ষাটের দশকের প্রথমার্ধে যারা প্রথম শ্রেণীতে পড়েছেন এবং আমার মতো যাদের শিক্ষার মাধ্যম ছিল বাংলা ভাষা, তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীতে ওঠার অনিবার্য শর্ত ছিল বাংলা ও ইংরেজির সঙ্গে গণিতেও পাস করতে হবে।
গণিতের নিশ্চিত কয়েকটি প্রশ্নের একটি ছিল—অংক ও সংখ্যার তিনটি বা পাঁচটি করে উদাহরণ দাও। অংক হচ্ছে ১০টি আর সংখ্যার কোনো হিসাব নেই।
১, ২ ,৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ এবং ০—এই ১০টি হচ্ছে অংক, আর ১০ থেকে শুরু করে অনন্ত পর্যন্ত যা লিখব তাই সংখ্যা। আমার ‘অংক স্যার’ সংখ্যা কমানোর সহজ কায়দা শিখিয়ে ছিলেন—অন্তত দুটি অংক বসাবে, তারপর ১০টি বসালেও সমস্যা নেই, তবে শুরুতে শূন্য বসানো থাকে না। হাই স্কুলে এসে পাটিগণিতের সঙ্গে বীজগণিত ও জ্যামিতি পড়ালেও ‘অংক স্যার’ কখনো গণিতের স্যার হয়ে ওঠেননি। এমনকি ত্রিকোনোমিতি পড়ানো গম্ভীর ভীষণ রাগী সিদ্ধেশ্বর হালদারও ছিলেন আমাদের অংক স্যার। অংক স্যারকে বিএসসি হতেই হয়। ইংরেজিতেও যখন একটু পেকে উঠতে শুরু করি, তখন শিখি ‘ফ্রম ওয়ান টু জিরো’—এই ১০টা হচ্ছে ডিজিট। দুনিয়ার বাদবাকি সব সংখ্যা। ডিজিটের আরো একটি মানে আছে—আঙুল। তারপর বহু বছর পার হলো। বাস্তবে যাই হোক না কেন, সুযোগ পেলে আমিও দেশী ও ভিনদেশীদেরও শুনিয়ে দিই: আমরা কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়ে গেলাম। বক্তৃতায়-বিবৃতিতে যাই বলা হোক না কেন, বাস্তবের ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার বিকল্প কিছু নেই।
বাংলা একাডেমির ইংরেজি থেকে বাংলা অভিধানে ডিজিটাল মানে অঙ্গুলিসংক্রান্ত অথবা সংখ্যাঘটিত। অংকঘটিত নয়। অংকঘটিত হলে সমস্যা ছিল, তখন অনুবাদে দাঁড়ায় আংকিক বাংলাদেশ।
অংকীয় বাংলাদেশ।
বাংলা একাডেমির বাংলা থেকে ইংরেজি অভিধানে অংক ইংরেজি ডিজিট ও নাম্বার উভয়েই জায়গা করে নিয়েছে; অংকের রোমান্টিক ব্যাখ্যায় অংকলগ্ন নারী কোলে বসা; স্ত্রী বা মিসট্রেস; অংকময়িনী তো বটেই। অক্সফোর্ডের অগ্রগামী শিক্ষার্থীর যে অভিধান, তাতে ডিজিট মানে এক থেকে শূন্য পর্যন্ত ১০টির যেকোনো একটি। তাতে আঙুলও বাদ পড়েনি। তবে ডিজিটালের যথার্থ মানে লিখেছে: ০ এবং ১ দুটি অংকের ব্যবহারে তথ্য আদান-প্রদানের ইলেকট্রিক সিগন্যাল সৃষ্টির প্রক্রিয়া।
অংক না সংখ্যা—নিষ্পত্তি পরে হোক; একটা কথা স্বীকার করতেই হবে যে ইনাম আহমদ চৌধুরীর ‘সংখ্যা-লিপি-সংস্কার’ নামের সিঙ্গেল কলামের বড়জোর ৬ ইঞ্চি (প্রশংসা অংশটুকু বাদে) একটি লেখা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়াতেই তার প্রস্তাবনা সমর্থন করতে প্ররোচিত বোধ করছি।
সব ধরনের গবেষণা এবং সব আপেক্ষিক সত্য অংক ও সংখ্যার সমর্থনেই প্রতিষ্ঠিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে যতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, বাস্তবের গুরুত্ব তার চেয়ে অনেক বেশি।
আমার আলোচনার শুরুতে আরো কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই। একই ঘটনা হলেও আমি যেমন কেদারায় বসি না চেয়ারেই বসি, কম্পিউটারের ইঁদুর দাবড়াই না, মাউস চালাই, তেমনি জিজিটাল ডিজিটালই। এটার বাংলা বোঝানোর প্রয়োজন নেই, বোঝাতে হলে তা ডিজিটের ভাষাতেই হতে হবে। কম্পিউটার যে ভাষা বুঝে এবং ব্যবহার করে, তার ভেতর কোনো লেটার বা হরফ নেই, আছে দুটি মাত্র অংক: ০১০১০১০১০১০১...প্রয়োজনের তাগিদে এভাবেই চলতে থাকে। প্রথমটি জিরো, তারপর ওয়ান। জিরো ও ওয়ান আমার জন্য দুর্বোধ্য কিন্তু কম্পিউটারের জন্য একমাত্র বোধ্য ভাষাটির নাম মেশিন ল্যাঙ্গুয়েজ বা মেশিন কোড। এটাই হচ্ছে বাইনারি, একটি নিউমেরিক সিস্টেম। লাস ভেগাসের জুয়াড়ি আর ভ্যাটিকানের পোপের কাজ ও ভাষায় দুস্তর ব্যবধান থাকলেও দুজনের কম্পিউটার একই মেশিন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে। আমি যদি শূন্য এক শূন্য এক শূন্য এক...বলি, মেশিন কিন্তু ০০০০০০০০০০০০০০ মনে করবে না, তবে মেশিনে ০১০১০১০১০১০১ এভাবেই স্থাপন করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রথম শর্ত মাথার ওপর উপগ্রহের চক্কর নিয়ে গল্প করা নয়, কম্পিউটারের যৌক্তিক ভাষাটা বোঝা। ৩০ বছরে প্রযুক্তিজগতে কতটা পরিবর্তন ঘটেছে, তার একটি ছোট সংখ্যাভিত্তিক হিসাব দিই:
১৯৯০ সালে সেলফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন (জনসংখ্যার ০.২৫ শতাংশ)। ১৯৯০ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন (জনসংখ্যার ০.০৫ শতাংশ)। ২০২০ সালে সেলফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন (৬২ শতাংশ)। ২০২০ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন (৫৯ শতাংশ)। প্রযুক্তির মহাসড়কে লিপফ্রগের সুযোগ আছে। আমরাও খুব পিছিয়ে নেই। কয়টা ব্যাঙ লাফ দিয়ে আমরাও এগিয়েছি। আরো এগোতে পারতাম যদি প্রযুক্তির সংস্কৃতির সঙ্গে, প্রযুক্তির ভাষার সঙ্গে দ্রুত নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারতাম। যারা দ্রুত এই খাপ খাওয়ানোর কাজটা করতে পেরেছেন, তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছেন। আমাদের নিকট প্রতিবেশী হিন্দিভাষীরা ভালো পেরেছেন বলে বেঙ্গালুরুতে তারা সিলিকন ভ্যালি প্রতিষ্ঠা করেছেন। ভাষার শুদ্ধতার গোয়ার্তুমি সংস্কৃত, লাতিন, হিব্রু, ইডিশ এবং আরো কিছু ভাষাকে শেষ করে দিয়েছে। ভাষা টিকে থাকে, বিকশিত হয় তার চাহিদা ও অর্থমূল্যের ওপর। ভাষায়ও মূল্য সংযোজিত হতে হয়। গত ৫০০ বছরে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজিত হয়েছে ইংরেজিতে। এখন ইংরেজি যেখানে পৌঁছেছে, এমনকি ইংরেজদের ওপর নাখোশ পণ্ডিতজনরাও বলতে শুরু করেছেন, ইংরেজি তো ভাষা নয়, এটাই প্রযুক্তি। সুতরাং ইংরেজির ১০টা ডিজিট বাংলা ভাষার জন্য কবুল করে নিয়ে বাংলাকেও তো বিশ্ব প্রযুক্তির অংশীদার করে তোলা যায়। এ দেশটির মধ্যে দুটো আমরা বাংলা সংখ্যালিপির উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গেই কবুল করে নিয়েছি। একটি শূন্য (০), অন্যটি দুই (২); তিনটিও বলতে পারি, বাংলার চার (৪), আর ইংরেজির এইট (৮), একই রকম কিঞ্চিৎ স্থান পরিবর্তন করতে হবে, এই যা। বাকি সাতটির পরিবর্তন এবং চর্চামানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে একদিন। আর যারা শুধুই বাংলা সংখ্যালিপি চেনেন, তাদের ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ০-এর বদলে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ০ আত্মস্থ করতে লাগবে একদিন। একই দিনে সব ঘটতে পারে।
আমার আশঙ্কা ছিল, এক, দুই, তিনের বদলে আবার না ওয়ান, টু, থ্রি বলতে হয়। ইনাম আহমদ চৌধুরীর প্রস্তাব আমার আশঙ্কার পথে আদৌ এগোয়নি। তিনি চেয়েছেন লেখাগুলো ইংরেজি ডিজিট হলেও বলব বাংলায়—এক, দুই, তিন।
তাতে লাভ?
লেখার সময় শুধু চিহ্ন পরিবর্তন করলেই আমরা তাত্ক্ষণিকভাবে সংখ্যালিপিতে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পারি।
বাংলাদেশের যেসব নাগরিক চীন দেশের হাটবাজার সফর করেছেন, তারা দেখেছেন সামান্য লিখতে না জানা চীনা নারীদের হাতে হাতে করতলের চেয়ে বড় মাপের ক্যালকুলেটর এবং সেই ক্যালকুলেটরে চীনা ভাষার অংক কিংবা সংখ্যা নেই, যা আছে সবই ইংরেজির। আমাদের গ্রামীণ হাটেও ক্যালকুলেটর প্রবেশ করেছে। সেখানে দোকানি ১৫ টাকা দামের পাঁচটি দ্রব্যের দাম ক্যালকুলেটরে ১৫ী৫ টিপে সেভেন্টি ফাইভ টাকা বলেন না। বলেন পঁচাত্তর। কাজেই বাংলা ভাষার এতটুকু ক্ষতি না করে ইনাম আহমদ চৌধুরী প্রস্তাবিত বিষয়টি কিন্তু গ্রামবাংলায় বাস্তবায়িত হয়ে আসছে। এখন কেবল দরকার বাংলা ভাষার কথিত অভিভাবকদের সায়। এই উদ্যোগ বাংলা একাডেমিই নিতে পারে।
হাঁটুর অনেক নিচে নেমে আসা লম্বা পাঞ্জাবির যেসব বুদ্ধিজীবী এতে আপত্তি করতে পারেন, বাংলা ভাষায় তাদের স্টেইক অতি সামান্যই। তাদের সন্তানসন্ততি ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা করছেন (ব্যতিক্রম দু-একজন থাকবেনই), তবে তাদের নাতি ও নাতনি যে তাদের বাংলা বইয়ের নামতা পড়তে পারবেন না, এ ব্যাপারে সন্দেহ থাকার কোনো কারণ নেই।
যে আমলে আমার জন্ম, আমার ডিজিটাল ফোবিক হওয়ার কারণ রয়েছে। ইনাম আহমদ চৌধুরীর আরো বেশি হওয়ার কথা ছিল (আমি যখন স্কুলে প্রথম শ্রেণীর ছাত্র, মেধাবী এই মানুষটি তখন কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসের সদস্য হিসেবে তিন বছর চাকরি করে ফেলেছেন)। আমি অবাক হচ্ছি যে প্রস্তাবটি আসার কথা ‘ডিজিটাল নেটিভ’দের কাছ থেকে, কিন্তু তারা নিশ্চুপ, প্রস্তাব দিচ্ছেন অশীতিপর ইনাম আহমদ চৌধুরী। কিংবা ব্যাপারটা এমনও হতে পারে ডিজিটাল নেটিভরা বাংলা ভাষার অক্ষর ও সংখ্যা ব্যবহারই করেন না। এ নিয়ে ভাবেনও না।
পরিবর্তনশীল গতিময় পৃথিবীর সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়ানোর দায়িত্বটি আমাদেরই। নতুবা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিশ্ব এগিয়ে যাবে, আমরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইংরেজ, পাঞ্জাবি, এমনকি ক্ষমতাহারা রাজনীতিক দলগুলোকে দোষারোপ করতে করতে ভাষার দুরবস্থা অবলোকন করে যাব। বাংলা ভাষার অভিভাবক সেজে যারা বসে আছেন, তাদের নাকের ডগায় ইংরেজি হরফ বাংলাকে গিলে ফেলেছে, তাদের পুত্র-কন্যা ও নাতি-নাতনিদের পাঠানো এবং গ্রহণ করা টেক্সট মেসেজগুলোই সে প্রমাণ দেবে। ব্যবহারকারীদের সামান্যতম দোষও নেই। কারণ অভিভাবকরা তাদের হাতে ভাষাকে যন্ত্রের ব্যবহার উপযোগী করে তুলে দিতে পারেননি।
এই মুহূর্তে একটি জরুরি আর্জি পেশ করছি, প্রস্তাবটি সরকারের কাছেই—ডিজিট সংস্কারের বিষয়টি দ্রুত ভাবা হোক। একটি ছোট কমিটি প্রস্তাবটি পরীক্ষা করে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিক। পরবর্তী ৪৫ দিনে সুপারিশ পরীক্ষা, সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন ঘটুক। কমিটির প্রস্তাবিত আহ্বায়ক ইনাম আহমদ চৌধুরী, সদস্য সচিব হবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক (বর্তমান মহাপরিচালক প্রকৌশলী কাজেই বিজ্ঞানের গুরুত্ব অনুধাবন করবেন) এবং তিনজন সদস্য, যাদের দুজন হবেন অনূর্ধ্ব পঁয়ত্রিশ এবং সাইবার জগতের সঙ্গে পরিচিত এবং একজন ভাষাতাত্ত্বিক।
বেশি দেরি হলে ইংরেজিতে বাংলা টেক্সটের মতো এটাও হাতছাড়া হয়ে যাবে। আশা করি, সরকার এ সুযোগটিও হাতছাড়া করবে না। তাছাড়া প্রস্তাবকের পরিচিতিতে লেখা আছে তিনি সরকারি দলেরই উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।
ড. এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা