সভ্যতার সমৃদ্ধির আসে রেলপথ ধরে—ঔপনিবেশিক আমলে এ কথাটা বেশ প্রচলিত ছিল। এ সময়ে এসে বলতে হয়, সমৃদ্ধি-অগ্রগতির মূল সূত্র উপযোগী ও সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা। যেখানে রেল-জল-সড়ক পথকে সমান গুরুত্ব দেয়া জরুরি। যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেলপথের গুরুত্ব কমেনি, আবার কম খরচে পণ্য পরিবহনে আজো উপযোগিতা ধরে রেখেছে জলপথ। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অতীতকাল থেকেই কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাত ব্যবস্থা অগ্রসর হয়েছে জলপথ ও রেলের ওপর নির্ভর করে। যদিও আজ সড়ক পথকেই গুরুত্ব বেশি দিতে দেখা যায়। সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়ন কার্যক্রমেই আমরা বেশি মনোযোগ দিয়েছি। ফলে রেলপথ ক্রমেই অবহেলিত হয়ে পড়ে। আজ দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই অথর্ব, অকেজো, দুর্ঘটনা ও দুর্নীতিগ্রস্তও। অথচ নগরায়ণ ও শিল্পের বিকাশের জন্য রেল ও জলপথগুলোকে উন্নত এবং সক্ষম করে গড়ে তোলা ছিল জরুরি। আমরা তা করিনি, কারণ অনেক কিছুর মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা সংস্কারের ক্ষেত্রেও আমরা দূরদর্শিতা দেখাতে সক্ষম হইনি। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে নতুন নতুন সড়ক পথ নির্মাণ, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে ঠিকই, সঙ্গে রয়েছে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের ক্ষতও। যে ক্ষত আজ আর পূরণ হচ্ছে না, ক্রমে গাঢ় ও বিস্তৃত হচ্ছে। অথচ আমরা যদি সড়ক-জল-রেল—এ তিনটি পথের সমন্বয় করে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা নিতাম, রেলের সঙ্গে সড়কের, সড়কের সঙ্গে নৌপথকে সংযুক্ত করতে পারতাম, তাহলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ঘিরে সরকারের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ থাকত এবং সিন্ডিকেট প্রথাও গড়ে উঠত না।
শহরকেন্দ্রিক সবচেয়ে নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থার বড় উদাহরণ ঢাকা। প্রতিদিন-প্রতি মুহূর্তে এ নগরীর বাসিন্দারা ধুঁকছেন। যানজট, মানুষের জট, ফুটপাত জট—এমন এক তাল পাকানো অবস্থায় দৈনন্দিনের কাজগুলো সারতে হচ্ছে তাদের। স্বাস্থ্য-শরীর-সুস্থতার মান চলে গেছে তলানিতে। একের পর এক অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে, কিন্তু ঢাকার সড়ক ব্যবস্থা স্বাভাবিক হচ্ছে না। একমাত্র আশার আলোর হয়ে আছে মেট্রোরেল। এখানেও বড় সমস্যা হচ্ছে, একটি যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে অন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার সংযোগের অভাব।
কিছুদিন আগে নেদারল্যান্ডসের আমস্ট্রাডামসহ প্যারিসের ফ্রান্স, জার্মানির কয়েকটি শহর দেখার সুযোগের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু কথা তুলে ধরছি। ইউরোপ কত উন্নত, ওদের শিল্প-সংস্কৃতি কত পুরনো এসব আলাপের চেয়ে আমরা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ওরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে শহরের প্রতিটি পয়েন্টের সঙ্গে রেল, বাস, মেট্রো, ট্রামের সংযোগ তৈরি করেছে। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই মেট্রো ও বাসস্টেশন। যে কেউ চাইলে একটি ট্রাভেল কার্ড করে নিতে পারেন। নির্দিষ্ট বুথ রয়েছে, প্রয়োজনীয় কয়েন বা কার্ড দিয়ে স্টেশন থেকে টিকিট করে নেয়া যায়। বাসে পজ মেশিন আছে, ডেবিট অথবা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টিকিট কাটা যায়। আর টিকিটের বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ সুবিধা তো আছেই।
