জুলাই গণ-অভ্যুত্থান

জুলাইয়ে স্বদেশের সংকট প্রবাসীদের ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছিল

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, যা দেশের সীমা অতিক্রম করে বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের মনোজগতেও গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও তারা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রশ্নে প্রত্যক্ষ অংশীদারের মতোই উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত ও সক্রিয় ছিলেন। প্রবাসীদের জীবনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, জীবন বাস্তবতায় তারা দেশান্তরিত হলেও স্বদেশকে চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘প্রবাসী পরিচয়’ (ডায়াসপোরিক আইডেন্টিটি)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শারীরিকভাবে প্রবাসীরা হয়তো স্বদেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে অবস্থান করে, কিন্তু তাদের যাপিত জীবনের স্মৃতি, আবেগ-অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে সংযুক্ত থাকে প্রিয় জন্মভূমির সঙ্গে।

স্বদেশ চেতনার পাশাপাশি প্রবাসীদের উদ্বেগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো দেশে রেখে আসা আপনজনদের কল্যাণ-চিন্তা ও স্বদেশের প্রতি গভীর টান। চব্বিশের অভ্যুত্থানে এ উদ্বেগ বহু গুণে বেড়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং অনিশ্চয়তার খবর তাদের উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় অনেকেই রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করেছেন, ফোনে পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন, বন্ধুদের খোঁজ করেছেন। প্রবাসীদের এ মানসিক অবস্থাকে কেবল রাজনৈতিক উদ্বেগ বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে; এটি ছিল স্বজন, স্বজাতি এবং স্বদেশের প্রতি গভীর আবেগ, দায়িত্ববোধ ও মানবিক সংযোগের বহিঃপ্রকাশ।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বিভীষিকাময় মুহূর্ত ছিল যখন স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ কার্যত বন্ধ করে দেয়ার পর। প্রতিদিনের ফোনকল, ভিডিও আলাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা কিংবা সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ প্রভৃতি সবকিছু মিলিয়েই নানা মাধ্যমে প্রবাসীরা দেশকে কাছে অনুভব করেন। সেই সেতুবন্ধ অর্থাৎ ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা যেন ভিনগ্রহের বাসিন্দা হয়ে পড়লেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মুহূর্তে অসংখ্য প্রবাসীর মনে হয়েছিল যেন বাংলাদেশ হঠাৎ করেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আড়াল হয়ে গেছে। আমার মতো অনেকের চেতনায় বাংলাদেশ যেন হারিয়ে গিয়েছিল। সময় কাটাতে হয়েছিল দুর্যোগকালীন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে। দেশে কী ঘটছে, কারা নিরাপদ আছে, কারা বিপদে আছে, কীভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা যেতে পারে এসব কোনো কিছুই আর নিশ্চিতভাবে জানার উপায় ছিল না।

রাষ্ট্র যখন তথ্যপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষের কল্পনা ও আশঙ্কা বাস্তবতার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, তথ্যের অভাব প্রায়ই মানুষের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সেই অজানাকে, যার সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য ও ধারণা পাওয়া যায় না। অনেক প্রবাসী রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। কর্মস্থলে থেকেও কাজে মনোযোগ দিতে পারেননি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বসেও মন পড়েছিল বাংলাদেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে। দেশে বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্তুতি, আত্মীয়-স্বজন কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো সুযোগ না থাকায় প্রতিটি মুহূর্ত কাটছিল অনিশ্চয়তার মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য কোনো তথ্যের সন্ধানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু তথ্যের চেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ভয়তাড়িত অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার ভারই তখন ছিল বেশি।

আমি নিজেও সত্যিকার অর্থে সেই জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারিনি। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা, পেশাগত দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত কাজ—সবকিছুই যেন অর্থহীন মনে হচ্ছিল। সারাক্ষণ মনে হতো, দেশে কী হচ্ছে? আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা কেমন আছেন? পরিচিতজনদের কেউ বিপদে পড়েছেন কিনা? নানাভাবে মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু প্রবাসী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য। সেই সময় প্রবাসীদের অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাদের সম্মিলিত মানসিক যন্ত্রণা। একজনের উৎকণ্ঠা আরেকজনের উদ্বেগকে স্পর্শ করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্রবাসী গ্রুপ, কমিউনিটি ফোরাম এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলো তখন পরিণত হয়েছিল উদ্বিগ্ন মানুষের অনানুষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থায়। কেউ সামান্য কোনো তথ্য পেলেই অন্যদের জানাতেন, কেউ সম্ভাব্য যোগাযোগের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন, কেউ আবার শুধু মানসিক সমর্থন দেয়ার জন্য অন্যদের পাশে দাঁড়াতেন। এ সম্মিলিত উদ্বেগ ও পারস্পরিক সংযোগই প্রমাণ করে যে প্রবাসী সম্প্রদায় কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের সমষ্টি নয়; বরং একটি বিস্তৃত মানবিক ও আবেগিক নেটওয়ার্ক, যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে স্বদেশ চেতনা।

প্রবাসীদের জীবনে হয়তো অনেক স্মৃতি আসে-যায়, কিন্তু দেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জুলাইয়ের সেই মুহূর্তগুলো তারা কোনোদিন ভুলতে পারবেন না। তখন ভৌগোলিক দূরত্ব যেন হঠাৎ করেই বহু গুণ বেড়ে গিয়েছিল। প্রবাসীরা নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন যে দূরে থাকলেও তাদের হৃদয়, চিন্তা এবং অস্তিত্বের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গেই বাঁধা। স্বদেশের সংকট তখন তাদের ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছিল। প্রবাসীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা। তারা কেবল অর্থ পাঠান না; দেশের সুখ-দুঃখ, উন্নয়ন ও সংকটের অর্থনৈতিক দায়ভারও বহন করেন। ফলে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের জন্য কেবল একটি সংবাদ নয়; বরং তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রবাসীরা যখন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তখন সেই উদ্বেগের সঙ্গে অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে।

ওপরে তুলে ধরা এ তিন বাস্তবতা তথা স্বদেশ চেতনা, আপনজনের প্রতি আবেগগত বন্ধন এবং অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ফলে তারা কেবল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাননি; বরং নানা পন্থায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছেন এ নাগরিক অধিকার আদায়ের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংগ্রামে। ভৌগোলিক দূরত্ব তাদের শারীরিক উপস্থিতিকে সীমিত করতে পেরেছিল, কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনা, গণদাবির পক্ষে অবস্থান এবং স্বৈরাচারী সরকারবিরোধী কর্মতৎপরতাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে দূর থেকে পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তাদের আন্দোলনের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর বিশেষ সক্ষমতা দিয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানে প্রবাসীদের সবচেয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল তথ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যখন তথ্যপ্রবাহ নানা সীমাবদ্ধতা, বিভ্রান্তি এবং নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়ছিল, তখন প্রবাসীরা বিকল্প তথ্যপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্লাটফর্ম, ওয়েবিনার, লাইভ আলোচনা, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা দেশের পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া খণ্ডিত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচারে অনেক প্রবাসী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে দেশের ভেতরের আন্দোলনকারী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগ সেতু তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, অনুবাদ, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দেশের অভ্যন্তরে যে কণ্ঠস্বর কখনো কখনো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, তা প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। প্রবাসীরা কেবল তথ্যের গ্রহীতা ছিলেন না; বরং তারা তথ্য-নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তথ্যসংগ্রাম তথা ‘ইনফরমেশন অ্যাক্টিভিজম’-এর সক্রিয় অংশে পরিণত হয়েছিলেন। একবিংশ শতাব্দীর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলন-সংগ্রামে তথ্যপ্রবাহের গুরুত্ব বিবেচনা করলে এ ভূমিকার তাৎপর্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রবাসীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, আহত ব্যক্তি, নিহতদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বহু প্রবাসী ব্যক্তি ও সংগঠন আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশীরা নিজ নিজ উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহ করেছেন, সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং সংকটাপন্ন পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানবিক সহায়তার এ প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং এটি ছিল জাতীয় সংহতি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি শক্তিশালী প্রকাশ। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত করার আহ্বানও দেখা যায়, যা সরকারের প্রতি এক ধরনের প্রতীকী এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল। প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেছিল যে রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থান প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এ উদ্যোগের ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এটি ঐক্য ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছিল।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে প্রবাসীদের ভূমিকার একটি বিশেষ দিক ছিল তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘নাগরিক কূটনীতি’ (সিটিজেন ডিপ্লোমেসি) বলা হয়, যেখানে সাধারণ নাগরিকরাই আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন। প্রবাসীদের অনেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। অনেক দেশে স্মারকলিপি প্রদান, চিঠি প্রেরণ, গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন, সংবাদ সম্মেলন এবং প্রতিনিধি বৈঠকের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরে থেকেও তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছেন।

রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাংলাদেশীরা প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, আলোচনা সভা এবং সংহতি কর্মসূচির আয়োজন করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি, বার্লিন, প্যারিস, রোম, স্টকহোমসহ বিশ্বের নানা শহরে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণে সহায়ক হয়েছিল। বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ একটি জাতীয় ইস্যুর গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। প্রবাসীদের এ ভূমিকা অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। চব্বিশের অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে যে প্রবাসীদের ভূমিকা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন-আলোচনায় প্রবাসীদের অবদানকে প্রায়ই অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো তারা দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখনো তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা ভৌগোলিকভাবে দূরে অবস্থান করলেও নিজেদের দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নৈতিক ভবিষ্যৎ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন মনে করেননি। শুধু আজকের বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসরত মানুষের নয়; এটি একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত পেশাজীবীদের, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশীরও। তাদের প্রত্যেকের জীবন, স্বপ্ন ও পরিচয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে দেশের সংকট, সংগ্রাম কিংবা অর্জন তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশে পরিণত হওয়াই স্বাভাবিক।

প্রবাসীরা কেবল অর্থনৈতিক অবদানের উৎস নন; তারা একই সঙ্গে জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক শক্তি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে প্রবাসীদের এ সক্রিয় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী নাগরিক এবং প্রবাসীদের মধ্যে আরো শক্তিশালী, প্রাতিষ্ঠানিক এবং টেকসই সেতুবন্ধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ একটি জাতির শক্তি কেবল তার ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার মানুষের জ্ঞান, শ্রম, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা, ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতার মধ্যেও নিহিত থাকে। যে রাষ্ট্র তার প্রবাসীদের কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস হিসেবে দেখে, সে রাষ্ট্র তাদের প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে না। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা যেখানে প্রবাসীদের দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, নীতিনির্ধারণ এবং রাষ্ট্রগঠনের বৃহত্তর অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ড. মাহরুফ চৌধুরী: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য

আরও