বাংলাদেশে
‘প্রত্নতত্ত্ব’
কিংবা ‘প্রত্নতাত্ত্বিক’
শব্দগুলো শোনামাত্র
বেশির ভাগ
মানুষ চলচ্চিত্রের
ইন্ডিয়ানা জোন্সকে
খোঁজার চেষ্টা
করেন। এর
পেছনে একটি
অন্যতম প্রধান
কারণ হলো,
এ দেশের
প্রত্নতত্ত্ব চর্চা
শুরু হয়েছিল
ঔপনিবেশিক শাসকদের
হাত ধরে।
যে কারণে
প্রত্নস্থল বলতেই
অনেকে মনে
করে থাকেন—মাটির
গভীরে সোনাদানা-মণিমুক্তা
লুক্কায়িত রয়েছে
এবং প্রত্নতাত্ত্বিকের
কাজ সেগুলো
খুঁজে বের
করা! প্রায়
২০০ বছরের
ব্রিটিশ শাসনকাল
এবং প্রায়
২৪ বছরের
পাকিস্তানি আগ্রাসনের
ফলে আমাদের
দেশে ঔপনিবেশিক
ধাঁচের প্রত্নতত্ত্ব
চর্চার ভ্রান্ত
ধারণার সঙ্গে
তথাকথিত ‘অভিজাত’
সম্প্রদায়ের সম্পর্ক
যুক্ত হয়েছে,
যেখানে অতীতের
সাধারণ মানুষের
আর্থসামাজিক ও
সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত
সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত।
স্বাধীন বাংলাদেশে
গত ৫০
বছরে প্রত্নতত্ত্ব
চর্চার প্রচলিত
ধারণা পরিবর্তনের
ক্ষেত্রে বাংলাদেশ
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর
এবং জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব
বিভাগের অবদান
নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য।
তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী
৫০ বছরে
গভীরভাবে বিজ্ঞানসম্মত
পদ্ধতি অনুসরণ
করে প্রত্নতাত্ত্বিক
প্রেক্ষিতের গবেষণার
জন্য যে
ধরনের গবেষণাগার
সুবিধাদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে
থাকা দরকার
তার কতটুকু
আমরা দিতে
সক্ষম হয়েছি?
অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ব
অধিদপ্তরের সঙ্গে
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রত্নতত্ত্ব
বিষয়ের একটি
আন্তঃসম্পর্ক স্থাপন
করার প্রয়োজনীয়তা
রয়েছে। তবে
আশার কথা
হলো যে,
ইদানীংকালে প্রত্নতত্ত্ব
অধিদপ্তর প্রাতিষ্ঠানিক
প্রত্নতাত্ত্বিক নিয়োগের
ক্ষেত্রে কিছু
সুযোগ সৃষ্টি
করেছে এবং
এজন্য বাংলাদেশ
সরকারের সংস্কৃতি
মন্ত্রণালয় নিঃসন্দেহে
সাধুবাদ পাওয়ার
দাবিদার।
প্রত্নতত্ত্ব এমন
একটি বহুমাত্রিক
জটিল বিষয়,
যা অধ্যয়নের
ক্ষেত্রে অনেক
বিষয়ের সমন্বয়ে
এটিকে অধ্যয়ন
করতে হয়।
প্রত্নতত্ত্ব অধ্যয়নের
জন্য যেমন
ঐতিহাসিক উৎস
সাহায্য করে,
অন্যদিকে ভৌগোলিক
প্রেক্ষিত; ভূতত্ত্ব;
মাটির গঠন-ধরন-রঙ
বোঝার জন্য
মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞ,
পরিবেশের সঙ্গে
তত্কালীন মানুষের
সম্পর্ক অনুসন্ধানের
জন্য জীব-প্রত্নবিজ্ঞানী
এবং উদ্ভিদ-প্রত্নবিজ্ঞানীদের
সাহায্য প্রয়োজন
হয়। এছাড়া
