সিসা ও ভারী ধাতু দূষণ

প্রতিরোধে নেয়া হোক কার্যকর পদক্ষেপ

বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন ঘটছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যে। পরিবেশে বাড়ছে ক্ষতিকর সিসা ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি, যা মানুষের বিশেষ করে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন ঘটছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যে। পরিবেশে বাড়ছে ক্ষতিকর সিসা ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি, যা মানুষের বিশেষ করে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে ভারী ধাতু বিশেষ করে সিসা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ওপর বেশি গুরুতর প্রভাব ফেলছে। শিশুদের মানসিক, স্নায়বিক ও শারীরিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বাতাস, পানি, মাটি, খাবার, খেলনা, রঙ ও রান্নার সামগ্রীর মাধ্যমে বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসায় ঝুঁকি বাড়ছে শিশুদের। আর বয়স্কদের ক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে হৃদরোগসহ নানা জটিলতা। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে তাদের অনাগত শিশুরা হয় ক্ষতিগ্রস্ত। এ দূষণের ফলে ভুক্তভোগী মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশুরা যে ভোগান্তির শিকার হয় এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে যে বাড়তি ব্যয় করতে হয় তা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। কেননা এ দূষণ অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য। এজন্য দরকার সুস্পষ্ট আইন, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ। যদিও সরকার সব অংশীজনের সহযোগিতায় ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সিসামুক্ত করার অঙ্গীকার করেছে। তবে এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দরকার সিসা দূষণের উৎস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন। সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ক্ষতিকর সিসা ও ভারী ধাতুর দূষণ কমিয়ে আনা যেতে পারে।

গত ৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সিসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ পালিত হয়। এ উপলক্ষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের উদ্যোগে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। সিসাসহ শিশুদের ক্ষতিসাধন করে এমন ভারী ধাতুর উৎস সম্পর্কে ধারণা বাড়ানো এবং সিসার দূষণ কমানোর লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীজনদের সম্পৃক্ত করতে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বলেছেন, সিসা ও ভারী ধাতুর দূষণ একটি নীরব ঘাতক, যা মোকাবেলায় প্রয়োজন জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। সবার জন্য একটি সিসামুক্ত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে সিসা দূষণ রোধ করতে অন্তর্বর্তী সরকার সব অংশীজনের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশে বিষাক্ত ধাতুর সংস্পর্শে আসার প্রধান উৎসগুলো চিহ্নিত করতে সরকার একত্রে একটি বিস্তৃত ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গড়ে তুলতে পারবে। আমরা আশা করি, সিসা ও ভারী ধাতুর দূষণ প্রতিরোধে সরকার সব অংশীজনকে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

দেশের বিভিন্ন জেলার শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেননা শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। সিসা শনাক্তকরণ ও সিসার সংস্পর্শে আসার উৎস ও উপায়গুলো রোধ করার ওপর এখনই বিশেষ জোর দিতে হবে। তা না হলে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি মৃত্যুঝুঁকিও বাড়বে। সিসা ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি নির্ণয়ে বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে একটি সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষায় খুলনা, টাঙ্গাইল, পটুয়াখালী ও সিলেট জেলায় ৯৮০ ও ঢাকায় ৫০০ শিশুকে পরীক্ষা করে সবার রক্তে সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব নমুনার মধ্যে চার জেলায় ৪০ শতাংশ এবং ঢাকায় ৮০ শতাংশ নমুনায় প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি সিসা পাওয়া যায়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। এ সংবাদ দেশের জন্য মোটেই সুখকর নয়। এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক হুমকিতে পড়বে।

বর্তমানে বিভিন্ন উৎস থেকে ভারী ধাতু নির্গত হচ্ছে। এসব ধাতু পরিবেশের উপাদানের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কৃষিনির্ভর দেশে ফসল উৎপাদনের প্রধান মাধ্যম মাটি; কিন্তু বিভিন্ন উৎস থেকে আসা ভারী ধাতু ও ধাতব পদার্থ; যেমন সিসা, তামা, পারদ, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, কোবাল্ট, টিন ইত্যাদি মাটিকে দূষিত করছে। ভারী ধাতবগুলোর প্রাথমিক উৎস কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান, পশু-পাখির অপচনশীল অংশ, দূষিত পানি দ্বারা সেচ, ধাতব কীটনাশক, ফসফেট উপাদানসমৃদ্ধ সার, নর্দমার বর্জ্য ইত্যাদি প্রাকৃতিক উৎস। এছাড়া মানবসৃষ্ট কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত না করায় ভারী ধাতু দূষণ সৃষ্টি হচ্ছে। গবেষকদের ধারণা, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পারদ দূষণের একটি প্রধান উৎস। ক্যাডমিয়ামের উৎস রাসায়নিক সার এবং ক্রোমিয়াম ও সিসার উৎস মূলত শিল্প-কারখানা, ইলেকট্রনিক এবং মেডিকেল বর্জ্য। এছাড়া বৈদ্যুতিক বর্জ্য, বিভিন্ন শক্তি ও জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কয়লা খনি, বিভিন্ন রাসায়নিক শিল্প, টেক্সটাইল, চামড়া শিল্প, ইলেকট্রোপ্লেটিং কারখানা, বর্জ্য পানি পরিশোধনাগার এবং ই-বর্জ্য ইত্যাদি থেকেও ভারী ধাতু পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

এ ধাতুগুলো পানি, মাটি ও খাদ্যদ্রব্যে সরাসরি প্রবেশ করে। পরিবেশগত দূষক খাদ্য সুরক্ষা এবং মানবস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। পরিবেশে ভারী ধাতুগুলোর ঘনত্ব সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকরা বলছেন, খাদ্যচক্রে রাসায়নিক দূষণের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে, যা মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এসব ভারী ধাতুর উপস্থিতি মানবদেহে নানা রোগের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। মানসিক বিকাশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধাদেয় ও হৃদরোগ সৃষ্টি করে। এছাড়া মানবদেহে ক্ষয়রোগ, মাথাব্যথা, হৃদরোগ জটিলতা, কিডনি বিকল, উচ্চ রক্তচাপ, লিভার, ফুসফুস ও স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন গুরুতর রোগের সৃষ্টি করতে পারে। এ ভারী ধাতুগুলো মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ছাড়াও মাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন উপকারী প্রাণীকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে মাটির উর্বরতা এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে।

মানুষের স্বাস্ব্যঝুঁকি কমাতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাও জরুরি। ভারী ধাতুর দূষণ রোধ করতে ফসলি জমিতে সেচ ও শিল্প-কারখানার বর্জ্যপ্রবাহের ভারী ধাতুর উৎসগুলো যথাযথ সুব্যবস্থায় আনতে হবে। মাটিতে ভারী ধাতুর দূষণ প্রতিকার রোধে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারসহ পরিবেশগত জৈবিক ও রাসায়নিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে ন্যানো টেকনোলজির উদ্ভাবনগুলো সহায়তা করতে পারে। কৃষিক্ষেত্র থেকে দূরবর্তী স্থানে কারখানা স্থাপন করতে হবে। মাটির দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় গবেষণা এবং দূষণ প্রতিকারে শিল্প-কারখানায় ইটিপি স্থাপন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে অনুসরণ করা অত্যাবশ্যকীয়। মাটির গুণাগুণ রক্ষায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে জৈব সার এবং জৈবপ্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে পরিবেশ থেকে ভারী ধাতুর দূষণ রোধ করা যেতে পারে। ছোট-বড় ব্যাটারি, কলকারখানার বর্জ্য, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, হাসপাতাল ও ক্লিনিক বর্জ্য, গবেষণাগারের বর্জ্য ইত্যাদির ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক পদ্ধতিতে বর্জ্য সংরক্ষণ করতে হবে। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে এসব ক্ষতিকর ভারী ধাতুর প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রয়োজন এসব ভারী ধাতু সম্পর্কে কৃষক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে জ্ঞান প্রদান ও সচেতন করা। বাংলাদেশে সিসামুক্ত ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী আইন ও পদক্ষেপও নিতে হবে। ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতের পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়াতে সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।

আরও