শিক্ষা

দেশ পরিবর্তন করতে চাইলে আগে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে

একটা উন্নত জাতি গঠনে অবদান রাখে সে দেশের নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। যখন কোনো দেশের সব পেশার অধিকাংশ মানুষ দক্ষতা, আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তখন সেই দেশ অবধারিতভাবে এগিয়ে যায়, উন্নত হয়।

একটা উন্নত জাতি গঠনে অবদান রাখে সে দেশের নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। যখন কোনো দেশের সব পেশার অধিকাংশ মানুষ দক্ষতা, আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তখন সেই দেশ অবধারিতভাবে এগিয়ে যায়, উন্নত হয়। এ কারণে একটা দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো, কর্তব্য-কর্মে সে দেশের সব পেশার সিংহভাগ মানুষের সৎ, আন্তরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। আর এসব মানুষ বা পেশাজীবী তৈরি হয় সুপরিকল্পিত, চাহিদাভিত্তিক এবং দূরদর্শী শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে। ফলে যেকোনো জাতির সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের পেছনে থাকে তার উন্নত ও টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনুন্নত রেখে কোনো দেশ উন্নত হয়েছে—পৃথিবীতে এমন কোনো নজির নেই।

কিন্তু ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন জাতি তার জাতীয় উন্নয়নে শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো ভূমিকা উপলব্ধি করে না; সুশিক্ষার গুরুত্ব তাদের চোখে পড়ে না। তারা ভাবে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সেতু তৈরি করেন না, বিমান চালান না, মানুষের চিকিৎসা করেন না, বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন না, হালচাষ করেন না, রাস্তাঘাট বানান না, মিল-কারখানা চালান না, আসামি ধরেন না, জেলে পাঠান না—এক কথায় তারা এমন কোনো কাজ করেন না, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সচল রাখার জন্য অপরিহার্য।

হয়তো এ রকম অপরিণামদর্শী ভাবনা আর সরল সমীকরণের কারণে বিভিন্ন সরকারের আমলে দেশে শিক্ষা খাত পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। শিক্ষা কমিশন গঠন হয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গভাবে তার সুপারিশ কখনো বাস্তবায়ন হয়নি; সরকার আগ্রহ দেখায়নি। বর্তমান সরকার নানা খাত ও পেশার মানোন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সরকার দুই দফায় এখন পর্যন্ত ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়নি।

দেশ সংস্কার করতে চাইলে দেশের বিভিন্ন সেক্টর বা খাতের সংস্কার করতে হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিভিন্ন খাতকে সংস্কারের আলোকে পরিবর্তন করবেন যেসব পেশাজীবী, তারা তো আগে মানুষ, তারপর পেশাজীবী। পেশাজীবী হয়ে ওঠার আগে এসব মানুষকে মৌলিক ও পেশাগত জ্ঞান ও যোগ্যতার অধিকারী হতে হয়, যার ভিত্তি রচিত হয় বিভিন্ন শিক্ষায়তনে। এসব মানুষকে যদি আগে সংস্কার করা না যায়, তাহলে নানা খাতের এসব সংস্কার কি আদৌ সম্ভব হবে?

এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করবেন যারা, তাদের মধ্যে আগে সংস্কারের মানসিকতা ও যোগ্যতা ধারণ ও লালন করার দৃষ্টিভঙ্গি আগে গঠন করতে হবে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক পরিবর্তন তখন আসবে, যখন সেই প্রতিষ্ঠানের মানুষগুলো আগে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হবে। এজন্য আগে দরকার শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, যার মাধ্যমে সংস্কারের নিয়ামক বা মানুষগুলোর আগে সংস্কার হবে। মানুষ সংস্কার না হলে কোনো সংস্কারই বাস্তবে রূপ নেবে না, স্থায়ী হবে না—মাঝখান থেকে সময়, অর্থ ও রিসোর্স বা সম্পদের অপচয় হবে।

