ছবিটি ভেনিস ক্যানেলের। ১৯৫০-এর দশকে ভেনিস খাল পরিষ্কারের দৃশ্য। এরপর যে প্রশ্নটি আসে তা হচ্ছে, ঢাকার খালগুলোর জন্য কি বেশি দেরি হয়ে গেল? আমরাও কি আমাদের জলাধারগুলো শোধন করে ভেনিস, টেমস, সিউলের চেংগিচিয়ন বা ব্যাংককের কোনো নদীর কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারি না?
১৮৫৮ সালের এক গ্রীষ্মে লন্ডন
নগরটি পুরোপুরি
স্থবির হয়ে পড়ে। এদিন নগরবাসী ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়। এটি ছিল তাদের সম্মিলিত
প্রতিবাদের অংশ। তাদের দাবি সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর
পদক্ষেপ গ্রহণের
আশ্বাস দিতে হবে। কেন এ কাজ করেছিল লন্ডনের
নাগরিকরা? কারণ লন্ডনের অহংকার
টেমস নদীর অবস্থা কিন্তু
আগাগোড়া এমন পরিচ্ছন্ন-নির্মল
ছিল না। পানির ওপরে ও নিচে জমা ময়লা বর্জ্য থেকে আসা অপ্রতিরোধ্য দুর্গন্ধ শহরের বাসিন্দারা
আর সহ্য করতে পারছিল
না বলে তারা ঘরে অবস্থানের সিদ্ধান্ত
নেয়।
আজ বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন নদী টেমস হলেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য—মানবসৃষ্ট বর্জ্য, পশুবর্জ্য ও শিল্প-কলকারখানার ময়লা বর্জ্যের ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে নদীটি। যেমনটা ঢাকার খালগুলো করে চলেছে।
সেদিন লন্ডনবাসীর প্রতিবাদের মুখে নড়েচড়ে বসেন নীতিনির্ধারকরা। যদিও ইংল্যান্ডের শিল্প যুগের সূচনার আগে থেকেই টেমসের দূষণ পরিস্থিতি উদ্বেগ ছড়াচ্ছিল, তবুও নীতিনির্ধারকদের টনক নড়ে ১৮৫৮ সালে। তাছাড়া প্রথম দিকে তারা বিষয়টি পাশ কাটাতেও চেয়েছিলেন, যেমন পার্লামেন্টে বিল পাস না করা বা কোনো ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে প্রথম অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা। কেননা লন্ডনের নীতিনির্ধারকরা জানতেন সংস্কারকাজে হাত দিলে টেমসের পুরো অবকাঠামো ঢেলে সাজাতে হবে। তাদের অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু জনচাপের মুখে শেষমেশ পার্লামেন্ট থেকে টেমস নদীর অবকাঠামোগত সংস্কারের পক্ষে সম্মতি দেয়া হয়। মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে বিল পাস হয় এবং আইন তৈরি হয়, যেখানে নদী ব্যবস্থার সম্পূর্ণ সংস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়।
আমাদের দেশে খাল সংরক্ষণবিষয়ক আইন আছে, দ্য ক্যানেলস অ্যাক্ট ১৮৬৪, ল’স অব বাংলাদেশ নামে। আইনটি ব্রিটিশ আমলে তৈরি। আমাদের দেশে খাল সংরক্ষণের জন্য পরিপূর্ণ আইন বর্তমানে এটি। তবে আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, আইন থাকলেও আমরা তা প্রয়োগ করতে পারছি না বা করছি না।
টেমস সংস্কারের সবচেয়ে সোচ্চার ও সুপরিচিত সমর্থকদের একজন ছিলেন পদার্থ ও রসায়নবিদ মাইকেল ফ্যারাডে। সে সময় তিনি দ্য টাইমস পত্রিকায় নদীটিকে ‘একটি প্রকৃত নর্দমা’ আখ্যায়িত করে সংস্কারের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লেখেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিবাদের মূল উপজীব্য হয় তার লেখাটি।
টেমসের সংস্কারের মধ্যে শুধু পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার বাস্তবায়নই অন্তর্ভুক্ত ছিল না, দুই পাশে বাঁধ নির্মাণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়া হয়। এটির নকশা করেছিলেন ইংরেজ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার স্যার জোসেফ ব্যাজলজেট। এভাবে ‘দ্য গ্রেট স্ট্যাংক’ বা তীব্র দুর্গন্ধ ধীরে ধীরে দূর হতে শুরু করে এবং লন্ডনবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। আর টেমস ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন নদীতে পরিণত হয়। তাছাড়া টেমসের কার্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার বাস্তবায়ন লন্ডনের বাসিন্দাদের বহু শতাব্দী ধরে জর্জরিত করা পানিবাহিত অসুস্থতাও দূর করতে শুরু করে।
২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস ফুটবল বিশ্বকাপ আসরে রানার্স আপ হলে আমস্টারডাম কর্তৃপক্ষ অভিনব এক উদযাপনের আয়োজন করে, যার নাম ছিল ক্যানেল প্যারেড। খেলোয়াড়দের দলটা ক্যানেলের ওপর দিয়ে নৌকায় করে পতাকা হাতে গোটা আমস্টারডাম শহর প্রদক্ষিণ করে। ক্যানেলের চারপাশে হাজার হাজার মানুষ তাদের অভিবাদন জানায়। এ ধরনের আয়োজন তখনই সম্ভব হয়েছে, যখন আমস্টারডাম নগর কর্তৃপক্ষ তাদের খালগুলো ব্যবহারের উপযোগী করেছে। তারা সেগুলো সংরক্ষণ করেছে, ব্যবহার করেছে এবং পানির গুণগত মান ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে।
বেশ কয়েক বছর আগে একবার বুড়িগঙ্গায় গিয়ে করুণ অবস্থা হয়েছিল মনে আছে। নৌকায় চড়ে কিছুক্ষণ পর সবার ত্রাহি ত্রাহি দশা। দুর্গন্ধে বেশিক্ষণ পানির আশেপাশে থাকা সম্ভব হয়নি।
আমেরিকায়ও
দেখা যায় খালের দুই পাড় সংরক্ষণ
করে যান চলাচলের ব্যবস্থা
তারা রেখেছে।
তাছাড়া ছুটির
দিনগুলোয় ক্যানেল
ও আশেপাশে
নানা ধরনের
আয়োজন রাখা হয়। প্রাত্যহিক
জীবনে নদী বা গণপরিসরের
সংযোগ তৈরি করা হলে তা সংরক্ষণের
মানসিকতাও তৈরি হয় মানুষের
মধ্যে। শহরের
জলাশয়গুলো তারা তাদের প্রাত্যহিক
জীবনের অংশ করে নিয়েছে।
আর আমরা এখনো ময়লা ফেলার জায়গা
হিসেবেই দেখি।
অথচ নদীর পাড় হতে পারে ভীষণ চমত্কার গণপরিসর।
নোংরা, আবর্জনাহীন
পরিচ্ছন্ন জলের পাশে বসে প্রাত্যহিক ক্লান্তি
সহজে ভোলা যায়। নদীর পাশে প্রশস্ত
রাস্তা, রেস্তোরাঁ
ও পাবলিক
স্পেস তৈরি করে তা নগরজীবনের সঙ্গে
অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
ঢাকার ধোলাই খালের ওপর অনেক আগে যে লোহার পুল ছিল, সেখানে এখন বক্স কালভার্ট। সে বক্স কালভার্টের ওপরে এখন গাড়ি সারাইয়ের দোকান। নিচের খালটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, শুধু কিছু জায়গায় সচল আছে। খাল বা জলাশয় পরিচ্ছন্ন রেখে ব্যবহার করলে নগরে পানির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এগুলো যদি রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, তবে নগরজীবন অনেকটাই সহজ ও সুন্দর হয়। খালগুলো কাজে লাগিয়ে চলাচল ব্যবস্থাও তৈরি করা যায়। তার উদাহরণ ভেনিস হতে পারে, ব্যাংককের মতো শহরেও খালের ব্যবহার রয়েছে। সেখানেও আছে জলযান চালানোর ব্যবস্থা।
ঢাকায় যেমন হাতিরঝিল। কারওয়ান বাজার থেকে শুরু করে জলযানে করে গুলশান-বনানী পর্যন্ত যাওয়া যায়। নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আকতার মাহমুদ কথায় কথায় বলছিলেন, উত্তরায় এবং ঢাকার অন্যান্য অনেক জায়গায় এটা করা সম্ভব।
আমাদের খালগুলো ছোট নয়। কিছু জায়গায় ছোট হয়ে গেছে। কিন্তু এর ব্যবহার করা যায়। তবে খাল ও জলাশয়ের সঙ্গে বাসাবাড়ির বর্জ্যের পানির সংযোগ বন্ধ করা জরুরি। তা না হলে এগুলো ব্যবহার করা যাবে না। কেননা এ বর্জ্যে বায়োডিগ্রেডেবল পদার্থ থাকে, যা এক-দুদিন পর পচতে শুরু করে, তখনই পানিতে দুর্গন্ধ হয়ে যায়। তাই পানিতে বর্জ্য ফেলার বিষয়টির সুরাহাও জরুরি। ঢাকা ওয়াসার তথ্যমতে, মাত্র ২০ শতাংশ বাড়িতে সুয়ারেজ কানেকশন রয়েছে। অন্য একটি তথ্য বলছে, ঢাকার কোনো কোনো বাসার সেপটিক ট্যাংকের লাইন সরাসরি পানির লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত।
ঢাকা শহরে দুই ধরনের স্যানিটেশন
ব্যবস্থা বিদ্যমান।
এক. সুয়ারেজ
পদ্ধতি। বাসার
টয়লেট থেকে সরাসরি সুয়ারেজ
সিস্টেমে সংযোগ
দিলে সুয়েজ
বা ‘পয়োবর্জ্য
পানি’ সুয়ার
নেটওয়ার্ক দিয়ে ট্রিটমেন্ট প্লান্টে
বা শোধনাগারে
যায়। সেখানে
প্রয়োজন অনুযায়ী
শোধনের পর পরিশোধিত ‘পয়োবর্জ্য
পানি’ নদী বা পরিবেশে
নিষ্কাশিত হয়। দুই. অনসাইট
স্যানিটেশন পদ্ধতি।
যেমন সেপটিক
ট্যাংক সিস্টেম
বা পিট ল্যাট্রিন। সেপটিক
ট্যাংক পয়োবর্জ্য
থেকে কঠিন পদার্থ আলাদা
করে। এটা স্লাজ হিসেবে
ট্যাংকের তলায় জমা হয়। আর স্লাজবিহীন
পয়োবর্জ্য পানি কিছুটা শোধন হয়ে সোকপিটের
মাধ্যমে মাটি শুষে নেয়। ট্যাংকের তলায় জমাকৃত স্লাজ
নির্দিষ্ট সময় পর খালি করে পয়োবর্জ্য
শোধনাগারে পরিশোধন
করতে হয়। কিন্তু অনেকে
জায়গার অভাবে
একটা পিট বানায় কিন্তু
বলে যে এটাই সেপটিক
ট্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার
সুয়ার নেটওয়ার্কের সঙ্গে ২৫টি সুয়েজ
লিফট স্টেশন
থাকলেও ১৮টি কাজ করছে না। এর মানে সুয়েজ
লিকেজ হয়ে পানিতে দূষণ ছড়াচ্ছে। তাছাড়া
ঢাকা শহরে অনসাইট স্যানিটেশন
সিস্টেমের অবস্থা
সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। ঢাকা ওয়াসার সুয়ারেজ
নেটওয়ার্কের বাইরে
৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ
নগরবাসী অনসাইট
স্যানিটেশন সিস্টেমের
ওপর নিভর্রশীল।
এর মধ্যে
৭১ শতাংশের
বেশি তাদের
বাসাবাড়ির সেপটিক
ট্যাংক বা টয়লেট সরাসরি
স্ট্রম ড্রেন,
লেক, খাল ইত্যাদিতে সংযোগ
দিয়েছে।
অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অর্জন করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে আমাদের সামনে। এসডিজিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি দেশের শতভাগ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা অর্জন করতে হবে। ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩৮ শতাংশ পয়োনিষ্কাশন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পেরেছে। মাত্র নয় বছরের মধ্যে অবশিষ্ট ৬২ শতাংশ অর্জন করতে হবে। শুধু ঢাকা নয়, অন্যান্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে যদি এক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়া হয়, তাহলে আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে পারব কিনা সেটিই প্রশ্ন।
একটি শহরের নাগরিক সুবিধা কেমন, তার অনেকাংশই নির্ভর করে এর জলাধার কতটা পরিচ্ছন্ন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা কতটা উন্নত তার ওপর। ঢাকা শহরের স্যানিটেশন ব্যবস্থা যে খুুবই দুর্বল, তা নিয়ে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। মানসম্মত সুয়ারেজ ব্যবস্থা ব্যতীত যেকোনো শহরের ইকোসিস্টেম ধ্বংস হয়ে যায়। সুয়ারেজ ব্যবস্থা উন্নত করার দায়িত্ব ওয়াসার। আর সাধারণ ড্রেন সিস্টেম ভালো রাখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।
ওয়াসাকে ঘিরে হাজারটা অভিযোগ। দাশেরকান্দিতে পাঁচ লাখ ঘনমিটার ক্ষমতার অনেক বড় একটা ট্রিটমেন্ট প্লান্ট তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ঢাকার বর্জ্য সেখানে কীভাবে পৌঁছবে? শোনা যাচ্ছে, ট্রিটমেন্ট প্লান্টে সুয়েজ প্রবাহের জন্য প্রয়োজনীয় সুয়ার নেটওয়ার্কের কাজ এখনো শুরু করা যায়নি। এ অবস্থায় ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা শহরকে শতভাগ সুয়ারেজ নেটওয়ার্কের মধ্যে আনার ওয়াসার পরিকল্পনা কতটা সফল হবে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান জরুরি। যখন শহরে ঠিকমতো সুয়ারেজ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হবে, জলাশয়ের পানির মান বাড়বে, পানি থেকে কোনো দুর্গন্ধ আসবে না, তখন মানুষও তা ব্যবহার করতে পছন্দ করবে। জলাশয়ের সীমানা তৈরি করাও জরুরি। পাশাপাশি দুই পাশে চলাচলের পথ তৈরি করতে হবে নাগরিকদের ব্যবহারের জন্য।
রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক