প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের বিশ্লেষণ

বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি জনস্বার্থের জন্য হুমকি হলে তাদের লাগাম টেনে ধরা সরকারের দায়িত্ব

বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর ক্রমাগত বাড়তে থাকা ঋণ নীতিনির্ধারকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। নেক্সটএরা এখন ঝুঁকিপূর্ণ ‘হাইব্রিড বন্ড’ ইস্যু করার ক্ষেত্রে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এটি তাদের সুদের পরিশোধ স্থগিত রাখার সুযোগ দিচ্ছে। অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ততা আর্থিক ঝুঁকি বাড়ায় এবং ঋণ নেয়ার খরচ বাড়িয়ে দেয়। আর এমন হলে কোম্পানিগুলো সাধারণত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এটি জনসেবামূলক এসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বকেও হুমকির মুখে ফেলে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অভাবনীয় প্রসার বিদ্যুৎ খাতকে রাতারাতি রাজনীতির মূল আলোচনায় নিয়ে এসেছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এতদিন বেশির ভাগ মানুষের চোখের আড়ালেই ছিল। বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো এখন ডাটা সেন্টারের বিশাল বিদ্যুতের চাহিদা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে আইনপ্রণেতারাও এখন প্রশ্ন তুলছেন, বিদ্যুৎ বিল না বাড়িয়ে এ বিশাল চাহিদা মেটানো সম্ভব কিনা, কিংবা আদৌ তা করা উচিত কিনা। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এর চেয়েও নীরব একটি প্রবণতা সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল আরো বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি করপোরেট জবাবদিহিকে দুর্বল করার হুমকি দিচ্ছে। কারণ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত একীভূত হচ্ছে এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে।

আমেরিকানরা আগেও এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। এক শতাব্দী আগে, বিদ্যুৎ খাতের শীর্ষকর্তারা বিশাল সব হোল্ডিং কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন, যা ডজন ডজন বা শত শত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মালিক ছিলেন। সামগ্রিকভাবে ‘পাওয়ার ট্রাস্ট’ নামে পরিচিত এ করপোরেট সাম্রাজ্যগুলো দেখতে বিশাল ও শক্তিশালী মনে হলেও তারা ছিল প্রচণ্ড ঋণগ্রস্ত। ১৯২৯ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর এর অনেকগুলোই ভেঙে পড়েছিল।

বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর একীভূত হওয়া নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক অতীতের তুলনায় বর্তমানের চুক্তিগুলোর আকার ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেক্সটএরা ও ডমিনিয়ন এনার্জির মধ্যকার ৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের চুক্তিটি এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এটি বাস্তবায়ন হলে ফ্লোরিডা, ক্যারোলাইনা ও ভার্জিনিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বণ্টনসহ পুরো ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণকারী এক জাতীয় দৈত্যের জন্ম হবে। একই সঙ্গে সারা দেশে তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকবে, যা পাইকারি বিদ্যুৎ বাজারকে আরো বেশি মুষ্টিমেয় প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দি করে ফেলতে পারে। উল্লেখ্য, এ পাইকারি বাজারেই বিদ্যুৎ কোম্পানি, শিল্পগ্রাহক ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কেনাবেচা হয়।

একীভূত এ নতুন কোম্পানিটি ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিশাল রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করবে। নেক্সটএরার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে ক্ষমতা অপব্যবহারের নানা অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে সাংবাদিকদের ভয় দেখানো, স্থানীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে ভুয়া প্রার্থীদের সমর্থন দেয়া এবং জ্যাকসনভিলের সরকারি বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা অন্তর্ভুক্ত।

প্রস্তাবিত এ মেগা-একীভূতকরণের উদ্যোগটি আসে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, ক্যালপাইন যখন কনস্টেলেশন কিনে নেয় ঠিক তার পর পরই। মিড-আটলান্টিক পাইকারি বিদ্যুৎ বাজারে এ নতুন কোম্পানির এককভাবে দাম নির্ধারণ করার ক্ষমতা তৈরি হওয়া সত্ত্বেও ফেডারেল এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এ চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতের নিশ্চিত ও মোটা অংকের লাভের লোভে প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মগুলো এখন আক্রমণাত্মকভাবে এ খাতে প্রবেশ করছে। ২০২৫ সালে ব্ল্যাকরক কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে মিনেসোটার বিদ্যুৎ কোম্পানি অ্যালেট কিনে নেয়। এদিকে চলতি বছরের শুরুতে সুইডিশ প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম ইকিউটির সঙ্গে জোট বেঁধে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এইএস অধিগ্রহণ করে। আর এখন ব্ল্যাকস্টোন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ কোম্পানি টিএক্সএনএম এনার্জিকে কেনার চেষ্টা করছে।

সম্ভাব্য ক্রেতাদের দাবি, বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে কোম্পানিগুলোর পরিধি আরো বড় করা প্রয়োজন। কিন্তু অ্যালেটের মতো কোম্পানিগুলোর কাছে ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং নতুন ডেটা সেন্টারে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা এখনই রয়েছে। অন্যদিকে প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মগুলো প্রায়শই স্বল্পমেয়াদি লাভকে প্রাধান্য দেয়। তাই তারা অপরিহার্য রক্ষণাবেক্ষণকে অবহেলা করতে পারে এবং বিদ্যুৎ কর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে খরচ কমাতে পারে।

বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর ক্রমাগত বাড়তে থাকা ঋণ নীতিনির্ধারকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। নেক্সটএরা এখন ঝুঁকিপূর্ণ ‘হাইব্রিড বন্ড’ ইস্যু করার ক্ষেত্রে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এটি তাদের সুদের পরিশোধ স্থগিত রাখার সুযোগ দিচ্ছে। অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ততা আর্থিক ঝুঁকি বাড়ায় এবং ঋণ নেয়ার খরচ বাড়িয়ে দেয়। আর এমন হলে কোম্পানিগুলো সাধারণত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এটি জনসেবামূলক এসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বকেও হুমকির মুখে ফেলে।

অতীতের এই ‘পাওয়ার ট্রাস্ট’ আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ১৯২০-এর দশকে স্যামুয়েল ইনসুলের মতো শীর্ষকর্তারা দেশের শীর্ষ অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিশাল সব হোল্ডিং কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন। তারা ঋণের টাকায় অন্য কোম্পানি অধিগ্রহণ করতেন, আর্থিক কারসাজির মাধ্যমে মুনাফা বাড়াতেন এবং এক করপোরেট কাঠামোর ওপর আরেক কাঠামো চাপিয়ে জটিল মালিকানা তৈরি করতেন।

এই করপোরেট পিরামিডের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা সামান্য মূলধন বিনিয়োগ করেই অসীম ক্ষমতার মালিক বনে যেতেন। উদাহরণস্বরূপ, ১৯২৯ সালে হাওয়ার্ড হবসন আর জন মাঞ্জ মিলে ‘অ্যাসোসিয়েটেড গ্যাস অ্যান্ড ইলেকট্রিক কোম্পানি’ নিয়ন্ত্রণ করতেন। কোম্পানিটির সম্পদমূল্য ছিল ৯০ কোটি ডলারের বেশি। অথচ সেখানে তাদের নিজেদের মূলধন বিনিয়োগ ছিল ৩ লাখ ডলারেরও কম।

ইনসুলের ‘মিডল ওয়েস্ট ইউটিলিটিজ’সহ এ ধরনের বেশকিছু একত্রীকরণের কোনো যৌক্তিক কর্মপরিকল্পনা ছিল না। এক অর্থনীতিবিদ এদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, এগুলো ছিল ‘অসংলগ্ন ও বিশৃঙ্খল কিছু সম্পত্তির এলোমেলো মেলবন্ধন’, যা ‘রাজনীতিবিদদের মতোই নিজ সুবিধামতো সাজানো হয়েছিল।’

সাধারণ মানুষকে সেবা দিতে পাওয়ার ট্রাস্টের এ ব্যর্থতা ব্যাপক জনঅসন্তোষের জন্ম দেয়। সহজ মুনাফার আশায় বেসরকারি কোম্পানিগুলো কেবল শিল্প-কারখানা এবং ধনী পরিবারগুলোর দিকেই নজর দিয়েছিল। ১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে শহরের অধিকাংশ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা পেয়েছিল। তবে অতিরিক্ত দাম এবং পুরনো আবাসন ব্যবস্থার কারণে অনেক শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবারে ফ্রিজ বা ওয়াশিং মেশিনের মতো যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ ছিল না।

গ্রামাঞ্চলের অবস্থা ছিল আরো করুণ। ১৯২৫ সালে আমেরিকার বড় একটি অংশই ছিল গ্রামীণ। তখন মাত্র ৫ শতাংশেরও কম খামারে বিদ্যুৎ ছিল। বিদ্যুৎ বা আশপাশে জামাকাপড় ধোয়ার দোকান (লন্ড্রি) না থাকায় হাতে কাপড় কাচতে হতো। কাজটি নারীদেরই করতে হতো এবং এজন্য কঠোর কায়িক শ্রম করতে হতো।

অবশেষে ঋণের বোঝা এ পাওয়ার ট্রাস্টের পতন ডেকে আনে। ১৯২৯ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর উৎপাদন বা কৃষি খাতের তুলনায় বিদ্যুৎ বিক্রি খুব একটা কমেনি। কিন্তু সেই সামান্য মন্দা সামলাতেই হিমশিম খেতে হয় বিশাল ঋণে জর্জরিত হোল্ডিং কোম্পানিগুলোকে। ভেঙে পড়ে ইনসুলের বিশাল সাম্রাজ্য, আর মামলার হাত থেকে বাঁচতে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।

১৯৩২ সালে সান ফ্রান্সিসকোতে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট যুক্তি দিয়েছিলেন যে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো যখন জনস্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাদের লাগাম টেনে ধরা সরকারের দায়িত্ব। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘যখন দায়িত্বজ্ঞানহীন কোনো চক্রান্তকারী কিংবা ইনসুলের মতো ব্যক্তি জনকল্যাণমূলক কাজে অংশ নিতে অস্বীকার করে এবং পুরো খাতকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেয়ার হুমকি দেয়, তখন সরকারের কাছে উপযুক্ত পদক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশা করাই স্বাভাবিক।’

রুজভেল্টের ‘নিউ ডিল’ নীতি এ দর্শনকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছিল। তিনি পাওয়ার ট্রাস্টকে ভেঙে ভেঙে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেন। এ মুহূর্তে ‘নিউ ডিল’-এর মতো কোনো উদ্যোগ নেয়া রাজনৈতিকভাবে সম্ভব নাও হতে পারে। ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করার আগেই এবং সাধারণ আমেরিকানদের ওপর পুনরায় সেই খরচের বোঝা চেপে বসার আগেই ফেডারেল ও রাজ্য সরকারগুলোর উচিত এ একীভূতকরণের রাশ টেনে ধরা।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট-২০২৬]

সন্দীপ ভাহেসান: ওপেন মার্কেটস ইনস্টিটিউটের লিগ্যাল ডিরেক্টর এবং ‘ডেমোক্রেসি ইন পাওয়ার: আ হিস্ট্রি অব ইলেকট্রোফিকেশন ইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’ (ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস, ২০২৪) গ্রন্থের লেখক।

আরও