রাষ্ট্রের অনুদানে পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নেই স্বচ্ছ হিসাব কাঠামো

বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নিরীক্ষণের জন্য একীভূত আইনি কাঠামো দরকার

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মাত্র ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি অনুদান ছিল ৪ হাজার ৯৯৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ও মোট ব্যয় ছিল ৬ হাজার ১৭২ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে অর্থ ব্যয় করেছে ও অনুদানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কেমন সে তথ্য অবশ্য নেই। এটি শিক্ষা খাতের জন্য একটি বড় জটিলতা ও সংকট হয়ে উঠেছে। জনগণের করের টাকা দিয়ে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা হচ্ছে তা জানার নৈতিক অধিকার সবার রয়েছে। সরকারকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য তাই আইনি কাঠামো কিংবা দিকনির্দেশনা দিতে হয়। বাস্তবতা হলো, দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাবমান অনুসরণ করে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী তৈরি করছে না। এজন্য সমন্বিত আইনি কাঠামোও নেই। উল্টো নিরীক্ষা প্রতিবেদন কার কাছে যাবে, কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং নিরীক্ষা কতটা স্বাধীন ও স্বচ্ছ হবে—এসব নিয়ে জটিলতাই বেশি।

ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট কাউন্সিল (এফআরসি) গত বছর ইউজিসির মাধ্যমে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে সর্বশেষ বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়। তখন ৭০টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদন জমা দেয় যার মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র ২১টি। বাকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নির্ধারিত সময়েও কোনো প্রতিবেদন পাঠায়নি। এদিকে যে ২১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সেগুলোর অধিকাংশই ছিল আংশিক, অনিরীক্ষিত ও অসম্পূর্ণ। অথচ আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী, একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যালান্স শিট, আয় বিবরণী, নগদপ্রবাহ বিবরণী এবং নোটস টু অ্যাকাউন্টস থাকা বাধ্যতামূলক। এসব তথ্য না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জমি, ভবন, গবেষণা অবকাঠামো, স্থায়ী সম্পদ, দীর্ঘমেয়াদি দায় ও ভবিষ্যৎ আর্থিক ঝুঁকির কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সম্পদ ও দেনা কত সে তথ্য কারোরই জানা নেই। এদিকে অডিট আপত্তির তথ্যে মিলেছে অনিয়মের ইঙ্গিত। ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রমপুঞ্জীভূত অডিট আপত্তির সংখ্যা ছিল ৫০৬টি এবং এতে জড়িত অর্থের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪২১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অসম্পূর্ণ হিসাবে যে বিবরণ এসেছে তা থেকেই অনুমান করা যায় যে পূর্ণাঙ্গ হিসাবে সংখ্যাটি আরো বড় হতো।

মূল সমস্যা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হিসাব নিরীক্ষার জন্য সমন্বিত আইনি কাঠামো নেই। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা আইনে পরিচালিত এবং বিশ্ববিদ্যালয় আইনে নিরীক্ষার ধরন ও কর্তৃপক্ষ নিয়ে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। মাত্র ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাব নিরীক্ষার জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট নিয়োগের আইনি বিধান রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আইনে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। শুধু আর্থিক সংবিধান ২০০৬ অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসাব ‘সম্পূর্ণতা ও শুদ্ধতা’ যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবেন, এই ভাসা ভাসা বিধানের ওপর ভর করে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টির অর্থ ব্যবস্থাপনা। স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয়টির কোষাধ্যক্ষই স্বীকার করেছেন, হিসাবের নিয়মকানুন অনুসরণ করে আর্থিক বিবরণী তৈরি করার অবস্থায় তারা যেতে পারেননি। অন্যদিকে রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ব্যালান্স শিট তৈরির কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর নয়। এ বিচ্ছিন্নতার ফলে একই দেশের একই সরকারি অনুদানে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো অভিন্ন জবাবদিহির কাঠামোর আওতায় নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয় সিএজির মাধ্যমে নিরীক্ষিত হচ্ছে, আরেকটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের মাধ্যমে, আর কোথাও কোথাও ইউজিসি মনোনীত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। এ বহুমুখী নিরীক্ষণ কাঠামো স্বচ্ছতার পরিবর্তে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

স্বচ্ছ হিসাব কাঠামোর অনুপস্থিতি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, এটি সরাসরি শিক্ষার মান ও গবেষণা পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অপ্রকাশিত হিসাব দুর্নীতির আড়াল তৈরি করে। বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে অনিয়ম ও আর্থিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলাও দায়ের করেছে। স্বচ্ছ হিসাব তথ্যের অনুপস্থিতি এ অনিয়মের সুযোগকে কাঠামোগতভাবে বৈধতার সুযোগ দেয়। জবাবদিহিতা না থাকলে অনিয়ম আড়ালেই থেকে যায়। তাই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ও দায়ের পূর্ণ হিসাব ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্ভব না। গবেষণা অবকাঠামোয় কতটুকু বিনিয়োগ হয়েছে, কোথায় সম্পদ অব্যবহৃত পড়ে আছে, কোথায় নতুন বরাদ্দ প্রয়োজন—এসব জরুরি সিদ্ধান্ত তখন নিতে হয় অনুমানের ওপর ভিত্তি করে, তথ্যের ওপর নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্বল অবস্থানের যতগুলো কারণ রয়েছে তার মধ্যে দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন একটি। বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে যাতে মেধাবী গবেষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অংশীদারদের আস্থা অর্জন করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ পথে না হাঁটলে আন্তর্জাতিক একাডেমিক অংশীদারত্ব, যৌথ গবেষণা প্রকল্প ও বিদেশী অনুদান আকর্ষণের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হবে।

উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব নিয়ে যে জটিলতা রয়েছে তা সমাধানে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি অভিন্ন আইনি ও হিসাব কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। নিরীক্ষার জন্য একীভূত আইনি কাঠামো করে তা সিএজির তত্ত্বাবধানে পরিচালনার কথা ভাবতে হবে। প্রয়োজনে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট নিয়োগ দেয়ার কাজটিও সিএজি করতে পারে। যোগ্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা, নিরীক্ষা প্রতিবেদন কার কাছে যাবে এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কীভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে—এসবের সুনির্দিষ্ট বিধান আইনি কাঠামোয় থাকবে। এভাবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সংসদীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ তৈরি হবে। ভারতের উদাহরণ অনুসরণ করা যায়। দেশটিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিরীক্ষা প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপিত হয় ও পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশেও জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি বা পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির মাধ্যমে এমন কাঠামো তৈরি করা যায়। শুধু আইনি কাঠামো করলেই হবে না, তা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে বার্ষিক নিরীক্ষিত প্রতিবেদন প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা জরুরি।

অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব ব্যবস্থাপনা দশকের পর দশক ধরে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক হিসাবমান বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার এবং পরিবর্তন ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা প্রয়োজন। এগুলোর কোনোটিই এ মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেই। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের যুক্তি দিয়ে নিরীক্ষার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ উপেক্ষার সুযোগ নেই। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের করের টাকায় পরিচালিত। তাই এ অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে জানার অধিকার জনগণের আছে। সংসদকেও তদারকির দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি ও এফআরসির উচিত যৌথভাবে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা, যেখানে স্বল্পমেয়াদে অন্তত সব বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতায় আনা হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত আইনি কাঠামো ও স্বাধীন বহির্নিরীক্ষার বিধান নিশ্চিত করা হবে।

আরও