শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশনা ব্যবসা ও কাজী আনোয়ার হোসেন

কাজী আনোয়ার হোসেন চিরবিদায় নিলেন (১৯ জানুয়ারি, ২০২২) ৮৫ বছর ছয় মাস বয়সে। বাংলা রহস্য সাহিত্যের এক প্রবাদপুরুষ তিনি, যদিও সাহিত্যের মূলধারার লেখক-সমালোচক-বোদ্ধাদের বেশির ভাগের কাছেই ঠিক পছন্দনীয় ছিলেন না, নেইও। তার লেখালেখি ও কাজকে তারা মানসম্মত সাহিত্য বলেও মনে করতেন না। অথচ বাংলা সাহিত্যে আধুনিক বিশ্বের গুপ্তচরগিরিভিত্তিক রহস্য-

কাজী আনোয়ার হোসেন চিরবিদায় নিলেন (১৯ জানুয়ারি, ২০২২) ৮৫ বছর ছয় মাস বয়সে। বাংলা রহস্য সাহিত্যের এক প্রবাদপুরুষ তিনি, যদিও সাহিত্যের মূলধারার লেখক-সমালোচক-বোদ্ধাদের বেশির ভাগের কাছেই ঠিক পছন্দনীয় ছিলেন না, নেইও। তার লেখালেখি কাজকে তারা মানসম্মত সাহিত্য বলেও মনে করতেন না। অথচ বাংলা সাহিত্যে আধুনিক বিশ্বের গুপ্তচরগিরিভিত্তিক রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনী নিয়ে আসেন তিনি। সৃষ্টি করেন বাংলা সাহিত্যে প্রথম স্পাই থ্রিলার স্পাই বা গুপ্তচর চরিত্র মাসুদ রানার। সেটা ১৯৬৬ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের ছাত্র তার আগ পর্যন্ত গানের জগতে বেশ বুঁদ হয়েছিলেন, যদিও রহস্য-রোমাঞ্চ-অভিযান তাকে ছেলেবেলা থেকেই মাতিয়ে রাখত। হেমেন্দ্রকুমার রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্রসহ বিভিন্ন লেখকের রহস্য-গোয়েন্দা বইগুলো গোগ্রাসে গিলতেন। ফলে রহস্য রোমাঞ্চ নিয়ে লেখালেখি করার সুপ্ত বাসনা অনেক আগেই গেঁথে গিয়েছিল মাথার ভেতরে।

তো পাখি শিকারের জন্য নিজে একটা বন্দুক কেনার টাকা জোগাতে গিয়ে ঠিক করলেন বই লিখবেন। শুধু রেডিওতে গান গেয়ে অত টাকা জোটানো কঠিন। তবে বই লিখে টাকা কামানো যায়ষাটের দশকে ঢাকা শহরে চিন্তাটা একাধারে ঝুঁকিপূর্ণ বিস্ময়করই বটে। তবে চিন্তার মধ্যেই বোধহয় লুকিয়ে ছিল একজন পেশাদার লেখক হওয়ার বীজ। বেশ দ্রুত দুটো পাণ্ডুলিপি দাঁড় করিয়েও ফেললেন। কিন্তু কে প্রকাশ করবে? এক প্রকাশক এই শর্তে রাজি হলেন যে অন্তত ১০টি বই আগে লিখে দিতে হবে। তাহলে কিছু টাকা দেয়া যেতে পারে। আরেকজন এমন ভাব করলেন যে কাগজ আর কালি ছাড়া কি-ইবা খরচ হয়েছে যে টাকা দিতে হবে। হতাশ হয়েছিলেন তরুণ আনোয়ার। তবে বাবা . কাজী মোতাহার হোসেন পাণ্ডুলিপি দুটো পড়ে বললেন রেখে দিতে আর সুযোগ পেলে নিজেই ছেপে প্রকাশ করতে। শেষ পর্যন্ত সেটাই কিন্তু হলো। প্রেসের ব্যবসাও হবে, বইও প্রকাশ করা হবে চিন্তা থেকেই সেগুনবাগান প্রেসের যাত্রা শুরু। সেটা ১৯৬৩ সালের কথা। অথচ ব্যবসার - বুঝতেন না। সে কারণেই মা সাজেদা খাতুন ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলেন যে টাকা-পয়সা সব খুইয়ে রাস্তায় বসবে! তবে বাবা পুঁজি হিসেবে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। প্রেস চালু করা হলো। ততদিনে গায়িকা ফরিদা ইয়াসমীনকে বিয়ে করেছেন। নিজের বিয়ের কার্ড ছাপতে গিয়ে ছাপাখানার জগতের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। তার পরই মাথার ভেতর গেঁথে গিয়েছিল যে নিজে একটা ছাপাখানা দেবেন। দিয়েও ফেললেন।

