সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপন হয়েছে গতকাল। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য: ‘সাহসী নতুন বিশ্বে রিপোর্টিং—স্বাধীন গণমাধ্যমে এআই-এর প্রভাব।’ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়। বিগত সরকারের সময়ে গণমাধ্যমকে অনেকটা চাপে থাকতে হয়েছে। কিন্তু অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, নতুন বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যম হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সাংবাদিকরা আওয়ামী লীগ আমলে কেউ সরকারের বিরোধিতা করলেই ‘বিএনপি-জামায়াত’ ট্যাগ লাগানো হতো। এখন ট্যাগ লাগানো হয় ‘স্বৈরাচারের দোসর’। কয়েকদিন আগে তিনটি বেসরকারি চ্যানেলের তিন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। উল্লিখিত তিন সাংবাদিকের একজন উপদেষ্টার কাছে বাংলা নববর্ষের আয়োজন ও জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। তিন সাংবাদিকের প্রশ্নের মান নিয়ে সংশয় আছে। থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। শহীদদের বিষয়ে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আরো সতর্ক ও সংবেদনশীল থাকা উচিত ছিল। কিন্তু অনুচিত প্রশ্ন করার কারণে সাংবাদিকের চাকরি যাওয়ার উদাহরণ সম্ভবত এটাই প্রথম।
আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেয়ার সময় বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২১তম। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১৫ বছরে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ৪৪ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু গত বছরের তুলনায় এ বছর বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৬ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সূচকে এবারো বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিস্থিতি বেশ গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) ২০২৫ সালের সূচক থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। ৩৩ দশমিক ৭১ স্কোর নিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম। ২০২৪ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৫তম। নেপাল (৯০তম), শ্রীলংকা (১৩৯তম) ও মালদ্বীপ (১০৪তম) বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে। যদিও তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা বলেছেন, ‘গণমাধ্যমে সরকারের হস্তক্ষেপ না থাকায় বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে এক বছরে ১৬ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ।’ এ ধারা আগামী বছরেও অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা করছি।
গণতন্ত্রের জন্য যেমন গণমাধ্যম দরকার, তেমনি গণমাধ্যমের আক্ষরিক অর্থে গণমাধ্যম হয়ে ওঠার জন্য দরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। গণমাধ্যমকে একটি রাষ্ট্রের দর্পণ বা আয়না হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই একটি রাষ্ট্রের উন্নতি, অগ্রগতি ও রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে গণমাধ্যমের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে উল্লেখ করা রাষ্ট্রপরিচালনার চারটি মূলনীতির একটি হলো গণতন্ত্র। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই প্রধান। জনসাধারণের প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করে দেশটি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করাই গণতন্ত্র। ফলে গণতন্ত্রে নাগরিকদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ ও স্বাধীনতা থাকে। গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হলে মুক্ত গণমাধ্যম তথা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
গত বছরের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। তারা বাংলাদেশের সংবিধানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় উল্লিখিত বাধ্যবাধকতাকে ক্ষুণ্ন করে, এমন সব আইন স্থগিত করারও দাবি করেছিল। এর মধ্যে দণ্ডবিধির আওতাধীন মানহানিসংক্রান্ত ফৌজদারি অপরাধ ও ঔপনিবেশিক আমলের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট রয়েছে। যেকোনো আইনি প্রতিবন্ধকতা স্বাধীন সাংবাদিকতার সহায়ক নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা আইন তেমন একটি আইন, যেটি বিগত সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রয়োগ হতে দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতেও চরিত্রগত ফারাক কম। প্রস্তাবিত আইনেও যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হলেই গ্রেফতার করার বিধান আছে। সরকার মনে করলে যেকোনো স্থাপনায় তল্লাশি ও মালামাল জব্দ করতে পারবে। কোনো রাষ্ট্র যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করে, তবে সেখানে গণমাধ্যমের একশ ভাগ স্বাধীনতা থাকতেই হবে। যে গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করবে, সেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আবার সেই সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। জনসাধারণের কথাই উঠে আসে গণমাধ্যমে। তাই এ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। গণমাধ্যম মানুষের জন্য তথ্যের বৃহত্তর প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। সরকারের সমালোচনার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, এতে গণমাধ্যমের ভূমিকাই সর্বাধিক।
গণমাধ্যম সরকার ও জনগণের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। যেকোনো রাষ্ট্রে গণমাধ্যম গণমানুষের সারথিস্বরূপ। অসহায় মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, নীতির ত্রুটি প্রভৃতি বিষয় তুলে ধরে সমাধানের পথ ত্বরান্বিত করে গণমাধ্যম। আবার দুর্নীতি, অপরাধ, অবিচার তথা সমাজের নেতিবাচক দিকগুলোর বিরুদ্ধেও থাকে সোচ্চার। আর এ সোচ্চার হওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষকে সংশোধনের পথ বাতলে দিয়ে একটি সুন্দর, নৈতিক ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলাই গণমাধ্যমের অন্যতম লক্ষ্য। একমাত্র স্বাধীন গণমাধ্যমই বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাই এ লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৯৩ সালের ৩ মে প্রথমবারের মতো বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হয়। এরপর প্রতি বছরই এ দিনটি বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়ে আসছে। কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে গণমানুষের অধিকারের সম্পর্ক খুঁজতে গেলে তাকাতে হবে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের দিকে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এ ঘোষণা দেয়া হয়। এ ঘোষণাপত্রের ১৯তম ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক মানুষেরই মতামত পোষণ ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। অবাধে মতামত পোষণ এবং রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষে যেকোনো মাধ্যমে ভাব ও তথ্য জ্ঞাপন, গ্রহণ ও সন্ধানের স্বাধীনতাও এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।’ কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য গণমাধ্যম এখনো নানামুখী চাপ ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
গণমাধ্যম হলো একটা জাতির ভিত্তি। আর এ ভিত্তি মজবুত রাখতে প্রয়োজন এর নিরপেক্ষতা, সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকের মূল বৈশিষ্ট্য হলো নীতি ও নৈতিকতা। গণমাধ্যম ও সাংবাদিককে তার নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে সবসময় অটল থাকতে হবে। আমরা আশা করি, গণমাধ্যমগুলো সংবাদ ও সাংবাদিকতার সব নিয়মনীতি মেনে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রের সঠিক ও সত্য চিত্র তুলে ধরে গণমাধ্যমের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণে সফল হবে এবং সরকার তাদের সে স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। নিশ্চিত করতে হবে সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের শান্তি প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য সহায়ক অংশীদার। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা ব্যতীত একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের সুষম উন্নয়ন কখনই সম্ভব নয়। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিতকরণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জনগণের একটি মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের ধারার ৩৯(১)-এ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে এবং ৩৯(২)-এ সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। যেখানে গণমাধ্যম যত বেশি শক্তিশালী, সেখানে গণতন্ত্র তত বেশি শক্তিশালী। গণমাধ্যমের সঠিক চর্চা যেমন গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারে, তেমনি প্রকৃত গণতন্ত্র পারে গণমাধ্যমকে স্বাধীন রাখতে। স্বাধীন গণমাধ্যম যেকোনো সরকারের সেরা বন্ধু। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচক হিসেবে ধরা হয়। একটি দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে কি নেই এবং নাগরিকের চিন্তার স্বাধীনতা আছে কি নেই, তা দিয়ে সহজেই গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি পরিমাপ করা সম্ভব।