অপার সম্ভাবনার ঢাকা অনাবাসযোগ্য
‘মানবসভ্যতার ইতিহাসে নগর একটি বিস্ময়’—এ চিন্তাধারা অধ্যাপক নজরুলকে তার কাজকর্মে তাড়িত করেছে যা ঢাকা নিয়ে তার আশা-নিরাশায় বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। প্রাদেশিক রাজধানী থেকে দেশের রাজধানী, নগর থেকে মহানগর এবং তাও পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম—ঢাকার এ রূপান্তরের গৌরবের সঙ্গে অনাবাসযোগ্য পরিচিতি অধ্যাপক নজরুলকে বিচলিত করে। অধ্যাপক নজরুল অপ্রীতিকর বা কঠিন কথা বলার মানুষ নন। তাই তিনি যখন লেখেন, ‘অব্যবস্থা, উদাসীনতা, অযোগ্যতা এবং দুর্নীতির ফলে রাজধানীর এ অবস্থা হয়েছে’ তখন উপলব্ধি করা যায় ঢাকা নিয়ে তার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বর্তমান অবস্থার ফারাক কতটা। তার আকাঙ্ক্ষায় ঢাকা হবে ‘একটি সুন্দর সমৃদ্ধ রাজধানী শহর। এমন একটি শহর যেখানে সর্বক্ষেত্রে দক্ষতা থাকবে, সৌন্দর্য থাকবে, প্রবৃদ্ধি থাকবে, সমতা থাকবে, পরিবেশ ভারসাম্য বজায় থাকবে, স্বাস্থ্যসম্মত হবে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অটুট থাকবে, গণতান্ত্রিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে’। এ প্রসঙ্গে আরো একটি গভীর উপলব্ধির কথা তিনি স্পষ্ট করেন অনাবাসযোগ্য তো নয়ই—‘অসাম্যের রাজধানীও কখনই সুন্দর রাজধানী হবে না’।
তিনি মন্তব্য করেন, ঢাকার বর্তমান অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি, বহু বছরের অবহেলা, অদক্ষতা, অপরিণামদর্শিতা, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব, সদিচ্ছার অভাব, যথাযথ নেতৃত্বের অভাবে আজকের ঢাকার অনাবাসযোগ্য পরিচিতি। এ পরিচিতিকে অস্বীকার না করে তিনি দৃষ্টিতে আনেন বসবাসের অনুপযোগী নির্ণয়ের সমীক্ষায় যে পাঁচটি বিষয় বিবেচনা করা হয় তার প্রতি। এগুলো হলো: স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা, অবকাঠামো। ঢাকার সবচেয়ে খারাপ স্কোর অবকাঠামোতে (২৬.৮/১০০)। অধ্যাপক নজরুল মনে করেন, ঢাকার অনাবাসযোগ্য পরিচিতি যে বিবেচনায় হলো তার দৃশ্যত কারণ অবশ্যই অবকাঠামো। যার মধ্যে রয়েছে পরিবহন, রাস্তাঘাট, পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, জ্বালানি, উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ, পার্ক, গাছপালা।
ঢাকার বহুল সমস্যা উপলব্ধি ও সমাধানের জন্য প্রথমেই বিবেচনায় আনতে হবে এর বিশালতা ও গুরুত্ব। দেশের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ৪০০ বছরে গড়ে ওঠা ঢাকা জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের এ ৫০ বছরের মাথায় যে ঢাকায় রূপান্তরিত হয়েছে তার আকারে রয়েছে ঢাকার দুটি করপোরেশনসহ সাতটি পৌরসভা। ঢাকার দুটির সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ, কদম রসুল, টঙ্গী, গাজীপুর ও সাভারে বিস্তৃত হয়ে গঠিত হয়েছে আজকের মহানগর ঢাকা, যার সীমানা ১ হাজার ৫৩০ বর্গকিলোমিটার (রাজউকের সীমানা) ও লোকসংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। কিন্তু কেন্দ্রীয় শহর মাত্র ৩৬০ বর্গকিলোমিটার বা আরো কম (লোকসংখ্যা ৭০-৭৫ লাখ)। এ বিশাল নগরবাসীর ৪০ শতাংশের অধিক দারিদ্র্যসীমার নিচে, খুবই দরিদ্র ২০%-২৫% ও ৩০% বস্তিতে (নজরুল ইসলামের ‘ঢাকা মহানগরীর উন্নয়ন’, ২০১৪, পৃ ৩০৫) যা এরই মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে প্রকট হয়ে উঠেছে।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম চিহ্নিত ঢাকার সমস্যার কারণের মধ্যে রয়েছে: জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার, কর্মসংস্থান সমস্যা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ব্যাপক দারিদ্র্য, পরিবহন সমস্যা, আবাসন সমস্যা, পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, জলাবদ্ধতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশ বিপন্নতা ও দূষণ সমস্যা, আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তা সমস্যা। ‘খালগুলো দখল হয়ে গেছে’ কথাটা বারবার আসে তার লেখায় বিশেষ করে জলাবদ্ধতা সমস্যা প্রসঙ্গে। খাল গেছে বেদখল হয়ে আর বুড়িগঙ্গা শেষ হয়ে যাচ্ছে পরিবেশ বিধ্বংসী উন্নয়ন ও ঠুনকো শিল্পায়নে। কেন এ রকম হলো? তিনি বিভিন্নভাবে তা প্রকাশ করেছেন: ‘অব্যবস্থা, উদাসীনতা, অযোগ্যতা এবং দুর্নীতির ফলে রাজধানীর এ অবস্থা হয়েছে’; ‘নগর কর্তৃপক্ষের ও বিভিন্ন সংস্থার উদাসীনতার কারণে ঢাকার বর্তমান অবস্থা’; ‘বহু বছরের বহু দশকের অমনোযোগের কারণে, অবহেলার কারণে, অপরিকল্পনার কারণে’; ‘সত্যিকার গরজ নেই, প্রচেষ্টাও নেই’; ‘মহানগরের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার সম্পৃক্ত সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব’; ‘সম্পদের সীমাবদ্ধতা, সার্বিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নাগরিক সচেতনতার ঘাটতি’। ‘পূর্ব ঢাকার প্রান্ত দিয়ে বালু নদীর পাড় দিয়ে পূর্ব ঢাকা বাইপাস সড়ক ও বন্যারক্ষা বাঁধ নির্মাণ’ তার নতুন উদ্বেগ।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সামগ্রিকভাবে প্রয়োজন কর্মতত্পরতা, কর্মদক্ষতা ও অর্থসংস্থান বৃদ্ধি। অবকাঠামোর অপর্যাপ্ততার জন্যই যে ঢাকার অনাবাসযোগ্য পরিচিতি তা উল্লেখ করে তিনি অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে নির্দিষ্ট করেন দুর্নীতি ও অর্থায়ন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করা প্রয়োজন (অবশ্যই ব্যয়-মূল্যে) সব ধরনের পাবলিক ইউটিলিটি (পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস); পাবলিক গুডস (রাস্তাঘাট, হাঁটার পথ, মাঠ, পার্ক); গণপরিবহন (রেল, মেট্রো, বাস)। বিত্তবানদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রাধিকার (যেমন গাড়ি চলাচলের জন্য রাস্তা, হাইওয়ে, ব্রিজ বা সেতু) কমিয়ে অগ্রাধিকার দেয়া দরকার স্বল্প খরচের গণপরিবহনে, হাঁটার পথ ও পাবলিক টয়লেট নির্মাণে। অধ্যাপক নজরুল শহরের গণ পরিবহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি মনে করেন কমিউটার ট্রেন যা ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকে যাওয়া-আসার জন্য প্রয়োজন। ব্যয়, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য পরিবহন সেবা প্রদানে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সড়ক দুর্ঘটনা ঢাকাসহ সমগ্র দেশের রাস্তাগুলোয় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যার থেকে মুক্তির জন্য বহুমুখী ব্যবস্থার মধ্যে অন্যতম চালকদের শিক্ষা, ড্রাইভিং দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা; লাগামহীন মুনাফার পেছনে মালিকদের ছুটে চলার প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা; প্রয়োজনীয় রাস্তাঘাট তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ; ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ; পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য জেব্রা-ক্রসিং ও ফুটব্রিজসহ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ।
যে ধরনের ভৌত-অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার অপর্যাপ্ততা ঢাকাকে অনাবাসযোগ্য করে তুলেছে তার মধ্যে অন্যতম নিষ্কাশন এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা; নিম্ন আয়ের ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নগরজীবনের জন্য যথাযথ আবাসস্থলের অভাব; পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অপর্যাপ্ততা ও দুর্লভ্যতা; উন্নতমানের পাবলিক টয়লেট ও স্যানিটেশনের অপর্যাপ্ততা; বায়ুদূষণসহ নানা ধরনের দূষণ ও খোলা জায়গা, পার্ক ও খেলাধুলার মাঠের অভাব।
অবকাঠামো সরবরাহে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। সেবার জন্য মূল্য নির্ধারণে ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে ক্রস ভর্তুকি (অর্থাৎ আয় অনুসারে স্বল্প আয়ের নাগরিকের জন্য সেবামূল্য হবে কম আর বেশি আয়ের নাগরিকের জন্য বেশি। এ নীতির কিছু প্রয়োগ রয়েছে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে (অপ্রত্যক্ষভাবে ব্যবহারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে) যা অনুসরণ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের নগরবাসীর জন্য নাগরিক পরিষেবা সুলভ মূল্যে বা ক্রয় করার সামর্থ্যের মধ্যে আনার ব্যবস্থা করা যায়। তবে কোনো সেবাই বিনামূল্যে বা সেবা প্রদানের ব্যয়ের কম মূল্য দেয়ার নীতি বহনযোগ্য নয়। এ প্রসঙ্গে ‘যারা বিত্তবান তাদের জন্য সরকার কিছু না করলেও চলে’—অধাপক নজরুলের এ বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য।
নির্মিত অবকাঠামো ও পরিবেশ ছাড়া শহর-নগর হয় না। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না দুনিয়াজুড়েই শহর-নগর গড়ে ওঠে কিছু অন্তর্নিহিত অবস্থানগত বা ভৌগোলিক সুবিধার জন্য। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিতি তাই ঢাকার বড় পরিচিতি। প্রাকৃতিক দিক থেকে ঢাকার প্রয়োজন ও সৌন্দর্য একমাত্র বুড়িগঙ্গা ছিল না। মালার মতো ঢাকার চারিদিকে আরো রয়েছে শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী। এ নদীগুলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে যোগাযোগেও বড় ভূমিকা রাখে। বর্জ্য ও শিল্প বর্জ্যপানি নিষ্কাশনে বিবেকহীন ব্যবহারের মাধ্যমে চারদিকের এ নদীগুলোকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। ঢাকা নগরের আরেক বড় সম্পদ ছিল খাল, তাও প্রায় সবই হারিয়ে গেছে ‘উন্নয়নের’ যাত্রাপথে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিশালতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢাকার রমনা-গ্রিন বা বলধা গার্ডেনের মতো নতুন সৃষ্টি এখনো নেই। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম যথার্থই মনে করেন ‘পুষ্প-বৃক্ষে শোভিত শহর সুন্দর। ঢাকা একসময় এরকম সুন্দর শহর ছিল’। তিনি এর সঙ্গে আরো যুক্ত করেন: ‘সুন্দর স্থাপত্যের শহরও সুন্দর; শহর সুন্দর যেমন সাম্যে, সুন্দর তেমনি বাহ্যিক, ভৌত নান্দনিকতাতেও; পরিচ্ছন্ন শহরও সুন্দর শহর’। গাছ লাগানোকে টোকেনিজম না করে প্রয়োজন ‘নতুন নতুন বাঁশঝাড়, হিজলতলা, শালবন’।
নগর দারিদ্র্য
অধ্যাপক নজরুল নগর দারিদ্র্যের প্রোফাইল তুলে ধরেন এভাবে: দারিদ্র্য মোচনে ওরা প্রধানত যুক্ত হয় ‘ইনফর্মাল কার্যক্রমে’, শ্রমিকের কাজ করে ২৩%; বাসস্থান অত্যন্ত নিম্নমানের, অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ; পরিবারের কোনো-না-কোনো সদস্য মাসে একবার হলেও অসুস্থ থাকেন’। এ দরিদ্র জনগোষ্ঠী মূলত গ্রামের দরিদ্র মানুষ থেকে অভিবাসনের মাধ্যমে উঠে আসা শ্রমশক্তি। যেসব সেক্টরে এরা কাজ করে তার মধ্যে প্রধান নির্মাণ, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও গৃহকর্ম। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা তরুণ মহিলারা তৈরি পোশাক শিল্পে নিয়োজিত হয়ে নগর দরিদ্র ও বস্তিবাসীর সংখ্যা স্ফীত করে তুলেছে। এসব স্বল্প বেতনের কাজও যারা পায় না তাদের জন্য অবারিত কর্মক্ষেত্র অনানুষ্ঠানিক খাতের নানা রকমের কাজ যা হতে পারে টোকাইর, রিকশা চালানোর, রাস্তায় বসে বা দাঁড়িয়ে নানা ধরনের দ্রব্যের বিক্রেতা ও মেরামতের কাজ (জুতা সেলাই থেকে শুরু করে তালা-চাবি মেরামতের কাজ)। ট্রাফিক জ্যামে দাঁড়িয়ে পত্রিকা বিক্রি থেকে শুরু করে বোতলজাত পানি ও নানা ধরনের ক্ষুদ্র নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। এসব অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রমে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্ত হয়েছে সুকান্তের রানারের মতো নানা ধরনের পাঠাও বা ডেলিভারি কাজে নিয়োজিত তরুণ ও শিক্ষিত শ্রমশক্তি।
কাজের, শ্রমের ও নিয়োগের ধরনের পার্থক্য থাকলেও যা এ লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য বা সবার জন্য প্রযোজ্য তা হলো: কাজটি ও তার থেকে পাওয়া মজুরি বা আয়ের অনিশ্চয়তা; কাজে না যেতে পারলে (অসুস্থতাজনিত কারণে) মজুরি না পাওয়া বা আয় করতে না পারা এবং দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসার কারণে স্বল্প আয় বা মজুরি থেকেও গ্রামে ফেলে আসা বাবা-মা, স্ত্রী-স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য টাকা পাঠানো। এসব দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতায় খরচ কমায় বস্তিতে যত সম্ভব অল্প ভাড়া দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে; খাওয়া খরচ যতটা সম্ভব কমিয়ে ও সুস্থ থাকার জন্য খরচপাতি বাদ দিয়ে। অধিকারহীনতা ও অসহায়ত্ব নগর দারিদ্র্যের আরেকটি দিক।
নগর দরিদ্রের কাজ বা শ্রমের অবদানের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসে, নগরায়ণের সার্বিক ব্যয় হ্রাসে, গ্রামীণ শ্রম সরবরাহ কমিয়ে গ্রামীণ মজুরি বৃদ্ধিতে, স্বল্প দামে নগরবাসীর নানা সেবা পাওয়ায়। কিন্তু এসবই হয় নিজেদের কল্যাণের বিনিময়ে, এমনকি সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল কমিয়ে। যেসব পেশা বা কাজে নগর দরিদ্ররা নিয়োজিত বা জড়িত যেমন টোকাই, রিকশাওয়ালা, পরিবহন কর্মী, নির্মাণ শ্রমিক—এদের সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল জাতীয় গড় আয়ুষ্কাল থেকে কম হয় যা গড় হিসাবের বদৌলতে অজানা থেকে যায়।
নগর দরিদ্রের এ ধরনের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিতির জন্যই অধ্যাপক নজরুল লেখেন ‘যারা বিত্তবান তাদের জন্য সরকার কিছু না করলেও চলে’। পক্ষান্তরে নগর দরিদ্রের জন্য সরকারের ভূমিকা প্রয়োজন কর্মসংস্থানে, শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে (শিক্ষা ও কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা করে ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মাধ্যমে)। আরো গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন নগর দরিদ্রের সন্তানদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য। তা না করা হলে নগর দরিদ্রের সন্তানও হবে নগর দরিদ্র—এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে হস্তান্তর হবে দারিদ্র্য। অধ্যাপক নজরুল যথাযথই মনে করেন ‘নগর দারিদ্র্য সমাধানে পেশাগত অধিকার’ নিশ্চিত করা—যেমন ‘অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রমে বাধা না দেয়া’, নিয়মিত হয়রানি বন্ধ করা, চাঁদা তুলতে না দেয়া ও ‘উচ্ছেদ কর্মকাণ্ড পরিহার করা’ ন্যূনতম নৈতিক দায়িত্ব।
অনাবাসযোগ্য বস্তি বসতি
অধ্যাপক নজরুল ঠিকই মনে করেন ‘বস্তি হলো শহর-দরিদ্রের আবাসন সমস্যার সমাধান, কেননা অন্য কোনো পদ্ধতিতে দরিদ্ররা আবাসন সমস্যার সমাধান করতে পারে না, সরকার বা প্রাইভেট সেক্টর দরিদ্র নগরবাসীর আবাসন সমস্যার সমাধান করতে সাধারণত উদ্যোগী হয় না’ (ইসলাম, ২০১৩, ৪০)। অর্থনীতির যুক্তি অনুসারেও বস্তি হলো নগর দরিদ্র মানুষের থাকার জায়গা বা বাসস্থানের জন্য খরচ ন্যূনতম রাখার একটি প্রধান উপায়। কিন্তু এর ফলে যে ধরনের জীবনধারণ তাদের করতে হয় তা অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি, ফজলে রেজা সুমন, তার একটি সাম্প্রতিক নিবন্ধে ঢাকা নগরের আবাসিক সমস্যা তুলে ধরতে উল্লেখ করেন ‘ঢাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বস্তিতে বসবাস করে। ঘিঞ্জি ঘর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাদের থাকতে হয়। পানি, বিদ্যুৎসহ মৌলিক নানা সেবা নিয়ে তাদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়’।
অধ্যাপক নজরুলের অভিমত, বস্তিবাসীর প্রান্তিক অবস্থার কারণ ‘মৌলিক নগরীয় সেবাগুলো শুধু স্থাবর সম্পদের বৈধ মালিকদের (বাড়িঘরে) কাছেই সরবরাহ ও সম্প্রসারণের সরকারি নীতি’ (ইসলাম, ২০১৪, ৩৬৮)। এ ভ্রান্ত নীতির পরিবর্তে ‘বস্তিতে পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ব্যবহারের (সেবামূল্যের বিনিময়ে) অধিকার’ প্রদানের তার অভিমত অর্থনৈতিক যুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সামগ্রিক ভিত্তিতে বস্তি সমস্যা সমাধানে তিন ধরনের কৌশল নেয়ার ক্ষেত্রে তার অভিমতগুলো হলো (১) স্থানীয়ভাবে বস্তি উন্নয়ন বা ‘ইনসিটু বস্তি উন্নয়ন’, (২) শহরের কেন্দ্রীয় এলাকাগুলো থেকে বস্তি অপসারণ করে শহরের প্রান্তিক এলাকা শহর থেকে একটু দূরে খোলামেলা জায়গায় সুপরিকল্পিতভাবে বস্তিবাসীর পুনর্বাসন এবং (৩) ইচ্ছুক বস্তিবাসীদের নিজ গ্রামে অথবা অন্য কোনো পল্লী এলাকায় সরকারি খাসজমিতে অর্থনৈতিক পুনর্বাসনসহ সার্বিক পুনর্বাসন।
বর্তমান বাস্তবতার আলোকে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি কিন্তু তিনি যথার্থই মনে করেন আবাসন সমস্যা সমাধানে সার্বিক পদক্ষেপ হওয়া দরকার ‘বিভিন্ন শ্রেণীর জন্য তাদের জনসংখ্যা ও ক্রয় ক্ষমতা বিবেচনায় এনে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় আবাসিক ভূমির সংস্থান করা’। এ কাজেও টোকেনিজম বা লোক দেখানো কিছু প্রজেক্ট নেয়া পরিহার করে নগর দরিদ্র, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ও বস্তিবাসীদের আবাসন ব্যবস্থা অন্যান্য নাগরিক গোষ্ঠীর আবাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে সামগ্রিক আবাসন ব্যবস্থার নীতি গ্রহণ অপরিহার্য। নগর আবাসন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মালিকানার তুলনায় গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন ভাড়ার জন্য বাসস্থান (রেন্টাল একমডেশন) নির্মাণ। একজন জাপানি নগর পরিকল্পনাবিদ সাদাও ওয়াটানাবে যথার্থই মনে করেন, নগর হলো আয় করার স্থান—সিটিজ আর প্লেসেস ফর আর্নিং। এ প্রয়োজন মেটাতে দরকার সাশ্রয়ী আবাসন। গ্রামই থাকতে পারে যার যার নিজস্ব বাড়ির জন্য আর শহরে-নগরে ভাড়া বাসাবাড়ি হতে পারে জীবিকাকে সহজতর ও সাশ্রয়ী করার আবাসস্থল। ছোট এ বাংলাদেশে যাতায়াতের উন্নতির ফলে গ্রাম-নগরের আসা-যাওয়ার সময় দিন দিনই কমে আসছে। যার ফলে গ্রামের বাড়িই থাকতে পারে মূল বাড়ি; আর শহরে-নগরে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসার জন্য থাকার প্রয়োজনে যে বাসস্থান তা হতে পারে ভাড়া দেয়ার জন্য নির্মিত বাসাবাড়ি। এ রকম দৃষ্টিকোণ থেকে আবাসন ব্যবস্থা ও নীতি গ্রহণ করলে শহরে-নগরের যে দৃষ্টিকটু অসমতা আবাসন ব্যবস্থায় বহু বিস্তৃত তা কমে আসবে।
শেষ কথা
নগর ঠিকই মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি বিস্ময়। কিন্তু এ নগরই আবার বৈষম্য ও অসমতাকে সবচেয়ে প্রখর করে তোলে। নগর যেমন উৎপাদনশীলতায় এগিয়ে, আবার এ নগরেরই আরেক পরিচিতি ‘পরজীবী’। শুধু খাদ্য নয়, শ্রমশক্তির জন্যও শহর-নগর গ্রামের ওপর নির্ভরশীল। পক্ষান্তরে শহর-নগর মানুষকে স্বপ্ন দেখায় অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য। যে নগরায়ণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে শহর-নগর গড়ে উঠেছে তা একদিকে যেমন বিভিন্ন ধরনের অসমতার সৃষ্টি করেছে তেমনি গ্রামকে পরিবর্তিত করে চলেছে শহর-নগরের আলোকে! এভাবেই গ্রাম-নগরের পার্থক্য কমে আসছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো চলে আসা প্রক্রিয়ায় যে অর্থনৈতিক অসমতা, মানব বসতির ধরন ও পরিবেশ বিধ্বংসী প্রক্রিয়া চলছে তা অধ্যাপক নজরুলের মতো যারা নগরায়ণ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করেন তাদের বিচলিত করে। নগরায়ণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে দেশব্যাপী দুর্ঘটনায় বিকলাঙ্গ বা মৃত্যু; আলোর বা আয়ের সন্ধানে এসে বস্তিতে অমানুষিক জীবনযাপন; ১০-১২ ঘণ্টা পরিশ্রম করেও বাসা ভাড়া-খাওয়া-ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে না পারা; গুরুতর অসুস্থ হয়ে সরকারি হাসপাতালে গিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা। এসব দুর্দশা নগর, নগরায়ণ ও নগর পরিকল্পনা নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের মধ্যে একটা অসহায়ত্ব বোধ সৃষ্টি করে। অধ্যাপক নজরুলের লেখালেখিতেও আমরা তা লক্ষ করি। তিনি এসব বিষয়ে কাজ করার জন্য যে প্রতিষ্ঠান (সিইউএস) গড়ে তুলেছেন তার মাধ্যমে জড়ো করেছেন একঝাঁক নগরবিষয়ক গবেষককে। নগরায়ণ, ঢাকাকে বাসোপযোগী করা, নগর দারিদ্র্য ও বস্তি সমস্যার সমাধানে এ সম্পদকে (এ সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে থাকা সম্পদসহ) কাজে লাগাতে পারে আমাদের নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো। সিইউএসও উদ্যোগ নিতে পারে অধ্যাপক নজরুল ও তার সহযোগীদের কাজকে বাস্তবায়নের জন্য সৃজনশীল উপায় বের করার।
ড. এটিএম নুরুল আমিন: ইমেরিটাস প্রফেসর, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ব্যাংকক