বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নন-কটন পণ্যের দিকে না এগোলে বাংলাদেশ শুধু প্রতিযোগিতায় পিছিয়েই পড়বে না, বরং দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিও পড়বে ঝুঁকিতে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি এখনো মূলত কটননির্ভর। গত এক দশকে এ নির্ভরতা কমেছে সামান্যই। একই সময়ে বিশ্ববাজার দ্রুতগতিতে সরে গেছে নন-কটনের দিকে। ২০২৫ সালের চিত্র অনুযায়ী (ইপিবি, ক্যালেন্ডার বছর হিসেবে) বাংলাদেশের পোশাক রফতানির ৭২ দশমিক ৭ শতাংশই কটননির্ভর। এর মধ্যে নন-কটন মাত্র ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ (ম্যানমেড ফাইবার, উল, সিল্ক ও মিশ্র ফাইবার মিলিয়ে)। একই বছরে বিশ্বব্যাপী চিত্র (আইটিসির ট্রেড ম্যাপ অনুযায়ী) প্রায় উল্টো অর্থাৎ ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ কটন আর ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ নন-কটন। অর্থাৎ বিশ্ববাজার এখন মূলত নন-কটননির্ভর। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো মূলত কটননির্ভর।
দশকের হিসাব ঘাঁটলে সমস্যাটি আরো স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশে কটনের হিস্যা ২০১৬ সালে ৭৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে নেমেছে ৭২ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ দশ বছরে কমেছে মাত্র দেড় শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সময়ে বিশ্বে কটনের হিস্যা কমেছে ৪৬ দশমিক ৫ থেকে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশে, প্রায় পাঁচ পয়েন্ট। এটি বাংলাদেশের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি গতিতে ঘটেছে। ফলে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ-বিশ্বের নন-কটন হিস্যার ব্যবধান ছিল ২৭ দশমিক ৭ পয়েন্ট, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩১ দশমিক ১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই, কিন্তু বিশ্বের সঙ্গে দূরত্ব কমছে না বরং বাড়ছে। ইপিবির তথ্য লিপিবদ্ধ করার সময় কিছু পণ্য সরাসরি ফাইবার ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকার কারণে কিংবা ব্লেন্ডেড বা মিশ্রিত অংশে থাকায় নির্দিষ্ট কোনো শতাংশে তা সরাসরি হিসাব করা সম্ভব হয় না। অন্যথায় প্রতিটি ক্যাটাগরিতেই কিছু না কিছু অংশ বাড়ত। তবে বাংলাদেশের এ ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকও আছে। নন-কটন ফাইবারের মাঝে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ফাইবার হলো ম্যানমেড ফাইবার। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ম্যানমেড ফাইবারের হিস্যা ২০১৬ সালে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল। ২০২৫ সালে তা ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ (২০২১ সালে সর্বোচ্চ ছিল ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ, এরপর কিছুটা কমে গত দুই বছরে আবার বাড়ছে)। সক্ষমতা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু এত ধীরগতিতে যে সামগ্রিক কটননির্ভরতায় তেমন হেরফের হচ্ছে না।
প্রতিযোগীদের সঙ্গে তুলনায় অবস্থানটি আরো স্পষ্ট। ২০২৫ সালে দেশভেদে ম্যানমেড ফাইবারের হিস্যা: পাকিস্তান ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারত ১৬ দশমিক ৭, বাংলাদেশ ১৬ দশমিক ৮ (ইপিবি), কম্বোডিয়া ৪৩ দশমিক ৬, ইন্দোনেশিয়া ৪৪ দশমিক ৮, চীন ৪৮ দশমিক ৪ ও ভিয়েতনাম ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ। পাকিস্তান আর ভারতও সস্তা শ্রমনির্ভর দেশ, তবু কটনেই আটকে আছে। তাই বিষয়টা শুধু মজুরির প্রশ্ন নয়। আবার কম্বোডিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে সামান্যই বেশি, তবু সিনথেটিক ফাইবারে তাদের সক্ষমতা প্রায় ভিয়েতনাম-চীনের কাছাকাছি। শুধু মজুরি এখানে পার্থক্য গড়েনি। বিনিয়োগ ও নীতিসিদ্ধান্ত এখানে মূল প্রভাবক। মূল কথা হলো বাংলাদেশ নন-কটনের দিকে তথা ম্যানমেড ফাইবারের দিকে এগোচ্ছে, কিন্তু এত ধীরে যে বিশ্বের সঙ্গে ব্যবধান কমার বদলে বাড়ছে। আউটারওয়্যার, টেকনিক্যাল ও স্পোর্টসওয়্যারের মতো বেশি মুনাফার ক্যাটাগরি মূলত সিনথেটিক ও মিশ্র ফাইবারনির্ভর। এখানে ঢুকতে নন-কটন তথা ম্যানমেড ফাইবারে বিনিয়োগের গতি বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। প্রভাবটা ক্যাটাগরি পর্যায়েও স্পষ্ট: আউটারওয়্যার বিশ্ববাজারের সবচেয়ে বড় ক্যাটাগরি, বিশ্ব রফতানির ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ এটির দখলে। অথচ এক্ষেত্রে বাংলাদেশের রফতানি হিস্যা মাত্র ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। কটননির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা দিয়ে এ ক্যাটাগরিতে ঢোকা কাঠামোগতভাবেই সম্ভব নয়।
প্রতিযোগী দেশ অর্থাৎ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া নিজেদের নন-কটন হিস্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়াচ্ছে। চীন নিজের কটন সুতা-কাপড় উৎপাদনের বড় অংশ সরিয়ে নিয়েছে ভিয়েতনামে, আর নিজে বিনিয়োগ করছে নন-কটন ও উঁচু প্রযুক্তির ফাইবারে। অর্থাৎ বিশ্বের বড় উৎপাদক-বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই বাজি ধরছেন নন-কটনের ওপর। বাংলাদেশ এখনই এগিয়ে না এলে এ ব্যবধান আরো বাড়বে। প্রশ্নটা শুধু পরিসংখ্যানের নয়, বাংলাদেশের সামনের বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িত। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর শুল্ক সুবিধা কমতে থাকবে, আর সেই ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লাগবে ঠিক ওই মৌলিক, কটননির্ভর পণ্যগুলোতেই। আর এ ধরনের পণ্যের ওপরই বাংলাদেশ এখন বেশি নির্ভরশীল। একই সময়ে বড় ব্র্যান্ড ক্রেতাদের চাহিদা সরে যাচ্ছে টেকনিক্যাল, পারফরম্যান্স ও সিনথেটিক-মিশ্র পণ্যের দিকে। এখানে মুনাফার মার্জিন বেশি, মজুরি প্রতিযোগিতার চাপ কম। এ দুই স্রোত মিলে বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোকে সিলিংয়ে আটকে দিচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি চাপ। বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা ও প্রতিযোগিতা প্রায় স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ক্রেতারা বাড়তি দামে পণ্য কিনতে রাজি নন, আর সেই মূল্য চাপ ব্র্যান্ড বায়াররা সরাসরি চাপিয়ে দিচ্ছেন কারখানার ওপর। ফলে উদ্ভাবন, বৈচিত্র্য বা নতুন সক্ষমতার খরচ জোগানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ চাপ সামলাতে নন-কটন পণ্য হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি। কারণ বেশি মূল্য সংযোজিত এসব ক্যাটাগরিতে মার্জিন তুলনামূলক বেশি, মূল্য চাপ সামলানোর সক্ষমতাও বেশি।
বিশ্ববাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে কটনের পাশাপাশি অন্য ফাইবারেও দ্রুত যুক্ত হতে হবে। এর জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও অবকাঠামো—সিনথেটিক ও টেকনিক্যাল ফাইবার প্রক্রিয়াজাত করার মেশিনারি এবং রং-ফিনিশিং সক্ষমতা, যা আজকের কটনকেন্দ্রিক কারখানা কাঠামোয় সীমিত। দরকার দক্ষ টেকনিশিয়ান-প্রকৌশলী তৈরির লক্ষ্যবদ্ধ প্রশিক্ষণ, কারণ সিনথেটিক প্রক্রিয়াকরণ কটনের চেয়ে আলাদা ও বেশি কারিগরি দক্ষতা দাবি করে। দরকার নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, কারণ সিনথেটিক রঙ-ফিনিশিং জ্বালানি বেশি খরচ করে। আর দরকার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ—সরকারি নীতিসহায়তা ও বিদেশী বিনিয়োগ দুই দিক থেকেই, ঠিক যেভাবে কম্বোডিয়া-ইন্দোনেশিয়া তুলনামূলক কম মজুরিতেও এ সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
পরিকল্পনা অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, জ্বালানি নিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ—এ চার বিষয় একসঙ্গে এগোতে না পারলে বাংলাদেশের নন-কটন তথা ম্যানমেড ফাইবারে যাত্রা ধীরগতিতেই থেকে যাবে, আর বিশ্ববাজারের সঙ্গে ব্যবধান বাড়তেই থাকবে। কটন বাংলাদেশের শক্তির জায়গা থাকবেই, কিন্তু শুধু কটনের ওপর ভরসা করে আগামী দশকের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে আগামী দশকে বাংলাদেশ শুধু রফতানির পরিমাণে নয়, মূল্য সংযোজনেও বিশ্ববাজারের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে—আর সেটাই হওয়া উচিত এ যাত্রার আসল লক্ষ্য।
মহিউদ্দিন রুবেল: প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস