সময়ের ভাবনা

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, পড়তি মধ্যবিত্ত ও স্থানীয় অর্থনীতি

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গত এক বছরের মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। এছাড়া ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে গত মে মাসে (৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ)। একই মাসে গত বছরে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। এছাড়া মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এ সময় গ্রামে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ আর

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গত এক বছরের মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। এছাড়া ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে গত মে মাসে (৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ)। একই মাসে গত বছরে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। এছাড়া মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এ সময় গ্রামে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ আর শহরে ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। গ্রাম ও শহরে দুই স্থানেই খাদ্যের চেয়ে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে (বণিক বার্তা, ৬ জুন, ২০২৩)।

অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির জন্য অভিঘাতস্বরূপ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায়। ক্ষুধা বাড়ায়। সহজ ভাষায়, মূল্যস্ফীতি বলতে পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাওয়া বোঝায়। যা সাধারণত অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের কারণে ঘটে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে পণ্যের মজুদ ও মুদ্রার পরিমাণের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক যখন অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপে, তখন মূল্যস্ফীতি ঘটে।  ফলে মুদ্রার মান ও ক্রয়ক্ষমতা কমে। এছাড়া দুর্যোগ, যুদ্ধ, উন্নয়নযজ্ঞ, ব্যাংকের সুদহার কমানো, ভর্তুকি ও আমদানিনির্ভরতার কারণেও মূল্যস্ফীতি বাড়ে।

অর্থনীতির ভাষায়, মূল্যস্ফীতিকে বলা হয় এক ধরনের কর, যা ধনী-গরিব সবার ওপর আরোপিত হয়। তবে মূলত সীমিত আয়ের মানুষ এর চাপে পড়ে। মূল্যস্ফীতি ২-৫ শতাংশের মধ্যে থাকলে সহনীয়, ৭-১০ শতাংশ হলে নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য অসহনীয় এবং এর চেয়ে বেশি হলে স্ট্যাগফ্লেশন পুরো দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত ও মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে (নয়া দিগন্ত, ৯ মার্চ, ২০২৩)।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি যদি দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সেটি নেতিবাচক। স্বাভাবিকভাবে বর্তমানে দেশে জিডিপির চেয়ে মূল্যস্ফীতির হারের প্রবণতা বেশি। এ প্রেক্ষাপটেই আগামী বাজেটে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির লাগাম ৬ শতাংশের মধ্যে টেনে ধরার কথা বলা হয়েছে, যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় বেরিয়েছে, ঢাকা শহরে গরিব মানুষের অর্ধেকের বেশি ‘‌নতুন দরিদ্র’। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সপ্তম ধাপের (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) ফলাফল অনুযায়ী, এ মুহূর্তে বাংলাদেশী খানাগুলোর প্রায় অর্ধেকই খাদ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে। জরিপে দেখা যায়, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে সবচেয়ে বড় আর্থিক ধাক্কা হিসেবে চিহ্নিত করেছে ৪৮ শতাংশ খানা। এই যে মূল্যস্ফীতি, তা সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উত্থানকে বাধাগ্রস্ত করছে। মূল্যস্ফীতি মধ্যবিত্তকে নামাচ্ছে নিম্ন-মধ্যবিত্তে, আর নিম্ন-মধ্যবিত্তকে নিয়ে যাচ্ছে নিম্নবিত্তে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। 

তাই মূল্যস্ফীতির আলোচনায় মধ্যবিত্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, মধ্যবিত্ত আসলে কারা? ঠিক কাকে মধ্যবিত্ত বলে? মধ্যবিত্ত হিসেবে দেখা হয় তাদের যারা দারিদ্র্য থেকে কিছুটা মুক্ত আবার বিত্তবৈভবের সুখ থেকে বঞ্চিত। অর্থনীতিবিদরা মধ্যবিত্তকে পরিমাপ করেন আয়-ব্যয়ের নিক্তিতে। সব মধ্যবিত্তকে একইভাবে চিহ্নিত করাও হয় না। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) নিম্ন-মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করেছে তাদেরকে যাদের আয় মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা আয়কারীদের মধ্য-মধ্যবিত্ত এবং ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা আয়ের অধিকারীদের উচ্চ-মধ্যবিত্ত ধরা হয়েছে। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ হোমিও খোরাসের মতে, মধ্যবিত্তের জীবনে গুণমান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও আত্মনির্ভরশীলতা থাকে। নানা পেশা থেকে মধ্যবিত্তের আবির্ভাব হয়: সরকারি কর্মকর্তা, কলেজ গ্র্যাজুয়েট, সচ্ছল কৃষক, বণিক প্রভৃতি। মধ্যবিত্তরা নতুন নতুন পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা তৈরি করে।

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ এজাজ ঘানি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে: মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ ব্যয় বেশি করে। ব্যবসায়ে উচ্চমুনাফা, সঞ্চয়, বিনিয়োগ, উচ্চপ্রবৃদ্ধি ও বৃহৎ মধ্যবিত্ত তৈরিতে তারা ভূমিকা রাখে।  দ্য ম্যাকেঞ্জি গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের রিপোর্ট (২০০৭) মতে, মধ্যবিত্তরা এমন একটি জীবনধারা উপভোগ করে, যা তাদের মধ্যবিত্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সাধারণত তাদের একটি টেলিভিশন, একটি ফ্রিজ, মোবাইল ফোন, স্কুটার বা গাড়ি থাকে। তারা সন্তানের শিক্ষা ও অবসর জীবনের জন্য সঞ্চয় করেন।

মধ্যবিত্তরা শুধু আবশ্যক পণ্যই কেনে না, তারা  শৌখিন পণ্যও ক্রয় করে। এটিই তাদের অর্থনৈতিক চরিত্র। তারা শতরঞ্জি, বালিশের কুশন, জানালার পর্দা, কার্পেট, ওয়ালমেট, অ্যাকোয়ারিয়াম ইত্যাদি কেনে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা দেশের বাজার ও অর্থনীতির পরিবর্তন আনে। তারা ঘুরতে যায়, হোটেল-মোটেলে থাকে, রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। আবার ফুডপান্ডায় খাবার অর্ডার করে, উবার ব্যবহার করে। লোডশেডিংয়ে আইপিএস, গরমে এসি কেনে। তারা ভোগ্যপণ্যের নতুন নতুন চাহিদা তৈরি করে। তাদের চাহিদার কারণেই ভারতের টাটা মোটরস ও ভিডিওকন গ্রুপ ব্যবসায় সফল হয়েছে। মধ্যবিত্তের সুবাদে দেশে আরএফএল ও ওয়ালটনের ব্যবসা ভালো হচ্ছে। মধ্যবিত্তরা যে কেবল দেশী বা স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ায়, এমন নয়। আয় বাড়ার সঙ্গে তারা আমদানীকৃত পণ্যের দিকেও ঝুঁকে। দেশে স্যামসাং, সনি, ফিলিপস, প্যানাসনিক ও মিয়াকোর মতো বিদেশী ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার রয়েছে। অর্থাৎ এটি বলা যায়, মধ্যবিত্তের বিকাশে স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ে। নতুন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। দেশের বাজারে বিদেশী পণ্যের সঙ্গে দেশী পণ্যের টেক্কা চলে। তাদের কারণে শপিং সেন্টার, শো রুম ও প্লাজা গড়ে ওঠে।

দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় আরো একটি গোষ্ঠী রয়েছে। সাধারণত তারা ছোট দোকান ও কৃষিজমির মালিক কিংবা শিল্প ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পদক্ষ কর্মী। তাদের জীবন সহজ না হলেও ঘরে তাদের পর্যাপ্ত খাবার থাকে। তাদের মধ্যে কারো ঘরে টেলিভিশন, ফ্রিজ, প্রোপেন (এলপি গ্যাস) চুলা, জল গরম করার বৈদ্যুতিক জিনিসপত্র, এমনকি চার্জার ফ্যানও থাকে। তারা আয়ের অর্ধেক অর্থ মৌলিক প্রয়োজনের জন্য ব্যয় করে। অন্যান্য অনেক কেনাকাটা সেকেন্ডহ্যান্ড বা অনানুষ্ঠানিক বা খোলা বাজার থেকে কেনাকাটা করেন। এ গোষ্ঠীকে উঠতি মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত বলা হচ্ছে। তাদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে তা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য সুবিধাজনক হবে। কিন্তু এ গোষ্ঠীর উত্তরণের স্বপ্ন খেয়ে ফেলছে মূল্যস্ফীতি। বরং তাদের অবস্থা আরো নাজুক হচ্ছে। আয়ের এখন পুরোটাই তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে খরচ করতে হচ্ছে। ধারদেনা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে যারা মধ্যবিত্ত পর্যায়ে ছিল, তারাও পড়তির দিকে। তাদের অনেকেই আয়-ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে না পেরে দরিদ্রের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। 

এবারের বাজেট প্রস্তাবে মধ্যবিত্তের দুশ্চিন্তার কারণ রয়েছে। বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, মোবাইল ফোন, সানগ্লাস, টিস্যু, ন্যাপকিন, শ্যাম্পু-সাবান থেকে শুরু করে জমি-ফ্ল্যাট কেনা—এসবের খরচ বাড়বে। করযোগ্য আয় না থাকলেও ন্যূনতম কর দিতে হবে বহু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষকে। এছাড়া গৃহস্থালি পণ্য, সিলিন্ডার গ্যাস, বাসমতী চাল, বিদেশী ফলমূল ও কাজুবাদামের দাম বাড়বে। এছাড়া আকাশপথে ২০০ টাকা ভ্রমণ কর বসানো হয়েছে। অর্থাৎ মধ্যবিত্তকে শখ-আহ্লাদ ও জমি-ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন বাদ দিতে হবে। অবস্থা এমন যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যবিত্ত আরো সংকুচিত হবে। সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানো, ভালো হাসপাতালমুখী হওয়া এমনকি ব্যাংকে টাকা রেখে অর্জিত সুদে সংসার চালানোর চিন্তা বাদ দিতে হবে। 

দিনে দিনে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠা নিত্যপণ্য, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন ব্যবস্থা তাদের কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। বৈশ্বিক বাজারে এখন পণ্যের দাম কমছে। দেশেও কমবে আশা করা যায়। সেক্ষেত্রে সরকারকে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের কৃষি উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সরকারি দৃষ্টি আরো জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ‘‌গোল্ডেন মিন’ অর্থাৎ আয়-ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করে চলতে হবে। 

এছাড়া জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের দামে ঊর্ধ্বগতি ও উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাসে প্রতিষ্ঠানগুলো এমনিতেই বড় ধরনের বিপদে রয়েছে। বাজেট প্রস্তাবে কিছু খাতের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বাজেটটিকে আপাতদৃষ্টিতে ব্যবসাবান্ধব হিসেবে দেখছেন না। আবার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে মধ্যবিত্তের সংখ্যা কমবে। এ অবস্থায় স্থানীয় পণ্যের বাজার ও শিল্পে নেতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ফলে দেশে টেকসই ও বৈষম্যহীন অর্থনীতি তৈরি বাধাগ্রস্ত হবে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সাধারণ মানুষের দরিদ্র থেকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত উত্তরণ কিংবা মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্রে নামার প্রক্রিয়ায় স্থানীয় বাজার ও জাতীয় অর্থনীতি জড়িত। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দিয়ে স্থানীয় শিল্প বিকাশে সরকারকে এগোতে হবে। 

পাপলু রহমান: সাংবাদিক

আরও