অর্থনীতি পর্যালোচনা

করোনাক্রান্তিতে যাপিত জীবন

করোনাক্রান্তি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে অভূতপূর্ব হুমকির মধ্যে ফেলেছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামোয় বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনার প্রভাব মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন নীতি-কৌশল ও ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে বৈষম্যমূলক প্রভাবের কারণে পিছিয়ে পড়া, দুর্বল, ঝুঁকিপ্রবণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তরা ক্রমে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।

করোনাক্রান্তি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে অভূতপূর্ব হুমকির মধ্যে ফেলেছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামোয় বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনার প্রভাব মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন নীতি-কৌশল ও ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে বৈষম্যমূলক প্রভাবের কারণে পিছিয়ে পড়া, দুর্বল, ঝুঁকিপ্রবণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তরা ক্রমে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।

সম্পদ ওপরের দিকে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। নতুন দারিদ্র্য বাড়ছে। নতুন ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কাতারে যুক্ত হয়েছে (বিআইডিএস, ২০২০)। করোনার প্রথম চার মাসেই বেকারত্ব বেড়েছে ১০ গুণ। আর্থিক সংকটে পড়া ৪৬ দশমিক ২২ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় ভেঙে এবং ৪৩ শতাংশের বেশি পরিবার আত্মীয়স্বজনের সাহায্য-সহায়তার ওপর নির্ভর করে সংসার চালিয়েছে (বিবিএস, ২০২০)। বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো পর্যাপ্ত নয়।

এখানে করোনাক্রান্তিতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও খাতের মানুষের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি পুনরুদ্ধার কৌশলের দিকনির্দেশনা উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। 

স্বাস্থ্যসেবা খাত: সালমা নারায়ণগঞ্জে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত। মার্চে প্রথম তিনি হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগী দেখতে পান। ওই সময়ে করোনা সংক্রমিত কাউকে চিকিৎসাসেবা দেয়ার কোনো কিছুই জানা ছিল না তাদের। কারণ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত রোগীদের শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল না। পরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সালমা দেখতে পান, হাসপাতালটির প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জামাদি (পিপিই), ভেন্টিলেটর এবং অন্যান্য সরঞ্জামের কিছুই নেই। ফলে তারা নতুন রোগীদের প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই চিকিৎসক-নার্সসহ হাসপাতালের অনেক কর্মী সংক্রমিত হয়ে পড়েন।

বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে ডাক্তারের অনুপাত মাত্র ৫ দশমিক ২৬ জন। এ অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে ১৬ দশমিক ৫ কোটি জনসংখ্যার জন্য আইসিইউ শয্যা আছে মাত্র এক হাজারের মতো। অন্যদিকে ৬৭টি জেলার মধ্যে মাত্র ৪৭টি জেলায় আইসিইউ সুবিধা আছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের নাজুক দশা মহামারীতে মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

অভিবাসী শ্রমিক: হারুন ইতালিতে রেস্তোরাঁ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ইতালি লকডাউনে যাওয়ার সময় তিনি চাকরি হারান এবং তখন তার পক্ষে দেশে ফেরাও সম্ভব ছিল না। হারুন এখন নিজের সামান্য সঞ্চয়টুকু ভেঙে পাঁচজনের সঙ্গে একটি রুমে ভাগ করে থাকছেন। দেশে ফিরতে না পারা বেশির ভাগ অভিবাসী শ্রমিক গ্রেফতার এবং দেশে ফেরত পাঠানোর আতঙ্কে আছেন। ২১টি জেলায় ২০০টি খানায় একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ সময়ে প্রতিটি খানায় গড়ে ৪৭ হাজার টাকা অভিবাসী আয় আসে। তবে কভিড-১৯-এর কারণে ৬১ শতাংশ খানায় কোনো অভিবাসী আয়ই আসেনি। অন্য ৩৯ শতাংশ খানায় এখন প্রতি মাসে গড়ে ৩০ হাজার টাকা অভিবাসী আয় আসছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় ৩৬ শতাংশ কম। এ খানাগুলোর ৫৭ শতাংশেই রেমিট্যান্স একমাত্র আয়ের উৎস (বিসিএসএম ও আরএমএমআরইউ, ২০২০)।

