ফলে এটি শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে তৈরি করছে উদ্বেগজনক ঝুঁকি। সম্প্রতি ‘এক্সপ্লোরিং স্মার্টফোন ইউজ অ্যামাং সেকেন্ডারি স্কুল স্টুডেন্টস ইন আ রুরাল স্কুল ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তারই উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনে চাঁদপুরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬৯ শিক্ষার্থীর ওপর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জানা গেছে, ৩৩ শতাংশ শিশু দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভুগছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে মায়োপিয়া বলা হয়। গবেষণাটি দেশের একটি অংশে পরিচালিত হলেও অনুমান করা যায়, সারা দেশেই এ ধরনের সমস্যা কমবেশি রয়েছে। সমস্যাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে খেলাধুলা ও বিকল্প বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরির কথা ভাবতে হবে।
কোনো প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই কল্যাণকর থাকে না। প্রযুক্তিকে বিনোদন, প্রাত্যহিক জীবনে নানা সমস্যার সমাধান ও সৃজনশীলতার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে না পারলেই জটিলতা দেখা দেয়। এর প্রমাণ অতীতেও বহুবার মিলেছে। যেমন ২০২১ সালে ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের একটি গবেষণায় ঢাকা, বরিশাল, জামালপুর ও নওগাঁর ৩২ হাজারেরও বেশি স্কুলশিক্ষার্থীর চোখ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জনে প্রায় ১৪ জনের দৃষ্টিত্রুটি রয়েছে। রাজধানীতে এ হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। মূলত স্মার্টফোনে অতিরিক্ত তাকিয়ে থাকার ফলে এ সমস্যা হয়েছে। স্মার্টফোনে আসক্ত এ শিশুদের মধ্যে অনিদ্রা, স্থূলতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। স্বাস্থ্যবিষয়ক জার্নাল জামা নেটওয়ার্কে বিশ্বের ৩৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে ৪৫টি গবেষণার ওপর পরিচালিত একটি মেটা-বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, দৈনিক ১-৪ ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম মায়োপিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং এ ঝুঁকি ক্রমে বাড়তে থাকে। সমান্তরালভাবে এসব তাদের মনোযোগের ঘাটতিও তৈরি করে।
নিজেদের ব্যস্ততার সময় অনেক মা-বাবা শিশুদের ভুলিয়ে রাখতে বা তাদের যেন বিরক্ত না করে, সেজন্য মোবাইল ফোন দিয়ে রাখেন। আবার বিদ্যালয়গুলোয় (যেখানে শিশুদের বড় একটি সময় কাটাতে হয়) পর্যাপ্ত মাঠ ও বিকাশ অবকাঠামোর অভাব পূরণ করা হচ্ছে ডিজিটাল পাঠদান পদ্ধতির অজুহাত দিয়ে। সেখানেও স্মার্টফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই বেশি হয়। বিদ্যালয়গুলোয় ইনডোর অ্যাক্টিভিটি, ক্লাব অ্যাক্টিভিটি কিংবা শিশুর বিনোদনের বহুমুখী ব্যবস্থা থাকে না। সেখানে শুধু পাঠ্যপুস্তককেন্দ্রিক শিক্ষাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। শারীরিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলার মতো ব্যবহারিক বিষয়গুলোকে ঐচ্ছিক পরিসরে রাখায় বিদ্যালয়গুলোও এ বিষয়ে উদাসীন। আপাতদৃষ্টিতে এসব বিষয়কে বাস্তবতা বলে মেনে নিলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশের ক্ষেত্রে এটি বড় হুমকি। এ সময় সংকটের প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়াই শ্রেয়।
ডিভাইসের স্ক্রিনের দিকে অতিরিক্ত তাকিয়ে থাকলে শিশুদের যোগাযোগ দক্ষতায় সম্ভাব্য যে ক্ষতি হতে পারে তা হলো ভাষাগত বিকাশ দেরিতে হওয়া। পাশাপাশি"শিশুরা যদি যথেষ্ট খেলাধুলার সময় না পায় অথবা নেতিবাচক আবেগকে প্রশমিত করতে তাদের ট্যাব বা ফোন হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়, তাহলে তাদের অস্বস্তি বা অসুবিধা কাটিয়ে ওঠার দক্ষতাও তৈরি হবে না। শিশুদের স্মার্টফোন দেয়ার পর নানা গেমস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট কিংবা স্ট্রিমিং সার্ভিসের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। কিন্তু শিশুরা কেমন কনটেন্টের সঙ্গে পরিচিত হবে তা দেশের অধিকাংশ অভিভাবকই নির্ধারণ করে দেন না। অথচ প্রায় প্রতিটি অ্যাপ বা স্মার্টফোনই প্যারেনশিয়াল কন্ট্রোল নামক বিশেষ সফটওয়্যার সুবিধা দিয়ে থাকে। ফিচারটির ব্যবহারের বিষয়ে অভিভাবকদের উদাসীনতা শিশুদের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শর্ট ভিডিও শিশুদের মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমকে এমনভাবে উত্তেজিত করে যে তারা দীর্ঘস্থায়ী কোনো সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দিতে পারছে না। এটিকে মনোবিজ্ঞানে বলা হচ্ছে ‘ব্রেন রট।’ আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ৭১টি গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত শর্ট-ফর্ম ভিডিও দেখার অভ্যাস সরাসরি জ্ঞানীয় কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ক্ষমতা ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। বাংলাদেশেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এ সমস্যা প্রবল আকার ধারণ করছে। ফলে মাদকাসক্তি, আত্মহত্যা ও মানসিক জটিলতার পরিসংখ্যান বড় হচ্ছে। অথচ সুস্থ একটি জাতি গড়ে তোলার জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার বিকল্প নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানই বলছে, স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় চর্চা থাকলে শরীর ও মন সুস্থ থাকে।
এরিকসনের মনোসামাজিক বিকাশ তত্ত্ব বলছে, শৈশব ও কৈশোর হলো পরিচয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু যখন এ বয়সেই শিশু ভার্চুয়াল জগতে বেশি আরামদায়ক হয়ে পড়ে, তখন বাস্তব সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতা, সহমর্মিতা ও আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ দুর্বল হয়ে যায়। এজন্য শিশুদের খেলাধুলাসহ অবসর সময়ে বিনোদনের মাধ্যমকে বহুমুখী করতে হবে। স্মার্টফোন থেকে শিশুদের মনোযোগ সরানোর জন্যই এখন আমাদের অবকাঠামো ও চর্চাগত পরিবর্তন আনতে হবে। শিশুদের সাংস্কৃতিক অর্থনীতির সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে ছবি আঁকা, গান গাওয়া, লেখালেখি, ছবি তোলার মতো সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিদ্যালয়গুলোয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে নানাভাবে উৎসাহ দিতে হবে। এশিয়ার দেশ জাপানে ক্লাব অ্যাক্টিভিটির জন্য বিদ্যালয় পর্যায়ে আলাদা মূল্যায়ন পদ্ধতি রয়েছে। ক্লাব অ্যাক্টিভিটি কিংবা ক্রীড়া কোটার মতো সুবিধা থাকায় জাপানে শুধু পাঠ্যপুস্তককেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত নয়। আমরাও জাপানের উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের শিক্ষায়তনের অবকাঠামোগত পরিকল্পনা নিতে পারি। নানা বাস্তবতায় দেশের শহুরে অবকাঠামোয় পর্যাপ্ত স্থানের অভাব রয়েছে। সেক্ষেত্রে ইনডোর গেমস বা অ্যাক্টিভিটির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় পার্ক ও খেলার মাঠ বাড়াতে হবে। বিশেষত শহর অঞ্চলে পার্ক ও খেলার মাঠ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। অনেক বিদ্যালয়ের নিজস্ব মাঠই নেই। উপযুক্ত অবকাঠামো ব্যতীত কোনো বিদ্যালয় যেন কার্যক্রম চালু করতে না পারে এ বিষয়ে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। অনেক সময় নিরাপত্তার কথা ভেবে অভিভাবকরা শিশুদের ঘরে আটকে রাখতে চান। শিশুদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়েও ভাবতে হবে। এছাড়া শিশুর বিকাশ ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ কিছু কর্মসূচি নেয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বাজেটে আলাদা বরাদ্দও রাখা যেতে পারে।
শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের ‘অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট’ শিশুদের সুরক্ষার আইনি দায়িত্ব শুধু ব্যবহারকারী নয়, ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোর ওপরও দিয়েছে। বাংলাদেশও এটির অনুকরণে সামঞ্জস্যপূর্ণ মডেল তৈরি করতে পারে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি জাতীয় শিশু ডিজিটাল সুস্বাস্থ্য নীতিমালা প্রণয়ন এখন অপরিহার্য। স্কুলে ফোন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট বিধি, ডিজিটাল সাক্ষরতাকে বাধ্যতামূলক পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্তি এবং নিয়মিত দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা সরকার নিতে পারে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকেও প্লাটফর্মগুলোর শিশুমুখী কনটেন্ট অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণে কর্তৃত্ব দেয়া উচিত। এছাড়া প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যেন ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই, স্ক্রিন টাইম সতর্কতা ও শিশুদের জন্য আলাদা নিরাপদ কনটেন্ট পরিবেশ নিশ্চিত করে, সেজন্য আলাদা আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করা উচিত।
শিশুদের খেলাধুলায় মনোযোগী করার বিষয়ে বিএনপি সরকার এরই মধ্যে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খেলাধুলাকে কেবল বিনোদন হিসেবে নয়, বরং একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণী থেকে খেলাধুলাকে পাঠ্যসূচিতে বাধ্যতামূলক করা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করার ভাবনাও রয়েছে। খেলোয়াড়দের উৎসাহ বাড়াতে ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা কার্যক্রম চালু হয়েছে। সারা দেশে আধুনিক ইনডোর সুবিধাসহ ‘ˆস্পার্টস ভিলেজ’ নির্মাণের পরিকল্পনাও আলোচনায়। কিন্তু এগুলো আলোচনা ও প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। কাজটি করতে হবে দ্রুত। কারণ যেকোনো প্রজন্মের বিকাশের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা জাতির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।