আলোকপাত

উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা

বিশ্বপরিমণ্ডলে একসময় ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশ বলে পরিচিত বাংলাদেশ আজ আবির্ভূত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচন করে একটি উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্র হওয়ার পথে জোরেশোরে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে জয়লাভের পর বাংলাদেশের শাসনভার নিজের কাঁধে নিয়ে যে শান্তি ও প্রগতির রাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু

বিশ্বপরিমণ্ডলে একসময় ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশ বলে পরিচিত বাংলাদেশ আজ আবির্ভূত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচন করে একটি উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্র হওয়ার পথে জোরেশোরে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে জয়লাভের পর বাংলাদেশের শাসনভার নিজের কাঁধে নিয়ে যে শান্তি ও প্রগতির রাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছেন সামনে। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ বিশ্বশান্তির পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এ অমোঘ নীতি এখনো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র। এ মূলমন্ত্রের ওপর ভর করেই সব বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। তার শাসনামলের প্রতিটি পদে রচিত হচ্ছে সফলতার ইতিহাস। শেখ হাসিনা সরকারের বিগত ১৩ বছরে অজস্র কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ শুধু এ দেশের দূরদর্শী কূটনৈতিক নেতৃত্বের কারণে।

বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির দুটি ফোকাসিং পয়েন্ট হলো ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি এবং পাবলিক ডিপ্লোমেসি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও ব্যাপক প্রয়োজন। আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ এ বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই অগ্রসর হচ্ছে সামনে।

দুই. শেখ হাসিনার বর্তমান শাসনামলে অর্থনৈতিক কূটনীতির কার্যক্রম আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে। এর বড় প্রমাণ, গত এক বছরে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ ৬৮ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশের সমকক্ষ দেশগুলোর কেউই সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ আহরণে এমন সাফল্য পায়নি। এ দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির মূল লক্ষ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেয়া ‘ভিশন-২০২১’ ও ‘ভিশন-২০৪১’ অর্জনে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট, প্রবাসীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরো গতিময়, গুণগত উত্কর্ষ সেবাদানের মাধ্যমে সবার আস্থা অর্জন করা। এসব লক্ষ্য সামনে রেখে পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি।

অন্যদিকে পাবলিক ডিপ্লোমেসির উদ্দেশ্য হলো সামাজিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর সন্ত্রাস দমনে সরকারের অভাবনীয় সাফল্য এবং বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ ও শেখ হাসিনার ভিশনগুলোকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা। যাতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ পরিবর্তিত হয় এবং বিশ্ববাসী জানে বাংলাদেশ আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয় বরং বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশই হচ্ছে সর্বোত্কৃষ্ট গন্তব্য। কারণ, বাংলাদেশের রয়েছে গতিশীল ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি। অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের পর রিটার্ন আসে দ্রুত। অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশের রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট তুলনামূলক ভালো অবস্থানে। বিদেশে প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে, বিদেশের বিভিন্ন নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকে সম্পৃক্ত করে, সে দেশের সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে বাংলাদেশের সাফল্যের কাহিনী প্রচার করে উন্নত ভাবমূর্তি অর্জন মূল লক্ষ্য। এ কাজটি করার জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি মিশনে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ চালু হয়েছে। যেমন একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জানা ও বোঝার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশনের বাইরে ‘ইউএসআইএস’ প্রতিষ্ঠান ছিল, যারা মার্কিন জীবনধারা, তাদের ইতিহাস, তাদের অর্জন এবং তাদের গুণাবলি তুলে ধরত। ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ একইভাবে বাংলাদেশের অর্জন, বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার অর্জনে ত্যাগ, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগের সুযোগ ও পরিবেশ, উন্নত অবকাঠামো, বিশাল কর্মক্ষম ও দক্ষ যুবসমাজ, আইটি ক্ষেত্রে সক্ষমতা ইত্যাদি অর্থাৎ বাংলাদেশকে সম্ভাবনার অর্থনীতি হিসেবে বহির্বিশ্বে জানান দেয়া। নাগরিকদের সৃষ্টিশীলতা ব্যবহার করে দেশের কাজে লাগানো। প্রবাসীরা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন বৈকি।