প্রত্নতত্ত্ব যেহেতু
মানুষের সংস্কৃতি
নিয়ে গবেষণা
করে, তাই
নৃবিজ্ঞানকে ব্যবহার
না করে
এ চর্চা
অসম্পূর্ণ থেকে
যায়। পরবর্তী
সময়ে মাটির
নিচে বিভিন্ন
স্তরে প্রাপ্ত
নিদর্শনগুলোর সময়কাল
অনুধাবনের জন্য
রাসায়নিক পরীক্ষার
প্রয়োজন হয়,
বিশেষত কার্বন-১৪
কিংবা রেডিওকার্বন
পরীক্ষা ছাড়া
সময়কাল নির্ণয়
করা দুঃসাধ্য।
এছাড়া প্রাপ্ত
তথ্য-উপাত্ত
বিশ্লেষণের জন্য
কম্পিউটারের বিভিন্ন
সফটওয়্যার ব্যবহার
না করতে
পারলে একটি
প্রত্নস্থল সম্পর্কে
ব্যাখ্যা দেয়াটা
নিতান্তই কঠিন
কাজ।
যেহেতু ব্রিটিশ
শাসনামলে শুরু
হওয়া প্রত্নতত্ত্ব
চর্চায় শুধু
‘অভিজাত’
নিদর্শনকে অনুসন্ধানের
চেষ্টা করা
হয়েছে, তাই
এ ধারা
শুধু সাংস্কৃতিক
ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব
চর্চার প্রতি
মনোযোগী হয়ে
উঠেছিল। পরবর্তী
সময়ে বৈশ্বিক
প্রেক্ষাপটে প্রক্রিয়াবাদী
প্রত্নতাত্ত্বিকরা বিজ্ঞানসম্মতভাবে
উত্খনন, অধ্যয়ন
ও গবেষণার
প্রতি গুরুত্বারোপ
করেছেন। এমনকি
ইদানীংকালে উত্তর-প্রক্রিয়াবাদী
ধারার প্রত্নতত্ত্ব
চর্চার মাধ্যমে
প্রচলিত প্রত্নতত্ত্ব
চর্চার সীমাবদ্ধতাগুলোকে
নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ
করা হয়েছে।
সুইডেনের লুন্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের
শিক্ষার্থী হিসেবে
অধ্যয়নকালে সেখানকার
লৌহযুগের একটি
প্রত্নস্থলে উত্খনন
করার সুযোগ
ঘটেছিল আমার।
খুব ছোট
একটি গ্রিডে
উত্খনন এবং
গবেষণাটি চলছিল
প্রায় চার
দশক ধরে।
প্রতি বছরই
লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীরা সেই
প্রত্নস্থলের বিভিন্ন
প্রেক্ষিত নিয়ে
পিএইচডি শুরু
করেন। আমার
মাস্টার্সের সময়ও
সেই প্রত্নস্থলকে
থিসিসের একটি
অংশ হিসেবে
অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম।
সুইডেন যেহেতু
প্রযুক্তিগতভাবে অনেক
উন্নত, তাই
তারা, প্রত্নস্থল
এবং প্রত্নবস্তু
গবেষণার কাজে
প্রযুক্তিতে ব্যাপকভাবে
ব্যবহার করে
থাকে। একটি
খননকৃত অংশকে
ত্রিমাত্রিকভাবে কম্পিউটারে
কীভাবে ভিজুয়ালাইজ
করে গবেষণা
করা যায়,
সেগুলো নিয়ে
তারা কার্যকরী
সফটওয়্যারগুলো ব্যবহার
করে থাকে।
তারা চাইলেই
তাদের উত্খননকৃত
প্রত্নস্থলের নমুনা
সংগ্রহ করে
রেডিওকার্বন পরীক্ষা
করার সুযোগ
পায়। আর
জিআইএস মানচিত্রায়ণের
ক্ষেত্রে তাদের
দক্ষতা নিঃসন্দেহে
অতুলনীয়।
বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব
চর্চায় আমরা
কি প্রযুক্তিকে
ব্যবহার করার
সুযোগ পেয়েছি?
আমাদের দেশে
প্রত্নবস্তুর রাসায়নিক
পরীক্ষার জন্য
কি ভালো
মানের কোনো
গবেষণাগার রয়েছে?
