দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমুখী চাপ দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে নাড়া দিয়েছে। অর্থনীতির তিনটি মৌলিক ইউনিট তথা খানা, কারবার এবং রাষ্ট্রে প্রতিকূল দুর্দশা মোকাবেলায় নগদ অর্থের অভাব দিন দিন বাড়ছে। কভিড মহামারী পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাগত কমে যাওয়া এবং সর্বোপরি, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিম্নমুখী চাপ বাড়িয়েই চলছে। এ চাপ অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে পর্যবসিত করেছে। ঝুঁকি না কমাতে পারলে এমন আশঙ্কা অমূলক হবে না যে অর্থনীতি সংকটে নিপতিত হতে পারে। নভেল করোনাভাইরাসের জন্য সরবরাহ ও চাহিদার বড় মাত্রার পতন বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দায় নিমজ্জিত করেছে। এখন পর্যন্ত সেই সরবরাহ প্রবাহ সম্পূর্ণরূপে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়েই চলেছে। এরই মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত যুক্ত হয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ কঠিনতর করেছে।
রুশ-ইউক্রেন সংঘাতের ছয় মাস আগ থেকে বাংলাদেশে রিজার্ভ কমতে থাকে। অস্বাভাবিক আমদানি বাড়ার কারণে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে শুরু করে। অস্বাভাবিক আমদানি বাড়ার সঙ্গে পুঁজি পাচারের যোগসাজশের অভিযোগ তদন্ত করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমে যাওয়ায় রিজার্ভ আরো কমতে শুরু করেছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পতন রোধের জন্য একাধিক ব্যবস্থা নেয়া সত্ত্বে গত বছরের এপ্রিলের ৪৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন থেকে এ বছরের ১৩ এপ্রিলে রিজার্ভ ৩১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বিনিয়োগ বাদ দিলে নিট রিজার্ভ সাড়ে তিন মাসের মতো আমদানি ব্যয় বহন করতে পারবে।
অতিমারী শুরুর আগ থেকেই বাংলাদেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। যেমন দারিদ্র্য বিমোচনের হার কমতে শুরু করে। সার্বিকভাবে সমাজে বৈষম্য দ্রুতগতিতে বাড়ছে। মজুরি বাড়ার হারের তুলনায় মূলধনে বেশি মুনাফাপ্রাপ্তি বৈষম্যকে অধিক হারে বাড়িয়ে চলছে। করোনাভাইরাস অতিমারী দেশের প্রান্তিক গোষ্ঠীর সদস্য, বিশেষত নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, মহিলা, শিশু, বয়স্ক, বেকার ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকায় মারাত্মক অভিঘাত ফেলেছে। স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়েছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মজুরি প্রবৃদ্ধি সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। মূল মজুরি কমে যাওয়ায় অধিকাংশ মানুষ নিজেদের সঞ্চয় ভেঙে ব্যয় করছে। তাদের মধ্যে কিছু মানুষ নিজেদের দৈনন্দিন খরচের জন্য ধার-দেনা করছে।
বর্তমানে ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির চাপে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার অনুপস্থিতিতে অনেককে প্রয়োজনীয় খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ কমাতে বাধ্য করেছে। ফলে সার্বিকভাবে পুষ্টি গ্রহণের মাত্রা হ্রাস পাচ্ছে। কেউ কেউ চিকিৎসা ও শিশু শিক্ষার ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছেন।
২.