প্রেসের প্রকাশনী বিভাগ থেকে ১৯৬৪ সালের জুনে প্রকাশিত হলো কুয়াশা সিরিজের প্রথম বই কুয়াশা-১। মূলত কিশোর পাঠকদের রহস্য জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই কুয়াশা সিরিজ দিয়ে যাত্রা শুরু। তবে কুয়াশার দুটো বই পড়ে বন্ধু মাহবুব আমিন তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন ইয়ান ফ্লেমিংয়ের জেমস বন্ড সিরিজের ডক্টর নো তার আগে শুধু বলেছিলেন, দুনিয়ার থ্রিলার সাহিত্য সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণাই নেই। বইটি পড়ার পর স্তম্ভিত হয়ে যান আনোয়ার। উপলব্ধি করেন বিশ্ব রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্য থেকে কতশত মাইল দূর পড়ে রয়েছে বাংলা রহস্য সাহিত্য! এবার ঠিক করেন যে রকম একখানা বই লিখবেন। ফলে শুরু হলো আরো কিছু বিদেশী বই পড়া। কাহিনী সাজাতে মোটরসাইকেলে চেপে দুঃসাহসিকের মতোই ঘুরে এলেন চট্টগ্রাম, কাপ্তাই রাঙ্গামাটি। প্রায় সাত মাস ধরে লিখলেন ধ্বংস পাহাড় ১৯৬৬ সালের মে মাসে বাজারে এল বইটিমাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই। সাড়া ফেললবাংলায় প্রথম স্পাই থ্রিলার! সমালোচনার ঝড় উঠলযৌনতা! পাঠকদের বড় অংশ কিন্তু লুফে নিল। পাঠকের প্রতিক্রিয়া দেখে আর নিজের ভেতরের তাগিদ মেটাতে ১০ মাস সময় নিয়ে লিখলেন ভারতনাট্যম (ভরতনাট্যম নয়) রীতিমতো যেন চ্যালেঞ্জ করে বসলেন বাংলায় প্রচলিত সব ধরনের রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনীকে। হইচই, নিন্দা-সমালোচনার পাশাপাশি পাঠকের কাছ থেকেও চাহিদা বেড়ে গেল। তিনি বুঝলেন তার প্রকাশনা ব্যবসার বাজার তৈরি হচ্ছে। মার্কেটিং তথা বিপণনশাস্ত্রের ভাষায় বললে, একটা নিশ মার্কেট বা নির্দিষ্ট পণ্য সেবার চাহিদা রয়েছে এমন ভোক্তাশ্রেণীর বাজার। কাজেই বাজার ধরতে হবে এবং বাড়াতে হবে। তাহলে অনেকদূর যাওয়া যাবে, যদিও অতটা ভাবেননি তখন। তবে সাহসী তরুণ উদ্যোক্তার মতো ঝুঁকি নিতে কোনোই দ্বিধা করলেন না; বরং মাথা খাটিয়ে ঠিক করলেন বিদেশী কাহিনী অবলম্বনে রানা কুয়াশার বই লিখবেন। তাতে দেড় দুই মাসে একটা বই নামানো যাবে। তখন পুরোটাই হাতে লেখার যুগ। হাতে সিসার টাইপ দিয়ে কম্পোজ করে প্রেসে ছাপানোর যুগ। ফলে কায়িক শ্রম অনেক বেশি। আবার বই দিলেই হবে না, তা কম দামে বেচতে হবে যেন বেশি পাঠক কিনতে পারে। তাতে ব্যবসায় মুনাফাটাও সুবিধাজনক হবে। আর এই কম দামে বই বিক্রির চিন্তা মাসুদ রানা লেখার আগে থেকেই ছিল। সে কারণে প্রথম বই কুয়াশা- বের করেন সস্তা নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছেপে পেপারব্যাকের প্রচ্ছদে মুড়ে। মাসুদ রানা বের করতে গিয়ে বুঝলেন এভাবেই চালাতে হবে। কেননা পাঠক সস্তায় কিনবে, আনন্দ পাওয়ার জন্য পড়বে, তারপর একসময় সেরদরে বেচে দেবে। সেবার বই ব্যক্তিগত সংগ্রহে যত্নের সঙ্গে কেউ রাখবেএটা তিনি চিন্তাও করেননি। পরবর্তীকালে সেই চিন্তা অবশ্য অনেকটাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বহু পাঠক সেবার পছন্দের বিভিন্ন বই সযত্নে রেখে দিয়েছেন। 

দেখা যাচ্ছে এভাবে কাজী আনোয়ার হোসেন একাধারে লেখক প্রকাশক হিসেবে যাত্রা করেছিলেন শুরু থেকেই। আর তাই তার লেখকসত্তার পাশাপাশি প্রকাশকসত্তাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাকে বোঝার জন্য, তার কৃতিত্ব মূল্যায়নের জন্য। পাঠক তৈরি এবং সাহিত্যের এক সাবলীল ভাষারীতি চালু করার পাশাপাশি বিপণনসহ প্রকাশনা ব্যবসার নতুন মডেল দাঁড় করানোর বিরল কৃতিত্ব তাকেই দিতে হয়।

দুই. যদিও বই লেখা বই প্রকাশ করাএকটা আরেকটার ওপর নির্ভরশীল। মোটামুটি অল্প সময়ের মধ্যে দুটোর এক চমত্কার সমন্বয় করলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। সেবা প্রকাশনী নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছিল প্রথম কয়েকটি বই প্রকাশ পাওয়ার পর। তার আগ পর্যন্ত সেগুনবাগান প্রেসের প্রকাশনী বিভাগ থেকে এসব বই প্রকাশিত হচ্ছেএমনটিই উল্লেখ থাকত বইয়ে। ঠিকানা ছিল ১১৩, সেগুন বাগান, ঢাকা। প্রকাশক হিসেবে নাম ছাপা হতো সংগীতশিল্পী ফরিদা ইয়াসমীনের, যার সঙ্গে ১৯৬২ সালে কাজী আনোয়ার হোসেনের বিয়ে হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে সেগুনের সে আর বাগানের বা নিয়ে কালোর ওপরে সাদা ব্লকে সেবা প্রেস প্রতীক ছাপা শুরু হয়, প্রকাশনী বিভাগের উল্লেখ বাদ পড়ে। এর কিছুদিন পরে সেবা প্রকাশনী নামকরণ হয়ে যায়। প্রখ্যাত শিল্পী হাশেম খান প্রজাপতি দিয়ে সেবা প্রকাশনীর প্রতীক তৈরি করেন, যা হয়ে যায় সেবার ব্র্যান্ড।

বই তো একের পর এক বেরোতে শুরু করল, কিন্তু পাঠক জানবে কী করে? কীভাবে পৌঁছবে তাদের হাতে? সেবার বইয়ের পেছনের কয়েক পাতা বরাদ্দ হলো পাঠক-সমালোচকদের জন্য। তাদের পাঠানো চিঠিপত্র ছাপানো হতো, যার মধ্যে অনেকগুলোর জবাবও দেয়া হতো। আলোচনা বিভাগ দারুণ জনপ্রিয়তা পায় প্রথম থেকেই। নিজেদের নাম ছাপার অক্ষরে দেখতে পাওয়ার ইচ্ছে থেকে অনেকেই চিঠি পাঠাতে থাকেন। পাঠকদের মতামত পরামর্শকে বিবেচনায় নেয়ার কৌশলটি সেবার বইয়ের বিপণন কাজকে অনেকটা এগিয়ে দেয়। এছাড়া বইয়ের শেষে আগামী বইয়ের খবরও দেয়া হয়, যা পাঠককে অপেক্ষায় রাখে। মাসুদ রানার প্রথম দিককার কয়েকটি বইয়ের শেষ প্রচ্ছদে পরবর্তী বইয়ের কাহিনী সংক্ষেপসহ প্রকাশনার ঘোষণাও থাকত। যেমন ১৯৬৭ সালের জুনে প্রকাশিত মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা শেষ প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছিল: আগামী জুলাই মাসে বেরুচ্ছে বিদ্যুৎ মিত্র লিখিত রানা সিরিজের ষষ্ঠ রোমাঞ্চোপন্যাস দুর্গম দুর্গ এর পরই কাহিনী সংক্ষেপ দেয়া হয়েছিল এভাবে—‘দূর যাত্রায় চললো দুঃসাহসী চারজন পাকিস্তানি অভিযাত্রী। পেশোয়ারী মাহবুব চানন, পাঞ্জাবী মিশ্রী খান আর সিন্ধী আলতাফ ব্রোহী একত্রিত হলো বাঙালী মাসুদ রানার নেতৃত্বে। তারা পাড়ি দিল আরব সাগর। কেন?...আপনি চুপিচুপি জানতে চাইলে পড়ুন দুর্গম দুর্গ। আবার ১৯৬৭ সালের মে মাসে প্রকাশিত সিরিজের চতুর্থ বই দুঃসাহসিকে একটি বিশেষ ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছিল: রানা কুয়াশা সিরিজের লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন বিদ্যুৎ মিত্রে ছদ্মনাম পরিত্যাগ করে ভবিষ্যতে স্বনামে লিখবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার পরও রানা কুয়াশার কয়েকটি বই বিদ্যুৎ মিত্রের নামেই বের হয়েছিল। এভাবে প্রকাশিত বইয়ের মাধ্যমে পাঠককে নানা খবর দেয়ার তথা প্রচারণা চালানোর কাজটি করেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন প্রথম দিকে। আরো কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল বিপণন জোরদার করার জন্য।

বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পাক্ষিক পত্রিকায় মাসুদ রানার বই আলোচনা বের হতে লাগল। এরপর ছোট ছোট বিজ্ঞাপন। তবে দৈনিক বাংলা সাপ্তাহিক বিচিত্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে সেবা প্রকাশনীর নতুন বইয়ের বিজ্ঞাপন নিয়মিত ছাপা হয়েছে। ততদিনে বাজার মাত হয়ে গেছে। পাঠক নিজেই বইয়ের জন্য খোঁজ করে। তাই সম্ভবত নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে বিজ্ঞাপন দেয়া বন্ধ হলো। এদিকে ১৯৮৪ সালের নভেম্বর থেকে রহস্য পত্রিকা পুরোদমে প্রকাশিত হচ্ছে প্রতি মাসে। রহস্য পত্রিকায় সেবার বইয়ের পরিচিতি, বিজ্ঞাপন আলোচনা বেরোতে থাকল নিয়মিত। [চলবে]

 

তানিম আসজাদ: লেখক সাংবাদিক

আরও