অনেক অপূর্ণতা নিয়েও বাংলাদেশ একটি সার্থক স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের জন্য রক্ত দিয়েছে। (এর জন্য নাগরিক মাত্র অহংকার করবে।) ভাষা আন্দোলনের পর মুক্তিযুদ্ধ এবং কালের যাত্রায় আত্মপরিচয় দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। দশকের বাঁকে বাঁকে নানাবিধ সংকট মোকাবেলা করে অর্জন করেছে কিছু সূচকরেখায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান।
কিন্তু মুক্তচিন্তা, মানবাধিকার ও মূল্যবোধের বিষয়ে প্রশ্ন গুরুতর। পরিষ্কার বলা যায়, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বাংলাদেশের মতো জাতিরাষ্ট্রকে বারবার বাধা দিচ্ছে গন্তব্যে পৌঁছাতে। এর কারণ সংবিধানে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিকে (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) তোয়াক্কা না করা। ফলে মতের অমিল হলেই হামলা-মামলা জেল-জুলুম। মানুষ মাত্রই মত ও পথের ভিন্নতা থাকবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য তো কালে কালে ছিল। তাই বলে জীবন শেষ করে দেয়া যায় না। রক্তের ওপর ক্ষমতার ‘মসনদ’ সাময়িক। যেভাবে স্বপ্নের পাকিস্তান ভেঙে গেছে।
একাত্তরে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশে ‘তারুণ্য ছাড় দেয় ছেড়ে দেয় না।’ দেশপ্রেমিক তারুণ্য এমন বহু সংকট গুঁড়িয়ে দিয়েছে আগেও। পাকিস্তান থেকে স্বাধীন দেশের স্বৈরাচার, সাম্রাজ্যবাদের হুমকি, জনগণকে ভুল দীক্ষা, বঞ্চিত মানুষের অধিকার হরণ যখনই হয়েছে তখনই জেগেছে তারুণ্য। প্রতিবাদে সোচ্চার হতে তার নেতৃত্বের দরকার হয়নি। ‘সংকট’ সম্ভাবনার গুরু জ্ঞান করে জেগেছে তারুণ্য। গত এক দশকের যেকোনো গণ-আন্দোলনকে সফল করেছে তারুণ্য।
খ. চলমান পরিস্থিতি তুলে ধরতে প্রাসঙ্গিক একটি ঘটনা হাজির করি। তিউনিসিয়ার গণআন্দোলনের বিষয়টি নিশ্চয়ই অনেকের জানা। রাজধানী তিউনিসে রুটির দোকানে রুটি কিনতে যান অতিসাধারণ একজন। দাম বেড়ে যাওয়ায় তার পক্ষে কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এ নিয়ে দোকানির সঙ্গে শুরু হয় তর্ক। মেজাজ খারাপ হলে আঘাত করেন দোকানি। অভুক্ত ক্রেতা মাটিতে পড়ে যান। জ্ঞান হারিয়ে ঘটনাস্থলেই জীবন শেষ! সবাই তো অবাক। এ পরিণতির জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। পথচারীদের ভিড় বাড়তে থাকে। লোকে লোকারণ্য। সবাই নিজেদের মাঝে সেই ক্রেতার ছবি খুঁজে পান। কল্পনা করেন, পড়ে থাকা ক্রেতার লাশটা যেন নিজের। আপন অক্ষমতার ছায়া…
অগ্নিগিরি ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের কাছে রুটির দোকান হয়ে ওঠে স্বৈরাচার সরকারের প্রতিভূ। দোকানি পালিয়ে যায়। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় রুটির দোকান জনতা। শুরু হয় লাশ নিয়ে মিছিল, ঢল নামে মানুষের। জানাজায় লাখ লাখ মানুষ। দাফন হয়, কিন্তু ক্ষোভের আর দাফন হয় না, বরং বাড়তে থাকে। সহিংস থেকে সহিংসতর হতে থাকে জনরোষ।
মূর্খ শাসক ভাবলেন, রুটির দাম নিয়েই যখন সূত্রপাত, রুটির দাম কমিয়ে দাও। কিন্তু দেখা গেল, দাম কমিয়ে ক্ষোভের আগুন নেভানো গেল না। আরো জ্বলে উঠল। জনবিচ্ছিন্ন শাসক রুটিটাই দেখেছিল; আর মানুষ দেখেছিল রুটিতে ঝলসানো দেশ। জনতা দেখেছিল সিন্ডিকেট, অর্থ পাচারে সরকারের আশ্রয় ও সুবিধাভোগীর হাতে দেশ নামের রুটিটি ঝলসে গেছে।
রুটিওয়ালার ফাঁসি বা দোকানির লাইসেন্স বাতিল প্রাথমিক দাবি থাকলেও তা আর সেখানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্দোলনের আগুন দেশের সীমারেখা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, বুঝতে পারেনি শাসক। যখন বুঝেছে ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে গেছে! তাই বাংলাদেশে ছাত্রদের কোটা আন্দোলন যে শুধু চাকরির জন্য, সেটি মনে করার কারণ নেই। আড়ালে প্রাত্যহিক হতাশা, খেতে না পারা, কথা বলতে না পারাসহ বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি অফিস, আদালতে ঘুস আর বৈষম্যের শিকার সাধারণ মানুষ। স্বাধীন দেশে মনে হয় দেখার কেউ নেই, নেই বলারও! বলতে চাইলেও সাইবার মামলা ভয়!
দেশের কোটি কোটি মানুষ, বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন ও অর্থনীতি। সহজ করে বললে মানুষ দীর্ঘদিনের কষ্ট প্রকাশ করতে পারেনি। চাপা ক্ষোভ দিনের পর দিন পুঞ্জীভূত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, দুর্নীতি, গরিবে-ধনীতে বৈষম্য, জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যাওয়া থেকে শুরু করে ভোট দিতে না পারা ও ভোটে নির্বাচিত সরকার না আসা—এসব আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘আমরা যারা এটুকু বুঝতে পারি, এ দেশের জনগণ দীর্ঘদিন অন্যায় ব্যবস্থা মেনে নেয় না। তারা একসময় প্রতিবাদ করে। বাষট্টি, ঊনসত্তর, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের অভ্যুত্থানে আমরা দেখেছি, মানুষ দীর্ঘদিন সহ্য করে, অপেক্ষা করে, কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে তখন বিস্ফোরণ ঘটে।
গ. কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় ২০১৮ সালে৷ পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের দমন-পীড়নের মুখেও সারা দেশে আন্দোলনে উত্তাল হয়৷ তখন প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, ‘যখন কেউই কোটা চায় না, তখন কোনো কোটাই থাকবে না, কোটা পদ্ধতি বাতিল।৷’
তারপর মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, নারী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তারা আদালতে যায়। কোটার পক্ষে রুল দেন আদালত।৷ কোটা বাতিল দাবিতে রাজপথে নামেন তরুণেরা।৷ নিয়ম মেনে আন্দোলন করলেও দাবি না মেনে বরং উস্কে দেয়, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে সরকার।
একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমি মনে করি, একাত্তরে যারা প্রাণ দিয়েছেন তারা কোনো কিছুর বিনিময় চাননি। বাবা বলেন, ‘আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে নিজের মেধা-যোগ্যতার প্রমাণ দেয়া ছাড়া গতি নেই। সামাজিক সাম্যের জন্য আমাদের লড়াই। আমরা স্বাধীনতা এনেছি এবার তোমার সামাজিক মুক্তি নিয়ে কাজ কর, ভিক্ষা না।’ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা এমন কোটা চান না, নিজের সুবিধা না, সবাইকে নিয়ে বাঁচতে চান।
প্রধানমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরাও (চাকরি) পাবে না? তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে? সেটা আমার প্রশ্ন।’ (দ্য ডেইলি স্টার)
প্রধানমন্ত্রীর কথার প্রতিক্রিয়ায় মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল করেন, স্লোগান দেন, ‘আমি কে তুমি কে, রাজাকার রাজাকার।’ এই স্লোগানের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। শিক্ষার্থীরা যদিও বলেছেন, ‘আমি কে তুমি কে, রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ কিন্তু সেটাকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। তরুণরা এটা মেনে নিতে পারেন না।
তারপর দলের সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আন্দোলন থেকে আত্মস্বীকৃত রাজাকার ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের প্রকাশ পেয়েছে। এর জবাব দেয়ার জন্য ছাত্রলীগ প্রস্তুত।’ ওই দিন বিকাল থেকে ছাত্রলীগ কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর অন্যায়ভাবে হামলা করে। তারপর পরিস্থিতি সবার অজানা নয়।
আন্দোলনে ছাত্রসহ তাদের সমর্থকদের ওপর এ নির্বিচার আক্রমণ করেছে সরকারের বাহিনীরা। মেয়েদের লাঠিপেটা, রক্তাক্ত ও লাঞ্ছিত করার বহু টুকরা স্মৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে নামানোর প্রকাশ্য নির্দেশ দেয়। এতে দুই শতাধিক প্রাণ শেষ। আহত সহস্রাধিক এখনো হাসপাতালে। মানুষের আহাজারি আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। আর মৃত্যু তো কেবল সংখ্যা নয়; প্রত্যেক মানুষের মৃত্যু কিছু ক্ষতচিহ্ন রেখে যায় স্বজন ও স্বদেশের বুকে।
প্রথমে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে হত্যা করল পুলিশ। একা দাঁড়িয়ে ছিলেন; দুই হাত প্রসারিত করে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায়। মৃত্যুর একদিন আগে পোস্ট দিয়েছিলেন আবু সাঈদ শহীদ ড. শামসুজ্জোহাকে স্মরণ করে ‘স্যার! এই মুহূর্তে আপনাকে ভীষণ দরকার! আপনার সমসাময়িক সময়ে যারা ছিল সবাই তো মরে গেছে, কিন্তু আপনি মরেও অমর। আপনার সমাধি, আমাদের প্রেরণা।’ ‘অন্তত একজন শামসুজ্জোহা" হয়ে মরে যাওয়াটা অনেক বেশি আনন্দের, সম্মানের আর গর্বের,’ লেখেন তিনি।
তারপর কলেজ ছাত্র ফারহান লিখছেন, একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। তবে এমন জীবন গড়ো, যাতে মৃত্যুর পর মানুষ তোমাকে মনে রাখে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুগ্ধ ফেসবুকে নিজের সম্পর্কে লিখে রেখেছিলেন, কখন চলে যেতে হবে তা জানতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ। এই হচ্ছে আমাদের তারুণ্য, তাদের জীবনের উপলব্ধি। এইভাবে ফেসবুকে ভেসে যায়। তারপর বন্ধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
গণমাধ্যমকে তার বন্ধু মেধা বলেন, ‘মুগ্ধ আমাদের জন্য ছিল একটা সাহসের নাম। মুগ্ধ ছিল ভরসার নাম। অথচ আমাদের সেই সাহসকে এভাবে হারাতে হলো। এ ক্ষতি অপূরণীয়।’
অন্যদিকে সংঘর্ষের ছবি তুলতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন সাংবাদিক হাসান মেহেদী। জসিম উত্তরায় একটি অটোমোবাইলের দোকানে চাকরি করতেন। ১৮ জুলাই মালিকের নির্দেশে যান গাড়ির কিছু যন্ত্রাংশ কিনতে। আসার পথে গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থলে মারা যান জসিম। তার ভাই বলেন, ‘আমার ভাই মরে গেছে, এখন আর কার কাছে বিচার চাইব। কেই-বা বিচার করবে? (প্রথম আলো)!’ এইভাবে সাধারণ মানুষের অগণিত জীবন কেন গেল? জবাব কে দেবে!
একাত্তরের পরে এত লাশ কেউ দেখেনি। ১৯ জুলাই নিজে গিয়ে দেখেছি শূন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এত রক্ত, এত বর্বরতা—মানা যায়নি। না মেনেও কিছু পারছি না, অসহায়। কতটা অসহায় হলে স্বাধীন দেশে কেউ বিচার চায় না, কার কাছে চাইবে? এর থেকে লজ্জা কি? এখনো চলছে ধরপাকড়। যাকে-তাকে ধরছে, মামলা দিচ্ছে। খবরে দেখলাম, একটি প্রতিবন্ধী শিশুকেও আটক করা হয়েছে।‘
সরকার বারবার বলছে, বিএনপি-জামায়াতের উস্কানিতে আন্দোলন। আমাদের প্রশ্ন মাত্র রাষ্ট্রবিরোধীরা এত বড় অস্থিতিশীল পরিবেশ কীভাবে সৃষ্টি করতে পারল। টানা ১৫ বছরের একক কর্তৃত্বে থাকা সরকারের অধীনে কীভাবে এটা হতে পারে?
মনে রাখতে হবে, তারুণ্যের শক্তিই, দেশের শক্তি। তাদের মন ও মনন জিতে নিতে হবে। এবার যেভাবে শিক্ষার্থীদের ‘মোকাবেলা’ করা হলো, এতে মেধা পাচার বাড়বে। এআইনির্ভর বিশ্ব প্রতিভাবানদের নিয়ে গ্লোবাল ভিলেজ গড়ে তুলবে এবং কোনো নিপীড়নমূলক ব্যবস্থায় তাদের আটকে রাখা যাবে না।
শেষ করব এই বলে, এখন যাদের বয়স ৩০-৩৫, তারুণ্যের গুরুত্বপূর্ণ সময়। তারা কোনোদিন ভোট দিতে পারেনি। (নিবন্ধকও তাদের একজন) তাদের সামনে অহংকার করে বলে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, কূটনৈতিক দুর্বলতায় ব্যর্থ সফর শেষে কমেডি সম্মেলন, লুটপাট দুর্নীতির আশ্রয়, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ। তরুণরা হাসে, তাচ্ছিল্যের হাসি।
শাসকদের চরিত্র ও রাষ্ট্রের নানান হয়রানির চিত্র চারপাশে অহরহ। স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন উদযাপন করতে না পারা তরুণদের মনে ক্ষোভ-যন্ত্রণা। ফলে বিস্ময়করভাবে বিস্ফোরিত হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি—এ হতে পারে না। দলান্ধদের অত্যাচারে জেগে ওঠে তারুণ্য, একে বলা যায় বাংলাদেশের নবজাগরণ।
ইমরান মাহফুজ: কবি, গবেষক ও সম্পাদক কালের ধ্বনি