ডলারের অবমূল্যায়ন এবং পণ্যের দামের কারণে ব্যবসা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকঋণের পরিমাণও বাড়ছে। অন্যদিকে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে। ব্যাংকগুলো নিজেদের নগদ আমানত রিজার্ভ অনুপাতকে (সিআরআর) এবং বিধিবদ্ধ আমানত অনুপাত (এসএলআর) বজায় রাখতে উচ্চহারে তারল্য ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। উন্নত দেশগুলো সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অবলম্বন করে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়া অর্থনীতিকে মন্দার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওই দেশগুলোয় সাধারণের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে মন্দার আশঙ্কা করছে রফতানিকারকরা। গত অর্থবছরে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর রেমিট্যান্সের প্রবাহ এ অর্থবছরেও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ফলে জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি নাগাদ অর্থাৎ গত আট মাসে বৈদেশিক খাতে লেনদেনের সামগ্রিক ব্যাল্যান্স ঋণাত্মক ৭ দশমিক ৯৪৯ বিলিয়নে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের জুন শেষে সামগ্রিক ব্যালান্স ৯ দশমিক ২৭৪ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত ছিল।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থার (আইএমএফ) কাছ থেকে পাওয়া ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার তারল্য সংকটের ঝুঁকি প্রশমনের জন্য যথেষ্ট নয়। আইএমএফের ৪২ মাসের কর্মসূচি সরকারের নীতিমালা প্রণয়নের স্বাধীনতা কিছুটা হলেও কেড়ে নিয়েছে। তবে এ কর্মসূচি অর্থনীতির নিম্নমুখী চাপের পেছনের মূল কারণ চিহ্নিতের মাধ্যমে এর সমাধান করতে পারবে বলে মনে হয় না। এ চাপের উৎসের সঙ্গে রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যোগসূত্র রয়েছে। তবে আইএমএফের শর্ত মেনে বিভিন্ন পরিষেবার মূল্য বাড়ানোয় নির্দিষ্ট আয়ের, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগণ এবং উৎপাদনকারীর খরচের বোঝা বাড়িয়েছে। কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ কম থাকার অভিযোগ করছে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। দূরদর্শিতার অভাবের জন্যই জ্বালানি নিরাপত্তায় এ চাপ সৃষ্টি হয়েছে। মৌলিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য আমদানিনির্ভরতা, গ্যাস উত্তোলনের স্বল্পতা, পুনঃনবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে অগ্রগতির অভাব এবং জ্বালানি উৎপাদন খাতের উচ্চ ভাড়ার অবকাঠামো সত্ত্বেও সঞ্চালন ব্যবস্থায় অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের কারণে এ খাতের সমস্যাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। একদিকে জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয়, অন্যদিকে বিপুল অংকের ক্যাপাসিটি চার্জ বাজেটে প্রস্তাবিত অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ব্যয় সংকুলান অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পাওনা পরিশোধও জমছে।
কৃষিতে উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে এবং উৎপাদন খরচ বেড়েছে। যেমন সারের বাজার অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। সবুজ বিপ্লব উত্তরকালে কৃষি খাতে উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসেনি। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়েছে এবং উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ঋণ পরিশোধে সেরা ট্র্যাক রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও কৃষকদের অর্থায়ন প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করলেও ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প এখনো অবহেলিত। সেবা খাতে দক্ষ জনশক্তির স্বল্পতা রয়েছে।
আর্থিক খাত অনেক দিন ধরে বিপর্যস্ত। দেশের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান খেলাপি নয়। অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান ও হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তির কাছেই খেলাপি ঋণের বেশির ভাগ অংশ। বিভিন্ন ছাড় ও সুবিধা দেয়া সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় এখনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত সুবিধা ভোগের সংস্কৃতিই এজন্য দায়ী। এ কারণে গত ১০ বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ তিন গুণ বেড়েছে।
৩.
রাষ্ট্রের রাজস্ব ভারসাম্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। কর-মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অনুপাতের দিক দিয়ে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান একেবারে তলানির দিকে। করের পরিমাণ ক্ষুদ্র হওয়ায় বাংলাদেশের বাজেটের আকারও সমগোত্রীয় দেশের তুলনায় ছোট। সাম্প্রতিককালে কর-মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আরো কমে যাওয়ায় ঋণনির্ভরতা ও সার্বিকভাবে দেনার পরিমাণ বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ নতুন রেকর্ড করে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। সরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ায় আরো বেশি পরিমাণে মুদ্রিত অর্থ বাজারে প্রবেশ করছে। ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এছাড়া উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ব্যয়ের হিড়িক নিয়ন্ত্রণ না করা হলে প্রকল্পগুলো বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
বলা বাহুল্য, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে। ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৬০ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে ৫১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার ছিল এবং এক বছরে প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ১১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে।
২০২৪ সালের শেষ নাগাদ পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের ঋণের বোঝা ১৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। শর্ত না বুঝে ও নানা ধরনের ত্রুটিসহ বৈদেশিক ঋণের চুক্তি স্বাক্ষর, প্রকল্প তৈরি, অনুমোদন এবং তদারকির ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি, উন্নয়ন সহযোগীদের আমলাতান্ত্রিকতাসহ নানা কারণে বৈদেশিক অর্থছাড় কম। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায়ের শ্লথ প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকোচনেরই ইঙ্গিত দেয়। পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধি এ ভোগভিত্তিক কর আদায়ের সামান্য অগ্রগতির কারণ। আমদানির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রাস্বল্পতার কারণে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী ঋণপত্র খুলতে পারছে না। ফলে আমদানি ও আমদানি শুল্ক আদায়ের পরিমাণও কমছে। যখন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়, একই সঙ্গে কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতাও বাড়তে থাকে। বিশেষত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আকার বড় হয়। ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার ঘটে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সরকার কর পরিহার ও ফাঁকি প্রতিরোধ করতে পারলে এ অর্জন সম্ভব। এক্ষেত্রে একটি স্বকীয় দেশোপযোগী কর সংস্কার কর্মসূচি অতীব জরুরি। অভ্যন্তরীণ সম্পদ গঠনের প্রধান উৎস হিসেবে আয়করকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার আরো সম্প্রসারণ ঘটিয়ে উন্নয়নমুখী টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা অর্জন সম্ভব। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যদি অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের প্রধান উৎস হিসেবে আয়কর আদায়ের অনুমোদিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে তবেই আর্থিক একটি পরিসর তৈরি হবে। প্রণোদনা স্কিমে ও ভর্তুকি কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। বর্তমান চলমান ব্যবস্থা পরিত্যাগ করে পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্তযুক্ত প্রণোদনা স্কিমের দিকে যেতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি অথবা রফতানি আয় মানদণ্ড হতে পারে। সাধারণ মানুষের নগদ অর্থ যেমন প্রয়োজন। বছরের পর বছর ধরে বলা হয়েছে, জীবনযাত্রার সংকট উত্তরণে ছড়ানো নিরাপত্তাজাল কর্মসূচিগুলো একক ও সমন্বিত প্রশাসনিক ছাতার আওতায় আনতে হবে। কর্মসূচিগুলোর সম্মিলিত বিশাল অর্থ সঠিক গৃহস্থালিতে যাওয়ার জন্য জাতীয় জনসংখ্যা তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলাকে জাতীয় আবশ্যিক ঘোষণা করে সার্থকতার সঙ্গে এনআইডি যারা করেছেন তাদের নিয়োজিত করা যায়।
দুর্ভাগ্যবশত অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘায়িত নিম্নমুখী ঝুঁকি মোকাবেলা ও রূপান্তরের জন্য বাগাড়ম্বরপূর্ণ ভাষ্য এবং প্রসন্নতা থেকে দূরে সরে এসে চ্যালেঞ্জগুলোর গুরুত্ব স্বীকার করতে হবে। তার সঙ্গে নিম্নমুখী চাপের কেন্দ্রগুলোকে শনাক্ত করে কার্যকরী, বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সরকারকে বার্তা দিতে হবে অর্থনীতিকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমুখী চাপ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ততে একটি ভুল পদক্ষেপ সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
৪.
কভিড মহামারীর আগেই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের অর্থাৎ জিডিপির অনুপাতে স্থবির হয়ে পড়েছিল। কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়ে আছে। কর্মযুক্ত প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের গতি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের স্থবিরতা অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। সরকারি ব্যয় থেকে প্রবৃদ্ধির একটি অংশ এসেছে; তবে তা বর্তমানে নিম্নমুখী। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মজুরি বাড়ার হারের তুলনায় মূলধনে বেশি মুনাফাপ্রাপ্তি বৈষম্যকে অধিক হারে উসকে দিচ্ছে। জনসংখ্যার বেশির ভাগেরই মজুরি নিম্নমুখী মাত্রায় থাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জিডিপির অনুপাতে সঞ্চয় কমেছে। এ নেতিবাচক প্রভাব সার্বিক বিনিয়োগের ওপর অভিঘাত ফেলছে।