এর সঙ্গে জরুরি বিষয়টি হলো আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা। দেশের অভ্যন্তরীণ অথবা বাইরের যেকোনো বৈরিতা মোকাবেলা করে দেশ এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ কোনো অঞ্চল একবার অস্থির হয়ে উঠলে সেই এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়, সে সমাজের শান্তি নষ্ট হয়। যার প্রভাব পড়ে অন্য সমাজ ও অন্য দেশেও। একটি শান্তিপূর্ণ দেশের স্থিতিশীল অবস্থাও নষ্ট হতে পারে পাশের দেশের অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে। আঞ্চলিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার মানসিকতা না থাকলে কোনো দেশের একার পক্ষে উন্নয়নের সুফল ভোগ সম্ভব নয়। তাছাড়া আমাদের উন্নয়নের অর্জন ধরে রাখতে এবং টেকসই করতে প্রয়োজন আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা। এ কারণে সবসময়ই বাংলাদেশ বৈরিতার নীতি পরিহার করে চলছে। বঙ্গবন্ধু প্রদর্শিত সবার সঙ্গে সুসম্পর্কের নীতিই এখনো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল বক্তব্য। এর ওপর ভর করেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক অঙ্গনে অর্জিত হয়েছে অভূতপূর্ব সব সাফল্য। এর সুফল হিসেবেই ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত স্থল ও সমুদ্রসীমা শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পন্ন হয়েছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারত স্থলসীমানা চুক্তি ১৯৭৪-এর প্রটোকল স্বাক্ষর এবং ২০১৫ সালে স্থলসীমানা চুক্তির অনুসমর্থন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সুদীর্ঘ চেষ্টারই সুফল। ইন্সট্রুমেন্ট অব রেটিফিকেশন এবং লেটার অব মোডালিটিস স্বাক্ষরের মাধ্যমে তত্কালীন ১১১টি ভারতের ছিটমহল বাংলাদেশের এবং আমাদের ৫১টি ছিটমহল ভারতের অংশ হয়ে যায়। ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে এর আগে নাগরিকত্বহীন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব লাভ করে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসৃত হচ্ছে দেশের পররাষ্ট্রনীতি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে সুনির্দিষ্ট ভিশন নির্ধারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বিশ্বের তালিকায় উন্নীত করার লক্ষ্যে রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর আলোকে কার্যকর ও যুগোপযোগী নীতি গ্রহণ এবং কার্যক্রম পরিচালনা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের নীতি ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপগুলো বিদেশী কূটনৈতিক মিশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম, সভা ও সেমিনারে তুলে ধরছে। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করেছে আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক চেষ্টা জোরদারের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান সরকারের দক্ষ নেতৃত্বে বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রফতানি আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রায় ১১ বিলিয়ন থেকে ৫২ বিলিয়নে উন্নীত হয়েছে।

শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব ও সফল কূটনৈতিক তত্পরতার ফলে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সমুদ্রসীমা নির্ধারণসংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি হয়। ঐতিহাসিক এ নিষ্পত্তিতে বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিরোধ নিরসনে বিরল এ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানে উপনীত হওয়ার এ নীতি আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত করেছে। এ রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় সম্ভাবনাময় সব সম্পদ আহরণের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ২০১৮ সালে ভারত ও চীনের সঙ্গে ‘ব্লু ইকোনমি’ এবং ‘মেরিটাইম খাতের মান উন্নয়নে সহযোগিতা’ বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সে সঙ্গে এ বিশাল জলরাশিতে যেসব সম্পদ রয়েছে তার সঠিক ব্যবহারের জন্য (ডেল্টা-২১০০) ১০০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

তিন. বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম কারণ হলো দেশের বর্তমান স্থিতিশীল রাজনীতি। সুদীর্ঘ ১৩ বছর সব ঝড়ঝঞ্ঝা মোকাবেলা করে শক্ত হাতে দেশ চালাচ্ছেন শেখ হাসিনা। তার যোগ্য ও সুকৌশলী নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অস্থিতিশীলতা একটা জাতিকে কতটুকু পিছিয়ে দিতে পারে, তার বর্তমান উদাহরণ আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইয়ামেন কিংবা লেবানন। এ দেশগুলোর জনজীবন ও উন্নয়ন এখন বাধাগ্রস্ত। শান্তি ও স্থিতিশীলতায় ভাটা পড়লে উন্নয়ন ব্যাহত হয়। আমাদের দেশেও এর প্রমাণ রয়েছে। পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কারণে বাংলাদেশ ৩০ বছরের জন্য পিছিয়ে পড়ে। বাংলাদেশ যে চারটি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সে দর্শনের অন্যতম একটি হলো গণতন্ত্র, যা ধ্বংস হয়ে গেল ১৫ আগস্টের ভোর রাতে। গণতন্ত্র হয়ে গেল সামরিক গণতন্ত্র। তার সঙ্গে মানুষের দোরগোড়ায় গুণগত উন্নত সেবা পৌঁছে ছদ্মাবরণের দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার যে ‘জেলায় জেলায় জেলা সরকার’ প্রবর্তন করে, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। ফলে জনগণের সব ধরনের সেবা পাওয়ার জন্য এখনো মানুষকে কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। যদিও বর্তমান সরকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আন্তরিক হয়ে কাজ করছে। সামরিক শাসন একা চলতে পারে না। যখনই তার সঙ্গে প্রহসনের নির্বাচনের মতো গণতন্ত্রের সংমিশ্রণ ঘটানো হয়, তখন তা এতই বিপজ্জনক হয়, একটা রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশের অবস্থাও হয়ে পড়েছিল সে রকম। সে অবস্থা থেকে উত্তরণে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বহু বাধা পেরিয়ে আজ বর্তমান অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। যেকোনো সংগঠন, প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূল ভিত্তি স্থিতিশীলতা। সেই স্থিতিশীলতা আসে জনগণের মৌলিক শিক্ষা, দেশপ্রেম, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যমে। শেখ হাসিনার সরকার এর প্রতিটি বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে সামনে।

স্থিতিশীল রাজনীতি একটি দেশকে কেমন করে উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এশিয়ার অন্যতম দেশ মালয়েশিয়া। ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে দেশটি। মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশ। যার মোট আয়তন ৩ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার। মোট ১৩টি প্রদেশ এবং তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চল নিয়ে গঠিত এ দেশের জনসংখ্যা ৩২ দশমিক ৭ মিলিয়ন। মাথাপিছু আয় ১২ হাজার ১৫০ মার্কিন ডলার। ২০২০ সালে উন্নত রাষ্ট্র ঘোষণা করার টার্গেট অর্জন করতে সক্ষম না হলেও ২০৩০ সালে উন্নত রাষ্ট্র ঘোষণা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। চীন, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ড এর জল ও স্থল সীমান্তঘেরা মালয়েশিয়ার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রয়েছে শক্তিশালী অবস্থান।

মাহাথির মোহাম্মদ যেদিন মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, সেদিন দেশটি ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র। তখন তার মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১৩০ ডলার। জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। মুল্যস্ফীতির হার ছিল ২৫ শতাংশ। শিক্ষিতের হার ছিল ২০ শতাংশ। জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ ছিল শহরবাসী ও শিল্পনির্ভর। কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছরের শাসন শেষে মাহাথির যেদিন স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়েন, সেদিন দেশটির মাথাপিছু আয় ছিল ৩ হাজার ৩৩০ ডলার। শিক্ষিতের হার ৯৯ শতাংশ। পুরুষদের গড় আয়ু ৭১ বছর, নারীর ৭৬ বছর। ১৯৮১ সালের ১৬ জুলাই ৫৫ বছর বয়সে ডা. মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একটানা ২২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ৭৭ বছর বয়সে ২০০৩ সালের ৩১ অক্টোবর স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ও রাজনীতি থেকে বিদায় নেন। একটি পক্ষ সব দেশেই থাকে, যাদের কাজ শুধু সমালোচনা করা। কিন্তু উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে সবসময় সব সমালোচনা গায়ে মাখলে চলবে না। নিজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক রেখে দৃঢ়ভাবে পথ চলতে হবে, মাহাথিরের দীর্ঘ শাসন মূলত এ  জিনিসটাই দেখিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে।

স্থিতিশীল রাজনীতির সুফল ভোগকারী আরেকটি ছোট্ট দেশ সিঙ্গাপুর। এশিয়ার ‘চার বাঘ’খ্যাত ছোট দেশগুলোর একটি সিঙ্গাপুর। বাকি তিন দেশ হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান। সম্প্রতি বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অর্থনীতির র্যাংকিংয়ে সিঙ্গাপুর যুক্তরাষ্ট্র ও হংকংকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিজনেস স্কুল আইএমডির র্যাংকিং এমনটা জানাচ্ছে। একেকটি দেশ টেকসই প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং নাগরিকদের কল্যাণ কর্মসূচি বৃদ্ধির পরিবেশ কতটা নিশ্চিত করতে পারছে, তা বিশ্লেষণ করে এ ক্রম সাজানো হয়ে থাকে। র্যাংকিংয়ের শীর্ষে সিঙ্গাপুরের উঠে আসার পেছনে দেশটির সরকারের স্থিতিশীলতা, উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিকের প্রাপ্যতা, অনুকূল অভিবাসন আইন এবং নতুন নতুন ব্যবসার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ কাজ করেছে। প্রশ্ন হলো সিঙ্গাপুরের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি অতিক্ষুদ্র দেশ যেখানে কাদা আর সমুদ্রের খোলা আকাশ ছাড়া কিছুই ছিল না সেটা অর্থনৈতিকভাবে এত উচ্চতায় উঠে এল কীভাবে?

সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় দলটি হলো পিপলস অ্যাকশন পার্টি। ১৯৫৪ সালে একটি ছাত্রসংগঠন থেকে স্বাধীনতাপন্থী এ দলের জন্ম হয়েছিল। দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি টানা তিন দশক সরকারপ্রধান ছিলেন। দীর্ঘ তিন দশকের শাসনামলে নিজের চেষ্টা ও যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে এক প্রজন্মেই সিঙ্গাপুরকে তৃতীয় বিশ্ব থেকে প্রথম বিশ্বে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এ কারণে তাকে জাতির স্থপতি বলা হয়। লি কঠোরভাবে ও সুশৃঙ্খলভাবে একদলীয় শাসন ধরে রেখেছিলেন। স্থিতিশীল একদলীয় শাসন দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মসৃণভাবে এগিয়ে নিতে পেরেছিলেন। যেভাবে লি একক হাতে দেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন, তা যদি বারবার হাত বদল হতো, তা কখনোই সম্ভব হতো না হয়তো। এখনো তার ছেলে শক্ত হাতে দেশকে বিশ্বের অভাবনীয় সাফল্যের দেশে পরিণত করে চলেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম উন্নত দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির মানুষের বর্তমান মাথাপিছু আয় ৩৭ হাজার ৪৯৭ মার্কিন ডলার। জিডিপির আকার ৪২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আধুনিক এ আরব আমিরাতের রূপকার ছিলেন শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। বর্তমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উন্নয়নের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি তার সুদীর্ঘ ১৮ বছরের শাসনামলে। ২০০৪ সালে দেশটির প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণ করে ২০২২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ দীর্ঘ সময়ে দেশকে ঢেলে সাজিয়েছেন ইচ্ছামতো। স্থিতিশীল রাজনীতির সুফল ভোগকারী অন্য দুটি দেশ হলো কম্বোডিয়া ও রুয়ান্ডা। রুয়ান্ডাকে বর্তমানে বলা হয় সিঙ্গাপুর অব আফ্রিকা। বিগত দুই দশকে রুয়ান্ডার অর্থনীতি ব্যাপক উন্নত হয়েছে। বিশেষ করে দেশটি শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে। একসময় যে রুয়ান্ডার মানুষ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে নিয়মিত লড়াই করত, ঔপনিবেশকদের সৃষ্টি জাতিগত বিভেদ; হুতি ও তুিসর আত্মঘাতি আত্মহত্যার কারণে ভবিষ্যৎ ছিল অন্ধকার, তারা এখন স্বপ্ন দেখছে উন্নত ও আধুনিক জীবনের। রুয়ান্ডার মানুষকে এ স্বপ্ন দেখিয়েছন দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট পল কাগামী বস্তুত ১৯৯৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এখনো দেশটি শাসন করছেন। তার এ দীর্ঘ ২৬ বছরের শাসনে (উপরাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রপতি) পুরো চেহারাই বদলে গেছে রুয়ান্ডার অর্থনীতির। মানুষের আয় যেমন বেড়েছে, বেড়েছে জীবন যাত্রার মানও। অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনের পথে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে রুয়ান্ডা। কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে একই রকম চিত্র। দেশটির প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ১৯৯৮ সাল থেকে এখনো দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। কম্বোডিয়ার অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তার দীর্ঘ ও স্থিতিশীল শাসনামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কম্বোডিয়ার অর্থনীতি। [চলবে]

 

ড. এ কে আব্দুল মোমেন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

আরও