তরমুজ সিন্ডিকেট, মাথাপিছু আয় ও আমাদের বৈদেশিক ঋণবৃত্তান্ত

বিদেশী ঋণের বিপরীতে সরকার এক বছরে মোট ৯ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা সুদের মধ্যে শুধু রাশিয়াকেই দিয়েছে ২ হাজার ৪২০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। যদিও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককে (এডিবি) পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ৭৯৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। মোদ্দা কথা, গত অর্থবছরে একক দেশ হিসেবে রাশিয়া সর্বোচ্চ সুদ পেয়েছে সরকার থেকে। সরকার বা আমরাও বিনিময়ে অনেক কিছু পেয়েছি রাশিয়া থেকে।

সাম্প্রতিক খবরে জানা যাচ্ছে, বিদেশী ঋণের বিপরীতে সরকার এক বছরে মোট ৯ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা সুদের মধ্যে শুধু রাশিয়াকেই দিয়েছে ২ হাজার ৪২০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। যদিও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককে (এডিবি) পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ৭৯৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। মোদ্দা কথা, গত অর্থবছরে একক দেশ হিসেবে রাশিয়া সর্বোচ্চ সুদ পেয়েছে সরকার থেকে। সরকার বা আমরাও বিনিময়ে অনেক কিছু পেয়েছি রাশিয়া থেকে। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন্দ্রিক সম্পর্কের সূত্রপাত থেকে রাশিয়া বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র। পূর্ব পাকিস্তান আমল থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব বুঝে বর্তমান বাংলাদেশও সেই সম্পর্কের গুরুত্বকে দিন দিন আরো কার্যকর ও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ফলে রাশিয়ার কল্যাণেই বাংলাদেশ এখন পারমাণবিক জ্বালানিশক্তি ব্যবহারকারী বিশ্বের ৩৩তম দেশ। এটি চাট্টিখানি কথা নয়। একটি অর্থবহ ও কার্যকর সম্পর্ক অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এই এক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে রাশিয়া-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক অন্তত সেটি নির্দ্বিধায় প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। যেকোনো ঋণের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত মেনে চললে বা ঋণের টাকা থেকে সুদ ও আসলের অংশ পরিশোধ হতে থাকলে উভয়ের জন্য মঙ্গলময়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিকে আমাদের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে পরাজয় বরণের পথে থাকা পাকিস্তানকে সাহায্যের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে যে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল। তার  প্রত্যুত্তরে মার্কিন নৌবহরকে প্রতিহত করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়া  যে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত একটি পারমাণবিক ডুবোজাহাজ পাঠিয়ে মার্কিন নৌবহরের মাধ্যমে পাকিস্তানকে সহায়তা করতে ব্যর্থ করে দিয়েছিল সেই ঋণ বাংলাদেশ কীভাবে শোধ করবে? 

ছোট্ট দেশ হিসেবে ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ বরাবরই সমগ্র দাতাগোষ্ঠীর কাছে প্রশংসিত হয়ে আসছে। এমনকি বহুল আলোচিত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা বাংলাদেশকে আর্থিক উন্নয়নের দিক থেকে এশিয়ার পরবর্তী টাইগার হিসেবে বারবার আখ্যায়িত করেছিলেন, যদিও তিনি একটি দলের প্রয়াত নেতার মুখে ‘কাজের মেয়ে মর্জিনা’ খেতাব নিয়ে এ দেশ থেকে বিদায় হয়ে চলে গেছেন। কিন্তু টাইগার জিন্দা হ্যায়। সম্প্রতি সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, আগামী দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৬তম অর্থনৈতিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র।  এ বিস্ময়কর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে,  ২০২৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ৩০তম অর্থনৈতিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, যখন মালয়েশিয়ার অবস্থান হবে বিশ্বের ৩২তম অর্থনৈতিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। করোনা পরবর্তী সময়ে  ২০২২ সালেও অর্থনৈতিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩৫তম। সুতরাং ড্যান মজিনাকে নিয়ে যতই সমালোচনা করি না কেন বাংলাদেশ শুধু এশিয়া নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও জায়গা করে নিয়েছে। 

তবে ভাবনার বিষয় হলো, বাংলাদেশের কাঁধে এখন ঋণের বড় বোঝা। সরকারের আর্থিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত এক তথ্যমতে বাংলাদেশের বৈদেশিক দেনার পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ৭৮০ বিলিয়ন টাকা (১০০ কোটিতে ১ বিলিয়ন)। সরকারের সঙ্গে দাতা সংস্থা বা দাতা দেশগুলোর কথাবার্তা সব ঠিকঠাক থাকলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৬০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৪২ বিলিয়ন, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৫৬৬ দশমিক ২৪ এবং ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরে সরকারকে ৪৮৯ দশমিক ২৮ বিলিয়ন টাকার বৈদেশিক দায় পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হবে ২০২৭ সালে, তখন ওই প্রকল্পের মূল পেমেন্ট শুরু হবে। কিন্তু এ চিন্তা করতে না করতেই গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক জানাল যে, বাংলাদেশের বিদেশী ঋণ প্রথমবারের মতো ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে সরকার ও বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণে স্থিতি ছিল ১০০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৬৪ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ১১ ট্রিলিয়ন বা ১১ লাখ ৭ হাজার ৪০ কোটি টাকার সমান। অথচ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিদেশী ঋণের স্থিতি ছিল ৯ হাজার ৬৫২ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বিদেশী ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৪১২ কোটি ডলার। 

