,
প্রতিযোগিতা বেড়েছে, নতুন
নতুন ব্যাংকিং পণ্য বাজারে এসেছে। তবে ক্ষেত্র ও ব্যাপ্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে
যেমন নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে অসংখ্য নতুন ধরনের
ঝুঁকি। কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় এবং
দক্ষতা বৃদ্ধি সব অংশীদারি পক্ষের সর্বজনীন লক্ষ্য। তবে এ পথচলায় জ্ঞানচর্চা, জ্ঞান
অন্বেষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
দেশের আর্থিক খাত ব্যাংকনির্ভর।
বাংলাদেশের আর্থিক খাত মানে মূলত ব্যাংকিং খাত, যা উন্নয়নশীল দেশের জন্য অস্বাভাবিক
নয়। বর্তমানে ৫৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আর্থিক
সেবা প্রদান করছে। ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার, ব্যাংকগুলোর
পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নানা আইন ও নীতি প্রণয়ন, কৌশল
নির্ধারণ ও তার বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে
এক্ষেত্রে সময়ের প্রয়োজনে সব অংশীদারি পক্ষকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। বিশেষত
২০০৮-১২ সালের বিশ্বমন্দা-পরবর্তী সময়ে ব্যাংক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আঙ্গিকে বড় ধরনের পরিবর্তন
এসেছে। এছাড়া আর্থিক দুর্নীতির সম্প্রসারণ,
মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং ডিজিটাল
নিরাপত্তা ঝুঁকি ব্যাংকিং খাতের নীতিনির্ধারক ও ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে ভাবতে
বাধ্য করছে।
নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ
ব্যাংক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং
খাতের সার্বিক ঝুঁকির বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েক বছরে ঋণ খাতকে শক্তিশালী
করার লক্ষ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষত ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে
ব্যাসেল-২ এবং ব্যাসেল-৩-এর বাস্তবায়ন এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন আনতে বেশকিছু কার্যকর
ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও ঝুঁকি
মোকাবেলায় যেমন মানি লন্ডারিং ও জঙ্গি অর্থায়ন, করেসপনডেন্ট ব্যাংকিং-সংক্রান্ত
সমস্যা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি ও কৌশল প্রণয়নে বিশেষ গুরুত্ব
পেয়েছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ ব্যাংকিং কার্যক্রম তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণে
গুণগত পরিবর্তন এনেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাংকের সম্পৃক্ততা
স্পষ্ট। সারা বিশ্বে পরিবর্তনশীল বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ন্ত্রক
সংস্থা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন নতুন বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে।
ব্যাংকগুলোকে অধিকতর পরিপালন শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। যার মানে হলো, ব্যাংক
ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অধিকতর হস্তক্ষেপের প্রবণতা। ফলে বিশ্বব্যাপী ব্যাংকগুলো
মানবসম্পদ নিয়োগ ও পুনর্বণ্টনে মনোযোগ দিচ্ছে এবং কিছু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে
অধিকতর হারে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে সচেষ্ট হচ্ছে। বোধহয়
সবচেয়ে জোরেশোরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আজকাল নৈতিকতা, পেশাগত
সংস্কৃতি ও জবাবদিহিতার বিষয়গুলোকে বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে
সন্নিবেশিত করছেন। মূলত ভবিষ্যৎ মন্দা মোকাবেলা ও টেকসই আর্থিক খাতের তাগিদেই এমন
সব পদক্ষেপ। নীতিপ্রণেতা ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার এরূপ চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে
দক্ষ মানবসম্পদে বিনিয়োগ বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসা কৌশল
নির্ধারণে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা
নিরূপণে ঋণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, শ্রেণীকৃত
ঋণের স্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এটি বাংলাদেশের
ব্যাংকিং খাতের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। একথা সত্য, গত
দুই দশকে শ্রেণীকৃত ঋণের আনুপাতিক হারে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। এ সমস্যার বেড়াজাল
থেকে বেরিয়ে আসতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সময় লাগছে। ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও
শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে চলেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসেবার ক্ষেত্রে এবং মানি লন্ডারিং ও জঙ্গি অর্থায়ন মোকাবেলায়
বিশ্বের অন্যান্য ব্যাংকিং খাতের মতো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ক্রমাগত
নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের নিত্যনতুন পরিচালন নীতির মুখোমুখি হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে
পরিপালন ঝুঁকি বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি অন্যতম প্রধান
চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা আরো জটিল সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় নতুন লোকবল নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান জনশক্তির মধ্যে
দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এ খাতে আরো অধিক বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।
একদিকে যেমন পরিচালন ব্যয় সামগ্রিকভাবে বেড়েছে, অন্যদিকে পরিচালনা পর্ষদের ওপর
ব্যাংকিং কার্যক্রমের লভ্যাংশের লক্ষ্য নির্ধারণে চাপ তৈরি হচ্ছে।
বর্তমান ও আগামী দিনের ব্যাংকিং খাতের
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মানবসম্পদ উন্নয়ন ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির বিকল্প নেই। একটি
প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অবশ্যই সমস্যা,
বাধা,
উত্থান-পতন ও মন্দা আসবে। এ সময়কালই একটি নেতৃত্বের যোগ্যতার পরীক্ষার সময়।
কার্যকরী নেতৃত্ব ও দক্ষ মানবসম্পদ এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানকে সচল রেখে লক্ষ্য
অর্জনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। বিশ্বমন্দা পরিস্থিতিতেও সার্বিকভাবে
ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। আর এর সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যাংকগুলোয়
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। নীতিনির্ধারণী তথা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার
চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতের নেতৃত্বের মাঝেও সংগতিপূর্ণ পরিবর্তন বাঞ্ছনীয়।
বর্তমান পরিস্থিতি সামনে রেখে ব্যাংকিং খাতের নেতৃত্ব তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোয়
সুদক্ষ মানবসম্পদের সমন্বয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করবেন, যা
নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী ভূমিকা পালনের সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তার
সন্তুষ্টি ও শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট হবে। এই নিয়ন্ত্রণ বা
নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক,
ভোক্তা ও শেয়ারহোল্ডার—এই মূল
অংশীদারি পক্ষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা তথা কার্যক্রম ব্যাংক নেতৃত্ব ও ব্যাংক
নির্বাহীদের এ সময়ের একটি কঠিনতম চ্যালেঞ্জ।
প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে পরিকল্পনা
প্রণয়ন ও নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি যোগ্য নেতৃত্ব সহযোগী অধীনস্থ বা অনুসারীদের
পর্যাপ্ত উৎসাহ ও প্রেষণার উৎস হিসেবে কাজ করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়
সহযোগীদের মতামত গ্রহণ ও তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
অধীনস্থদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার প্রদান
করতে হয়, যা তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধের জন্ম দেয় এবং প্রতিষ্ঠানকে নিজের করে
ভাবার সুযোগ করে দেয়। একজন সফল নেতা অধীনস্থদের দায়ভার নিজের কাঁধে নেয়ার মানসিকতা
ধারণ করেন। সহযোগী বা অনুসারীদের অগ্রগতিতে আনন্দিত হন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে
যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নেতৃত্ব বর্তমানকে ছাড়িয়ে যাবে এটাই
স্বাভাবিক ও কাম্য। সফল নেতৃত্ব পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে যোগ্য নেতৃত্বের উত্থানের
জন্য চারণভূমি তৈরি করেন। যে নেতৃত্ব উত্তরসূরি তৈরি করতে ব্যর্থ, সে
নেতৃত্ব অন্তত নেতৃত্বের মাপকাঠিতে সফল বলে গণ্য হওয়ার কারণ নেই বলে মনে করি।
ব্যাংক নেতৃত্বের বিকল্প নেই।
সার্বিকভাবে ব্যাংক পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি নেতৃত্ব পরিমণ্ডল
দায়িত্ব পালন করে। অর্থাৎ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ নেতৃত্ব বা ব্যবস্থাপনা
সার্বিকভাবে ব্যাংকের নীতিমালা প্রণয়ন,
সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা
রাখে। অবশ্যই পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্ব হওয়া উচিত নীতি ও দিকনির্দেশনামূলক। আর
শীর্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়োজিত থাকবে নীতির বাস্তবায়ন ও দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনায়। এ
ভূমিকার সুষ্ঠু বণ্টন ব্যাংক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমার বিশ্বাস আজকের বিআইবিএমের
বার্ষিক কনফারেন্সের প্রথম দিনের দুটি সেশনের উপস্থাপনায় এবং আলোচনায় উল্লিখিত
সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো বিশেষ স্থান পাবে এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ
পথ চলায় তা যথাযথ ভূমিকা রাখবে।
ড. শাহ্ মো. আহসান
হাবীব: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক
ও পরিচালক প্রশিক্ষণ এবং বিআইবিএমের বার্ষিক ব্যাংকিং কনফারেন্স-২০১৯-এর
কার্যকরী কমিটির সভাপতি