কয়েক বছর ধরে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। করোনা মহামারী আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে আমরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারি যার পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব নয়। এ রকম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েও উন্নয়নের পথ অনুসন্ধান করা এ সময়ের চ্যালেঞ্জ।
একটি দেশের উন্নয়নের মৌলিক নীতিগুলো জনগণের সংগ্রামের মাধ্যমে তাদের আকাঙ্ক্ষা থেকে উদ্ভূত হয়। অতএব উচ্চাকাঙ্ক্ষী উন্নয়ন নীতি হলো, মানুষ কোন ধরনের সমাজে বাস করতে চায় তার একটি বোধগম্যতা। রূপান্তর অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে গভীরভাবে নিহিত। অতএব দুটি বিপরীত মেরুর মধ্যে অবিচ্ছিন্ন দ্বন্দ্ব এবং সংগ্রাম রয়েছে—আকাঙ্ক্ষা ও চাপ প্রয়োগ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয়, রাষ্ট্র ও বাজার উভয়ই আরো নিবর্তনমূলক ও জবাবদিহিতাহীন হয়ে উঠেছে। বাজার আগ্রাসী পথ অনুসরণ করছে। নির্বাহী ক্ষমতার দাপটে সংবিধান লঙ্ঘিত হচ্ছে। সংবিধান আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর ভিত্তি। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকদের সামাজিক চুক্তি ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড়িয়েছে।
একটি সমাজে ক্ষমতার বিন্যাস সরকারি সম্পদের বরাদ্দ ও বণ্টন নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনশীল বিষয়। আইনের শাসন বজায় থাকার কথা। বখরা-বণ্টনকারী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে দেয়। জবাবদিহিতার অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে ওঠে স্বৈরাচারী। তাই জবাবদিহিহীন সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় নাগরিকদের কল্যাণকে খুব কমই অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
মানুষের ভালো থাকা”জনসমাজের (পাবলিক সোসাইটি) শক্তিশালী উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। জনসমাজের উদ্ভব হয় যখন ক্ষমতা সাধারণ বণ্টনের মতো মধ্যবর্তী জনসংখ্যার মধ্যে নিহিত থাকে। বাস্তবে তির্যক বণ্টন ব্যবস্থা লক্ষণীয়। ক্ষমতাচর্চা তারাই করে।
কভিড-১৯ মহামারী কয়েক দশকের অগ্রগতি এবং উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত ও স্থলবেষ্টিত স্বল্পোন্নত এবং বিশ্বের ছোট উন্নয়নশীল দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে। নানা সংঘর্ষের কারণে অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে।
অর্থনৈতিক কার্যক্রমে শ্লথগতি নীতিকাঠামোর বিচ্যুতিগুলোকে উন্মোচন করেছে। উল্লেখযোগ্য হারে মজুরি স্তরের অবনমন হয়েছে, জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হয়েছে। এর পেছনে দায়ী সামাজিক সুরক্ষা এবং আর্থিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর অনুপস্থিতি। সরকারও উন্নয়ন, জনসেবায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অর্থনৈতিক বিভাজনের আকার বাড়িয়েছে। আয়বৈষম্যও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বৈষম্য আগের চেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং স্পষ্টভাবেই তা প্রকাশ পাচ্ছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনো স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। যদিও প্রায়ই এগুলো সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সাংবিধানিক অনুমোদন দেয়া হলেও রাষ্ট্রের ওপর এসব মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নেই। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সম্পদ বরাদ্দ নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও এগুলো নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
এসব অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারার ব্যর্থতা ব্যক্তি খাতকে বাজার ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো প্রয়োজনীয় খাতগুলোর বেসরকারিকরণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে উপেক্ষা করে কেবল চিহ্নিত সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সহায়তা করে। যখন একটি রাষ্ট্র কার্যকরভাবে এসব পণ্য ও পরিষেবার বাজার নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয় এবং সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারে না, তখন এর পরিণতি মারাত্মক হয়।
একটি অসম রাজনৈতিক বন্দোবস্ত অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। এ চিত্র উন্নত এবং উন্নয়নশীল উভয় দেশে পরিলক্ষিত হয়। এসব দেশে নীতিগুলো কার্যকর করা হয় ওই সিস্টেমকে অর্থায়নের জন্য, যে সিস্টেম সংকট সৃষ্টি করেছে। সরকার প্রধান বিষয়গুলোকে প্রাধান্য না দিয়ে অপ্রধান বিষয়াদির ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকে। ফলে দুর্ভাগা জনগণ ভোগান্তির শিকার হয়। তারা তাদের সঞ্চয়, চাকরি, পেনশন ও ঘর খোয়ায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। এসব দেশে সরকার প্রায়ই আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং শাসকদের সঙ্গে যুক্ত অভিজাতদের উদ্ধারের কাজে ব্যতিব্যস্ত থাকে। ফলে সবার জন্য সমসুযোগ প্রদানের মাধ্যমে উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্তরায় বাড়তে থাকে।
যদিও পুরনো মত ও পথে জং ধরেছে এবং উন্নয়নের নতুন পথ অনুসন্ধানের দাবি উঠছে। সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে হবে। বিভিন্ন জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন সামাজিক চুক্তিতে গুরুত্বপূ্র্ণ জায়গা নিতে হবে সবুজ, নিরাপদ এবং উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।
কভিড-১৯ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আকস্মিক ধাক্কাগুলো আগামীতে পুনরায় সামাজিক, আর্থিক এবং প্রযুক্তি খাতে নেতিবাচক অভিঘাতের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের বিতর্ককে জোরদার করছে। টেকসই ভবিষ্যতের জন্য আন্তঃপ্রজন্মীয় সমতাভিত্তিক রূপান্তরের পথে হাঁটতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, অর্থনৈতিক অবনতি, পরিবেশগত ক্ষতি, প্রযুক্তিগত অনিশ্চয়তা এবং জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা মোকাবেলার জন্য কৌশল প্রয়োজন। কেননা বিশ্ব এখনো সমতা, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার থেকে বহু যোজন দূরে।
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ৫৩ বছর পূর্ণ করেছে। কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করেছে। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র কুখ্যতি, পরনির্ভরতা ও দুর্ভিক্ষ থেকে নিজেকে বিশ্বের কাছে ‘উন্নয়ন বিস্ময়ে’র কৌতূহল উদ্দীপক দেশে রূপান্তরিত করেছে। তবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। যদিও ভৌগোলিক আকারের দিক থেকে ৯৪তম অবস্থান। দেশের অধিকাংশ ভূখণ্ডের সীমানা ভারতবেষ্টিত। এছাড়া কিছু অংশ মিয়ানমারের সঙ্গে এবং চীনের কাছাকাছি রয়েছে। মূলত কৌশলগতভাবে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বঙ্গোপসাগর আরো গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কেন্দ্রে অবস্থিত। চীনের দক্ষিণ স্থলবেষ্টিত অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম। বঙ্গোপসাগর বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদেরও আধার।
স্বাধীনতা-পরবর্তী পাঁচ দশকে ভূরাজনৈতিক নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন কারণে ভূরাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে এখন আরো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দাবি করছে। গৌরবময় সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়েছে।
এক্ষেত্রে আমাদের সভ্যতার উত্থান ও পতনের বৈজ্ঞানিক ইতিহাস দিকনির্দেশনা দিতে পারে। শস্যভিত্তিক কৃষি এশিয়ার বিভিন্ন সভ্যতাকে অন্যান্য সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। মৌসুমি বায়ু এশিয়ায় কৃষির বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়; আর শীতকালে উত্তর-পূর্ব থেকে প্রবাহিত হয়। মৌসুমি বায়ুর গতিবেগ অনুসারে জাহাজের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করা হতো।
এশিয়ায় ধান মূলত অন্যান্য ভূখণ্ডের সঙ্গে এশিয়ার সংযোগ স্থাপনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। ধান শস্যের মধ্যে প্রতি হেক্টরে সবচেয়ে বেশি ক্যালোরি উৎপন্ন করে এবং স্বাস্থ্যের জন্য কম ক্ষতিকর। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ সমাজগুলোয় খাদ্যের জোগান দেয়া সম্ভব হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক বন্দোবস্তের গুরুত্ব অপরিসীম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, খেমার অঞ্চলের আঙ্কোরের কথা। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে তাদের জল ব্যবস্থাপনা ভেঙে গেলে সমাজ অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছিল।
সম্প্রতি বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বরে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে শস্যদানার মধ্যে জাপোনিকা ধান পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে আমরা এ বার্তাই পাই যে, পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে আমাদের সংযোগ অনেক পুরনো। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ ও আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নে এ আবিষ্কার বাংলাদেশকে পথ দেখাবে।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়