স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে দেশে খাদ্যনিরাপত্তার ঘাটতি খুবই কম। তবে পুষ্টিনিরাপত্তাহীনতার মাত্রা এখনো বেশি। বিভিন্ন হিসাব থেকে প্রতীয়মান হয় যে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এখনো পুষ্টিহীতার শিকার। ভগ্নস্বাস্থ্য, রোগ ও অকালমৃত্যু তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এরূপ দৈন্যদশা থেকে ভুক্তভোগী মানুষকে উদ্ধার করার জন্য তাদের পৃষ্টিনিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে পুষ্টির অন্যতম নির্ভরযোগ্য উপখাত পশুপাখি, মৎস্য ও ফলমূল উৎপাদনের ওপর মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হচ্ছে।
কৃষি খাতের একটি অন্যতম উপখাত প্রাণিসম্পদ। দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে এ খাতের অবদান অনীস্বাকার্য। গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানে এ খাতের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মোট দেশজ উৎপাদনে প্রাণিসম্পদের শরিকানা প্রায় ২ শতাংশ। সার্বিক কৃষি উৎপাদনে এর হিস্যা প্রায় সাড়ে ১৫ শতাংশ। সম্প্রতি খাতটি বছরে গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। মোট জাতীয় রফতানি আয়ের প্রায় ২ শতাংশ এ খাত থেকে আসে। পুষ্টির প্রধান উপকরণ দুধ, মাংস ও ডিম পশুপাখিরই অবদান। চাষাবাদে পশুশক্তির ব্যবহার এখনো প্রায় ৫ শতাংশ। এছাড়া জৈব সার সরবরাহের ক্ষেত্রেও পশুপাখির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে পশুপাখি খাতে। এক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ অপেক্ষাকৃত বেশি। এসব কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নে পশুপাখিসম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে পশুপাখির সংখ্যা বেশি। তবে উৎপাদনশীলতা কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী এ দেশে ২৫ দশমিক শূন্য ১ মিলিয়ন গরু, ১ দশমিক ৫২ মিলিয়ন মহিষ, ২৭ দশমিক ১২ মিলিয়ন ছাগল এবং ৩ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ভেড়া আছে। মোট প্রাণীর সংখ্যা ৫৭ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন। তাছাড়া মোরগ-মুরগি আছে ৩২৭ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন এবং হাঁস আছে ৬৮ দশমিক ২৬ মিলিয়ন। মোট হাঁস-মুরগির সংখ্যা ৩৯৬ দশমিক শূন্য ৪ মিলিয়ন। প্রতি হেক্টর আবাদযোগ্য জমিতে পশুপাখির ঘনত্ব ৪৬টি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় হেক্টরপ্রতি পশুপাখির সংখ্যা বাংলাদেশে বেশি। তবে তাদের ইউনিটপ্রতি উৎপাদন কম।
বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ গ্রামীণ পরিবার কোনো না কোনো ধরনের পশুপাখি প্রতিপালন করে। প্রতিটি কৃষি পরিবারে গড়ে ৩ দশমিক ১৩ সংখ্যক প্রাণী এবং ২৩ দশমিক শূন্য ৭ সংখ্যক পাখি রয়েছে। এগুলো মানুষের পুষ্টি চাহিদা মেটায়, কর্মসংস্থান করে এবং আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
পশুপাখি থেকে পুষ্টির প্রধান উপাদান দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে মোট উৎপাদন ১৫ দশমিক শূন্য ৪ মিলিয়ন টন দুধ, ৯ দশমিক ২৩ মিলিয়ন টন মাংস এবং ১৮ হাজার ৯৬ মিলিয়ন ডিম। জনপ্রতি প্রাপ্যতা প্রতিদিন ২৩৪ দশমিক ৪৫ মিলিলিটার দুধ, ১৪৩ দশমিক ৭৭ গ্রাম মাংস এবং বছরে ১৩৫ দশমিক শূন্য ৯টি ডিম। জনপ্রতি মানুষের দৈনিক চাহিদা হলো ২৫০ মিলি দুধ, ১২০ গ্রাম মাংস এবং বার্ষিক ১০৪টি ডিম। সে হিসেবে মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ম্ভর। দুধের ক্ষেত্রে স্বয়ম্ভরতার মাত্রা প্রায় ৯৪ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বিভাগের হিসাব অনুযায়ী আমাদের জনপ্রতি দুধ, মাংস ও ডিমের প্রাপ্যতা অনেক কম। সর্বশেষ হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভের ফলাফল অনুসারে বাংলাদেশের মানুষ জনপ্রতি দৈনিক মাত্র ৩৪ গ্রাম দুধ, ৪০ গ্রাম মাংস ও ১৯ গ্রাম ডিম ভোগ করছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ প্রদত্ত উৎপাদন ও জনপ্রতি প্রাপ্যতার সঙ্গে এর বিশাল ফারাক। এটা নিছকই তথ্যের বিভ্রাট নয়। প্রকৃতপক্ষে উৎপাদন ও প্রাপ্যতার পরিসংখ্যান অতিমূল্যায়িত। বাজারে এসব পণ্যের দাম বেশি। তাতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার কম। অনেক সময় কোনো কোনো প্রাণিজাত পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি ও মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য আমরা আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ি।
১৯৭২-৭৩ সালে মোট কৃষি জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের হিস্যা ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশে। অন্যদিকে শস্য খাতের শরিকানা কমেছে। আগে গ্রামাঞ্চলে ঘরে ঘরে পশু-পাখি লালন-পালন করা হতো। গরু-মহিষ পালন হতো চাষাবাদের জন্য। এখন চিরায়ত পদ্ধতির পশুপালন কম। প্রতি গ্রামে এখন গড়ে উঠেছে দুগ্ধ ও পোলট্রি খামার। গরু মোটাতাজাকরণ এখন কোনো কোনো কৃষকের বড় আয়ের উৎস। কোরবানির ঈদের সময় অধিকাংশ গরুর সরবরাহ আসে মোটাতাজাকরণ খামার থেকে। ১৫ বছর আগেও প্রতি বছর আমদানি করা হতো প্রায় ১৫-২০ লাখ গরু। এখন তা নেমে এসেছে ১ লাখের কোটায়। ব্যবসাভিত্তিক পশুপাখির খামার গড়ে ওঠার ফলেই অভ্যন্তরৗণ উৎপাদন দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫ লাখ দুগ্ধ খামার রয়েছে। এর মধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক খামারের সংখ্যা ৮০ হাজার ৭২০।
বর্তমানে বাংলাদেশে পালিত প্রায় ২৫ মিলিয়ন গরুর মধ্যে ৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন গাভী। এর মধ্যে ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন দেশী এবং ৪ দশমিক ১ মিলিয়ন সংকর জাতের গাভী। কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম জোরদার হওয়ার পর থেকে সংকর জাতের গাভীর পরিমাণ বেড়েছে।
অন্যদিকে পোলট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার মধ্যে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক খামার ৯২ হাজার ৩৪০টি। বছরে গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বাণিজ্যিক পোলট্রির সংখ্যা বাড়ছে। স্বাধীনতার পর মোট মাংস উৎপাদনে পোলট্রির অবদান ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। বর্তমানে তা ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। লাল থেকে সাদা মাংসের প্রতি মানুষের বেশি আগ্রহই এর মূল কারণ। তাছাড়া দ্রুত প্রবৃদ্ধির কারণে পোলট্রি মাংসের প্রাপ্যতা বাড়ছে। দামও অনেকটা আয়ত্তের মধ্যে। পোলট্রি খাতে মোট বিনিয়োগ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এ খাতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ কর্মে নিয়োজিত রয়েছে, যার ৪০ শতাংশই নারী।
পশুপাখিজাত পণ্যের জন্য চাহিদায় আয়ের স্থিতিস্থাপকতা বেশি। ভোক্তার আয় বাড়লে পণ্যের বাজার সাম্প্রসারিত হয়। তাতে পণ্য মূল্য বৃদ্ধি পায়, উৎপাদনকারী কৃষকের আয় বেড়ে যায়। সে কারণে পশুপাখিসম্পদ খাতে ব্যবসাভিত্তিক বড় খামার দ্রুত বাড়ছে। গড়ে উঠেছে করপোরেট কালচার। অনেক সময় বড় খামারগুলো কারসাজির মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়ায়। তাতে গরিব ভোক্তাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। বাংলাদেশে দুধ, ডিম ও মাংসের দাম পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে বেশি। এর কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ কমানো উচিত। বিপণন ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের বিপণন খরচ ও মুনাফা যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা উচিত।
আমাদের দেশে জীবন্ত পশুপাখির বাজার খুবই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসে। গরু-ছাগল ও মুরগি জবাই করা হয় যত্রতত্র। এর সংরক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অগ্রহণযোগ্য। এদের গুণাগুণ পরীক্ষায় খুব কমই পরিদর্শক মোতায়েন করা হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি রাখা উচিত।
ছোট দুগ্ধ ও পোলট্রি খামারগুলোর প্রধান সমস্যা অর্থায়ন। কোনো প্রাকৃতির দুর্যোগ বা রোগের কারণে খামারের আর্থিক ক্ষতি হলে এদের অনেকেই ব্যবস্থাপনা থেকে ছিটকে পড়ে। সহসাই উৎপাদনে ফিরে আসতে পারে না। এদের প্রয়োজন অর্থায়ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ নীতিমালায় ২০ শতাংশ ঋণ প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য নির্দিষ্ট করা আছে। কিন্তু অধিকাংশ ছোট কৃষক তার বরাদ্দ পান না। দেশের কৃষি ঋণের বেশির ভাগ অংশ বিতরণ করা হয় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর মাধ্যমে। কিন্তু এনজিও থেকে প্রাপ্ত ঋণে সুদহার বেশি। এ অবস্থায় পশুপাখির জন্য বিশেষ ঋণের পাশাপাশি বীমা সুবিধার নিশ্চয়তা থাকা দরকার। সম্প্রতি গবাদিপশু খামার ও বায়োগ্যাস প্রকল্প স্থাপনের জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে সুদহার ৪ শতাংশ। প্রাণিসম্পদ খাতের উদ্যোক্তারা এর সুবিধা নিতে পারেন।
বাংলাদেশে পশুপাখি প্রতিপালনে অনেক সমস্যা বিরাজমান। তার মধ্যে উন্নত প্রজননের অভাব, খাদ্য ও পুষ্টি সমস্যা, রোগব্যাধি, প্রশিক্ষণের অভাব ও গরু-ছাগল চুরি অত্যতম। সম্প্রতি কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পশুর জাত উন্নয়নের ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে। তবে তার সাম্প্রসারণ ধীরগতিতে চলছে। খাদ্যের বেলায় দানাদার খাদ্যের দাম বেশি। কাঁচা ঘাসের সরবরাহ কম। এক্ষেত্রে প্রচুর গবেষণা ও সম্প্রসারণকাজের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র। তাতে রোগব্যাধির প্রাদুর্ভার বেশি। সম্প্রতি লাম্পি স্কিন ডিজিজ, এফএমডি এবং পেট ফাঁপা রোগ গবাদিপশু প্রতিপালনে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পোলট্রির ক্ষেত্রে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত খামারগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। ছাগলের ক্ষেত্রে পিপিআর খুবই ক্ষতিকর রোগ। পশুপাখি থেকে মানবদেহে ছড়ায় এমন রোগ এ দেশে অনেক। এ ধরনের রোগকে বলা হয় জুনোটিক ডিজিজ। এর মধ্যে আছে অ্যানথ্রাক্স, বার্ডফ্লু, সোয়াইনফ্লু, জলাতঙ্ক, নিপা ভাইরাস ইত্যাদি। এসবের প্রতিকার দরকার। নিয়মিত ভ্যাকসিন সুবিধা প্রদান এবং ওষুধের সরবরাহ সহজলভ্য করা একান্ত প্রয়োজন। প্রতিটি গ্রামে উপজেলা ভেটেরিনারি ডাক্তার এবং তাদের সহকর্মীদের খামার পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করা দরকার। তাছাড়া গরু ও ছাগল চুরি থামানোর জন্য গ্রামভিত্তিক পাহারার ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। সর্বোপরি আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কৃষকদের নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া উচিত।
বাংলাদেশে পশুপাখির সংখ্যা অনেক। কিন্তু এদের উৎপাদনক্ষমতা কম। খামার ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়িয়ে এদের উৎপাদন আরো অনেক বাড়ানো সম্ভব। আমাদের এখন পশুপাখির সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে গুণগত মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা উচিত। এ কাজে গবেষণা বাড়াতে হবে। সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ডকে আরো খামারমুখী করতে হবে। যাবতীয় ওষুধ ও উৎপাদনের উপকরণ সহজলভ্য করতে হবে। কৃষকদের জন্য এসব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। তাতে এ খাতে উৎপাদন বাড়বে। মানুষের পুষ্টিহীনতা কমবে। কর্মসংস্থান বাড়বে। নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যাবে। এগুলো দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে।
ড. জাহাঙ্গীর আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ; সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি) এবং সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)