গতকালের পর
ডিফেনসিভ হিসেবে বিরোধিতার স্বার্থপর
সুরে কেউ হয়তো সজোরে বলতে পারেন,
বাণিজ্যিক ব্যাংকার ছাড়া অন্য পেশার দক্ষ, অভিজ্ঞ
ও সফল ব্যক্তি ব্যাংক ভালোভাবে চালাতে পারবেন না—এমন কথা সঠিক নয়। কারণ এখনো তো
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ক্যাডার সার্ভিসের লোক,
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লোক, ব্যবসায়ী, সামাজিক
ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রায় সব ব্যাংক বোর্ডের সংখাগরিষ্ঠ সদস্য (পরিচালক
ও চেয়ারম্যান) হিসেবে ভালোভাবেই ব্যাংক চালাতে দেখা যাচ্ছে। এমন সমালোচনার প্রতি
পর্যাপ্ত সম্মান রেখে গণতন্ত্রের দাবিতে বিনয়ের সঙ্গে বলতে হয়, বর্ণিত
দাবির মতামত সঠিক হলে অধিকাংশ ব্যাংক আজ নিম্নমুখিতায় পড়ত না; ব্যবসায়ীরা
ব্যাংকঋণে ব্যবসা করে কমপক্ষে ২০-২৫ শতাংশ মুনাফা করতে পারলে ব্যাংক নিজে এর ৮০
শতাংশ আমানতের (এমএলআর/সিআরআর বাদে) বিনিয়োগ থেকে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ নিট মুনাফা (অধিক
হারের প্রশাসনিক ব্যয় মিটিয়ে)
করতে ব্যর্থ হতো না; আসলে
ঋণের প্রকৃত বাস্তব অবস্থা উপেক্ষা করে ঘন ঘন সার্কুলার পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে
সিএল পুনর্বিন্যাসের সাহায্যে মুনাফা বাড়িয়ে বোনাস নিতে এবং ডিভিডেন্ট দিতে হতো না; ‘ইউসিপিডিসি’-এর
নিয়ম ভেঙে আমদানিকারকের খরচে ঋণপত্রের সপক্ষে বিদেশী মজবুত ব্যাংকের অ্যাড-কনফারমেশন নিতে
হতো না; ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকারি সহায়তা নিতে হতো না। এমনসব অনাচার
হচ্ছে হয়তো দেশী ব্যাংকারদের পর্যাপ্ত দক্ষতা, সততা, সাহস এবং বোর্ডের সৎ তথা দক্ষ
সহযোগিতার অভাবে। এছাড়া ব্যাংকের পাঁচমিশালি বোর্ডে (ব্যাংকার, অব্যাংকার) চেয়ারম্যানসহ
অব্যাংকার সদস্য সংখ্যাগরিষ্ঠ
(অধিক)
হওয়ার কারণে হয়তো ব্যাংক নিয়মমাফিক চলতে পারছে
না। বোর্ডের সংখ্যালঘিষ্ঠ (কম) ব্যাংকার-পরিচালকরা তাদের ব্যাংকিং দক্ষতা,
অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাংকের অনিয়মের বিষয়গুলো বুঝতে
পারলেও তা ঠেকাতে বোর্ড মিটিংয়ে সাহস দেখাতে পারছেন না বেইজ্জতি হয়ে সম্মানজনক
অবস্থান খোয়ানোর নিশ্চিত ভয়ে। হয়তো অব্যাংকার-পরিচালকদের খুঁটির জোরের ভয়ে দুর্বল
ব্যাংকার-পরিচালকরা সংকুচিত হয়ে থাকছেন।
এমন সন্ধিক্ষণে বলা যায়, শুধু
অদক্ষতা নয়, অসততাও ব্যাংকিং খাতের নিম্নমুখিতার মূল কারণ। আসলে প্রকৃত ভালো
ব্যাংকিং শিখতে ধৈর্য ও সময় লাগে। নির্লোভ হয়ে সততা দিয়ে সাহসের সঙ্গে নিরপেক্ষ
সিদ্ধান্তে অনমনীয় থাকতে পারলে ব্যাংকিংয়ের কাজ সহজ হয়ে যায়। মূলত ব্যাংক মানুষের
কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পদের নিরাপদ সংরক্ষক হয়ে তার পরিমাণ বাড়াতে সহযোগিতা করে।
আমানতকারীদের প্রাণাধিক প্রিয় অর্থ-সম্পদের নিরাপত্তার সার্বক্ষণিক ভাবনা তাদের বাঁচার সাহস ও শক্তি
জোগায়। তাই ব্যাংকিং করতে মানুষের মন-মেজাজ, স্বার্থ তথা গ্রাহকের কাজকে ভালোভাবে বুঝতে হয়, জানতে
হয়। সত্ভাবে কাজ করে এবং গ্রাহকের ব্যবসা পরিচালনায় উপযোগী পরামর্শ দিয়ে তাদের
আস্থা অর্জন করতে হয়। এমন করতে না পারলে গ্রাহককে তার ব্যবসায়ে উন্নতি করানো যায় না।
ব্যবসার আয় থেকে তাদের ব্যাংক দায় সুদসহ পরিশোধ করানো না গেলে ব্যাংকের ঋণ আদায় বা
পরিশোধ হয় না। গ্রাহক-ব্যাংকারের সম্পর্কে ব্যক্তিগত স্বার্থ সংযোগ বা গোপন আঁতাত থাকলে
ব্যাংকের ব্যবসা ভালো হয় না। দেশী ব্যাংকিংয়ে হয়তো এমনটি হয় বলেই এর অচলাবস্থা
কাটছে না।
ঋণ নিতে ব্যাংকে খরচ করতে হয় বলে
জনশ্রুতি আছে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ঘুষ বা বকশিশ অথবা হাদিয়া দিয়ে ভুয়া ঋণ
নিলে সেই ঋণের টাকা পরিশোধ না করা এবং সেই টাকা অপব্যবহারে ঋণগ্রহীতার মরিয়া ভাব
সামাল দিতে অসৎ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কোনো কর্তৃত্ব কাজ করে না। গ্রহীতা ভাবেন
ব্যাংকঋণ তার ক্রয়কৃত নিজস্ব সম্পত্তি,
তাই অন্য সব জিনিসের মতো ঋণকেও তিনি ইচ্ছামতো
ব্যবহার বা অপব্যবহার করতে পারেন। এ কারণেই ব্যাংকঋণের টাকা নির্ধারিত কাজে না
লেগে পাচার হয়, বিলাসে বা অনুৎপাদিত খাতে খরচ হয়। তাই বলতেই হয়, ব্যাংকার
সৎ ও পেশাজীবী হলে এবং ব্যাংকের টাকাকে নিজের টাকার মতো ভাবলে তা রক্ষা করতে তার
সতর্কতা ও সাহসের অভাব হয় না। ফলে নিতান্ত নিয়ন্ত্রণবিহীন দৈবদুর্বিপাক ছাড়া
ব্যাংকঋণ অনাদায়ীও হয় না। অন্যদিকে লোভ ও অসততা ব্যাংকারকে দুর্নীতিবাজ বানায়। তাই
তো কিছু অসৎ ব্যাংকার ভুয়া ঋণ দিয়ে,
কাজে ফাঁকি দেয়াসহ নানা ভুয়া অতিরিক্ত খরচ, ক্রয়
দেখিয়ে নিজের ‘আয়’ বাড়াতে পারেন। এমন অসৎ ব্যাংকার ও গ্রাহক জালিয়াতির টাকা নামে-বেনামে বিনিয়োগ
করে, তার
আয়ের যৎসামান্য অংশ খরচ করে তাদের দুষ্কর্মের মামলা সামলাতে পারেন। অবশিষ্ট সুদে-মূলে তার পুঁজি
তথা শক্তি-সাহস বাড়ায়। তাই জালিয়াতকারীর তেমন কোনো শাস্তি পেতে হয় না এবং তাকে
চুরির জিনিস ফেরত দিতে হয় না। এতসব সুবিধা থাকার কারণেই মানুষ চুরি-জালিয়াতির দিকে
ঝুঁকে পড়ে। ‘মানুষকে ভালো হতে হবে’—এমন পরামর্শের বুলি এখন অচল। কারণ অধিকাংশ মানুষের ‘ডিড
অ্যান্ড ডায়ালগে’ হারমনি নেই। এমন পরিস্থিতিতে মানুষকে ভালো থাকতে বাধ্য করতে হবে, এটাই
আসল কাজের কথা হওয়া উচিত। অর্থাৎ এ ব্যাপারে উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের সরকারকেও
আরো কঠোর হতেই হবে।
জালিয়াতির অবাধ সুযোগ ও জবাবদিহিতার
অভাবের কারণেই এমন অনৈতিক তথা নিয়মবহির্ভূত ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড অবলীলায় চলে।
দুর্নীতিবাজরা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের দোহাই দিয়ে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা
করে। আসলে ব্যাংকের বোর্ড ভালো হলে স্বাভাবিকভাবে এর ব্যবস্থাপনা ভালো হতে পারে।
আবার ব্যবস্থাপনা সৎ ও পেশাদার হলে বোর্ডকে সংযত রাখতে পারে। তাই বাণিজ্যিক
ব্যাংকিং কাজে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকারদের হাতে ব্যাংকের বোর্ডকে ছেড়ে দেয়া হলে (চেয়ারম্যানসহ
দুই-তৃতীয়াংশ
সংখাগরিষ্ঠতা) ব্যাংকের দুর্নীতি বন্ধ হতে পারে। কারণ তারা ব্যাংকিংয়ের ফাঁকফোকর, পথঘাট
ভালো চিনবেন বলে ভালোভাবে ব্যাংক চালাতে সচেষ্ট হবেন এবং দুর্নীতি করে দোষারোপের
পাল্টা ঠেলাঠেলিতে শামিল হবেন না। বর্তমানে ব্যাংকের বহুজাতিক বোর্ডে ব্যাংকার
সদস্যের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় তারা বোর্ডকে দিয়ে কোনো ভালো সিদ্ধান্ত পাস
করিয়ে নিতে পারেন না। ফলে খারাপ সিদ্ধান্ত অনায়াসে পাস হয় এবং দুর্নীতিপরায়ণ অথবা
ব্যাংকিংয়ে অনভিজ্ঞ বোর্ড সদস্যরা তাতে আটকা পড়ার ভয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনানুগ
ব্যবস্থা গ্রহণে নির্বাক বাধা হয়ে দাঁড়ান। বর্তমান কালের ব্যাংকিংয়ের মূল সমস্যা
এখানেই।
এছাড়া ব্যাংক বোর্ডের পরিচালকদের
প্রধান কাজ অন্য চাকরি, ব্যবসা, সমাজসেবা বা রাজনীতি হলে স্বাভাবিকভাবে তারা নিজেদের সেই মূল কাজ সামাল
দিয়ে ব্যাংক বোর্ডের অতিরিক্ত দায়িত্বে সময় দিতে পারেন কম। আবার পরিচালকদের কাছে
বোর্ড মিটিংয়ের ফাইল দুদিন আগে পৌঁছানোর কথা থাকলেও অধিকাংশ সময়ে তা পৌঁছে না।
অনেক সময় জরুরি ব্যবসায় প্রস্তাবের মেমো টেবিলে প্লেস করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে সবার ‘বাসার
হোম মিনিস্টারের’ এজেন্ডা তো থাকেই। ফলে অব্যাংকার-পরিচালকরা বোর্ড মিটিংয়ের সব ফাইল সময়
নিয়ে দেখার সুযোগ পান কম। তাই পরিচালকদের অনেকের সময়ের স্বল্পতা এবং ব্যাংকিং কাজে
তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে ব্যাংকের বহুমুখী জটিল সমস্যার স্তূপীকৃত
ফাইল অল্প সময়ে দেখে ফেলা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এছাড়া সামাজিক তদবিরের
প্রচ্ছন্ন চাপের ‘মাইন্ড সেট’ তো থাকেই। এমন পরিস্থিতিতে অব্যাংকার ডমিনেটেড বোর্ডকে কিছুটা হলেও
ব্যবস্থাপনানির্ভর হতে হয়। সেই সুযোগে অসৎ ব্যাংকারের দুর্বল সততা ফায়দা ওঠানোর
কথা ভাবতে পারে। তখন বোর্ড
‘ইমিউন্ড’ বলে মৌন সমঝোতার ভিত্তিতে ম্যানেজমেন্টের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে পড়তে
পারেন। আসলে এমনসব কৌশলেই হয়তো দুর্নীতি সুপ্তভাবে কাজ করে। ম্যানেজমেন্টের
প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে তার দায় নির্ধারণ করা হলে এবং
সর্বোপরি প্রকৃত দায়ী-দোষী ব্যক্তিরা অবিলম্বে উপযুক্ত শাস্তি পেলে অন্যায় করে অন্যের ঘাড়ে
দোষ চাপানোর হীন প্রবণতা বন্ধ হতে পারে।
পরিশেষে বলতে হয়, ইমিউন্ড
বোর্ডের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপানোর সুযোগ বন্ধ করে জবাবদিহিতার সঙ্গে ম্যানেজমেন্টের
কাছে ব্যাংকের পারফরম্যান্সের সব দায়িত্ব দেয়া হলে ব্যাংকাররা ভালো নিয়ম-নীতি প্রণয়ন
এবং তা সুষ্ঠুভাবে পরিপালনে বাধ্য হবেন। আর বোর্ডের দায়িত্ব হবে ‘ব্যালান্স
অ্যান্ড চেক’-এর নিরিখে দেশের,
দশের ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করে ব্যাংকের
জন্য ভালো নিয়ম-নীতি প্রণয়ন করা এবং ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে তার যথাযথ পরিপালন নিশ্চিত
করা। দুর্মুখরা ভাবতে পারেন ম্যানেজমেন্টের হাতে ঋণ দেয়ার অঢেল ক্ষমতা দেয়া হলে
রাতারাতি লুটপাট হয়ে ব্যাংক বসে যাবে। এমন আশঙ্কা নিরসনে বলা যায়, বর্তমান
ডিজিটালের দেশে কম্পিউটারের সাহায্যে ব্যাংকের সব কর্মকাণ্ডের ওপর মনিটরিং
সুপারভিশন রাখলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সেখানে প্রয়োজন তাত্ক্ষণিকভাবে চুরির
পণ্য উদ্ধার করে পরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি অবিলম্বে নিশ্চিত করা। আসলে
কঠোর জবাবদিহিতার সাহায্যেই তো স্থানীয় বিদেশী সব ব্যাংক হাজার হাজার মাইল দূরের
করপোরেট অফিসে বসে তাদের বিদেশী শাখার কার্যক্রম এ দেশের কর্মীকে দিয়ে করিয়েই
ঈর্ষণীয় মুনাফা করে বিদেশে পার করছে। দেশী ব্যাংকারদের মরিয়া আত্মপ্রত্যয় ও
প্রতিজ্ঞা দিয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়িয়ে বিদেশী ব্যাংকের এ দেশের বাম্পার ব্যবসা
কেড়ে নিয়ে তাদের গুটিয়ে দেয়া সম্ভব হতে পারে। তাই চেয়ারম্যানসহ দুই-তৃতীয়াংশ
সংখাগরিষ্ঠ সিজেন্ড বুনিয়াদি বাণিজ্যিক ব্যাংকার (অব.) দিয়ে অবিলম্বে
সব ব্যাংকের বোর্ড (কেন্দ্রীয় ব্যাংক বোর্ডে দুজনসহ)
গঠন করে কম্পিউটারের সাহায্যে সার্বক্ষণিক
মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা গেলে প্রত্যাশিত কৃতকার্যতা আসবে। তবে এর কর্মপদ্ধতি ‘স্বাধীন
ব্যাংক কমিশন’-কে করতে হবে। এমন করা হলেই ব্যাংকঋণের মহামারী প্রতিরোধ পেয়ে তা দেশী
ব্যাংকিংকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারবে। তা না হলে কর্মকারের কাজ স্বর্ণকারকে
দিয়ে করানোর ফলে ব্যাংকঋণের মহামারী ধীরে ধীরে ব্যাংকিং খাত তথা জাতীয় অর্থনীতিকে
পঙ্গু করে দেবে। ফলে সরকারের চলমান উন্নয়নমুখী ভাবমূর্তির ঊর্ধ্বগতি কঠিন সমস্যায়
পড়বে। তাই ব্যাংকিংয়ের আশু সফল সংস্কার প্রয়োজন। (শেষ)
রবিউল হোসেন: সাবেক
এমডি
সোনালী ব্যাংক লিমিটেড