ঋণের এ স্থিতি না বাড়ারও তো কোনো কারণ নেই, যেখানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল (লাইন-৬), পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ ইত্যাদি প্রকল্পগুলো তো আর এমনি এমনি হয়ে যাবে না। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সময়টা শুধু ক্লিক করছে না, তা না হলে এসব প্রকল্প ও পেমেন্ট নিয়ে এত বেশি চিন্তার কারণ ছিল না। তাছাড়া ২০২১ সালের আগস্টে  বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ বা ৪৮ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার, সেটি হতাশাজনকভাবে কমে এসেছে। এই যখন সরকারের বৈদেশিক দায়দেনার অবস্থা তখন দেশের বিপুলসংখ্যক খেলাপি ঋণ যেন বর্তমান আর্থিক সংকটে ঘি ঢালছে। বিভিন্ন বিবেচনায় ২০২২ সালেই ব্যাংকগুলোর পুনঃতফসিলকৃত ঋণের রেকর্ডসংখ্যক পরিমাণ ছিল ৬৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। তারপর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এ বিশাল অংশ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কিছুটা হলেও বিচলিত করেছে। এর মধ্যেও আশা জাগিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি গৃহীত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তারমধ্যে খেলাপি ঋণের মেয়াদ গণনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড ব্যাসেল-৩ নীতির বাস্তবায়ন। এটি অনুসরণ করা হলে কোনো ঋণ অপরিশোধিত থাকার পরের দিন থেকেই মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে স্বীকৃত হবে। এ নিয়মে কোনো ঋণ যদি ৯০ দিন বা তিন মাস অপরিশোধিত থাকে তাহলে  সেটির মান হবে সাব-স্ট্যান্ডার্ড (এসএস) বা নিম্নমানের শ্রেণীকৃত। আবার কোনো ঋণ যদি ১৮০ দিন অপরিশোধিত থাকে তাহলে সেটিকে গণ্য করা হবে ডাউটফুল (ডিএফ) বা সন্দেহজনক হিসেবে। আর ২৭০ দিন কোনো ঋণ যদি অপরিশোধিত থাকে তাহলে সেটির মান হবে মন্দ (বিএল) বা খারাপ ঋণ। তথ্যমতে, এ বছরের জুনের মধ্যেই ব্যাসেল-৩ স্বীকৃত মানদণ্ডে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেটি আসলে ক্রমবর্ধমান ঋণখেলাপিদের পরিসংখ্যানে বেশ হেরফের ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাসার সামনে থেকে দিনকয়েক আগে তরমুজ কিনতে গেলাম। বেশ কয়েকটি তরমুজের সঙ্গে একটি ডিজিটাল ওজন মেশিনও লক্ষ করলাম। তরমুজ পিস হিসেবে না কেজি হিসেবে বিক্রি করেন জানতে চাইলে  তরমুজওয়ালা সোজাসুজি জানিয়ে দেন যে পিস হিসেবে বিক্রি করছেন। কোনটার দাম কত জানতে চাইলে বললেন, বড়টা ৫০০ টাকা আর ছোটটা ২০০ টাকা। বললাম, আমাকে ছোট একটাই দেন। এরপর অনুরোধ করলাম, আচ্ছা এটি একটু মেশিনে দেন তো কত কেজি আছে দেখি। উদ্দেশ্য হলো, তরমুজের কেজি যদি ৩০ টাকা হয়, তাহলেও তো এতটুকু তরমুজ ২০০ টাকা হওয়ার কথা নয়। বেচারা মেশিনে ওঠানোর পর দেখলাম তরমুজটির ওজন ঠিক পাঁচ কেজি। বললাম, ভাই, বিভিন্ন অভিযানে আমরা তো দেখছি বড় বড় তরমুজ ১৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আপনি মেপে বিক্রি করলেও তো এটি ১৫০ টাকাই হয়। বললেন, স্যার গরিব মানুষ, খাব কী, পরব কী, সামনে ঈদ, দুনিয়ার দেনা দায়িকে ভরা। অথচ গত বছরের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, দেশে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ১৯ টাকা। কিন্তু আয় তখনো মাথাপিছু ঋণের চেয়ে বেশি ছিল। ওই প্রতিবেদনে উঠে আসে, দেশের জনগণের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৯৩ ডলার; যা তখনকার বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা ছিল। এমনকি গত ডিসেম্বরের শেষেও মাথাপিছু বিদেশী ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫৯২ ডলার (প্রায় ৬৫ হাজার টাকা)। আট বছর আগে এটা ছিল ২৫৭ ডলারের কিছু বেশি। এর বিপরীতে গত এক দশকে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করেছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু আয়ের অংশে চার বছর আগে ভারতকে আর আট বছর আগে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ। এর পরও যদি তরমুজওয়ালার খাওয়া-পরার চিন্তা করা লাগে তাহলে আমাদের অর্থনীতিতে ন্যায্যতার একটি বিরাট ঘাটতি রয়ে গেছে—এটা বলতেই হবে। 

যা-ই হোক, তরমুজওয়ালার দিকেই ফিরে আসি। বললাম, ভাই তরমুজের দাম তো দুই ভাবেই বেশি নিচ্ছেন, তার পরও আপনার এত অভাব কেন? এবার তরমুজওয়ালা মোলায়েম কণ্ঠে অনুরোধ করলেন, স্যার আপনি ওজনে নিয়েন না, ২০০ টাকা দিয়ে পিসই নেন, শোনেন স্যার আপনারা যেডাই করেন না কেন ‘যেই লাউ সেই কদু’। একটু মজার ছলে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই আমি কি আপনার কাছে কদু কিনতে আসছি নাকি তরমুজ কিনতে আসছি? রশিক তরমুজওয়ালা নিকিল ক্ষয়ে যাওয়া ৩২ পাটি দাঁত বের করে এবার জবাব দিলেন, স্যার আপনি এটাকে তরমুজ মনে করলে তরমুজ আর কদু মনে করলে কদু—যেইটা আপনার খুশি। বললাম, আমি তাহলে কদু মনে করেই নিয়ে গেলাম। তবে ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে সরকারের চেষ্টার সামান্যতম কোনো কমতি নেই—এ নিউজ খবরেই পড়ি, বাজারে গেলে তা টের পাই না।

এমএম মাহবুব হাসান: ব্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক 

এসভিপি, প্রাইম ব্যাংক


আরও