যেমন জুন-জুলাইয়ে জার্মান সরকার ট্রেনের টিকিটে বিশেষ ছাড় দিয়েছিল। মাত্র ৯ ইউরো দিয়ে টিকিট কেটে ট্রেনে করে গোটা জার্মানির যেকোনো জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ ছিল সেখানে। আবার নেদারল্যান্ডসে অভিকার্ড নামে যে কার্ড রয়েছে, যা দিয়ে ট্রেন, ট্রাম যেকোনো পরিবহন ব্যবহার করা যায়। বাইরের দেশ থেকে নেদারল্যান্ডস গিয়েও যে কেউ এটি সংগ্রহ করতে পারেন। শর্ত হচ্ছে কার্ডে সব সময় ন্যূনতম ২০ ইউরো থাকতে হবে। নেদারল্যান্ডস ঘোরা শেষ, যেকোনো স্টেশনে কার্ডটি জমা দিয়ে জমা ২০ ইউরো ক্যাশ করে নেয়ার সুযোগও রয়েছে। এখানে আরো একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রায় প্রতিটি রাস্তায় বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের পাশাপাশি রয়েছে বাইসাইকেল লেন ও হাঁটার জন্য ফুটপাত। রয়েছে নির্দিষ্ট স্টপ, যেখানে কিছুক্ষণ পরপর বাস, ট্রাম আসছে, যাত্রীরা উঠে পড়ছেন ঝুটঝামেলা ছাড়াই। তাড়াহুড়া, জায়গা পাওয়া নিয়ে মারামারি কিছু নেই। রাস্তা ও ফুটপাতের উচ্চতাও সমান্তরাল। ট্রেন থেকে প্লাটফর্মের ক্ষেত্রেও তাই। বড় বড় ল্যাগেজ ব্যাগ নিয়ে বাস-ট্রেনে উঠতে দু-একটি ক্ষেত্র ছাড়া সমস্যা হয় না।
এখন যদি কেউ প্রশ্ন করে, এ বিষয়গুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটেছে, তাহলে কিন্তু ভুল হলো। দীর্ঘদিন ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা আর দূরদর্শী চিন্তা দিয়েই এ ধরনের একটি অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, রিভার স্পার্নে হচ্ছে উত্তর হল্যান্ডের হার্লেম শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি নদী। এটি মূলত উত্তর সাগরে গিয়ে পড়েছে রিংভার্ট নদী হয়ে। স্পার্নে দিয়ে অনেক ছোট ও মাঝারি জাহাজের আসা-যাওয়া। স্পার্নের এপাড়-ওপাড় দুদিকেই রয়েছে সংযোগ সড়ক। ব্রিজের মাধ্যমে দুই পাশের রাস্তা সংযুক্ত। কিন্তু ব্রিজের যে উচ্চতা তার নিচ দিয়ে ছাউনিযুক্ত জলজান, মাঝারি জাহাজ চলাচল খানিকটা সমস্যার। তাই স্পার্নে নদীর ওপরের ব্রিজগুলো মুভিং ব্রিজ। দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় জাহাজ বা এ ধরনের জলযান চলাচলে ব্রিজগুলোকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়।
এমন একটা মুভিং ব্রিজের নাম মিল্কব্রিজ। নদীর ওপর অবস্থিত আড়াআড়ি এ ব্রিজটি ঘুরে গিয়ে লম্বালম্বি অবস্থান নেয়। এরপর ব্রিজটিকে মাঝে রেখে দুই পাশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের জলযান চলাচল করে। এরপর ব্রিজটি আবার ঘুরিয়ে সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। এরপর বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি আর মানুষ চলাচল করে। স্পার্নে নদীর ওপর ঢালাই করা লোহার এ সুইং ব্রিজটির বয়স ৭০০ বছর। ১৮৬৩ সালে প্রথম এ ব্রিজটির ভিত্তি স্থাপন করা হয়। ব্রিজটির নকশা করেন স্থাপত্যবিদ জ্যাক লিজ। ১৯৭১ সাল থেকে ব্রিজটিকে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি জুড়ে দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘোরানো হচ্ছে।
মিল্ক ব্রিজ থেকেই দেখা যায় ড্রব্রিজ গ্রেভেস্টেনব্রুগ। এটি অবশ্য আড়াআড়ি ঘোরানো যায় না, বরং মোটা তারের সাহায্যে ওপরের দিকে তুলে দেয়া হয়। প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো ব্রিজটির স্থলে নতুন এ ব্রিজটি তৈরি করা হয়েছে ১৯৫০ সালে। হার্লেমের মতো লিউওয়ার্ডেন শহরের স্লাউরহফব্রুগ ফ্লাইং ড্রব্রিজও সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়। এটি উন্মুক্ত করা হয় ২০০০ সালে। এভাবে নদীপথ ও সড়ক পথের মধ্যে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটিয়েই অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন ডাচরা।
শুধু সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সমন্বিত ও টেকসই করেই গড়ে তোলা হয়নি, ১৮৩৯ সাল থেকেই দেশটির নীতিনির্ধারকদের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে ছিলেন মনোযোগী। সে সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের রেলের ক্রমবিকাশকে যদি ছয়টি দশকে সাজানো যায়, তাহলে দেখা যায় প্রথম দশক শুরু থেকে ১৮৩৯ হচ্ছে রেলের জন্য প্রথম পরিকল্পনা প্রণয়নের দশক। এরপর ১৮৪০-৬০ প্রাথমিক সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮৬০-৯০ নতুন রেললাইন স্থাপনের নির্দেশ প্রদান করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে। ১৮৯০-১৯৩৮ এ সময়কালে মূলত বৃহৎ পরিসরে দুটি সমান্তরাল রেললাইন পুনর্বিন্যাস করে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হয়েছে। ১৯৩৮-৯২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ডাচ কোম্পানি নেদারল্যান্ডেস স্পুরওয়েগানকে রেল পরিবহনের একচেটিয়া অধিকার প্রদান করা হয়। এরপর ১৯৯২ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত নেদারল্যান্ডেস স্পুরওয়েগান তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ডাচ রেল অবকাঠামো নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রোরেল। প্রতিদিন ৪ হাজার ৮০০টি ট্রেন নির্ধারিত সিডিউল অনুসারে চলাচল করে এবং গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ দশমিক ১ মিলিয়ন যাত্রীকে সেবা প্রদান করা হয়।
বছরখানেক আগে দেশটির পক্ষ থেকে জরিপ চালিয়ে দেখা হয়েছে যে, ২০৪০ সালের দিকে তাদের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এটি সামলাতে তারা আবার পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় নয়টি বড় শহরের মধ্যে প্রতি ১০ মিনিট অন্তর ট্রেন চলাচল করা হচ্ছে। যেখানে ট্রেন থেকে নেমে যাত্রীদের মেট্রো, ট্রাম ও বাইসাইকেল ব্যবহারের সুবিধা থাকবে, যা বর্তমানেও আছে কিন্তু যাত্রী সুবিধার কথা ভেবে এটিকে আরো বেশি সমন্বিত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট থেকে শূন্য কার্বণ নিঃসরণের বিষয়টি নিয়েও কাজ চলছে। সর্বোপরি গ্রাহক সন্তুষ্টির রেটিং দেশের মধ্যে গড়ে আট হতে হবে। ফিউচার অব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট-২০৪০ শীর্ষক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশটির নীতিনির্ধারকরা অগ্রসর হচ্ছেন এভাবে। রিং আকৃতির রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা নয়টি বড় শহরকে আরো সমন্বিতভাবে সংযুক্তই করছেন না, যাত্রীসেবার মানের দিকেও যথাযথ নজর দিচ্ছেন। যাত্রীদের টিকিট কাটা, সিট বুকিং থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গোটা ব্যবস্থাটাকে তারা আরো টেকসই ও গতিশীল করে তুলতে কাজ করছেন।
ক্রমবর্ধমান নাগরিক চাহিদার কথা বিবেচনা করে দেশের পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা মূলত অস্বীকারের উপায় নেই। আমাদের দেশেও কার্যক্রম চলছে। সরকারও আন্তরিক। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারত্বের অভাব আর পদ্ধতিগত ফাঁকফোকরের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থার মানোন্নয়ন হচ্ছে না। রেলপথ নির্মাণে আমদানি করা সামগ্রীর নিম্ন মান নিয়ে কাগজে ছাপা হওয়া খবরের সংখ্যা কম নয়, কিংবা খোদ বিআরটিসির পক্ষ থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাইরের দেশ থেকে নিম্নমানের বাস-ট্রাক আমদানির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। কেন আমরা বাইরে থেকে নিম্নমানের পণ্য আমদানি করে নিজেদের ভূমিকে একটি ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত করব? তাই পদ্ধতিগত এ ফাঁকফোকরগুলো অপসারণ জরুরি। ইতিবাচক দিক হচ্ছে, দেশের রেল ব্যবস্থাকে আধুনিক ও উন্নত করার কথা ভাবা হচ্ছে, এক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি মানসম্পন্ন যন্ত্রাংশের বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে। পরিবহন ব্যবস্থার সংকটগুলো সমাধান সম্ভব না হলে আর্থিক খরচ বৃদ্ধি ও নাগরিক দুর্ভোগের যূপকাষ্ঠ থেকে বের হওয়া সহজ হবে না।
রুহিনা ফেরদৌস