দেশে পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য (ওয়ান টাইম) প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। পরিবেশবিদদের অনেকের মতে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহারে নগর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে নর্দমা-জলাশয় প্লাস্টিকে ভরাট হয়ে বর্ষা ও অসময়ের বৃষ্টিতে নগরে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা। এছাড়া কৃষি, মৎস্য, জনস্বাস্থ্য এমনকি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। একই সময়ে প্লাস্টিক ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কেও মানুষ সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করেছেন। বায়োডিগ্রেডেবল ও পঁচনশীল পণ্যের বাজারও এখন দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। এ বাজারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও কম নয়।
বিশ্বব্যাংক ২০২১ সালে ‘টুয়ার্ডস মাল্টিসেক্টোরাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর সাসটেইনেবল প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫ সালে দেশে প্লাস্টিকের বার্ষিক ব্যবহার ছিল গড়ে তিন কেজি। ২০২০ সালে তা বেড়ে নয় কেজি হয়। শুধু ঢাকাতে প্লাস্টিকের ব্যবহার ২০০৫ সালে ছিল ৯ দশমিক ২ কেজি। ২০২০ সালে তা ২২ দশমিক ২৫ কেজিতে উন্নীত হয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ শিল্পে প্রায় ১২ লাখ কর্মসংস্থান গড়তে পেরেছেন।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, প্লাস্টিক উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। এজন্য নদী, খাল, কৃষিজমি ও সমুদ্র উপকূলে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমা পড়ছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, মেঘনা, কর্ণফুলী ও রূপসা নদী দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ টন অপরিকল্পিত বর্জ্য উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবাহিত হয়। বিশ্বব্যাংক সমর্থিত ওয়েস্ট কনসার্নের এক গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকা ও আশপাশের চারটি নদীতে প্রায় ৩০ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীতেই জমা হয়।
জলাবদ্ধতা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি: রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় ড্রেন ও খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ পলিথিন। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যাওয়ার পেছনে প্লাস্টিক বর্জ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
অন্যদিকে মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করছে। দেশের নদী, মাছ, লবণ, সার এমনকি বাতাসেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পলিথিনের ক্ষুদ্র কণা মানবদেহে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট ও হরমোনজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার ৩৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ মানুষ বেশি দাম হলেও পরিবেশবান্ধব পণ্য কিনতে আগ্রহী। মাত্র ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ মানুষ জানিয়েছে, তারা সহজে বায়োডিগ্রেডেবল বিকল্প খুঁজে পায়।
প্লাস্টিকে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন: বাংলাদেশ ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধকারী বিশ্বের প্রথম দেশগুলোর একটি হলেও বাস্তবে এর ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। বাজার ও কাঁচাবাজারগুলোয় এখনো অবাধে পলিথিন ব্যবহার হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, সহজলভ্য ও সস্তা বিকল্প না থাকায় তারা পলিথিনের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত না করলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না।
নতুন সম্ভাবনা: বায়োডিগ্রেডেবল ও কম্পোস্টেবল শিল্প
বাংলাদেশে পাট, ভুট্টা ও উদ্ভিজ্জ উপাদানভিত্তিক বায়োডিগ্রেডেবল পণ্যের সম্ভাবনা এখন আলোচনায়। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কম্পোস্টেবল প্যাকেজিং ও জৈব ব্যাগ উৎপাদন শুরু করেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠান মাসে প্রায় ৫০০ টন বায়োপ্লাস্টিক উৎপাদন করছে, যদিও এর ৯০ শতাংশ রফতানি হচ্ছে স্থানীয় বাজারে কম চাহিদার কারণে।
বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমদ খানের উদ্ভাবিত পাটভিত্তিক ‘সোনালি ব্যাগ’ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে। তবে এটির উৎপাদন খরচ ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা নিয়ে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে পলিথিনের তুলনায় বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগের দাম এখনো বেশি এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন না হওয়ায় বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে।
অর্থনৈতিক সুযোগ কতটা?
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ হলে বাংলাদেশের পাট শিল্প নতুন গতি পেতে পারে। এতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং টেকসই শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাপী টেকসই প্যাকেজিং শিল্প দ্রুত বাড়ছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ওপর বিধিনিষেধ বাড়ায় বাংলাদেশের জন্য পরিবেশবান্ধব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারও সম্প্রসারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিকল্প উদ্ভাবন নয়, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কর প্রণোদনা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ‘বায়োডিগ্রেডেবল’ ও ‘কম্পোস্টেবল’ শব্দের সঠিক মানদণ্ড নির্ধারণ জরুরি, যাতে ভোক্তারা বিভ্রান্ত না হন। পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করেই পলিথিনের বিকল্প অনুসন্ধানে আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে। পলিথিনের সস্তা সুবিধার চেয়ে পরিবেশগত ক্ষতির মূল্য অনেক বেশি। তাই এখনই টেকসই বিকল্পে বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আরো বড় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে।
মো. মাহাবুবুল হাসান: ডিজিএম ও ব্যবসায় প্রধান, গ্রিন প্যাকেজিং ইউনিট, ব্র্যাক প্রিন্টিং প্যাক এন্টারপ্রাইজ