প্রসঙ্গত

সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে ‘২+১ লেন রোড’ পদ্ধতি

কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন বা কেএফসি নিয়ে একটি গল্প বেশ প্রচলিত। যেমন ১১ রকমের মসলা (হার্ব ও স্পাইস) দিয়ে তৈরি তাদের যে সিক্রেট রেসিপিটি আছে, একটা সময় কেএফসির মাত্র দুজন শেফ তা জানতেন। তাই তাদের কখনই একসঙ্গে উড়োজাহাজ কিংবা গাড়িতে ভ্রমণের অনুমতি ছিল না। আশঙ্কার কারণ কোনো ধরনের দুর্ঘটনায় যদি তাদের দুজনের মৃত্যু ঘটে, তাহলে কেএফসির গোপন রেসিপিটিও তাদের সঙ্গে হারিয়ে যাবে।

কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন বা কেএফসি নিয়ে একটি গল্প বেশ প্রচলিত। যেমন ১১ রকমের মসলা (হার্ব ও স্পাইস) দিয়ে তৈরি তাদের যে সিক্রেট রেসিপিটি আছে, একটা সময় কেএফসির মাত্র দুজন শেফ তা জানতেন। তাই তাদের কখনই একসঙ্গে উড়োজাহাজ কিংবা গাড়িতে ভ্রমণের অনুমতি ছিল না। আশঙ্কার কারণ কোনো ধরনের দুর্ঘটনায় যদি তাদের দুজনের মৃত্যু ঘটে, তাহলে কেএফসির গোপন রেসিপিটিও তাদের সঙ্গে হারিয়ে যাবে।

বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার ইদানীংকালের চিত্র বলে একই পরিবারের সব সদস্যের একসঙ্গে কোথাও যাওয়া এখন ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন গত ৮ ফেব্রুয়ারির সড়ক দুর্ঘটনা। মানু রানী সুশীলের পরিবারটিকে হঠাৎ দিশেহারা এক পরিস্থিতির সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। সেদিনের সে দুর্ঘটনার মাত্র দশদিন আগে অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী সুরেশ চন্দ্র মারা যান। ধর্মীয় আচার পালনের জন্য তার সাত ছেলে ও এক মেয়ে স্থানীয় একটি মন্দিরে যায়। প্রথা পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে একটি পিকআপের ধাক্কায় সুরেশ চন্দ্রের চার সন্তানের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাসপাতালে মারা যান আরো একজন। চিকিৎসাধীন ছিলেন একজন। গত ২২ ফেব্রুয়ারি মারা যান তিনিও। এভাবে একটি দুর্ঘটনা একই পরিবারের ছয় সদস্যকে কেড়ে নিয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু নিয়ে খোঁজ করলে দেখা যায়, গত বছর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশালে যাত্রীবাহী একটি বাস একটি ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারালে ঘটনাস্থলে পাঁচজন ও পরে আরো দুজন নিহত হয়। সেখানেও একই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যুর খবর মেলে (ত্রিশালে একই পরিবারের ৫ জনসহ নিহত ৭, অক্টোবর ২০২১, বণিক বার্তা)। এ ফেব্রুয়ারিতেই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কয়েকটি সংবাদের শিরোনাম এমন—কক্সবাজারে বাস-পিকআপ-মিনিবাসের ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত ৩ (৭  ফেব্রুয়ারি); ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫, সেনাসদস্যসহ আহত ২৩ (১৬  ফেব্রুয়ারি); রাজধানীতে গাড়িচাপায় নারীসহ ২ মোটরসাইকেল আরোহী নিহত (১৭ ফেব্রুয়ারি); কুমিল্লায় ট্রাক ও অটোরিকশার সংঘর্ষে মৃত্যু বেড়ে ৬ (১৮ ফেব্রুয়ারি); ঝালকাঠিতে বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ (২০ ফেব্রুয়ারি); বাগেরহাটে ট্রাক-অ্যাম্বুলেন্স-রিকশার ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত ২ (২১ ফেব্রুয়ারি); মুন্সীগঞ্জে সড়কে গেল মা ও মেয়ের প্রাণ (২২ ফেব্রুয়ারি)।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে দুই দফা আন্দোলন করল স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সড়ক ব্যবস্থাপনার ক্ষত মেরামতের জন্য টেকসই কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না। বিপরীতে উন্নয়নের পিঠপিছে সড়ক অব্যবস্থাপনা মহীরুহের আকার ধারণ করে চলেছে। সমস্যার সূত্র একাধিক। তবে সমাধানের অতীত নয়।

দেশের সড়কজুড়ে কতগুলো ট্রাক, গাড়ি, পিকআপ ইত্যাদি আছে, তার তুলনায় ঠিক কতজন চালকের লাইসেন্স আছে তা জানাটা রকেট সায়েন্সের মতো কঠিন বিষয় নয়। পণ্যবাহী ট্রাক, পিকআপ আর যাত্রীবাহী বিভিন্ন গাড়ির অবস্থা কী, এগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ কিনা, তা যেমন দেখা জরুরি, তেমনি দেশের হাইওয়ের মাঝখানে ডিভাইডার দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। একমুখী গাড়ি চললে দুর্ঘটনা কম ঘটে। আমাদের হাইওয়ে ব্যবস্থাপনায় কেন ডিভাইডার দেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। দেশের হাইওয়েগুলোতেই অনেক বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে ডিভাইডার না থাকার কারণে।

২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ইউরোপজুড়ে গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার যখন ৪৫ শতাংশ কমে, তখন পোল্যাল্ডে তা হ্রাস পায় মাত্র ২৪ শতাংশ। ২০১৩ সালের দিকে ইউরোপের গ্রিস, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, পর্তুগালসহ অন্যান্য দেশের মধ্যে পোল্যান্ডে গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি (সূত্র বিশ্বব্যাংক)। তখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের পোল্যান্ডভিত্তিক কান্ট্রি ম্যানেজার ছিলেন মেরিনা ওয়েস। তিনি সে সময় পোল্যান্ড সরকারকে পরামর্শ দিলেন, তোমরা যদি সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর হার কমাতে চাও তো সুইডিশ ‘২+১ লেন রোড’ পদ্ধতি অনুসরণ করো।

২+১ লেন রোড পদ্ধতি মূলত তিন লেনের রাস্তার একটি বিশেষ ধরন, যার একদিকে দুটি লেন এবং অন্যদিকে একটি লেন থাকে। তবে প্রতি দুই কিলোমিটার (কম-বেশি) পর লেনগুলো বিকল্পভাবে পরিবর্তন হয়। যেমন আপনি যদি ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ২+১ লেন পদ্ধতিতে তৈরি একটি মহাসড়ক ধরে যেতে থাকেন, তাহলে প্রতি দুই কিলোমিটার পর একই দিকের এক লেনের রাস্তা দুই লেনে বদলে যাবে। এভাবে কিছুদূর পরপর রাস্তার নকশা অনুসারে কখনো দুই লেন থেকে এক লেনে কখনো এক লেন থেকে দুই লেনে আপনাকে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। ২+১ লেন রোডের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাস্তার মাঝখানে ‘সেন্ট্রাল ব্যারিয়ার’ স্থাপন। এটি মূলত লম্বা মসৃণ মোটা তারের (কেবল ধরনের) বেড়া, যা দিয়ে দুটি লেন ও এক লেনকে বিভক্ত করা হয়। আমাদের রাস্তার মাঝখানে যেমন কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে মিডিয়ান তৈরি করা হয়, এ রাস্তার ‘সেন্ট্রাল ব্যারিয়ার’ কিন্তু তেমন নয়। এটি এমনভাবে তৈরি যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকারী দলটি তারের বেষ্টনী খুলে বিপরীত লেনে প্রবেশ করতে পারবে। আবার উদ্ধারকার্য শেষে পুনরায় পিলার ও তারগুলো সহজে প্রতিস্থাপন করতে পারে। পাশাপাশি একই দিকের দুই লেনে রয়েছে নিরাপদ ওভারটেকিং জোন সুবিধাও।

১৯৫৫-১৯৮০ সময়কালে সুইডেনে যে মহাসড়কগুলো তৈরি করা হয়, তা ছিল ১৩ মিটার (৪৩ ফুট) চওড়া। কিন্তু দেখা গেল যে এতেও সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করা যাচ্ছে না। গবেষণায় দেখা যায়, সড়কে ৬০ শতাংশ দুর্ঘটনাই ঘটছে মাঝখানে ডিভাইডার না থাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে। আবার রাস্তার দুই পাশ প্রসারিত করে উভয় লেনে জায়গা বাড়ানোর খরচও অনেক বেশি পড়ে। তখন সুইডিশ ন্যাশনাল রোড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও সুইডিশ রোড অ্যান্ড ট্রান্সপোর্টেশন রিসার্চ সেন্টার যৌথভাবে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে শুরু করে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১৯৯০ সালের দিকে হাইওয়ের মাঝখানে বেষ্টনী দিয়ে ২+১ লেন রোড পদ্ধতি প্রয়োগ করে তারা। মূলত যে সড়কগুলোয় দুদিক থেকে আসা গাড়ির মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ বেশি হওয়ার রেকর্ড ছিল, সেগুলোয় এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় কম খরচে সড়ক নিরাপত্তার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ২+১ লেন রোড দিয়ে নিরাপদ ওভারটেকিং সুবিধাও বেশি।

পদ্ধতিটির কার্যকারিতা এত বেশি যে ২০০০ সালের পর সুইডেনের ১ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি সড়ক সাধারণ চওড়া রাস্তার বদলে ২+১ লেন সড়কে বদলে দেয়া হয়। অবশ্যই মাঝখানে শক্তিশালী তারের বেষ্টনীসহ। এভাবে তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সক্ষম হয় দেশটি। ২+১ লেন পদ্ধতিটি সুইডেনের পাশাপাশি জার্মানি, ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, পর্তুগাল, রোমানিয়া, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি রাশিয়ার কিছু রাস্তাও এ পদ্ধতিতে তৈরি। ইউরোপ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, কানাডার অন্টারিও, কুইবেক, আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া, হ্যাম্পশায়ার, মিসৌরিসহ অন্যান্য রাজ্যে এটি প্রচলিত।

২০১৯ সালে বাংলাদেশে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৭০২টি। নিহত হয়েছে ৫ হাজার ২২৭ জন। আহত ৬ হাজার ৯৫৩ জন। সূত্র: নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। ২০২০ সালে দেশে ৪ হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৩১ জন নিহত হয়। আহত হয় ৭ হাজার ৩৭৯ জন। ২০২১ সালে ৫ হাজার ৩৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৬ হাজার ২৮৪ জন নিহত ও ৭ হাজার ৪৬৮ জন আহত হয় (সূত্র: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন)।

গত দুই দশকে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী চালক [সূত্র: অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বুয়েট)]। বিশ্বব্যাংকের (ডব্লিউবি) প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের মোট যানবাহনের মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রয়েছে বাংলাদেশে। তবে ২০১৯ সালে দেশে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। ওয়ার্ল্ড হেলথ র্যাংকিং অনুসারে, সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম।

আমাদের হাইওয়েগুলোয় অনেক বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, যার অন্যতম কারণ দুই লেনের মাঝখানে ডিভাইডার না থাকা। এতে চালকরাও খামখেয়ালিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের সুযোগ নিলে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া সড়ক নির্মাণকালে অনেক সময় খরচ কমানোর জন্য রোড সাইন বা মার্কিং না করার কথা শোনা যায়; যা কোনোভাবেই উচিত নয়। সড়কে নিরাপত্তা জোরদার করতে খোদ প্রধানমন্ত্রী সব রাস্তায় পর্যাপ্ত সাইন আর রোড মার্কিং করা এবং সার্ভিস রোড রাখার কথা বলেছেন। ২+১ লেন রোড পদ্ধতিতে উল্লিখিত বিষয়ের পাশাপাশি আরো যে দিকটিতে গুরুত্ব দেয়া হয় তা হলো, সড়কে পর্যাপ্ত সাইন আর রোড মার্কিং রাখা। তাছাড়া উন্নত দেশগুলো সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সড়ক নির্মাণের বিভিন্ন ধাপে তৃতীয় কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে রোড সেফটি অডিট করিয়ে থাকে। কারণ যিনি রাস্তার নকশা বা কারিগরি নির্দেশগুলো করেন, তার চোখে হয়তো সব ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। তাই নিরাপত্তা বিষয়গুলোয় গুরুত্ব দিয়ে তৃতীয় পক্ষের পরামর্শ নেয়া হয়।

সড়কের মাঝখানে ডিভাইডার দেয়ার পাশাপাশি নিরাপদ সড়কের অন্যতম শর্ত সঠিক সড়ক ব্যবস্থাপনা, দক্ষ চালক নিশ্চিত করা, চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও সড়ক পরিবহন আইনের কঠোর পরিপালনেও। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ আর সড়কে শৃঙ্খলা বৃদ্ধি করতে ১১১টা সুপারিশ রেখেছে। সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ আছে। সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে জোর দেয়ার পাশাপাশি মহাসড়কে ২+১ লেন পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

 রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক

আরও