আলোকপাত

দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে কিছুটা স্বস্তি দেয়া আশু কর্তব্য নতুন সরকারের

সদ্যসমাপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবারের মতো বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে। করুণাময়ের কাছে শেখ হাসিনার কৃতজ্ঞতা অবশ্যই আছে, যেমন কবির কথায় ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ এমনি লীলা তব/ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব।’ এরই মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ শপথ নিয়েছে যার মধ্যে চমক আছে

সদ্যসমাপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবারের মতো বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে। করুণাময়ের কাছে শেখ হাসিনার কৃতজ্ঞতা অবশ্যই আছে, যেমন কবির কথায় ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ এমনি লীলা তব/ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব।’ এরই মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ শপথ নিয়েছে যার মধ্যে চমক আছে সত্যি তবে বাস্তবতা এই যে তাদের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী হওয়া কোনোভাবেই অপরাধ নয়, তবে বিগত সরকারের সময় ব্যবসাবান্ধব নীতিমালার জায়গায় ব্যবসায়ীবান্ধব নীতিমালার কারণে জনগণকে ভুগতে হয়েছে। 

এবারের জাতীয় নির্বাচনে বড় চমক এই যে ৬২টি আসন দখল করে ক্ষমতাসীনদের পর সবচেয়ে বেশি জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তবে শেষমেশ ভোটের মাঠ ছেড়ে দেয়ার সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ২৬টি আসনে সমঝোতায় গিয়ে জয় পেয়েছে মাত্র ১১টি আসনে। অক্কা না পেলেও দলটি মনে হচ্ছে বড় ধরনের ধাক্কা খেল। বিজিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে চাউর আছে। আর তাই এক অর্থে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ হতে যাচ্ছে মূলত পুরোপুরি আওয়ামী লীগনির্ভর একটি সংসদ।

দুই.

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আমেরিকা ও ইউরোপ চেয়েছিল নানাভাবে নাক গলাতে; জিওপলিটিকস নামে এ অঞ্চলে প্রভাব প্রসারণে শুরুতে শক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিসা নীতি সামনে এনে সরব থাকলেও শেষ পর্যন্ত বরফ গলাতে পারেনি বলে বোধ হয় সরে পড়েছে। শেখ হাসিনার বাংলাদেশ প্রেম ও সাহসীক মনোভাবের কারণে বড় বড় জাহাজ তার দলের নৌকা ডোবাতে কেন দোলাতেও পারেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আয়নায় নয়, বরং স্থানীয় বাস্তবতার আলোকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করেছে। 

আপাতত থাক সে কথা। কথায় বলে শেষ ভালো যার সব ভালো তার। কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সার্বিক বিবেচনায় দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অপেক্ষাকৃত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করলে অযৌক্তিক হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া বিদেশী পর্যবেক্ষকদের মতামত অনেকটা সে রকমই। কেন্দ্র দখলের অপচেষ্টা কিংবা প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে বের করে দেয়া কিংবা হুমকি-ধমকির খবর শোনা গেছে, তবে সেসব ঘটনা ব্যাপক এবং বহু বিস্তৃত নয়। ভোটারের উপস্থিতির হার যেমনটি ভাবা হয়েছিল তেমন না হলেও আশাব্যঞ্জক ৪০ শতাংশ। যা-ই হোক ৪০-কে যে ৬০ দেখানো হয়নি অন্তত সেই অভিযোগ থেকে নির্বাচন কমিশন মুক্ত বলে আমরা মনে করি। তবে বাংলাদেশের নির্বাচন যে টাকা, অস্ত্র আর পেশির খেলা, সে অপবাদ থেকে বের হতে পারেনি সদ্যসমাপ্ত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনও। অর্থাৎ আমাদের নির্বাচনে টাকার অবস্থা পাকা, আর তাই রাজনীতি করে ব্যবসা করতে হবে অথবা ব্যবসায়ী হয়ে নমিনেশন নিতে হবে—এমন অবস্থা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। 

তিন.

বর্তমান নিবন্ধটি অবশ্য সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনের কোনো মূল্যায়ন নয়, যদিও প্রান্তিক সমালোচনামূলক আলোকপাত করা হয়েছে। এ লেখার মূল উদ্দেশ্য নির্বাচিত সরকারকে অব্যবহিত সময়ে কী কী বিষয়ে জরুরি নজর দিতে হবে তা নিয়ে ভাবনাচিন্তার ছিটেফোঁটা চিত্র তুলে ধরা। এর মধ্যে আছে বড় বড় চ্যালেঞ্জ যার জন্য দরকার হবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিপ্রসূত নির্ভীক ও নিরপেক্ষ কঠোর পদক্ষেপ এবং ছোটখাটো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকার যথাযথ নীতিমালা।

মোটাদাগে অর্থনীতিতে এখন তিনটি সমস্যা আছে বলে বিজ্ঞজনদের ধারণা। এগুলো হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা ও আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা। নতুন সরকার এসে সামষ্টিক অর্থনীতির যেসব সূচকে নজর দিতে হবে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মূল্যস্ফীতি, রফতানি ও প্রবাসী আয়, ব্যাংক খাত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদেশী ঋণ, রাজস্ব আয় ইত্যাদি। নতুন বছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ে বড় চিন্তায় থাকতে হবে নীতিনির্ধারকদের। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, মূল্যস্ফীতি কিছুতেই ৯ শতাংশের নিচে নামছে না। বাজারেও ভোগ্যপণ্যের দাম খুব একটা কমেনি। গত মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। আর চার মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘খাদ্যনিরাপত্তা’-সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাবারের ক্রমবর্ধমান দাম দেশের ৭১ শতাংশ পরিবারের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বরং সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশে এখন মোট পরিবার বা খানার সংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মানলে, খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তা ২ কোটি ৯০ লাখের বেশি পরিবারের জন্য উদ্বেগের বিষয়। অতএব মূল্যস্ফীতির চাপে নাকাল বিশেষত দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে কিছুটা স্বস্তি দেয়া আশু কর্তব্য নতুন সরকারের। 

চার.

নবনির্বাচিত সরকারকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে যে মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল এক্সপ্রেসওয়ে এসব ছাপিয়ে ক্রমবর্ধিষ্ণু ব্যাপক দুর্নীতি উন্নয়নের উচ্ছ্বাস ম্লান করে দিচ্ছে। এন্তার অভিযোগ যে মাত্র গুটিকয়েক পরিবার দেড়-দুই লাখ কোটি টাকা পাচার করেছে কেবল গত ক’বছরেই। দুর্নীতির দাপট দেশের ভেতর হেড টু ফুট এমন সরকারি দপ্তর নেই যেখানে অবৈধ অর্থের সংযোগ নেই। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে উন্নয়ন আর দুর্নীতি সমার্থক হয়ে ধরা দিচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

গত আড়াই দশকের উল্লম্ফিত এবং ত্বরান্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সমাজে বৈষম্য বেড়েছে বহু গুণ। অথচ একটা ন্যায়সংগত সমাজ বিনির্মাণ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৈষম্যকে উসকে দেয় কথাটা সত্যি, তাই বলে তা সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হলে সমাজে অস্থিতিশীলতা অবশ্যম্ভাবী এবং অবশ্যম্ভাবী অস্থিতিশীলতা নিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনো টেকসই হয় না। বৈষম্যের কারণে শুধু যে ব্যক্তি বঞ্চিত হয় তা নয়, পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন কেউ ঋণ না পেলে ঋণ ব্যবহার করে যে অতিরিক্ত উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকে তা রহিত হয়, বঞ্চিত হয় জাতি।

ব্যাংক খাতের ‘চিরন্তন’ সমস্যা খেলাপি ঋণ। গত বছরজুড়ে খেলাপি ঋণ ছিল লাগামছাড়া। সেই লাগামহীন খেলাপি ঋণ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বছর। দেশের ব্যাংক খাতে ২০২২ সালের শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা, যা বিদায়ী ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাংকের অর্থ ফেরত আনা যায় সেটা হওয়া উচিত অন্যতম উদ্বেগ। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের জন্য আর্থিক খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে প্রায়, একে উদ্ধার করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা আবশ্যক।

পাঁচ.

যথাযথ সুশাসন নিশ্চিত করে দুর্নীতি দূরীকরণ ও আর্থসামাজিক বৈষম্য হ্রাস বর্তমান নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকারে থাকবে বলে দেশের প্রতিটি মানুষ প্রত্যাশা করে। চোখ ধাঁধানো ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দ্রুত বর্ধনশীল দুর্নীতি ও বৈষম্যের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে এ-যাবৎকালের সব অর্জন বিসর্জন দিতে হতে পারে। সেই লক্ষ্যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সাপেক্ষে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব কর্মসূচি জাতীয় নির্বাচনের অজুহাতে আপাতত স্থগিত করে রাখা হয়েছিল। গত কয়েক দশক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যেমন দৃশ্যমান নয় তেমনি অনুপস্থিত যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। দুর্নীতি দমন ও আর্থসামাজিক বৈষম্য হ্রাসে জাতির কাছে অমর ও অক্ষয় হয়ে থাকার জন্য একটানা চতুর্থবারের মতো রেকর্ডধারী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আরো কঠোর এবং নির্মম হতে হবে। যিনি সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে পেরেছেন তিনি কেন সেই সাহসিকতার সঙ্গে দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠতে পারবেন না—সে প্রশ্ন জনমনে ছিল এবং এখনো আছে। এবারের সংগ্রাম হোক দুর্নীতির বিরুদ্ধে, এবারের সংগ্রাম হোক বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

সব অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে আমরা তার এবং তার সরকারের সর্বাত্মক সাফল্য কামনা করি। নিশ্চয় তিনি ভাবছেন, 

“The woods are lovely, dark and deep, 

But I have promises to keep, 

And miles to go before I sleep, 

And miles to go before I sleep.” (Stopping by Woods on a Snowy Evening

BY ROBERT FROST

আব্দুল বায়েস: সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

আরও