ফিরে দেখা

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও স্বাধীনতার পূর্ণতা প্রাপ্তি

১০ জানুয়ারি ১৯৭২। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছিলেন স্বাধীন-স্বদেশ, মুক্ত বাংলাদেশে। মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আনন্দে ভেসেছিল সমগ্র বাংলাদেশ, বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ।

১০ জানুয়ারি ১৯৭২। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছিলেন স্বাধীন-স্বদেশ, মুক্ত বাংলাদেশে। মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আনন্দে ভেসেছিল সমগ্র বাংলাদেশ, বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর আগমন বাঙালি জাতির জন্য একটি বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রশ্নে বাঙালি যখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি তখন পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান।

এর আগে পাকিস্তানের কারাগারে গোপনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সকল প্রকার আয়োজন করেছিলেন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এ ঘটনা জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তির জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে চাপ দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬৭টি দেশের সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি দেন। অন্যদিকে তিনি ইউরোপের পাঁচটি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করে বিশ্বজনমত বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অনুকূলে আনতে সক্ষম হন। ফলে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পান। একটি পাকিস্তান সামরিক বিমানে খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। লন্ডনে সময় তখন ভোর ৮টা ৩০ মিনিট, ৯ জানুয়ারি ১৯৭২ সাল। স্বদেশে ফেরার জন্য বঙ্গবন্ধু ওঠেন ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বহরের কমেট জেটে। বাংলাদেশে ফেরার পথে বিমানটি ২ ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করে দিল্লিতে। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান। লন্ডনে ও দিল্লি উভয় জায়গাতেই তিনি পেয়েছিলেন বীরোচিত সংবর্ধনা। ৮ জানুয়ারি সকাল ৭টায় বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হয়, ‘‌বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।’

কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে ব্রিটিশ ফরেন অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা স্যার ইয়ার মাদারল্যান্ড উপস্থিত হয়ে জানান ব্রিটিশ সরকার বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিয়েছে। সকাল ৮টার মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ক্যারিজেস হোটেলে নিয়ে আসা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা (পরে প্রধানমন্ত্রী) হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসে বলেন, ‘গুড মর্নিং মি. প্রেসিডেন্ট।’ 

বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে পৌঁছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ছিলেন লন্ডনের বাইরে। বঙ্গবন্ধুর পৌঁছার কথা শুনে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী হিথ ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে ছুটে আসেন। প্রধানমন্ত্রী হিথ তাকে নজিরবিহীন সম্মান দেখান। ইতিহাস সাক্ষী ওই দিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ নিজে তার কার্যালয়ের বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ শেখ মুজিব গাড়ি থেকে বেরিয়ে না এলেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি যখন তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করে, তখন লাখো জনতা মুহুর্মুহু হর্ষধ্বনি ও গগনবিদারী ‘‌জয় বাংলা’ স্লোগানে স্বাগত জানায় প্রাণপ্রিয় নেতাকে। জনস্রোত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি পৌঁছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তখনকার রেসকোর্স ময়দান)। যে দেশ এবং যে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেই মাটিতে পা দিয়েই আবেগে কেঁদে ফেলেন। বিমানবন্দরে অস্থায়ী সরকারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা সবাই অশ্রুসজল নয়নে বরণ করেন ইতিহাসের এ বরপুত্রকে।

বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১৭ মিনিট জাতির উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। যা ছিল জাতির জন্য দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশের আদর্শগত ভিত্তি কী হবে, রাষ্ট্রকাঠামো কী ধরনের হবে, পাকিস্তানি বাহিনীকে যারা সহযোগিতা করেছে তাদের কী হবে, বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বের স্বীকৃতি দেয়ার জন্য অনুরোধ, মুক্তিবাহিনী, ছাত্র সমাজ, কৃষক, শ্রমিকদের কাজ কী হবে, এসব বিষয়সহ বিভিন্ন দিক নিয়ে নির্দেশনা দেন এবং ডাক দেন দেশ গড়ার সংগ্রামে। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত মন্ত্রমুগ্ধ জনতা দুই হাত তুলে সেই সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। পূর্বপ্রস্তুতিহীন এ সংক্ষিপ্ত ভাষণে অনেক বিষয়ের প্রতি বঙ্গবন্ধু দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যা রাষ্ট্র ও জাতি গঠনে তাৎপর্য বহন করে। পাশাপাশি বহন করে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদৃষ্টির।

যাদের প্রাণ ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সেদিন বঙ্গবন্ধু ভাষণের শুরুতে বলেন, ‘স্মরণ করি আমার বাংলাদেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সিপাই, পুলিশ, জনগণকে, হিন্দু, মুসলমানকে যাদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা করে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমি আপনাদের কাছে দুই-একটা কথা বলতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ, আজ থেকে আমার হুকুম ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়।’

রেসকোর্সের জনসভায় তিনি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভাষণে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকবি তুমি বলেছিলে “‍সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি।’’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তুমি দেখে যাও, তোমার আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি। তোমার কথা মিথ্যা প্রমাণিত করে আজ ৭ কোটি বাঙালি যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছে। হে বিশ্বকবি তুমি আজ জীবিত থাকলে বাঙালির বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে নতুন কবিতা সৃষ্টি করতে।’

ভাষণের একপর্যায়ে বলেন, ‘আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু এসে থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব। আমার বাঙালি জাতকে অপমান করে যাব না। তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না এবং যাবার সময় বলে যাব, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।’

মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান যেমন সত্য, তেমনি এ দেশের মাটিতে ভারতীয় সৈন্যের অনির্দিষ্টকালের অবস্থানের ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াও ছিল এক বাস্তব সত্য। আর তা ভেবে বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, ‘যারা জানতে চান আমি বলে দেবার চাই, আসার সময় দিল্লিতে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আমি আপনাদের বলতে পারি, আমি জানি তাকে। তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। সে নেহেরুর কন্যা। তারা রাজনীতি করছে। ত্যাগ করছে। যেদিন আমি বলব সেই দিন ভারতের সৈন্য বাংলার মাটি ছেড়ে চলে যাবে। এবং আস্তে আস্তে কিছু সৈন্য সরায়ে নিচ্ছে।’ 

সেই ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু লাখ লাখ অনুরাগীর ভালোবাসায় সিক্ত হন। বাংলাদেশের জনগণ এদিনই প্রাণভরে বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ উপভোগ করে। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বাংলার মানুষ তখনো জানত না তাদের নয়নের মণি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জীবিত আছেন কিনা। তাই বিজয়ের মধ্যেও মানুষের মনে ছিল শঙ্কা ও বিষাদের ছাপ। এছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শারীরিক উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। তাই ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে ১০ জানুয়ারি ছিল বাঙালির জন্য পরিপূর্ণভাবে স্বাধীনতা অর্জনের দিন।

দেশে ফিরে একদিন পর বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করে দেশকে একটি ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে টেনে তোলার দায়িত্ব হাতে তুলে নিয়েছিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে ভারতীয় বাহিনীকে সসম্মানে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হন। ভারত থেকে দেশে ফেরা প্রায় এক কোটি ছিন্নমূল শরণার্থীকে পুনর্বাসন করেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশকে তিনি জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসি, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনসহ অন্যান্য বিশ্ব সংস্থার সদস্য করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই স্বল্প সময়ে তিনি আদায় করেছিলেন দুই শতাধিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মাথায় বিশ্বের অন্যতম আধুনিক একটি সংবিধান রচনা ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের এক অমর কীর্তি। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট এ মহান নেতারই অবদান। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে তিনি প্রথম ব্যক্তি, যিনি বাঙালি জাতির জন্য একটি পৃথক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।

এ বছর বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বকে ‘হার্ড পাওয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে টাইম ম্যাগাজিন। জননেত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই বলে আসছেন যে তিনি চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পান না। বঙ্গবন্ধু কন্যার রাজনীতি নিজের জন্য নয়, দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নেই তার এ পথচলা। এবার তার নেতৃত্বে সমগ্র জাতি নতুন উদ্দীপনায় আত্মনিয়োগ করবে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্নকে সফল করার মাধ্যমে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ‘‌সোনার বাংলা’ গড়ার মহান ব্রতে।

অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর: ট্রেজারার, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও