প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তারেক রহমান প্রথম মালয়েশিয়া সফর করলেন। এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একধরনের লুক ইস্ট পলিসি নিয়েছিলেন। তারেক রহমানের এ সফরেও কি এমন কিছুই দেখা যাচ্ছে?
প্রধানমন্ত্রী চীন সফরের পরিকল্পনা করেছিলেন। চীন সফরের আগে মালয়েশিয়া সফরটি এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মালয়েশিয়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ও সহযোগী রাষ্ট্র। বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় মালয়েশিয়ার গুরুত্ব অনেক। বিএনপির রাজনীতিতে বহুদিন ধরে লুক ইস্ট পলিসির সংস্কৃতি রয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় সফরগুলোয় তাকালে এর প্রতিফলন মিলবে। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পরও একই ধারা অনেকাংশে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। এ হিসেবে চীন সফরের আগে মালয়েশিয়ায় যাওয়াকে ‘লুক ইস্ট’ নীতিরই প্রতিফলন বলে ধরে নেয়া যায়।
আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এখন উদীয়মান অর্থনীতি এবং তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অনেক। এক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়ে আমাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত, বিশেষত মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে?
সরকার বাণিজ্য করে না। তারা বাণিজ্যের পথ মসৃণ করে। সেজন্য নানা উদ্যোগ ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এবার সরকার সবার জন্যই কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। শুধু আসিয়ানভুক্ত দেশই নয়, ইউরোপের দেশগুলোর দিকেও সমান মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছে। এখন যাদের সঙ্গেই বাণিজ্যিক সমঝোতা হয়, তারা যেন অবাধ ও মুক্তভাবে বাণিজ্য করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আমি ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকার সময় দুই দেশের বাণিজ্য পাঁচ গুণ বেড়েছিল। এদিকে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের বড় সম্পর্কের জায়গা শ্রমবাজার। দীর্ঘদিন এ বাজার আমাদের শ্রমিকদের জন্য সংকুচিত। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য উন্মুক্ত করার আলোচনা চলছে। আলোচনা সফল করার মাধ্যমে যদি দেশটিতে শ্রম রফতানি সহজ করা যায়, তাহলে আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর নতুন বাণিজ্য সম্ভাবনা খোঁজার কাজটি ব্যবসায়ীদের করতে হবে। সরকার এক্ষেত্রে বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে আমাদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে। ওখানকার শ্রমবাজার বেশ কয়েকবার বন্ধ হয়েছে। এক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য একটি সমস্যা। আবার মালয়েশিয়ায় যাওয়ার ব্যয়ও অনেক। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে সংকটগুলো সমাধান হবে বলে মনে করেন?
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে মালয়েশিয়ার বাজারে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট সমস্যার সমাধান হবে— এমনটি আশা করা সঠিক না, বরং দুই দেশের মধ্যে বহুপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সফরের মূল উদ্দেশ্য। যেমন ওখানকার শ্রমবাজার উন্মুক্ত ও যাতায়াত সহজ করা, এগুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে মন্ত্রী পর্যায় বা অফিশিয়ালদের মধ্যে। তবে নিয়োগ ব্যয়, সিন্ডিকেট, রিক্রুটিং এজেন্টদের অনিয়মের বিষয়টি সরাসরি এ সফরের মাধ্যমে সমাধান হবে না। এগুলো আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, নিয়মের কড়াকড়ি ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। এসব জায়গায় আমাদের সরকারকে কাজ করতে হবে।
মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হালাল পণ্যের বড় একটা বাজার। এ দেশগুলোয় হালাল পণ্যের বাণিজ্যে বাংলাদেশ কেমন সুবিধা করতে পারে?
মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বড় হালাল পণ্য উৎপাদক দেশ। তারা হালাল পণ্য রফতানি করে। ফলে শুধু হালাল পরিচয়ের ভিত্তিতে ওই বাজারে প্রবেশ করা সহজ হবে না। আমাদের এমন বাজার খুঁজতে হবে, যেখানে স্থানীয় উৎপাদন সীমিত এবং আমদানির সুযোগ বেশি। সেখানে বাংলাদেশী পণ্যের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গত এক দশকে মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জটিলতা আরো বেড়েছে। গত দুটি সরকারের অনেক উদ্যোগ সত্ত্বেও এখনো রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন সেভাবে শুরু করা যায়নি। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আলাপে এ বিষয়টাও ছিল। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মালয়েশিয়া এখানে কীভাবে সাহায্য করতে পারে?
মিয়ানমার আসিয়ানের সর্বশেষ সদস্য। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দায়িত্ব তাদের নয়। বাংলাদেশকে বিষয়টি আসিয়ানের আলোচ্যসূচিতে আরো জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়া সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর বাংলাদেশের জন্য কী কী ইতিবাচক বার্তা নিয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন?
প্রধানমন্ত্রী চীনের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) যোগ দিয়েছেন। সম্মেলন শেষে চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বেশকিছু বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। চীনের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অনেক ইস্যু আছে, তাদের বিনিয়োগকারীরা আমাদের দেশে আছে। সব মিলিয়ে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরো সমৃদ্ধ হবে আশা করা যায়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় চীনের সঙ্গে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যা দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে আরো বেড়েছিল। চীনের প্রধানমন্ত্রী সে সময় বাংলাদেশ সফর করেছিলেন এবং সেই সফরে দশটি চুক্তি সই হয়েছিল।
তিস্তা ব্যারাজ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, এ সফরে তিস্তা ব্যারাজের জটিলতার অবসান ঘটতে পারে কি?
তিস্তা সমস্যা ভারতের সঙ্গে। সুতরাং এর আলোচনা মূলত ভারতের সঙ্গেই হতে হবে। তবে চীন এর অংশীদার বটে। তাছাড়া চীন আমাদের অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে শক্তিধর দেশ, তাই পানি বণ্টনের ব্যাপারে চীন একটা বড় ভূমিকা রাখবে—এটাই বাংলাদেশ আশা করে। তাই চীনের সঙ্গে আলাপ নিশ্চয়ই হয়েছে এ ব্যাপারে। এক সফরে এ সমস্যার সমাধান হবে এ আশা করা ঠিক নয়, এটা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা করতে হবে। এর আগে অনেক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল। বিগত ১৫ বছর এটা নিয়ে তেমন কাজ হয়নি। আশা করছি এবার কিছুটা হবে।
পাকিস্তান বলছে তারা সার্কের পুনরুজ্জীবন চায়। জিয়াউর রহমান সার্ক প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে কোনো আশা দেখছেন সার্ক নিয়ে?
সার্কের অংশীদার মূলত সাতটি দেশ। সার্কের চার্টার অনুযায়ী শুধু পাকিস্তান বা ভারত এককভাবে কিছু চাইলেই তা হয়ে যাবে না। সবাই, বিশেষ করে ভারত এবং পাকিস্তান, যদি একটা সমঝোতায় আসতে পারে তাহলে বাংলাদেশ সেখানে একটা বড় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করতে পারে। তবে বাংলাদেশের মধ্যস্থতা ভারত যদি না মানে তাহলে এখানে আপাতত কিছু করার নেই বলে আমার মনে হয়। প্রধানমন্ত্রীর এ দুটি দেশ সফর শেষে বোঝা যাবে হয়তো যে সম্মেলন হবে কি হবে না—দুই দেশের নেতৃত্ব মুখোমুখি বসবেন কিনা। তারা যদি চায় সার্ক পুনরুজ্জীবিত হোক তাহলে আমরা আশার আলো দেখতে পাব। সার্ক ১৯৮৫ সালে গঠন হয়। তখন দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের রাজধানী একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। সার্কের বদৌলতে দেশগুলো আকাশপথে সংযুক্ত হয়েছে। এখন যদিও এটা খুব স্বাভাবিক বলে মনে হয় কিন্তু আশির দশকের আগে এটা শুধু একটা আশা ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যও তেমন হতো না। কিন্তু এখন তো হচ্ছে। এখন প্রয়োজন সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করা, বাণিজ্যের পরিসর বাড়ানো। এসব বিষয়ে আঞ্চলিক সংলাপ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে সার্ককে আরো কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেফতার হয়েছেন। ইউএই সরকার বাংলাদেশ সরকারের কাছে মামলার যেসব নথি চেয়েছে তা পাঠানো হয়েছে। তাকে দেশে এনে বিচার সম্ভব হবে বলে মনে করছেন কি?
এটা আইনি বিষয়। এছাড়া দুবাইয়ে সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তি আছে কিনা ফেরত দেয়ার তা দেখতে হবে। ইন্টারপোল গ্রেফতার করেছে, শুধু এর ওপর ভিত্তি করে তাকে ফেরত আনা যাবে না। দুবাইয়ের আদালতে তার অপরাধ প্রমাণ হতে হবে। তারপর কী করণীয় সেটা নিয়ে আইনিভাবে দেখতে হবে।
আফ্রিকার অনেক দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাদের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?
আফ্রিকার অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত এগোচ্ছে। তবে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা সেখানে কী রফতানি করতে পারব এবং তারাও আমাদের এখানে কী রফতানি করতে পারে বা কী ধরনের বাণিজ্য হতে পারে তা আগে নির্ণয় করা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও লাভজনকতা ও সক্ষমতার বিষয় বিবেচনা করতে হবে। এ মুহূর্তে আফ্রিকায় বড় আকারের বিনিয়োগের চেয়ে বাণিজ্যিক সুযোগগুলো চিহ্নিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।