শুধু অতীতের
রাজা-বাদশাহের
নাম জানার
জন্য প্রত্নতত্ত্ব
অধ্যয়ন করা
হয় না।
অতীত মানুষের
আর্থসামাজিক ও
সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত
বোঝার জন্য
নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ
করা প্রয়োজন।
এ দেশ
পৃথিবীর সবচেয়ে
বড় বদ্বীপ,
যা ভৌগোলিকভাবে
উপক্রান্তীয় অঞ্চলে
অবস্থিত একটি
দেশ। এর
অভ্যন্তরে বহমান
নদীগুলো থেকে
সৃষ্ট পললের
কারণে এটি
বহুকাল আগে
থেকেই মানববসতি
গড়ে তোলার
জন্য একটি
উপযোগী অঞ্চল
ছিল। এর
প্রমাণ আমরা
বিভিন্ন ঐতিহাসিক
এবং প্রত্নতাত্ত্বিক
গবেষণায় এরই
মধ্যে বুঝতে
পেরেছি। এমনকি
গ্রামভিত্তিক কৃষিনির্ভর
এ দেশে
যে নগরায়ণের
বিকাশ হয়েছিল
সেটিও এখন
প্রমাণিত। কিন্তু
প্রশ্ন হলো,
আমরা যে
হাজার বছরের
ইতিহাসের কথা
বলি, সেই
ইতিহাসের মানুষের
খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশের
সঙ্গে তাদের
আন্তঃসম্পর্ক, কীভাবে
এবং কখন
থেকে মানুষ
এ অঞ্চলে
আগমন করেছিল,
কেন তারা
এখানে তাদের
বসতি গড়ে
তুলেছিল ইত্যাদি
প্রশ্নগুলোর বহুমাত্রাগত
গবেষণা পুরোপুরি
অনুপস্থিত।
আরো গভীরভাবে
চিন্তা করলে
দেখা যাবে
যে, প্রত্নতাত্ত্বিক
পরিপ্রেক্ষিতে আমরা
পৃথিবীর অনেক
অঞ্চলের চেয়েও
বেশি সমৃদ্ধ।
এ সমৃদ্ধির
মূলে রয়েছে
এখানকার ভূমিরূপ
এবং পরিবেশগত
উপাদান। অতীতের
সমাজ-সংস্কৃতি
নিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে
প্রত্নতত্ত্ব চর্চা
এখন সময়ের
দাবি। ফলে
একদিকে যেমন
এ দেশের
বহুকাল আগের
মানুষের দৈনন্দিন
জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস
এবং তাদের
ব্যবহূত বস্তুগুলো
নিয়ে গবেষণার
সুযোগ তৈরি
হবে, তেমনি
ভবিষ্যতের দিকে
এগিয়ে যাওয়ার
ক্ষেত্রেও সেসব
তথ্য-উপাত্ত
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখবে। আর
এক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্ব
চর্চার গবেষণা
উপকরণের অপ্রতুলতা
এবং আর্থিক
সীমাবদ্ধতা থাকা
সত্ত্বেও আমাদের
দেশে প্রত্নতাত্ত্বিকরা
কয়েক দশক
ধরে তাদের
ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়
প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে
যে গবেষণাগুলো
করেছেন, সেগুলো
আমাদের নতুন
প্রজন্মের গবেষকদের
জন্য নিঃসন্দেহে
অনুপ্রেরণাদায়ক।
সাম্প্রতিক সময়ে
‘চাকরিবাজারভিত্তিক’
যে উচ্চতর
শিক্ষার দিকে
আমরা ধাবিত
হচ্ছি, এতে
করে অতীত
মানুষের সঙ্গে
পরিবেশের আন্তঃসম্পর্ক
বোঝার ক্ষেত্রে
বিশাল বড়
একটি শূন্যতা
তৈরি হওয়ার
আশঙ্কা রয়েছে।
এ আশঙ্কা
থেকে উত্তরণের
জন্য, স্থানীয়
জ্ঞানগুলোকে গভীরভাবে
অনুসন্ধানের জন্য
এবং সর্বোপরি
বঙ্গীয় বেসিনের
বহুমাত্রিক উপাত্তের
আদ্যোপান্ত জানার
জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার
উদ্যোগ গ্রহণ
করা প্রয়োজন।
শুধু হাতেগোনা
দুয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়
নয়, বরং
বেশির ভাগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘প্রত্নতত্ত্ব
বিজ্ঞান’ নামক
বিষয় চালু
করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি কলেজ
পর্যায়ের স্নাতক
বিষয় হিসেবেও
বিষয়টির অন্তর্ভুক্তীকরণ
জরুরি। এক্ষেত্রে
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে বাংলাদেশের
প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক
‘প্রত্নতত্ত্ব
বিজ্ঞান’ নামক
একটি বিষয়
চালুর উদ্যোগ
গ্রহণ করা
যেতে পারে।
বিশ্বকবির নামে
প্রতিষ্ঠিত এ
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান
প্রাচীন বরেন্দ্র
এবং পুন্ড্র
জনপদের মাঝামাঝি
স্থানে। গত
কয়েক শতকে
সিরাজগঞ্জ জেলায়
বড় আকৃতির
ভূমিকম্পের কারণে
এখানকার ভূ-প্রকৃতি
মারাত্মকভাবে পরিবর্তিত
হয়েছে। বিশালাকার
ব্রহ্মপুত্র নদীর
খাত পরিবর্তিত
হয়ে ক্রমে
যমুনা নদীর
উত্পত্তি হওয়ার
ফলে মানববসতির
ধারা বদলে
গেছে। অতীতকাল
থেকে মানুষ
কীভাবে প্রাকৃতিক
বিপর্যয়ের সঙ্গে
নিজেদের অভিযোজিত
করেছে, সেগুলোর
অনুসন্ধান কি
জরুরি বিষয়
নয়?
মো. রিফাত-উর-রহমান: শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