ভোগ বাবদ ব্যয়ই বাংলাদেশের জিডিপি বৃদ্ধির কারণ। বিনিয়োগনির্ভর প্রক্রিয়া ছাড়া ভোগ বাবদ ব্যয় থেকে আসা উন্নয়ন কখনই টেকসই নয়। এ রকম ভোগনির্ভর অর্থনীতিতে আমদানি চাহিদা বেশি থাকে এবং যেকোনো বহিঃস্থ চাপ তৈরি হলে সার্বিক বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যকে ঝুঁকিতে ফেলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ রকমই ঘটেছে।
ভোগ বাবদ ব্যয় থেকে উৎসারিত প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক চাহিদা বাড়ানোর জন্য অধিক ভোক্তা ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে বিনিয়োগ-নেতৃত্বাধীন প্রবৃদ্ধি নতুন উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি করে। ফলাফল হিসেবে আরো বেশি কর্মসংস্থান এবং অধিক চাহিদা তৈরি হয়। একটি উন্নয়নশীল দেশ ভোগ বাবদ ব্যয়কেন্দ্রিক দেশে পরিণত হলে আমদানি চাহিদা সর্বদা বেশি থাকে। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রবৃদ্ধিতে ধীরতা আসে।
বাংলাদেশ যদি উন্নয়নের বর্তমান পর্যায়ে ভোগ বাবদ ব্যয়কেন্দ্রিক মডেলের ওপর নির্ভর করতে থাকে তবে আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে। এ ধরনের পথ বিরাজমান বিস্তৃত বৈষম্যকেও আরো বাড়িয়ে তুলবে। প্রকৃত খাতের চ্যালেঞ্জের উৎসগুলো মূলত কাঠামোগত। বেশির ভাগ জমির মালিক চাষাবাদ না করে বরং জমি বর্গা বা নির্দিষ্ট হারের বিনিময়ে বন্দোবস্ত দেয়ায় কৃষিতে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়েছে। তাদের কাছে জমির মালিকানা মর্যাদার প্রতীক। তারা চাষাবাদের জন্য নয়, সঞ্চয় হিসেবে জমি ক্রয় করেন। চাষাবাদ থেকে প্রাপ্ত ফসলের দামের সঙ্গে জমির দামের কোনো সম্পর্ক নেই। ফসল ফলালে বা চাষাবাদ না করলেও জমির দাম বাড়তেই থাকে। বেঁচে থাকার অন্য উপায় না থাকায় চাষাবাদে জড়িত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক জমি কিনতে পারেন না। জনসংখ্যা বাড়ার ফলে খানাপ্রতি জমির পরিমাণ কমে আসছে। একই দাগের জমি বহুভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় খরচ বাড়ছে এবং উৎপাদনশীলতা কমছে। এরই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীরা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের আয় হতে পারত এমন একটা বড় অংশ লোপাট করে দিচ্ছে।
প্রচলিত ভূমি সংস্কার ও ক্ষুদ্র কৃষকনীতি বর্তমানের দুর্দশা থেকে মুক্তিতে ফলদায়ক হবে না। সুতরাং সমষ্টিগত চাষাবাদ অথবা বৃহৎ আকারসম্পন্ন চুক্তিভিত্তিক চাষের দিকে এগোতে হবে। প্রথম বিকল্পটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। এটি রাজনৈতিক বন্দোবস্তের একটি নির্দিষ্ট ফর্মের ওপর নির্ভর করে। উৎপাদনশীলতা হ্রাস মোকাবেলার পাশাপাশি পরিবেশগত উদ্বেগ সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
বিশিল্পায়ন অকালে শুরু হয়েছে। শিল্প খাতে নেতিবাচক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বিশিল্পায়নের যাত্রা। বিশিল্পায়নের ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে ঋণাত্মক প্রভাব পড়বে। অনানুষ্ঠানিকীকরণ বিশিল্পায়ন থেকে উদ্ভূত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিপত্য রয়েছে। আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষমতা, বিশেষ করে শিল্প খাতে ঋণাত্মক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বিশিল্পায়ন অকালে শুরু হয়েছে। রফতানি একটি খাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত নীতি প্রক্রিয়া আরো প্রতিযোগিতামূলক পণ্যের সম্প্রসারণ ও বৈচিত্র্যময় করার জন্য বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বাড়াতে পারেনি।
শিল্প খাতে উৎপাদনের বৃদ্ধি টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে। এ অকালীন বিশিল্পায়ন যাত্রাপথ মোকাবেলা ও রূপান্তরকারী পরিবর্তনের পথনকশাযুক্ত একটি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিল্পায়নের জন্য, শিল্পায়নে কর্মসংস্থানের স্তর ও অনুপাতের পরিবর্তন এবং জিডিপিতে শিল্পায়নের অংশ বাড়ানোর জন্য কার্যকরী দেশোপযোগী নীতিকাঠামো ও বাস্তবায়নযোগ্য দিকনির্দেশনা ওই কৌশলগত পরিকল্পনায় থাকতে হবে।
কভিড মহামারী বাংলাদেশের অর্থনীতির সংকোচনের বাইরেও সামাজিক খাতের কাঠামোগত ফাটলগুলো উন্মোচিত করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা এবং জনসাধারণের সেবা সরবরাহে বিদ্যমান পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলো সমাজকে আরো মেরুকেন্দ্রিক করেছে। মেরুকেন্দ্রিক বৈষম্যমূলক বিদ্যমান অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বজনীন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পূর্ণ জীবন চক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তবে আসল উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে উত্তরণ ব্যবস্থাপনায় স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অনুপস্থিতিতে অগ্রগতির অভাব রয়েছে। কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো মোকাবেলায় মধ্যমেয়াদি কৌশল না গ্রহণ করলে এ-যাবৎ অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখা মুশকিল হবে। অর্থনীতিকে নিম্ন স্তর ভারসাম্য ফাঁদের দিকে ধাবিত করবে।
৫.
একটি দেশ কখনই বহিঃস্থ চাপ সামলাতে পারে না, যখন পৃষ্ঠপোষকতা নির্ভর স্বজনতোষী রাজনীতি ক্ষমতার অসামঞ্জস্যতা তৈরি ও অধিকাংশ জনগণকে বঞ্চিত করে ক্ষমতাসীন মহলের সুবিধা আদায়ের প্রবণতায় জরাগ্রস্ত হয়ে থাকে। রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ক্ষমতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ফলাফলকে প্রভাবিত করে। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বৈরতন্ত্র সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বাস্তবায়ন স্তরেও নীতিগুলোকে অকার্যকর করে তোলে। ফলে বৈষম্যকে আরো প্রশস্ত এবং দারিদ্র্য হ্রাসের হারকে ধীরগতি করে তোলে। এ পরিস্থিতিতে কর্তৃত্ববাদ সত্তা একটি অন্যায্য সমাজ তৈরির দিকে পরিচালিত করে থাকে। রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নিপীড়নমূলক। যখন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বেশির ভাগ লোকের হয় না, তখন ‘ক্লায়েন্টলিজম’ বা গোষ্ঠীতন্ত্র প্রাধান্য পায়। গোষ্ঠীতন্ত্র অনর্জিত সম্পদ (রেন্ট) সংগ্রহ করে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে আদিম কায়দায় সম্পদ কেন্দ্রীভুবন চলতে থাকে। সম্পদনির্ভর সিন্ডিকেট প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের পরিষেবা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় এবং নাগরিক-রাষ্ট্রের ধারণাটি একটি দূরের আত্ম চিৎকারে পরিণত হয়।
১৯৯১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত, ইতিবাচক সূচকগুলো ক্রমবর্ধমান হারে (ত্বরিত) বেড়েছিল। কিন্তু পরে ইতিবাচক সূচকগুলোর গতি ধীর হয়ে যায় (মন্দা) এবং নেতিবাচক সূচকগুলো বাড়তে শুরু করে। এ পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কার্যকারণ সম্পর্ক রয়েছে।
অনর্জিত সম্পদ বা ইকোনমিক রেন্ট বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান ক্ষুধা এক ধরনের একচেটিয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আনুভূমিক ও উল্লম্বিক স্তরে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেয়। এর মাধ্যমে সংসদ সদস্য থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বা কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই পদ অধিগ্রহণের সংস্কৃতি তৈরি করে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অভাবে এমন গোষ্ঠী বৃদ্ধি পায় এবং ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে। এ ধরনের সম্পর্কের পরিণামে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ক্ষত সৃষ্টি হয়। যেমন ব্যাংকঋণ খেলাপি, মূলধন পাচার এবং কর ফাঁকি। এ ধরনের নিরংকুশ প্রক্রিয়া ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাসও কমায়। ফলে বিনিয়োগ হ্রাস পায় এবং কর্মসংস্থানের সৃষ্টির সুযোগ দমিত হয়।
প্রবৃদ্ধির প্রচলিত অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ছাড়াও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পর্যাপ্ত শর্ত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রসার ঘটার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক প্রতিনিধিত্বসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিসর সংকীর্ণ হওয়ায় অর্থনৈতিক রূপান্তর বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন সুদূরপরাহত হয়। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব ও সুদূর পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ সম্পর্কে একটি মিথীয় ধারণার কথা বলে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে একটিতে আপসের কোনো দাবি তাত্ত্বিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কোনো বিস্ময়কর আশ্চর্য, ধাঁধা বা প্যারাডক্স নয়। যদি যথাযথ অর্থনৈতিক শর্তগুলো পূরণ করা হয় তাহলে পরিমাণগত অর্জন সম্ভব। শুধু প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত শর্তে অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত রূপে তথা গুণগত রূপান্তর করতে পারে। রূপান্তরমূলক এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আবশ্যক।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান এবং ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন।