আজ ১০ জুন কবি ফররুখ আহমদের জন্মশতবার্ষিকী। তার
সঙ্গে আমার পরিচয় কবিতার মুগ্ধ পাঠক হিসেবে। আমাদের সময় স্কুল ও কলেজে তার কবিতা
পড়ানো হতো। তার কবিতায় এক ধরনের ছন্দময় তেজস্বিতা লক্ষ করি, যা আমাকে
আকর্ষণ করত। স্কুলের ছাত্র অবস্থায় বাংলা একাডেমি আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় একবার
অনেক বই পুরস্কার হিসেবে পাই,
যার মধ্যে ‘সাত
সাগরের মাঝি’
কাব্যগ্রন্থটিও ছিল। প্রায়ই বইটা খুলে বিভিন্ন কবিতা উচ্চৈঃস্বরে আবৃত্তি করতাম।
কেমন একটা বীর বীর ভাব হতো মনে।
আমি তখন চট্টগ্রামে স্কুলের ছাত্র। ছোটদের একটি
ম্যাগাজিন বের করতে গিয়ে তার সঙ্গে প্রথম দেখা। তিনি তখন রেডিওর কর্মকর্তা হিসেবে
প্রাপ্ত ইস্কাটন গার্ডেনের সরকারি বাসায় থাকতেন। প্রথম দর্শনেই তার উজ্জ্বল চোখ, বাবরি চুল
ও কথা বলার ব্যক্তিত্ব আমাকে আকর্ষণ করে। তিনি কবিতা দিতে সম্মত হলেন। ম্যাগাজিনে
কবিতা ছাপা হলে তাকে দিই। তাকে বেশ খুশি মনে হলো। ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ ও ভেতরের
ছবিগুলো এঁকেছিলেন নামকরা শিল্পী সবিহ-উল-আলম।
চট্টগ্রামে পড়া শেষ করে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
ভর্তি হই। সেখানে কবি ফররুখ আহমদের ছেলে সৈয়দ আব্দুল্লাহেল মাসুদের সঙ্গে পরিচয়
হয়। আমি অর্থনীতি ও মাসুদ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব
হয়। মাঝেমধ্যে তাদের বাসায় যাই। মাসুদরা বেশ কয়েকজন ভাইবোন। অত্যন্ত অনাড়ম্বর
তাদের জীবনযাত্রা, কিন্তু
আন্তরিকতার কমতি নেই। বাসায় গেলে চা আসে,
সঙ্গে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ
ও সর্ষের তেল দিয়ে মাখানো মুড়ি। মাঝে মাঝে কবির সঙ্গে দেখা, কথা হয়।
সমীহ করে কথা বলি। তাকে রাশভারী অথচ স্নেহপরায়ণ মনে হয়। আমি কবি কিংবা সাহিত্যিক
নই। তাই আমাদের বেশির ভাগ কথা হয় আমার পড়াশোনা, চট্টগ্রামে অবস্থিত আমার মা-বাবা, ভাইবোন ও
সন্দীপে আমাদের দাদা, নানাবাড়ি
বিষয়ে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একসময় খেয়াল করি, মাসুদ
ভার্সিটিতে আর আসছে না। তার ক্লাসের সহপাঠীদের জিজ্ঞেস করি। কেউ কিছু জানে না। আমি
তখন মহসিন হলে থাকি। একদিন মাসুদদের বাসায় গেলাম। বেশ কিছুক্ষণ কড়া নাড়লেও কেউ
দরজা খুলল না। অগত্যা আধভেজানো দরজা খুলে ঢুকে পড়ি। দেখলাম, ঘরের
ভেতরের বারান্দায় মাদুরে বসে কবি সপরিবারে ভাতের ফেন খাচ্ছেন! আমি
ড্রয়িংরুমে বসলাম। খাওয়া শেষ করে মাসুদ আসে। মাসুদেরও মুখ শুকনো। আমি জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে, ক্লাসে
যাচ্ছ না কেন? মাসুদের
কাছে শুনলাম, তার
আব্বাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বেতন বন্ধ, ঘরে খাবার নেই। এরই মধ্যে তার এক ছোট বোন
বিনা চিকিত্সায় মারা গেছে। আমি মাসুদকে জিজ্ঞেস করি, চাকরি গেল, কিন্তু কেন?
আমার লেখাটির শিরোনাম সাত সাগরের মাঝি কবিতার
দ্বিতীয় লাইন। কবি ফররুখ আহমদ অপাংঙেক্তয় হওয়ার অন্যতম কারণ এটি। তিনি তার কবিতায়
প্রচুর আরবি, ফারসি
শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন— নারঙ্গি
শব্দের অর্থ কমলালেবু। পাঠক,
অনুগ্রহ করে ‘নারঙ্গি’ শব্দটির
পরিবর্তে ‘কমলালেবু’
প্রতিস্থাপন করে লাইনটি আবার পড়ুন। আপনি নিজেই কবি হিসেবে ফররুখ আহমদের
শক্তিমত্তার পরিচয় পেয়ে যাবেন।
আমি মহসিন হলে ফিরে ভাবতে থাকি, কী করা
যায়। ভেবেচিন্তে আমি ফুলার রোডে বাবার বন্ধু অধ্যাপক আহমদ শরীফের বাসায় গিয়ে তাকে
ঘটনাটা জানাই। তিনি খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং কয়েকজনের সঙ্গে অ্যানালগ ফোনে কথা
বললেন। তাকে ফোনে বলতে শুনলাম,
‘ফররুখ আহমদ বিশ্বাসী ছিলেন ঠিকই,
কিন্তু তিনি তো আগ্রাসী ছিলেন না। কখনো কারো ক্ষতি করেননি। এটা ভীষণ
অন্যায়।’ যাদের
সঙ্গে কথা বললেন, তাদের
একজন উপাচার্য অধ্যাপক আবুল ফজল। যাই হোক,
তিনি এবং আমি মিলে সংবাদপত্রে প্রচারের জন্য একটা বিবৃতি মুসাবিদা
করলাম। তিনি আমাকে বিবৃতিটি স্বাক্ষরের জন্য কয়েকজন অধ্যাপকের কাছে পাঠালেন।
অধ্যাপক আহমদ শরীফ, নাজমুল
করিম, সিরাজুল
ইসলাম চৌধুরী, আনিসুর
রহমান, আবু
মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, ললিত মোহন
নাথসহ প্রায় ২০ জন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সানন্দে এতে স্বাক্ষর করেন। উল্লেখ্য, এদের
অনেকেরই অবস্থান ছিল ফররুখের মতাদর্শের বিপরীতে। বিবৃতিটি পরদিন ১৮ জুন, ১৯৭৩
বেশির ভাগ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলো। বিবৃতিতে ফররুখ আহমদের দুর্দশায় হতাশা এবং
এজন্য দায়ী ব্যক্তিদের নিন্দা জানিয়ে সরকার ও জনগণকে কবি ও তার পরিবারের দুর্দশা
লাঘবের জন্য আহ্বান জানানো হয়। একই সময় প্রথাবিরোধী লেখক আহমদ ছফা ‘ফররুখ
আহমদের কী অপরাধ’ শিরোনামে
একটি প্রবন্ধ লেখেন। কিন্তু কোনো কিছুই কবিবিদ্বেষীদের টলাতে পারেনি। তিনি চাকরি
বা বকেয়া বেতন কোনোটাই পাননি। অবশেষে ১৯ অক্টোবর, ১৯৭৪ কবি ফররুখ আহমদ তার প্রতি কৃত সব
অন্যায়ের জন্য আমাদের সাক্ষী রেখে পরলোক গমন করেন। তিনি পাকিস্তান সরকার থেকে কখনো
কোনো বিশেষ সুবিধা ভোগ করলে তার ঢাকায় বাড়িঘর, অর্থসম্পদ থাকত এবং তাকে এভাবে সপরিবারে
তিলে তিলে নিঃশেষ হতে হতো না।
এর মধ্যে আমি চট্টগ্রাম চলে যাই। সেখানে গিয়ে
উপাচার্য অধ্যাপক আবুল ফজলের নুর আহমদ সড়কের বাসায় দেখা করি। সেখানে আমরা ফররুখ
স্মৃতি তহবিল গঠন করি এবং এ তহবিলের জন্য সাহায্য চেয়ে একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়।
এবার চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবীরা এতে যোগ দেন। বিবৃতিতে অধ্যাপক আবুল ফজল, আবু হেনা
মোস্তফা কামাল, মাহবুবুল
আলম, নাট্যকার
মমতাজ উদ্দিন আহমদসহ চট্টগ্রামের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা স্বাক্ষর করেন। এ ব্যাপারে
অর্থ সাহায্যের জন্য অগ্রণী ব্যাংক,
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। প্রথমে
সংগৃহীত ৫ হাজার টাকা অধ্যাপক আবুল ফজলের একটি চিঠি ও ডিমান্ড ড্রাফটসহ কবিপত্নীকে
পাঠানো হয়।
এছাড়া অধ্যাপক আবুল ফজল আমাকে বললেন, ‘আমি ঢাকায়
গিয়ে এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলব।’ কথা
অনুযায়ী তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলে বঙ্গবন্ধু নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা, যতদূর মনে
পড়ে মোস্তফা সারওয়ারকে ফোনে বকা দিয়ে বলেন,
‘কবি ফররুখ আহমদের চাকরি গেল,
তিনি অর্থকষ্টে মারা গেলেন,
তোরা তো কেউ আমাকে কিছু জানালি না।’ বঙ্গবন্ধু তার তহবিল থেকে কবি পরিবারের
সাহায্যের জন্য ৫ হাজার টাকার চেক দেন এবং বলেন, তিনি নিজে এটা কবির পরিবারকে পৌঁছে দেবেন।
আবুল ফজল সাহেব বলেন, তিনি
বঙ্গবন্ধুর পক্ষে এটা কবি পরিবারকে পৌঁছে দেবেন। তিনি কবিপত্নীর সঙ্গে দেখা করে
চেকটা তাকে পৌঁছে দেন।
এরপর আমরা কবির সাহিত্যকর্মের প্রচার ও এর
সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগী হই। কবি পরিবার থেকে জানতে পারি, তার
বেশকিছু অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি রয়েছে। ফররুখ স্মৃতি তহবিলের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ‘ফররুখ
আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশ
করা হবে এবং এর বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে কবি পরিবারকে সহায়তা করা হবে। আবার অধ্যাপক
আবুল ফজলের স্বাক্ষরে বইটি প্রকাশের জন্য অর্থ সাহায্য চেয়ে আবেদন করা হয়। বইটি
প্রকাশের বিষয়ে কবি আহসান হাবীব,
ফজল শাহাবুদ্দিন,
তালিম হোসেন, মোহাম্মদ
মাহফুজুল্লাহ বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন। আমরা সবাই মিলে প্রথমে ফররুখ আহমদের সঙ্গে
ঘনিষ্ঠতা বিবেচনা করে শিল্পী কামরুল হাসানকে প্রচ্ছদ আঁকা ও কবি শামসুর রাহমানকে
বইটি সম্পাদনার জন্য অনুরোধ জানাই। অজ্ঞাত কারণে দুজনই অপারগতা জ্ঞাপন করেন। এরপর
আমরা বইটি সম্পাদনার জন্য কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি
সানন্দে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। বইটির প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেন কবি ফজল শাহাবুদ্দিন।
এজন্য তারা কেউই কোনো অর্থ গ্রহণ করেননি,
বরং নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে প্রেসে যাতায়াত করেছেন। তাদের টাকা-পয়সা দিতে
চাইলে তারা বলেছেন, এটা কবি
ফররুখের প্রতি তাদের অনুরাগ ও ভালোবাসার ফসল। এজন্য তারা কোনো টাকা-পয়সা
নেবেন না। ১০ জুন, ১৯৭৫
ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা প্রকাশিত হয় এবং এর বিক্রয়লব্ধ সমুদয় অর্থ কবি
পরিবারকে দেয়া হয়। এ উপলক্ষে কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল বইটির একটি দীর্ঘ
সমালোচনা লেখেন। লেখাটির পাণ্ডুলিপি দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান
হাবিবের হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য আমাকে দিতে গিয়ে খানিকটা স্বগতোক্তির মতো করে বলেন, ‘ফররুখ
আহমদ হলেন জাত কবি, বাকি সব
পদ্যলেখক।’
এরপর আমরা ফররুখ আহমদের অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
প্রকাশের উদ্যোগ নিই। প্রকাশনার ব্যয়ভার বহনের জন্য ‘পাঞ্জেরী’ নামে একটি ম্যাগাজিন বের করি, যাতে
ফররুখ আহমদের কবিকীর্তি বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল
ইসলামের একটি নিবন্ধ ও কবির লেখা
‘হে বন্য স্বপ্নেরা’র
পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে তা
‘হে বন্য স্বপ্নেরা’
কাব্যগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এ উদ্যোগের পুরোধা ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের
উপাচার্য, কবি ও
লেখক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। কবির সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। বইটির একটি
অতীব সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শিল্পী কাইউম চৌধুরী। এ প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িত কেউই
কোনো টাকা-পয়সা
নেননি। তাদের ফররুখ ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসার জন্যই তারা এ শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেছেন।
সন্দেহাতীতভাবে ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যের
প্রধান কবিদের একজন। কিন্তু আমাদের ভেদবুদ্ধির কারণে তার শেষ জীবন সুখের হয়নি। তার
বিশ্বাসের জন্য আজো তিনি মহলবিশেষের কাছে অপাঙেক্তয় হয়ে আছেন। অনেক প্রান্তিক
লেখকের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আমরা পত্রপত্রিকায় মাতামাতি, বিশেষ
পাতা দেখি। আজ ফররুখের জন্মশতবার্ষিকীতে এসবের কিছুই হবে না। এমনকি বণিক বার্তায়ও
না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কবি ফররুখ আহমদ এখন কেবল ইসলামপন্থীদের কবিতে পরিণত হয়েছেন।
এটা আমাদের একটা জাতীয় ক্ষতি। ভেদবুদ্ধির অবসান হোক। সবাই তার চিরায়ত সাহিত্যের
আস্বাদ গ্রহণ করুক। কবির জন্মশতবার্ষিকীতে এটাই কামনা।
লেখক: সাবেক সচিব ও অধ্যাপক