গণতন্ত্রের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সমাধান

দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার পর থেকেই যারা শাসন করেছেন, ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের প্রায় সবার কাছেই রাজনীতি ছিল এক ধরনের বাণিজ্যিক পেশা। জনগণের সেবা নয়। লক্ষ্য করেছি স্বাধীনতার পর পরই রাজনীতি চলে গেছে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে। সেই অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের উচ্চশ্রেণীর বেসামরিক আমলা, কখনো অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। মূলত এই দুই শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে স্বাধীনতার পর পরই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অধিকাংশ রাজনীতিবিদের পড়াশোনা সীমিত থাকার কারণে, রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং প্রশাসনে অনভিজ্ঞ হওয়ার কারণে নির্ভর করেছেন সরকারি উচ্চপদস্থ আমলা ও টেকনোক্র্যাটদের ওপর। যে কারণে এরা রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করেছেন অর্থনীতি দিয়ে, অর্থনৈতিক সমস্যার

অর্ধশত বছর প্রায় হতে চলল আমাদের কষ্টার্জিত ও রক্তার্জিত স্বাধীনতার। এর মধ্যে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে অনেকবার। তবে সেই পরিবর্তনে তেমন কোনো ফায়দা হয়নি জনগণের। জনগণ যে তিমিরে ছিল সেখানেই আছে। কোথাও কোথাও হয়তো মিটমিট করে জ্বলে আলো। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সেটা সামান্য। গত ৫০ বছর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন অনেকেই। বাইরের পোশাক এদের নানা রকম। কারো পরনে পাজামা, কারো মাথায় টুপি। কেউবা খাকি উর্দি। কেউ সুটেড-বুটেড। কারো মাথায় ঘোমটা। এ সবই এদের বাইরের পোশাক। ভেতরে রঙ একই রকম। মূল লক্ষ্য আগেও যা ছিল, এখনো তা-ই আছে। ক্ষমতা ধরে রাখা। কখনো গণতন্ত্রের নামে, কখনোবা দেশের বৃহত্তর স্বার্থের দোহাই দিয়ে। কখনো দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের প্রয়োজনে। কিন্তু এই ক্ষমতা কখনই অনুপ্রাণিত হয়নি বা পরিচালিত হয়নি মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বা প্রত্যাশা অর্জনের লক্ষ্যে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের নামে মানুষকে কানামাছি বানিয়ে চোখে রুমাল বেঁধে কানামাছি খেলায় মত্ত অধিকাংশ রাজনীতিবিদ। এদের বলি জনপ্রতিনিধি। প্রকৃতপক্ষে এরা সবাই নিজ স্বার্থের প্রতিনিধি। এদের মধ্যে যে যখন ব্যতিক্রম ভ‚মিকা পালন করেছেন বা করেন, তারা আমাদের শ্রদ্ধেয়। ইতিহাসে তাদের সেই মহত্ত্বের স্বীকৃতি উচ্চশিখরে আছে এবং থাকবে।

দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার পর থেকেই যারা শাসন করেছেন, ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের প্রায় সবার কাছেই রাজনীতি ছিল এক ধরনের বাণিজ্যিক পেশা। জনগণের সেবা নয়। লক্ষ্য করেছি স্বাধীনতার পর পরই রাজনীতি চলে গেছে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে। সেই অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের উচ্চশ্রেণীর বেসামরিক আমলা, কখনো অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। মূলত এই দুই শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে স্বাধীনতার পর পরই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অধিকাংশ রাজনীতিবিদের পড়াশোনা সীমিত থাকার কারণে, রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং প্রশাসনে অনভিজ্ঞ হওয়ার কারণে নির্ভর করেছেন সরকারি উচ্চপদস্থ আমলা ও টেকনোক্র্যাটদের ওপর। যে কারণে এরা রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করেছেন অর্থনীতি দিয়ে, অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করেছেন রাজনীতি দিয়ে, আর মূল রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করেছেন অগণতান্ত্রিক উপায়ে, ক্ষমতার প্রভাবে বন্দুক বা লাঠি দিয়ে। রাষ্ট্র পরিচালনার এই মেশিনারির সঙ্গে অনেক সময় যুক্ত হয়েছেন দেশের উচ্চশিক্ষিত বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর একাংশ। এই দল যখন যে ক্ষমতায় আসে বা থাকে, তাদের পদসেবা করতে বেশি অনুপ্রাণিত হয় এবং হচ্ছে। এদের স্বাধীন বিবেক জ্ঞান-বুদ্ধি বন্ধক রাখেন শাসকের আঙুলের নির্দেশে অথবা শাসকশ্রেণীর ব্যক্তিগত কোনো অন্ধ মোহে। এর বিনিময়ে এরা ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায় করতে পেরেছেন এবং পারছেন। মুষ্টিমেয় বলি বা অধিকাংশ বলি, এদের অনেকের লেখা বা কথা শুনলে মনে হয়, এদের একমাত্র কাজই হয়তো অন্ধের মতো বৈষয়িক স্বার্থরক্ষকারীদের সেবা করা।

অনেকদিন আগে বাংলা একটি ছবি দেখেছিলাম, হীরক রাজার দেশে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমরা তেমন রাজার দেশেই আছি। এরা নামে রাজা নয়, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রধান সামরিক শাসকও ছিলেন। লক্ষ্য এবং কাজ ওই হীরক রাজার মতোই। খুব একটা পার্থক্য করা যাবে না। এই শাসকদের দোসর বা জ্ঞানদাতাদের তাদের বুদ্ধিজীবী বলা হয়। এরা নাকি আলোকিত মানুষ। প্রশ্ন হচ্ছে, কাকে আলো দেন, কী আলো দেন, কেন দেন, কীভাবে দেন, তা অস্পষ্ট। বিনিময়ে রাষ্ট্র এদের খেতাব দেয়, অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য লাখ লাখ টাকাও দেয়। মারা গেলে একাধিক জানাজার আয়োজনও করে। মরণোত্তর পুরস্কার দেয়। সমাজের এই অনুৎপাদক শ্রেণী উৎপাদন অবকাঠামোর উন্নতিতে এবং এর সুষম বণ্টনে ভূমিকা পালন করে না। তবে উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ এবং তার অবকাঠামোর সঙ্গে এক ধরনের ব্যক্তিগত মালিকানার সম্পর্ক তৈরি করে উৎপাদন ভোগ করে।

স্বাধীনতা অর্জনের পর যদি লক্ষ করি আমাদের সামাজিক স্তরবিন্যাসের উত্থান-পতনকে, স্পষ্ট দেখতে পাব সেখানে হঠাৎ করে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বিশাল। এই ধনিক শ্রেণীর জাতীয় চরিত্রের চেয়ে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী চরিত্রই সমাজকে বিভক্ত করেছে। রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহৎ ঐক্য  নষ্ট করেছে। সমাজে এই ধনী ও প্রভাবশালীদের চরিত্র পাকিস্তান আমল থেকে কোনোভাবেই ভিন্ন নয়। এরা যেটা চায় এবং যা করে, সবটাই নিজের এবং পরিবারের স্বার্থে। মানুষের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে ভালোবাসে। এরা সংস্কারবিরোধী। অতীত বা পুরনোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। এরা সাধারণ মানুষের বন্ধু নয়, বন্ধু কেবল শাসকের। এ কারণে গত পাঁচ দশকে আমাদের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারিনি। কিছু লিপস্টিক উন্নতি হয়েছে, রঙ বদলেছে, শোভা বেড়েছে। সেটা গুটি কয়েকজনের জন্য।

তবে এটাও সত্য, আমাদের ঝুড়ি একেবারেই যে শূন্য তা কিন্তু বলা যায় না। অনেকেরই ঝুড়িতে সম্পদ জমা হয়েছে। ঝুড়ি আর আগের মতো ফুটো না। কিন্তু শ্রমিকের ঝুড়ি, কৃষকের ঝুড়ি, সমাজে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ঝুড়ি, যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের ঝুড়ি ফুটো। এদের কিছু জমছে না, ভাগ্যেরও তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটছে না। তবু এরা বেঁচে আছে। এদের কখনো দেখা যায় বড় বড় রাজনীতি সভায় ‘সংখ্যা’ হয়ে ভিড় জমাতে। সভা শেষে ফিরে যায় জীর্ণ ঘরে। সংখ্যায় এরাই প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ। বেঁচে আছে কারো স্বার্থের বলির পাঁঠা হতে। অনেকে বলেন, জনসংখ্যা আমাদের বড় সম্পদ। তা তো বটেই, কিন্তু এই বড় সম্পদের নিজেদের কোনো সম্পদ নেই।

গণতন্ত্র চাই, কিন্তু তার জন্য যে আত্মোপলব্ধি, আত্মসংযমবোধ, দায়িত্ব ও কর্তব্যজ্ঞান, সহঅবস্থান বোধ, সহনশীলতা এবং সহমর্মিতা প্রয়োজন, গত অর্ধশত বছরেও সেটা আমরা অর্জন করতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। এই বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের মতো একটি উচ্চমানের আদর্শ পরিচর্যা করা কঠিন বৈকি। গণতন্ত্র হচ্ছে সংস্কৃতি ও চর্চার বিষয়। পোস্টার, মিছিল বা স্লোগানের বিষয়ই নয়।

অনেকেই অহংকার বা গর্ব করে বলি, আমরা পৃথিবীতে অন্যতম একটি জাতি রাষ্ট্র। গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যে জাতি রাষ্ট্র ধারণা মূলত উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়। ইতিহাসে এর অনেক দৃষ্টান্ত আছে। আমাদের গণতন্ত্রকে বাঁচাতে, বিকশিত করতে হলে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার সব ক্ষেত্র থেকে সব ধরনের উগ্র চেতনা পরিহার জরুরি। উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে উগ্র বর্ণবাদ কিংবা ধর্মীয় উগ্র জাতীয়তার জন্ম হলে রাষ্ট্রের বৃহত্তর ঐক্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তখন সমাজের অভ্যন্তরে নানা রকমের বৈষম্য এবং অন্যায়-অবিচার-অত্যাচার-ব্যভিচার প্রশমিত হয়। এরও দৃষ্টান্ত আছে ইতিহাসে। প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রকে সফল করার জন্য চাই রাষ্ট্রের সব শ্রেণীর নাগরিকের ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করা এবং মুক্ত চিন্তাচেতনা প্রকাশে যেকোনো অন্তরায়কে বিনষ্ট করা। অন্যথায় গণতন্ত্রের নামে ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’ সমাজ ও রাষ্ট্রকে গ্রাস করবে। এর সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত প্রায় চার বছরের শাসনামলে দেখছি। ট্রাম্প, তিনি না রিপাবলিকান না ডেমোক্র্যাট। তার তন্ত্রমন্ত্র একটাই, তিনি একাই সর্বেসর্বা-সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি নিজেই নিজেকে মহিমান্বিত করেন। এক সময়ের জার্মান রাষ্ট্রনায়ক হিটলারও তা করতেন। হিটলার একজন উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন। আজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তেমনি একটি উগ্র জাতীয়তাবাদকে উৎসাহিত করছেন নানাভাবে। আজকের ভারত ও বাংলাদেশেও সেই ধরনের রাজনীতি ও জাতীয়তার প্রতাপ দেখি। একে কি গণতন্ত্র বলা যায়?

বিশ্বে গণতন্ত্রের নামে যারা স্বৈরশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, তাদের দুর্বিষহ ও নির্মম পতন দেখেছি সাম্প্রতিককালেও। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের পতন দেখেছি। লিবিয়ায় প্রতাপশালী কর্নেল গাদ্দাফির রক্তাক্ত দেহ দেখেছি। মিসরের দীর্ঘদিনের শাসক হোসনি মোবারকের পতন দেখেছি। একাত্তরে পাকিস্তানের ধ্বংস দেখেছি। ভারতের লৌহমানবী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যা দেখেছি। ভুট্টোর ফাঁসি দেখেছি। বেঁচে থাকাকালীন এদের প্রত্যেকের ক্ষমতার হাত কত লম্বা হয়, তাও দেখেছি। কিন্তু তাদের সব দম্ভের পতন ইতিহাসে কীভাবে লেখা হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেককে বলতে শুনি, ভাই এটা ’৭০, ’৮০ বা ’৯০-এর দশক নয়। এখন একবিংশ শতাব্দী। অবশ্যই। সময় তো বদলাতেই পারে। সব বদলানো কি একই প্রক্রিয়ায় ঘটে? ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘Our action shape our future.’।

সম্প্র্রতি একটা চিন্তা বা মতবাদ প্রচারিত যে গণতান্ত্রিক সরকারের চেয়ে কর্তৃত্ববাদী সরকারের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন বেশি হয়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় কয়েক দশক ধরে এ চিন্তা একশ্রেণীর মধ্যে বেশ আলোচিত। এ চিন্তা সামনে আনেন সিঙ্গাপুরের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান। পরবর্তীতে যেটা ‘লি-থিসিস’ নামে পরিচিতি পায়। অন্য পৃষ্ঠায় নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন তার এক বক্তব্যে বলেন, ১৯৪৭ সালে ভারতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি। সেই তুলনায় ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সময়কালে চীনের ইতিহাসে বড় দুর্ভিক্ষ হয়েছে। যেখানে প্রায় তিন কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেন, চীনে দুর্ভিক্ষ হয়েছে এ কারণে যে সেখানে কর্তৃত্ববাদী সরকার ছিল, তাই নিদারুণ দুর্ভিক্ষ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। পক্ষান্তরে ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে সংরক্ষিত ছিল। কাজেই দেশে খাদ্যের অভাব দেখা দিলে হইচই হতো। সরকারের জবাবদিহিতার কারণে সমস্যা তেমন প্রকট হতে পারত না।

সাম্প্রতিককালের ভারত কিংবা বাংলাদেশে তেমন কোনো সরকার বা গণতন্ত্র আছে কি? দুঃখজনক হলেও এটা সত্য, আমাদের গণতন্ত্র মূলত বাইরের তন্ত্রমন্ত্র অথবা স্লোগান কিংবা নির্বাচনের সময় ভোট ভিক্ষা চাওয়া। কাজকর্মে আমাদের গণতন্ত্র মূলত স্বৈরতন্ত্র, স্বেচ্ছাচারিতা, দল ও ব্যক্তিতন্ত্র। আমরা এদের কথা কান পেতে শুনি। মুখে বলি, নেতা তুমি শ্রেষ্ঠ। যা কিছু আমার সবই তোমার, যা কিছু তোমার, সেটাও কেবল শুধুই তোমার। এটাকে বলা যায় আমাদের দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা। যা আমরা দেখি না, তা তো দেখি না-ই; আর যা দেখি, সেটা আধা দেখি বা ঘোলাটে। যে কারণে গণতন্ত্রহীনতার আর্থসামাজিক বাস্তবতা থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না

বর্তমান বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্র এখন অনেকটাই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। এখানে ‘গণ’ থাকে ‘জন’দের দখলে আর অংকের হিসাবে। প্রাসাদে থাকেন শাসক বা তথাকথিত জনপ্রতিনিধি।

হোয়াইট হাউসের রঙ সাদা। এই সাদা বলতে যদি স্বচ্ছতা বুঝি, সেটা কিন্তু নেই এর ভেতরে। তেমনি গণভবন বা বঙ্গভবনে জনগণ নেই, যদিও এটির নাম ‘গণভবন’। থাকে নামিদামি গাড়ি, বাগানের মালি। সেই গাড়ি পার্কে কোনো রিকশা থাকে না, ঠেলাগাড়িও না। আশেপাশে কোনো ফকির-মিসকিন আসে না, ওরা জনগণ হলে কী হবে। এটা গণতন্ত্রের এক ধরনের কোয়ারেন্টিন বলা যায়।

সমাধান কেবল রাজনৈতিক গণতন্ত্রই নয়, সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নানা স্তরে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা দরকার। এ চর্চা আমাদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভ‚তি, সহনশীলতা, শ্রদ্ধা, বিনয়, সহাবস্থা এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও অর্থনৈতিক শ্রেণীবৈষম্য নির্বিশেষে সামাজিক একতার বন্ধন দৃঢ় করার। তাহলে গণতন্ত্রের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করা যেতে পারে।

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক

আরও