এক্ষেত্রে আমরা জাপানের পরিবর্তনের বিষয়টা বিবেচনায় নিতে পারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পৃথিবীর অন্যতম দুর্ধর্ষ ও নৃশংস জাতি হিসেবে কুখ্যাতি লাভ করে। কিন্তু এখন তারা পৃথিবীর অন্যতম উন্নত ও ভদ্র জাতি হিসেবে সুবিদিত। তাদের এ কুখ্যাতি থেকে সুখ্যাতিতে রূপান্তরটা এমনি এমনি সংঘটিত হয়নি। এটা রাতারাতিও ঘটেনি। বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান প্রথমে তার মানুষগুলো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়।

বয়স্ক শিক্ষিত মানুষ সাধারণত পরিবর্তিত হয় না। তাই বয়স্ক শিক্ষিত মানুষকে পরিবর্তন করে নিয়ে, তাদের দিয়ে প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও দেশ পরিবর্তন করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। এ বিশ্বাস থেকেই হয়তো জাপান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চালক বা শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষিত নাগরিকে রূপান্তরের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেয়। একটা উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা কাজটি সম্পন্ন করে। আমেরিকান মডেল অনুসরণে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়। শিক্ষাক্রম থেকে সম্রাটপূজা ও সামরিকতাবাদ বাদ দিয়ে গণতন্ত্র, শান্তি, সহযোগিতা, নৈতিকতা, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক জ্ঞান ও দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নয় বছর পর্যন্ত বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা করে।

ছেলেদের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের শিক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেয়া হয়। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সদাচরণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। শিশুদের আত্মনির্ভরশীল, গণতান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন, সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। উচ্চশিক্ষায় দেশের বাস্তব চাহিদার নিরিখে গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। ফলাফলটা রাতারাতি পাওয়া যায়নি। তবে তাদের ধৈর্য ও দূরদর্শিতা ছিল। তাই তৎক্ষণাৎ পরিবর্তন না এলেও সামনের দিনে যে পরিবর্তন আসবে—এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিল; ফলও পেয়েছে।

আমরা কেন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারি না? আমাদের দূরদর্শিতা, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসার ঘাটতি আছে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের সন্তানরা সাধারণত ব্রিটিশ বা আমেরিকান বা অন্য দেশের কারিকুলামে পড়াশোনা করে। ফলে দেশের আপামর জনগণের সন্তানদের জন্য যে শিক্ষা ব্যবস্থা, সেটা পরিবর্তনে তাদের মধ্যে হয়তো কোনো মমত্ববোধ কাজ করে না।

আমরা আবার সব সময় তাৎক্ষণিক জনতুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি, হাতে হাতে ফল চাই। আজকে পদক্ষেপ নিলাম, কাল বাজেট বরাদ্দ করলাম। কিন্তু ফলাফল আসবে ১০ বা ১৫ বছর পর; তা হবে না। ফলে আমরা শিক্ষা ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে পারি না। শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে দেশকে পরিবর্তন করা অসম্ভব। আর শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তনের পদক্ষেপ নিলে তার ফলাফল দৃশ্যমান হতে ১০ বা ১৫ বছর সময় লাগবেই।

কিন্তু ক্ষমতাসীন দল বা সরকার হয়তো ভাবে, ১০-১৫ বছর পর তো তারা সরকারে থাকবে না। তাই যে কাজ করলে এখনই জনগণ ফল দেখতে পারবে, ভোটের মাঠে আগামীকালই দলের পক্ষে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেসব খাতেই শুধু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়। আমাদের দূরদৃষ্টি না থাকায়, আমরা শুধু আজকালের কথা ভাবতে পারি—দূরের দৃশ্য দেখতেও পারি না, ভাবতেও চাই না।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। যদি আজই কলকারখানা, গাড়িঘোড়া, অফিস-আদালত, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, রাস্তাঘাট, দোকানপাট, হাসপাতাল ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় সেবা ও ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে আজই আমরা তার ফল টের পাব। আমাদের সবকিছু অচল হয়ে পড়বে। এ কারণে আমরা এসবের গুরুত্ব বুঝতে পারি এবং শুধু এসব খাতকেই অগ্রাধিকার দিই। ক্ষীণদৃষ্টির অধিকারী হওয়ায় আমরা শুধু আগামীকালের সমস্যা, চাহিদা ও সুবিধার দিকটা দেখতে পাই, ১০-২০ বছর পরের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আলো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।

আগামী পাঁচ-ছয় বছরের জন্য যদি সব স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়, তাহলে কী হবে? তাৎক্ষণিকভাবে আমরা তেমন কোনো সমস্যার সম্মুখীন হব না। সবকিছুই ঠিকঠাক চলবে। শুধু শিশুরা লেখাপড়া শিখবে না। তারপর? ১০-২০ বছর পর কী হবে?

তখন আমাদের শিক্ষিত ও দক্ষ জনবলের সংকট শুরু হবে, দেশ অচল হতে শুরু করবে। অর্থাৎ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার ফলটা দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে ১০-২০ বছর। একইভাবে আমরা যদি সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করি, তাহলে তার ফলাফল পেতেও আমাদের ১০-২০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এ ১০-২০ বছর অপেক্ষা করার ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস আমাদের নেই। দেশ ও জনগণের প্রতি সেই প্রতিশ্রুতি ও মমত্ববোধও আমাদের নেই।

উন্নত দেশ গড়তে হলে আগে চাই উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা। আর উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে চাই বাস্তবভিত্তিক জাতীয় চাহিদা নিরূপণ, পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ ও তার সদ্ব্যবহার। আমরা খারাপ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সাধারণত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বদনাম এবং শিক্ষকদের গালমন্দ করার মাধ্যমে আমাদের দায় সারতে চাই, সমস্যার উৎস বা মূলে প্রবেশ করতে চাই না। তাই আমাদের সংকটও যায় না।

ইউনেস্কোর সুপারিশ হলো, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪—৬ শতাংশ ব্যয় করা উচিত। উন্নত দেশগুলো সেটাই করে। কিন্তু বিশ্বের যে ১০টি দেশ অর্থনীতির আকারের তুলনায় শিক্ষা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেয়, বাংলাদেশ তার অন্যতম। শিক্ষা খাতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যয় সর্বনিম্ন। শিক্ষা খাতে ভুটান ব্যয় করে জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারত ৪ দশমিক ১ থেকে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, আফগানিস্তান ৪ দশমিক ১ শতাংশ, পাকিস্তান ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ১ দশমিক ৯ থেকে ২ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় করে।

এটা সত্য যে বাংলাদেশ নানা সংকটে জর্জরিত, আমাদের অর্থনীতি এখনো যথেষ্ট সবল নয়। আমরা চাইলেও সব খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে পারব না। তাহলে আমাদের করণীয় কী?

যদি কারো সামনে পাঁচটা সমস্যা থাকে আর মাত্র দুটি সমস্যা সমাধানের সম্পদ বা সামর্থ্য থাকে, তাহলে তিনি কী করবেন? অবশ্যই যে দুটি সমস্যা সব থেকে জরুরি, সে দুটিকেই অগ্রাধিকার দেবেন। একইভাবে দুর্বল ও অকার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করা যেকোনো দেশের জন্য সব চেয়ে জরুরি সমস্যা। শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করতে না পারলে দেশের কোনো খাতেরই উন্নয়ন সম্ভব হবে না। কারণ সব খাতের যারা নিয়ন্ত্রণকারী বা চেঞ্জমেকার, তারা তৈরি হন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে। ফলে সত্যিকার অর্থে, দেশ পরিবর্তন করতে চাইলে আগে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।

ড. মো. মুনিবুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক

ইংরেজি বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও