সাতসতেরো

তারকাখ্যাতি অর্জনের চেয়ে সেটা রক্ষা করা কঠিন!

কী ভাবছেন, সাম্প্রতিক আলোচিত ইস্যুতে লিখব? ধারণা ঠিক আছে, সেটাই সংগত। কিন্তু অতি আলোচিত ইস্যুতে আমি সাধারণত লিখি না; বরং তুলনামূলকভাবে স্থায়ী, গভীর ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলোয় ভাবতে ও পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করতে পছন্দ করি। আজও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

কী ভাবছেন, সাম্প্রতিক আলোচিত ইস্যুতে লিখব? ধারণা ঠিক আছে, সেটাই সংগত। কিন্তু অতি আলোচিত ইস্যুতে আমি সাধারণত লিখি না; বরং তুলনামূলকভাবে স্থায়ী, গভীর ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলোয় ভাবতে ও পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করতে পছন্দ করি। আজও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

একসময় গণমাধ্যমে মাত্র একবার ডাক পেতে বিশেষ যোগ্যতা বা উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকতে হতো। যেমন এইচএসসি রেজাল্টের পর আমাকে বিটিভিতে সাক্ষাত্কারের জন্য ডাকা হয়েছিল। তত্কালে অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হতো। নিরলস চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের ফলেই মাঝেমধ্যে ‘চান্স’ পাওয়া যেত। তাছাড়া দক্ষ ও অভিজ্ঞদের হাতে চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকায় শিল্পকর্মের নানামুখী প্রভাব বিবেচনা করে তবেই তার চূড়ান্ত ছাড়পত্র মিলত।    

তারিন-ঈশিতা-শাওনদের টেলিভিশনে ডাক পেতে হয়তো শতাধিক প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছিল। সেটা নিতান্তই অনুমান নয়। নিজের দুবার ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। তাছাড়া সেদিন বিপাশা হায়াত এক অনুষ্ঠানে বলছিলেন, থিয়েটারে কাজের শুরুতে (বাবা খ্যাতিমান অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও) আর দশজন কর্মীর মতো তাকে মঞ্চ ঝাড়ু দিতে হতো, কাউন্টারে বসে টিকিট বিক্রি করতে হতো! এভাবে একজন শিল্পী গড়ে উঠলে ‘তারকাখ্যাতি’ বহন করার সামর্থ্য অর্জিত হয়। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে ‘মাথা আউলা-ঝাউলা’ হয়ে যায় না।

আগের দিনে ‘তারকা’ তৈরি হতে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। সে কারণেই একবার দাঁড়িয়ে গেলে অনায়াসে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারত। তখন টেলিভিশন ও বেতারে অডিশনে পাস করার মাধ্যমে ওই জগতে প্রবেশের ছাড়পত্র মিলত। তাছাড়া ‘নতুন কুঁড়ি’ কিংবা ‘নতুন মুখের সন্ধানে’র মতো অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজে নেয়া হতো। মঞ্চে দীর্ঘদিন কাজ করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের মাধ্যমেও অনেকে গুণী নির্মাতাদের নজরে পড়ত। 

এ ধারার সরাসরি ব্যতিক্রম ঘটে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর রিয়েলিটি শোর আগমনে। রাতারাতি ‘বাই চান্স’ অনেকে টেলিভিশনে যাওয়ার সুযোগ পায়। আয়োজকদের বিবিধ কৌশল ও দর্শকদের এসএমএসের বন্যায় ভাসতে থাকা প্রতিযোগীরা নিজেদের সত্যিকারের ‘সেলিব্রেটি’ ভাবতে শুরু করে। অনেকে হঠাৎ করেই নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতার ব্যাপারে ‘অতি আত্মবিশ্বাসী’ হয়ে ওঠে।

প্রতিযোগিতার সেই সিজন সম্প্রচারকালে ‘বিশেষ আপ্যায়ন’ তাদের অনেককেই ভাবায় যে এটাই তাদের প্রকৃত মূল্যায়ন। ফলে যে মা-বাবা কিংবা শিক্ষকরা এতদিন তাদের মর্যাদা না দিয়ে ‘অবমূল্যায়ন’ করেছেন, তাদের ওপর রাগ-ক্ষোভ বাড়তে থাকে। তাদের মতামত ও পরামর্শকে জীবনে উন্নতির পথে বড় বাধা বলে গণ্য করে। লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের রঙিন জগৎ তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে থাকে। 

কিন্তু তারা এটা ধরতে পারে না যে সেটা কোনো প্রতিযোগিতা নয়, বরং টেলিভিশনের একটা ‘শো’ ছিল! সেটাকে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর করার জন্য বিভিন্ন সেক্টরের গুণীজন ও খ্যাতিমান ব্যক্তিদের আনা হয়েছিল। ক্ষণিকের জন্য তাদের পাশে বসতে পারা কিংবা উৎসাহজনক প্রশংসা শুনে ‘মুই কি হনুরে’ অবস্থার সৃষ্টি হয়। অথচ সেটা অনেক সময়ই তাদের প্রকৃত যোগ্যতার নির্দেশক নয়; খুবই ক্ষণস্থায়ী প্রাপ্তি। তারা ভুলে যায়, ইভেন্টের প্রয়োজনে যেভাবে দরকার জাস্ট তাদের সেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে!

ক্ষণিকের মোহে তারা এটা বুঝতে পারে না যে এমন আয়োজনগুলোয় দক্ষতা ও যোগ্যতার চেয়ে ‘পাবলিক সেন্টিমেন্ট’কে অনেক বেশি ভ্যালু দেয়া হয়। তাছাড়া ভবিষ্যতে কেউ তাদের দায় নেবে না। ইভেন্ট সফল করার জন্য যা যা করা দরকার, তার সবই করা হয়। সেখানে একটা পজিশন পাওয়া আর দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ারে সফল হওয়া মোটেই এক কথা নয়। যদি তা-ই হতো, তবে ক্লোজআপ ওয়ানের চ্যাম্পিয়ন অনেকেরই আজ এন্ড্রু কিশোরের ঘাটতি পূরণ করার কথা ছিল! 

যা হোক, ক্ষণিকের ওই আয়োজন অনেক প্রতিযোগীকেই একটা ‘ফলস ইমপ্রেশন’ দেয়। প্রতিষ্ঠিত নায়ক-নায়িকা বা কণ্ঠশিল্পীদের কাতারে নিজেকে কল্পনা করতে থাকে। ভাবে ‘স্টার’দের সঙ্গে চলতে হলে অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি ও বিলাসী জীবনযাপন করা অত্যাবশ্যক। তাই একের পর এক খরচের খাত উন্মুক্ত করতে থাকে। সামর্থ্যবান অনেক অভিভাবক প্রথম দিকে সাপোর্ট দিলেও একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন। অথচ তাদের লাইফস্টাইল সাপোর্ট করার মতো আয়ের নিশ্চিত কোনো উৎস থাকে না।

যেখানে প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের ঠিকমতো সম্মানী দেয়া হয় না। প্রাপ্য সম্মানীর জন্য অনেক দিন নির্মাতাদের পেছনে ঘুরতে হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় শিক্ষা, দক্ষতা ও কমিটমেন্টে ঘাটতি থাকা একজন নবাগতকে কারা কাজ দেবে? তাছাড়া নিজেকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টাও তাদের মাঝে খুব একটা থাকে না। ফলে ‘অহমিকায় ভরপুর’ তথাকথিত তারকা দ্রুতই বিচ্যুত হয়। 

প্রতিযোগীদের অনেকেই হঠাৎ পাওয়া ওই ‘খ্যাতির মোহ’ ছাড়তে পারে না। তারা ‘সেলিব্রেটি ইমেজ’ ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তখন তাদের প্রত্যাশিত জীবনের সব উপকরণের জোগান দিতে এগিয়ে আসে। আর সেগুলো গ্রহণ করার মাধ্যমে ক্রমেই তাদের জালে আটকে পড়তে থাকে। প্রিয়জনদের উপদেশ-পরামর্শ উপেক্ষা করে, এমনকি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে হলেও তথাকথিত ‘ভাইয়া’দের সঙ্গে ওঠাবসা অব্যাহত থাকে।

কখনো তাদের জীবনযাপন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে হঠাৎ করে একজন মাসে ‘৩ লাখ’ টাকা ভাড়ার ফ্ল্যাটে থাকে, কোটি টাকার গাড়ি হাঁকায়। অথচ দেশের একজন সিনিয়র সচিব বা সিলেকশন গ্রেডের প্রফেসর বেতন পান লাখ টাকার কাছাকাছি! কেউ ভালোবেসে তাদের পেছনে এমন অর্থ ‘বিনিয়োগ’ করে না; বরং তাদের অনেক বেশি রিটার্ন দিতে হয়। তাই একপর্যায়ে শুধু নিজের সার্ভিসে ব্যয় সংকুলান হয় না। তখন রঙিন জগতে সফলতাপ্রত্যাশীদের দলে ভেড়ানোর উদ্যোগ নেয়। একসময় জাস্ট টিকে থাকার স্বার্থেই তারা নানা ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

আজকাল অনেকেই সোস্যাল মিডিয়ায় সফলতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ‘ক্রেজি’ হয়ে উঠেছে। তাদের টিকটক, লাইকি বা ইউটিউব ভিডিওতে কিছু লাইক-কমেন্ট পড়লেই আর মাথা ঠিক থাকছে না। নিজেকে ‘তারকা’ ভাবতে শুরু করছে। এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে অনেকে। অখ্যাত চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অনুষ্ঠান নির্মাতাদের সঙ্গে সখ্য বৃদ্ধির অজুহাতে ক্লাব, বার, ঘরোয়া আড্ডা ও পুল পার্টিতে অনেককে ডাকা হয়। তার পরের পরিণতি তো মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়।

পরিবারের অগোচরে তাদের হাতে ধরা দিয়ে ধর্ষণের শিকার, মাদকাসক্ত হওয়া, এমনকি বিদেশে পাচারের ঘটনাও ঘটছে। আর দু-চারটা পণ্যের বিজ্ঞাপনে মডেল হলে তো কথাই নেই। সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা ও সম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে। করোনাকালে কর্মহীন শোবিজ জগতের অনেকেরই জীবনযাপনের উচ্চব্যয় নির্বাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের অনেকেই অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়তে দ্বিধা করছে না। গত কিছুদিন গণমাধ্যমে যা দেখা যাচ্ছে, আমার ধারণা সেগুলো ‘টিপ অব দি আইসবার্গ’ মাত্র। 

যেসব তরুণ-তরুণী ১৩ সেকেন্ডের ভিডিও দিয়ে স্টার হতে চাইছে, তাদের এটা বোঝা দরকার যে মিডিয়া বিস্তারের এ যুগে ‘টেকসই অবস্থান’ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। আকস্মিক জ্বলে উঠে পরক্ষণেই চুপসে যাওয়ার অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে। গত এক দশকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া শিল্পীদের অনেকেই নানা কারণে আজ বিস্মৃত।

চঞ্চল চৌধুরী বা জয়া আহসানের মতো টেকসই শিল্পী সহসা বের হচ্ছে না। সংগীতাঙ্গনেও একই চিত্র। তরুণ এক শিল্পী হঠাৎ একটা গান হিট হওয়ার পর নিজেকে সেলিব্রেটি ভাবতে শুরু করছে। কিন্তু তারপর ‘বাঁশি আর বাজে না তো আগের মতো!’ এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষাদীক্ষা, অভিজ্ঞতা, ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই নিজেকে ‘বড় তারকা’ ভাবা নিতান্তই আকাশকুসুম কল্পনা!

এটা অবশ্য সৃষ্টিশীল কাজের অন্যান্য শাখার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে মাঝেমধ্যেই আমরা সম্ভাবনাময় কিছু খেলোয়াড়ের ঝলকানি দেখি। তারপর খ্যাতির ভার সইতে না পেরে অথবা অজ্ঞাত কারণে কোথায় যেন ছিটকে পড়ে। নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জাতি বঞ্চিত হয় তাদের সেবা থেকে।

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, মিডিয়াগুলো একসময় সাব্বিরকে বাংলাদেশের বিরাট কোহলি বানিয়েছিল। পরে সে এমন বিজ্ঞাপনের মডেল হয় যে তীব্র সমালোচনার মুখে সেটা প্রত্যাহার করতে হয়। ঠিক তেমনিভাবে ইমরুল কায়েস সম্পর্কে শুরুর দিকে অতি উচ্চাশা ছিল। যুব বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দেয়া আকবরকে অনেকেই ক্রিকেটের নতুন সম্রাট বলে গণ্য করেছিল। ঠিক তেমনিভাবে জুবায়ের হোসেন লিখন, শামীম পাটোয়ারি, আবু হায়দার রনিদের শুরুটা ছিল প্রতিশ্রুতিশীল। কিন্তু কোথায় যেন হিসাবে গরমিল হয়ে যায়! 

এসব দেখে ছোটবেলায় পড়া ‘মুকুট পরা শক্ত, কিন্তু মুকুট ত্যাগ করা আরো কঠিন’ কিংবা ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন’ কথাগুলো মনে পড়ে যায়।

 

মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘মস্তিষ্কের মালিকানা’ বইয়ের লেখক

আরও