দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোর মধ্যে জেলা পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। কিন্তু বাস্তবে এটি সবচেয়ে দুর্বল ও অকার্যকর কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামো বিকাশের ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জেলা পর্যায়ে ক্ষমতার দ্বৈততা, প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত না হওয়া, জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতাহীন করে রাখা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও আমলাতান্ত্রিক কূটকৌশল এ অকার্যকরতার পেছনে দায়ী।
বাংলাদেশে জেলার প্রশাসনিক কাঠামোর সূচনা ঘটে মোগল আমলে। ১৭৬৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের স্বার্থে জেলা পর্যায়ে ‘জেলা কালেক্টরেট’ নামে একটি পদ সৃষ্টি করে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে জেলা কালেক্টরেটরাই হয়ে ওঠেন জেলার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি। এ পদে মূলত ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হতো। এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষা। কারণ রাজস্ব আদায় ও বিচারকার্য পরিচালনা করাই ছিল জেলা কালেক্টরেটের অন্যতম কাজ। পাকিস্তান আমলে জেলা কালেক্টরেটের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ডেপুটি কমিশনার’ বা ডিসি। পাকিস্তান আমলেও জেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোর চরিত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি; বরং ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক ধারাই বহাল ছিল।
স্বাধীনতার পর সংবিধানে স্থানীয় সরকারের সব স্তর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। ১৯৭২ সালে জেলা কাউন্সিলের নাম পরিবর্তন করে ‘জেলা বোর্ড’ করা হয়। জেলা বোর্ড আমলাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর প্রতিটি জেলায় সংসদ সদস্যকে গভর্নর করার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জেলা পর্যায়ে ‘ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট কো-অর্ডিনেটর (ডিডিসি)’ নামে একটি পদ সৃষ্টি করা হয়, যেখানে সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরোক্ষ প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়। যদিও সে ব্যবস্থাও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সংগত কারণেই সেটিও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরশাদ শাসনামলে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। মহাকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয় এবং জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ সময়ে আইউব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ মডেলের আদলে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। খালেদা জিয়ার শাসনামলে (১৯৯১-৯৬) জেলা পরিষদ কাঠামো ভেঙে দিয়ে এতে আবার প্রশাসনিক কর্তৃত্ব পুনঃস্থাপন করা হয় এবং জেলা প্রশাসকের হাতেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখা হয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে, ২০০০ সালে, জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করা হয়। এতে চেয়ারম্যানসহ ২১ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। তবে এ সময়েও পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালু রাখা হয়।
বর্তমানে জেলা পর্যায়ে জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসন নামে দুটি সমান্তরাল ক্ষমতার কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে রয়েছে জেলা প্রশাসন আর গণতান্ত্রিক চেতনার নামে নামসর্বস্বভাবে রয়েছে জেলা পরিষদ। জেলা পরিষদকে রাখা হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে আর জেলা প্রশাসন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আর প্রথাগতভাবে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হাতেই রাখা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
এতে দুটি দিকে সমস্যা তৈরি হয়। প্রথমত, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে যেহেতু স্থানীয় সরকারের খুঁটিনাটি সব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, সেহেতু স্থানীয় সরকার কাঠামোর এ গুরুত্বপূর্ণ পর্বটি পুরোপুরি আমলানির্ভরই হয়ে যায়। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী যেহেতু অন্য মন্ত্রীদের নিয়োগকর্তা এবং ডিসিকে জেলা পর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ধরে নেয়ার রেওয়াজ চালু হয়েছে, সেহেতু জেলা প্রশাসনই হয়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যায়ে শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।
ডিসির ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ সর্বগ্রাসী করে রাখা হয়েছে। ভূমি উন্নয়ন কর আরোপ, ভূমি অধিগ্রহণ, হাট-বাজার ইজারা, দরিদ্র ও ভূমিহীনদের জন্য পুনর্বাসন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, গুরুতর অপরাধ দমন, আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতিত্ব, পর্যটন সম্পর্কিত প্রায় সব কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি দমন, জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণসহ রাষ্ট্রের প্রায় পাঁচশর বেশি বিষয়ে ডিসির খবরদারির সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জেলা পরিষদের আওতায় রাখা হয়েছে অনুল্লেখযোগ্য দশটির মতো বিষয়।
এদিকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় জেলা পরিষদের দায়বদ্ধতা ও নৈতিক বলিষ্ঠতা থাকছে না। ফলে জেলা পরিষদ কার্যত নিষ্ক্রিয়ই রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিণত হয়েছে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে। যাদের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সুযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, যাদের এমপি-মন্ত্রী বানানো যাচ্ছে না, রাষ্ট্রীয় খরচে তাদের ভরণ-পোষণ ও লুটপাটের একটা চলনসই সুযোগ দেয়াই হয়ে উঠেছে জেলা পরিষদের একমাত্র লক্ষ্য। বিগত সরকারের এ অসৎ উদ্দেশ্যের কারণে জেলা পরিষদ অনেক দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের টাকা নষ্ট হচ্ছে। জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমলাতন্ত্রও তাদের সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে অপ্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির মাধ্যমে। জেলা পরিষদে তৈরি করা হয়েছে ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ নামে একটি পদ। পদটি প্রশাসন ক্যাডারের পঞ্চম গ্রেডের একটি। এদিকে ‘জেলা প্রশাসক’ নামে যে পদটি আছে, তাও প্রশাসন ক্যাডারের পঞ্চম গ্রেডের একটি। ডিসি ও জেলা পরিষদ নির্বাহী কর্মকর্তার পদমর্যাদা সমান হলেও ক্ষমতা ও দাপটের দিক থেকে পার্থক্য বিশাল। ডিসি যেখানে জেলার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, প্রধান নির্বাহী সেখানে কর্মহীন গোবেচারা। কাজেই প্রধান নির্বাহীর পদটিকে দেখা হয় প্রশাসন ক্যাডারের একটি ‘ডাম্পিং পোস্ট’ হিসেবে।
একজন ডিসিকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তার অনেকটাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়। স্থানীয় রাজস্ব আহরণ কিংবা ম্যাজিস্ট্রেসির মতো বিষয়গুলো এখনো ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার ধারাতেই জেলা প্রশাসনের হাতে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটি ক্ষেত্রেই রয়েছে স্বতন্ত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। রাজস্ব বিভাগ ও বিচার বিভাগ। কিন্তু সেই স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনাকে পাশ কাটিয়ে এ দুটি খাতে ডিসির হস্তক্ষেপের সুযোগ রাখা অনুচিত।
স্থানীয় উন্নয়নে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরিবর্তে আমলানির্ভরতা থাকায় এলাকার প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে একদিকে আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হচ্ছে, এর বিপরীতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে জেলা প্রশাসন ক্রমাগত বলশালী হলেও জেলা পরিষদ হয়ে পড়েছে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে—যার হাতে না আছে প্রশাসনিক ক্ষমতা, না আছে উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রকৃত কর্তৃত্ব।
অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ৭, ৯, ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ও এর কার্যাবলি নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মালিকানা জনগণের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। ৯ ও ১১ অনুচ্ছেদে গণতান্ত্রিক শাসন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা জোর দেয়া হয়েছে। ৫৯ অনুচ্ছেদে প্রশাসনিক, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নমূলক কাজ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। ৬০ অনুচ্ছেদে কর আরোপ, বাজেট প্রণয়ন ও ব্যয়ের ক্ষমতা স্থানীয় সরকারের হাতে অর্পণের নির্দেশনা রয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয় সরকার একটি রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ, যা জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা।
বর্তমানে জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট দ্বৈততার নীতি। একজন ডিসি বর্তমানে যে কাজগুলো করে থাকেন তার অধিকাংশ কাজই করার কথা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। কাজেই জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। জেলা পর্যায়ের উন্নয়ন ও শাসন কাঠামোর মূল কাজটি থাকতে হবে জেলা পরিষদের হাতে। আর জেলা পরিষদকে অবশ্যই হতে হবে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত। একজন নির্বাচিত চেয়ারম্যানই হতে পারেন জেলার সুযোগ্য অভিভাবক। ডিসি ও জেলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নামে যে পদ দুটি রয়েছে তাকে একীভূত করে জেলা পরিষদের আওতায় আনতে হবে। তাতে একদিকে জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে, জেলার সামগ্রিক উন্নয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও কাঠামোতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
সফিক ইসলাম: লেখক ও গবেষক