করোনায় অভিবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও অক্টোবরে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে ছিল ৪৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এরই মধ্যে বিদেশে শ্রমিক যাওয়া ৭১ শতাংশ কমেছে (আরএমএমআরইউ, ২০২০)। এ কারণেই অভিবাসী আয় কমতে শুরু করেছে। বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে না দাঁড়ালে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। কারণ ছদ্মবেকার ও উননিয়োজিত শ্রমিক গ্রাম থেকে শহরে ও বিদেশে শ্রমিক হিসেবে যাওয়ার কারণেই গ্রামে ভোগব্যয় বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে। অভিবাসী আয় কমে গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

নারী: শিরিন তার নিজস্ব ছোট্ট ক্যাটারিং ব্যবসা পরিচালনা করেন। তিনি চুক্তির ভিত্তিতে বিভিন্ন অফিসে দুপুরের খাবার সরবরাহ করতেন। কিন্তু করোনার কারণে বিভিন্ন অফিস বন্ধ হয়ে গেলে এবং ঘরে বসে কাজ শুরু হওয়ার পর শিরিন খাবার সরবরাহের সব চুক্তি হারান। কয়েক মাস ধরে শিরিনের আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও পরিবারের ভরণপোষণের খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। 

আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়ায় সংসারে ঘন ঘন কলহের ঘটনা ঘটছে। স্বামীর হাতে প্রায়ই তিনি শারীরিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। করোনায় অর্থনৈতিক চাপে শিরিনের মতো অনেক পরিবারে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন বেড়েছে। প্রায় ৫৮ শতাংশ নারী মনে করেন, মহামারীতে দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণেই সহিংসতা ও নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে (ব্র্যাক, ২০২০)। 

যুবক ও শিশু: সুমনের বয়স ১৯ বছর। তিনি মিরপুরের একটি হোস্টেলে থাকেন। সুমন মাধ্যমিক পর্যায়ের দুজন শিক্ষার্থীকে বাসায় গিয়ে পড়াতেন। করোনার মধ্যে অনলাইনে পড়ানো চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাকে এখন অর্ধেক বেতন দেয়া হচ্ছে।

করোনা অভিঘাতের আগেই যুবকদের অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছিল। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুব বেকারত্বের হার ছিল ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। বিআইডিএস এক গবেষণায় দেখিয়েছে, শিক্ষিত যুবকদের প্রায় ৩৩ শতাংশই ছিল বেকার। আইএলও ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের যৌথ প্রতিবেদন বলছে, করোনার কারণে বাংলাদেশে ১১ দশমিক ১৭ লাখ থেকে ১৬ দশমিক ৭৫ লাখ যুবক বেকার হতে পারেন।

অর্থনীতিতে বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতা এবং করোনার অভিঘাত যুবকদের এক ধরনের প্রিক্যারিটি বা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে। কিন্তু বিশালসংখ্যক যুবককে কাজে লাগানো না গেলে রাষ্ট্র জনমিতিক লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে বেশির ভাগ পরিবারের আয় কমে যাওয়ায় এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশুরা এখন আরো বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম, পরিবারের সদস্যদের দ্বারা শারীরিক শাস্তি এবং মনোসামাজিক সমস্যার ঝুঁকিতে রয়েছে (সেভ দ্য চিলড্রেন, ২০২০)।

বয়স্ক এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী: শামসুল আলম একজন অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী। ডায়াবেটিস ও হূদযন্ত্রের সমস্যার কারণে তিনি বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তার স্ত্রীর তীব্র বাতরোগ থাকায় তেমন হাঁটাচলা করতে পারেন না। অধিকাংশ সময় হুইলচেয়ারেই বসে থাকতে হয়। করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় শামসুল স্ত্রীকে ফিজিওথেরাপির জন্য হাসপাতালে নিতে ভয় পাচ্ছিলেন। শামসুল আলম এবং তার স্ত্রীর মতো বয়স্কদের করোনায় আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি।

বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি বয়স্ক মানুষ একাধিক স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগছেন। এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি বয়স্ক মানুষের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। ব্যাপক আতঙ্ক, ক্রমবর্ধমান সামাজিক যোগাযোগের অভাব, চলমান সংকটের ভয় এবং ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাতে ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০-১৫ শতাংশ প্রতিবন্ধিতার শিকার। আয় হ্রাস, নতুন দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে প্রতিবন্ধীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন।

বস্তিবাসী: পাঁচজনের পরিবার নিয়ে শাহানা মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ বস্তির পশ্চিম প্রান্তে একটি রুম ভাড়া করে থাকেন। শাহানা তিনটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে খণ্ডকালীন কাজ করতেন। মহামারী শুরু হলে দুটি পরিবার সংক্রমণের উদ্বেগ থেকে তাকে বিদায় করে দেয়। এখন শাহানার মাসিক আয় এক-তৃতীয়াংশের নিচে নেমে এসেছে। অটোরিকশাচালক স্বামীর উপার্জন পুরোপুরি হ্রাস পেয়েছে।

লকডাউনে বস্তির প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবারের প্রধান অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। ২০২০ সালের ফেব্রয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে শাহানার মতো শহুরে বস্তিবাসীদের মাথাপিছু দৈনিক আয় ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তার স্বামীর মতো অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেকেরই ৮০ থেকে ৯৯ শতাংশ আয় হ্রাস পেয়েছে।

অনানুষ্ঠানিক খাত: রিয়াজ ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির চালক হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। করোনা শুরু হলে গাড়ির মালিক কয়েক মাস ধরে তাকে বেতন দিচ্ছেন না। কিন্তু গাড়ি চালানো ব্যতীত বিকল্প কোনো কাজ খোঁজার পথ নেই তার। পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে না পেরে তিনি শেষমেশ গ্রামে ফিরে গেছেন। রিয়াজ এখন হন্যে হয়ে কাজের সন্ধানে ফিরছেন।

মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ তথা ৫ দশমিক ১৭ কোটি মানুষ কোনো রকম সুরক্ষা ছাড়াই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা যেকোনো সময় তাদের জীবিকা নির্বাহের উপায়টি হারাতে পারেন এবং যেকোনো সময় দারিদ্র্যের সীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। আয় না করে রাজধানীতে বসবাস করা ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকে গ্রামে ফিরে গিয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ গ্রামাঞ্চলে অবস্থার অবনতি ঘটিয়েছে। ফলে অধিকাংশ মানুষ সর্বাত্মক অভিঘাতের মুখোমুখি হয়েছে।

কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প: রতনের ঢাকায় একটি ছোট্ট দর্জি দোকান আছে। দোকানে কর্মচারী পাঁচজন। দোকানে আয়ের বড় অংশই আসে দুই ঈদে। কিন্তু এ বছরটি ছিল ভিন্ন। করোনার প্রথম তিন মাস দোকান বন্ধ ছিল, তাই ঈদুল ফিতরে কোনো আয়ই হয়নি। আবার ঈদুল আজহায় দোকান খোলা থাকলেও যৎসামান্য কাজ হয়েছে। এরই মধ্যে রতনের সঞ্চয় ফুরিয়েছে। কয়েক মাসের দোকান ভাড়া এবং কর্মচারীদের বেতন বাকি।

ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র শিল্পে সরকার ঘোষিত ঋণভিত্তিক অর্থসহায়তা দিতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। যদিও বেসরকারি খাতের প্রতি তিনজনের দুজনই এ খাতে নিযুক্ত। জীবিকার জন্য ৩ দশমিক ১২ কোটির বেশি মানুষ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। মহামারীতে এসএমই খাতের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছে এবং ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ ব্যবসা বন্ধ থাকা বা আংশিকভাবে বন্ধ থাকার কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রায় ৯৪ শতাংশ এমএসএমইর বিক্রয় কমেছে এবং তাদের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ সরকারি সহায়তা পেয়েছে।

ম্যানুফ্যাকচারিং খাত: নাসিমা সম্প্রতি কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করেন। তার উপার্জন সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম ৮ হাজার টাকা মজুরির একটি অংশ মাত্র। এই যৎসামান্য আয়ে কোনো রকমে জীবনযাপন চলে। কিন্তু লকডাউন শুরু হলে কারখানাটি তার পাওনা পরিশোধ না করে বন্ধ হয়ে যায়। নাসিমার কোনো সঞ্চয় বা জীবনধারণের বিকল্প উপায় নেই। কারখানা চালু হলে তিনি পুনরায় সামান্য মজুরিতে কাজে যোগ দিয়েছেন।

এপ্রিলে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের কার্যক্রম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমেছে। মজুরির হার ২০২০ সালের জানুয়ারির ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে জুলাইয়ে ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের তুলনায় এবার তৈরি পোশাক রফতানি হ্রাস পেয়েছে ৪৪৮ কোটি মার্কিন ডলার। মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে ১৭৯টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে প্রায় দশমিক ১ কোটি শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। অধিকন্তু, ৪৭ শতাংশ শ্রমিক মজুরি পাননি (ব্র্যাক, ২০২০)।

কৃষি খাত: কভিড-১৯ যখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে, ফেনীর নিকটবর্তী একটি প্রত্যন্ত গ্রামে রহমত বিভিন্ন কারণে চিন্তিত। বোরো মৌসুমে তার লোকসান হয়েছিল এবং রহমত ঋণ শোধ করতে পারেননি।

দেশের কৃষকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্র্যাকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারীজনিত কারণে প্রায় সব কৃষকই সরকার নির্ধারিত মূল্যের নিচে ফসল বিক্রি করেছেন। কভিড-১৯-এর প্রভাবে কৃষকদের প্রথম দেড় মাসে ৫৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। রহমতের মতো কৃষকদের গড় ক্ষতি প্রায় দশমিক শূন্য ২৮ কোটি টাকা (ব্র্যাক, ২০২০)। তার ওপরে এক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কারণে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। এতে দুর্ভোগ আরো বেড়েছে।

সেবা খাত: রূপায়ণ চাকমা রাঙ্গামাটির সাজেকের পাহাড়ে একটি খুদে রিসোর্টের মালিক। ভ্রমণে বিধিনিষেধের কারণে তার রিসোর্টের প্রায় সব বুকিং শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছিল। চার মাস ধরে রূপায়ণ কর্মচারীদের আংশিক বেতন নিজস্ব সঞ্চয় থেকে প্রদান করে যাচ্ছেন। আর নিজের ব্যবসায় গুনতে হচ্ছে বড় ধরনের লোকসান।

মহামারীর একেবারে গোড়ার দিকেই সেবা খাতের বেশির ভাগ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পর্যটন, পরিবহন ও যোগাযোগ, ব্যাংক-বীমা, হোটেল ও রিসোর্টের মতো খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ সেবা খাতে নিয়োজিত। জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি আসে এ খাত থেকে। মহামারীজনিত কারণে পর্যটন খাতের প্রাক্কলিত ক্ষয়ক্ষতি হবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা (উন্নয়ন অন্বেষণ, ২০২০)। পরিবহন খাতে প্রায় দশমিক ২৩ কোটি শ্রমিক নিযুক্ত এবং লকডাউনের কারণে এ খাত প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লোকসান করেছে। সামগ্রিকভাবে পরিষেবা খাতের মজুরির হার জুলাইয়ে হ্রাস পেয়ে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ হয়েছে। জানুয়ারিতে ছিল ৬ দশমিক ২২ শতাংশ (পিপিআরসি-বিআইজিডি, ২০২০)।

আনুষ্ঠানিক খাত: ওয়ালিউল হক ঢাকার একটি বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা বিভাগে সাত বছর ধরে কাজ করছিলেন। করোনায় কোম্পানিটির সংকোচন নীতির কারণে ওয়ালিউলকে চাকরি হারাতে হয়। এখন তিনি জীবিকার তাগিদে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ্লিকেশনগুলো ব্যবহার করে আয় করেছেন। করোনায় আনুষ্ঠানিক খাতেই এমন প্রভাব পড়েছিল।

যদিও অনানুষ্ঠানিক খাতের চেয়ে এখানে তুলনামূলকভাবে বেশি চাকরির সুরক্ষা থাকে বলে মনে করা হয়। আনুষ্ঠানিক খাতের দশমিক ৯ কোটি শ্রমিকের মধ্যে ৮৪ শতাংশ নিযুক্ত বেসরকারি খাতে। কিছু বেসরকারি সংস্থা তাদের মজুরি প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ কমিয়েছে। মহামারীর প্রথম কয়েক মাসে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, বাণিজ্যিক ও বহুজাতিক ব্যাংকের আয় কমেছে ৬৬ শতাংশ। অধিকন্তু, করোনার মধ্যেই সরকার ২৫টি সরকারি মালিকানাধীন পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে আরো ২৫ হাজার স্থায়ী কর্মী বেকারত্বের মুখে পড়েছেন।

রোহিঙ্গা শরণার্থী: ফাতেমা শরণার্থী শিবিরের একটি ছোট কুঁড়েঘরে দুটি সন্তান এবং ছোট ভাইকে নিয়ে থাকেন। তিনি সন্তানসম্ভবা। সম্প্রতি ফাতেমা লক্ষ করেছেন, এনজিওর লোকজন আগের মতো আসে না এবং বিভিন্ন সেবাও আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। ফাতেমা নভেল করোনাভাইরাস সম্পর্কে মানুষের মুখে ভাসা ভাসা শুনেছেন। কিন্তু এনজিওকর্মীরা না এলে ফাতেমা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাও পাবেন না।

মহামারীতে শিবিরগুলোয় যৌন হয়রানি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বেড়েছে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণ উভয়ের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ এমনিতেই হ্রাস পেয়েছে। প্রশাসন বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম ৮০ শতাংশ হ্রাস করার ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো অবনতি ঘটে। অন্যদিকে উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার সুযোগ না থাকায় রোহিঙ্গা নারী ও শিশু পাচারের ঝুঁকি বেড়েছে।

উপসংহার: সরকারের বিভিন্ন নীতি-কৌশলে অনুমান করা হচ্ছে মহামারী শেষ হওয়া মাত্রই অর্থনীতি দ্রুত আগের অবস্থানে ফিরে আসবে। কিন্তু পুনরুদ্ধারে গৃহীত নীতি কৌশল প্রকৃতপক্ষে দরিদ্রকে আরো দরিদ্র এবং মধ্যবিত্তের ভাঙন ত্বরান্বিত করেছে। বিপরীতে গোষ্ঠীতন্ত্র সব সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। ফলে সমাজে বৈষম্য ও মেরুকরণ বাড়ছে এবং পুনরুদ্ধার পথ ক্রমে ইংরেজি কে অক্ষরের মতো চেহারা ধারণ করছে। 

সরকার নীতি-কৌশলে সক্রিয় প্রতিরোধ (অ্যাকটিভ রেসট্রেইন্ট) ব্যবস্থা তথা সরকারিভাবে গণদ্রব্য বা পাবলিক গুডস প্রদান, সম্পদ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সুফল ও সুযোগ-সুবিধার সুষম বণ্টন, সামষ্টিক আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ এবং অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের জন্য নীতিমালা গ্রহণ করলে অপেক্ষাকৃত একটি সমতাভিত্তিক পুনরুদ্ধার সম্ভব। আর নীতি-কৌশলে সক্রিয় নিষ্ক্রিয়তার (অ্যাকটিভ ইনেকশন) আশ্রয় নিলে তথা প্রচলিত ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখলে অর্থনীতি চরম বৈষম্যমূলক পুনরুদ্ধারের পথে যেতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে মডার্ন মনিটারি তত্ত্বের (এমএমটি) আলোকে অর্থ সরবরাহ বাড়ানো তথা ঋণভিত্তিক প্রণোদনা প্যাকেজ খুব কার্যকরভাবে কাজ করবে না। ঋণভিত্তিক প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নসংক্রান্ত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো তা-ই বলছে। আবার রাজস্ব নীতির মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ বাড়ালেও আর্থিক নিষ্কাশন বা ফিসক্যাল ড্রেনেজের কারণে সহায়তা সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছানো দুরূহ। এখানে পুনরুদ্ধারের মূল লক্ষ্য তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সার্বিক চাহিদা বৃদ্ধি অর্জিত না হয়ে গোষ্ঠীতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতার (অপ) ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা বিদ্যমান। ফলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়া কঠিন। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও সক্ষমতা বাড়িয়ে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি। একই সঙ্গে সমতা, টেকসইযোগ্যতা এবং যেকোনো অভিঘাত মোকাবেলার সক্ষমতা ও সহনশীলতা অর্জনের পথে যেতে হবে। এক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মতো রাষ্ট্রকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। তবেই একটি গুণগত মানসম্পন্ন ও টিকে থাকার যোগ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব।

 

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চেয়ারপারসন, উন্নয়ন অন্বেষণ

মো. শাহ পরান, আদরিনা ইবনাত, জামিলী আদিবা ও ওয়াহিদ হায়দার: উন্নয়ন অন্বেষণের গবেষক

আরও