সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ড ফাইন্যান্স ‘গ্লোবাল সফট পাওয়ার ইনডেক্স ২০২৩’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নোয়ে সফট পাওয়ার ধারণাকে জনপ্রিয় করেন। সফট পাওয়ার বলতে সামরিক শক্তি ব্যতিরেকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে উদ্ভূত কোনো জাতির ক্ষমতাকে বোঝায়। এ এক অসামরিক সূচক ভিত্তিতে মূল্যায়ন। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু ২০২২ সালের ৩৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৭ শতাংশ বেড়ে ২০২৩ সালে ৫০৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ব্র্যান্ড জাতিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ গত বছর বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের পর রয়েছে উজবেকিস্তান (৩২ শতাংশ), আজারবাইজান (৩০ শতাংশ), সংযুক্ত আরব আমিরাত (২৪ শতাংশ) ও জর্জিয়া (২৩ শতাংশ)। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু সবচেয়ে বেশি যার পরিমাণ পাকিস্তানের দ্বিগুণের বেশি এবং শ্রীলংকার ১০ গুণ। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদাহরণ এবং বিশ্বব্যাংক ঘোষিত দারিদ্র্য দূরীকরণের এক উদ্দীপক মডেল।
কিছুদিন আগে আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসালটেটিভ গ্রুপ ‘দ্য ট্রিলিয়ন ডলার প্রাইজ’ শিরোনামে বাংলাদেশের ওপর বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১৬-২১ সময়ে বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ যা তার তুলনীয় দেশ ভিয়েতনাম, ভারত, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনস এসব নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে অনেক বেশি ভালো করেছে। এ প্রবৃদ্ধির হার নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড়ের চেয়ে দুই গুণ বেশি এবং বিশ্বের গড় হারের (২ দশমিক ৯ শতাংশ) চেয়ে অনেক বেশি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে ভোক্তাদের আশাবাদ, ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি, উদীয়মান তরুণ শ্রমশক্তি, উচ্চ অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা, ডিজিটাল উচ্চ গতিবেগ, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যক্তি খাতে দ্রুত বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্রুত বর্ধনশীল গিগ অর্থনীতি। স্বাধীনতার পর মোট বিনিয়োগে সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৮৫ শতাংশ, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ। যখন অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে হাত দিই তখন বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ছিল ৮৭ শতাংশ ও সরকারি বিনিয়োগ ছিল ১৭ শতাংশ। ভাবা যায় কি বিশাল পরিবর্তন! আমাদের অভ্যন্তরীণ শক্তিমত্তার এ এক সফল ভিত্তি, উন্নয়নের এসব বিষয় যেভাবেই হোক আমাদের স্বতন্ত্র থিংক ট্যাংকগুলোর বরাবরের মতো দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি ১০ শতাংশ হারে বাড়ে তাহলে ২০৩০ সালে মাত্র ৫ শতাংশ হারে বাড়লেও ২০৪০ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের বড় ইকোনমিতে পরিণত হবে। আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংক কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আমরাও এ পূর্বাভাস আগের লেখাগুলোয় তুলে ধরেছি। বর্তমান হারেও যদি বাড়তে থাকে ২০৪০ সালের আগেই (২০৩৫) ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে দেশ। একটা বিষয় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম সহনশীল অর্থনীতির একটি। ২০০৭-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় বাংলাদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ যা ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড এসব নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ ও বিশ্বের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি ছিল। করোনার সময়ও দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল যেখানে বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির দেশসহ বেশির ভাগ দেশেই এ হার ছিল নেতিবাচক। লন্ডনভিত্তিক আরো একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি নিয়ে প্রক্ষেপণ করে যা ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লীগ টেবিল’ নামে পরিচিত। ২০২৩ সালের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, চলতি মূল্যে ২০৩৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার হবে ১৬২৮ বিলিয়ন ডলার (দেড় ট্রিলিয়নের বেশি) অর্থাৎ বাংলাদেশ ২০২২ সালের ৩৪তম অবস্থান থেকে ১৪ ধাপ এগিয়ে ২০৩৭ সালে ২০তম বৃহত্তম অর্থনীতি হবে।
এক দশক আগেও বাংলাদেশের সাফল্যকে ‘আকস্মিক’ ধরা হতো। শুরুতে প্রতিকূল পরিস্থিতি, প্রায় সর্বস্তরে দুর্নীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও সমজাতীয় আয়ের দেশের তুলনায় একবিংশ শতকের প্রথম দশকের শেষের দিক থেকে শুরু হয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বিভিন্ন সামাজিক অগ্রগতি অনেকের কাছে ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ বা ‘উন্নয়ন গোলকধাঁধা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। একাডেমিসিয়ানদের বাইরেও একই ধরনের মত পাওয়া যায় যে বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে সামাজিক সূচকে অন্যান্য সমজাতীয় দেশের তুলনায় অগ্রগতি লাভ করতে সমর্থ হয়েছে তা প্রথম জানা যায় বিশ্বখ্যাত ইকোনমিস্ট পত্রিকায়। বাংলাদেশের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, বরং আছে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রয়েছে নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কীভাবে এগোল তার বাস্তব অনুধাবন অত্যন্ত উদ্দীপক বিষয়।
একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বাংলাদেশের জণগণের দারিদ্র্য নিরসন ও কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে পরিকল্পনায় গুণগত পরিবর্তন। ভিশন-মিশন নিয়ে জাতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কৃষিপ্রধান অর্থনীতি থেকে এখন শিল্প ও সেবা খাতের অগ্রসর নিশ্চিত হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি আসত কৃষি থেকে, এখন কৃষির অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্পের অবদান ৮ শতাংশ হতে ৩৫ শতাংশ হয়েছে। তবে কর্মসংস্থানের বিচারে এখনো কৃষির অবদান (৪০ শতাংশ) অনস্বীকার্য। গত দেড় দশকে সরকার ধারাবাহিকভাবে কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। ফলে একসময়ের দুর্ভিক্ষ থেকে বাংলাদেশ এখন খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাষযোগ্য জমি হ্রাস পেলেও চালের উৎপাদন ৫০ বছরে প্রায় চার গুণ বেড়েছে। শুধু খাদ্যশস্য নয়, গম, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফল উৎপাদন বহুলাংশে বেড়েছে। সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির ফলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি, কৃষি গবেষণায় নতুন জাত উদ্ভাবন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সরকারগুলো অসামান্য অবদান রেখেছে। তাছাড়া তৃণমূল জনগণের উদ্যোক্তা মনোভাব ও প্রতিকূল পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার দক্ষতা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নকে বহুলাংশে ত্বরান্বিত করেছে। গত দশকে সরকারের সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছে।
বিগত দশককে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে। বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বেশির ভাগই অর্জন করতে সক্ষম হয়। এর ফলে বাংলাদেশ ডজনের বেশি আন্তর্জাতিক সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হয়। বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয় এবং স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার শর্ত দুবার (২০১৮ ও ২০২১) পূরণ করে। বাংলাদেশের উন্নয়নের যত মাইলফলক ও অর্জন তা এ দেড় দশকে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশের গত দশকের প্রথম ভাগ থেকে চলমান এ উন্নয়নের মূলে নেপথ্যে ভূমিকায় যে চলকগুলো রয়েছে মোটাদাগে সেগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: বাংলাদেশের রূপান্তরের পেছনে সবচেয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি ও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকার কারণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। স্থিতিশীল অর্থনীতির কারণে গত দশকে চীনের পরই বাংলাদেশের গড় মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি সবচেয়ে বেশি ছিল। তাছাড়া সরকার ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নতির জন্য অবকাঠামোভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ এ সময়টায় দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিলসহ ফ্লাইওভারের যুগে প্রবেশ করেছে। সেই সঙ্গে প্রায় প্রতিটি উপজেলায় গ্রামে গ্রামে সড়ক সংযোগ ও বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়ার ফলে প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র ও বাজারগুলোয় সংযুক্ত হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা চলে এসেছে। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত ব্লুমবার্গ সংবাদ সংস্থা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেছে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় তার সময়োচিত সংস্কার পদক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য। এমনকি এ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্যই আগামী নির্বাচনে তিনি চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসতে পারেন বলে সংবাদ সংস্থাটি এরই মধ্যে মন্তব্য করেছে।
ডিজিটাল ডিভিডেন্ড: দেশে এখন ডিজিটাল রূপান্তর চলমান রয়েছে এবং মোবাইল ব্যবহারকারী ১৭৭ মিলিয়ন। গত ১০ বছরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার বেড়ে হয়েছে ৭০ শতাংশ। ২০১৯ সালে ডিজিটাল অর্থনীতির আকার ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন থেকে ২০২২ সালে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পরিণত হয়েছে। সরকারও অর্থনীতির জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে। গত দশকে সরকারি ব্যয় তিন গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নবম বৃহত্তম মোবাইল বাজার। বিকাশ এখন বিশ্বের শীর্ষ মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। নিজস্ব ইলেকট্রনিকস পণ্যে দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। ৬ লাখ ৫০ হাজারের অধিক ফ্রিল্যান্সারের বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অনলাইন শ্রমিকের সরবরাহকারী (বিশ্বের মোট ফ্রিল্যান্সারের ১৫ শতাংশ)। দেশে ফেসবুকে এখন ৫০ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা রয়েছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ তথা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সরকার এখন জনগণের দোরগোড়ায় সেবা দিতে বদ্ধপরিকর। ডিজিটাল আউটসোর্সিং সেবা প্রদানে সারা দেশে এখন প্রায় সাড়ে ছয় লাখ তরুণ জড়িত রয়েছে। এরা অর্জন করছে বছরে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। প্রধানত আশঙ্কা প্রকাশ ব্যতীত আমাদের থিংক ট্যাংকগুলো কিংবা স্বাধীন অর্থনীতিবিদ ও চিন্তকরা এ নব উত্থিত ভেতরের বিষয়গুলোকে এখনো গবেষণার বিষয়বস্তু করেনি।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব: প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা বিশ্বের বিভিন্ন নামকরা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। তার অর্থনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায় রূপকল্প ২০২১ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে। তিনি বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে উন্নয়নের চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে যেতে চান। রূপকল্প ২০২১-এর মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নের একটা ধাপ তথা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে চেয়েছেন। ফলে এই প্রথম দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান তথা মানুষের মধ্যে এক ধরনের জনআকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। এ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। তারই দিকনির্দেশনায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, কৃষি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য অভূতপূর্ব শতবর্ষের বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রণয়ন করা হয়। সামাজিক সুরক্ষা পদ্ধতিকে আরো কার্যকর ও গতিশীল করার জন্য জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করা হয় একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগে, তারই আন্তরিক সদিচ্ছায়। রূপকল্প ২০২১-এর পর রূপকল্প ২০৪১-এর সমৃদ্ধিশালী দেশ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে তিনি দৃঢ়প্রত্যয়ী। দেশকে উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়েই সরকার বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য নিরসনে কাজ করছে। প্রয়োজনীয় ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো দ্রুত গড়ে তুলেছে।
উদ্যোক্তা মনোভাব জাগিয়ে তোলা: ২০১৬-১৭-এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী আমাদের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের। নারীদের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৯২ শতাংশ। গ্রাম ও মফস্বলে এখন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণের সম্প্রসারণের ফলে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক অংশগ্রহণ বেড়েছে। সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপে উঠে এসেছে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে এরই মধ্যে (২০২২-২৩) ৪২ দশমিক ৬৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বেকার সমস্যা ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। গ্রামাঞ্চলে গ্রোথ সেন্টারের সম্প্রসারণ, কৃষির আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো সুবিধাদির কারণে মানুষ এখন ঝুঁকি সহনশীল ও বিনিয়োগপ্রবণ। বহুমুখী কৃষি কর্মকাণ্ড প্রসারিত হয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক গতিশীলতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের উন্নয়নের নিয়ামক ভূমিকা পালন করছে। রাজনৈতিক কারণে কিংবা সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের উত্থানে কোনো বড় সামাজিক অস্থিরতা তৈরি না হলে উন্নয়নের এ গতি অব্যাহত থাকবে চলমান এ অবিশ্বাস্য গতিতে।
ড. শামসুল আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার