‘বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় আগামীর করণীয়’ শিরোনামে একটা বই লিখলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন (ইউপিএল, মার্চ ২০২৪)। সর্বসাকল্যে ৬৩ পৃষ্ঠার একটা চটি বই। প্রারম্ভিকায় লেখক বলছেন, ‘বিদগ্ধজনের মতো আমিও বিভিন্ন সময়ে দেশের বিজয়রথের পথে যেসব অপূর্ণতা, উল্টো রথযাত্রা ও দুর্বলতা রয়েছে, তা সরল বিশ্বাসে শনাক্ত করে প্রতিকারের পথনির্দেশ করেছি। আশা করি দেশের নীতিনির্ধারকগণ বর্তমানে সরকারে ও বিরোধী মহল অর্থাৎ আগামী দিনে যারা সরকারে যাবেন, তাঁরা এ বইটিতে বর্ণিত সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ নজরে রাখতে রাজি হবেন।’
বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজনীতির বিদ্যমান সংকট সময়ের জন্য বইটি খুবই প্রাসঙ্গিক এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য উপযোগী করে সারসংক্ষেপ আকারে উপস্থাপিত, বিধায় বিদগ্ধ পাঠকের প্রয়োজনে নিবেদন করা হলো। মূল লক্ষ্য, বিজয়রথের পথের কাঁটাগুলো শনাক্ত করে আগামী করণীয় নির্ধারণ করা। আমেরিকার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান বলেছিলেন, আমাকে একজন এক-হাতি অর্থনীতিবিদ দাও, (Give me a one-handed Economist. All my economists say ‘on hand...’, then ‘but on the other...”), জনাব ফরাসউদ্দিন তার ‘জাতীয় সপ্তবার্ষিক কর্মপরিকল্পনার একটি প্রস্তাবিত রূপরেখা’ ঠিক এক-হাতি অর্থনীতিবিদের মতো পেশ করেছেন বলে মনে হলো। আরো মনে হলো সার্বিক নেতিবাচক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি যথেষ্ট উদ্বিগ্ন, কিছুটা ক্ষিপ্ত। বইয়ের বিভিন্ন অংশে কিছু ঠোঁটকাটা মন্তব্য দেখে মনে হয়, কবি নজরুলের ‘কৈফিয়ৎ’ কবিতার লাইনের মতো ‘দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে’।
দুই
৫৩ বছর ধরে বাংলাদেশের উন্নয়নে আমরা উল্লসিত, সন্দেহ নেই। আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বিভিন্ন অভিধায় অভিষিক্ত—রোল মডেল, উন্নয়ন ধাঁধা ইত্যাদি। এমনকি কিছু কিছু নির্দেশকে বাংলাদেশ পাকিস্তান ও ভারতকে পেছনে ফেলেছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মনে করেন বাংলাদেশ নির্দিষ্ট আর্থসামাজিক নির্দেশকে ভারতের চেয়ে ভালো করেছে। আমাদের আপাত নিশানা ২০৩১ নাগাদ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করা। ২০১০ সাল থেকে কভিড আগমনের আগ পর্যন্ত ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধির হার এবং আর্থসামাজিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সাপেক্ষে অনেক আশা-ভরসা জাগরূক ছিল। কিন্তু যে গতিতে দেশটি এগোচ্ছিল, কভিড আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এসে সে গতিকে শুধু শ্লথ করে দেয়নি, নানান জটিলতার জালে নিক্ষিপ্ত করেছে; যার মধ্যে রিজার্ভ হ্রাস, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, নাজুক বিনিময় হার অন্যতম। অবশ্য ফরাসউদ্দিনের বই মনোযোগ সহকারে পড়লে মনে হবে ওই সব সমস্যায় অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাজনিত দুর্বলতা কম দায়ী নয়। যাই হোক, বিভিন্ন বিষয়ের অবতারণা করেছেন কৃষি, আইনের শাসন এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, ন্যায়পাল নিয়োগ, ব্যাংকিং, প্রাইস কমিশন গঠন, সুনীল অর্থনীতি, ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে বিষোদগার ইত্যাদি। আজকের নিবন্ধে দুএকটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।
তিন
ফরাসউদ্দিন মনে করেন, পণ্যের মূল্য বেঁধে দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, বরং এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকারের কৃতসংকল্পতা, তদারকি ও বাস্তবায়ন না থাকলে সমূহ সমস্যার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বাজার প্রতিকূলতা সৃষ্টিকারী, মজুদদারি, মুনাফাখোর ও মাস্তানদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর আমলে শক্তিশালী টিসিবিকে আবারো উজ্জীবিত করে বাফার স্টক তুলতে সাহায্য করা, কৃষকদের মধ্যে সমবায় বিপণন ব্যবস্থার প্রচলন, পণ্য সংরক্ষণক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে ঋণ সুবিধা এবং মুক্তবাজারে বিক্রির সময়সীমা কয়েক মাস ধরে রাখা ইত্যাদি পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে টোটকা হিসেবে কাজ করে।
কর-জিডিপি অনুপাত কম কেন এ নিয়ে বিপুল বিতর্ক এবং গলদঘর্ম হওয়ার ঘটনা হরহামেশা। কিন্তু একটু আন্তরিক হলে ঘরের পাশে দেখব আরশিনগর অর্থাৎ হাতের কাছেই সম্ভাবনা লুকিয়ে অথচ দেখেও না দেখার ভান। যেমন বোস্টন কনসালটিং গ্রুপের হিসাবে বাংলাদেশে আড়াই কোটি মানুষের মাথাপিছু আয় ৫ হাজার টাকা। আগামী সাত বছরে তাদের আয়করের আওতায় আনা গেলে করহার কমিয়েও কর-রাজস্ব জিডিপি অনুপাত ২০২৪ সালে ১০ শতাংশ থেকে ২০৩০ নাগাদ ২০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব এবং জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ পৌঁছাবে ৪০ শতাংশের কোটায়। দুই. দেশের সর্বোচ্চ বিত্তবান ৮৭ লাখ ব্যক্তির মধ্যে মাত্র নয় লাখ কর দেন। বাকিদের শনাক্ত করে তাদের কাছ থেকে উচ্চতম স্তরে শতকরা ৩০ ভাগ আয়কর আদায় করার সুপারিশ আছে বিভিন্ন মহল থেকে, যা বাস্তবায়নে অনুপাতটির উন্নতি লক্ষ করা যাবে। তিন, পেশাজীবীরা যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজ্ঞ এমনকি ছায়াছবির নায়িকারা কবে থেকে সর্বজনীনভাবে তাদের আয়ের ওপর কর দিয়ে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করবেন? চার. আপেক্ষিক সুবিধার ভিত্তিতে শিল্প পণ্য ও উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। লোকসানি শিল্প-কারখানা (বিশেষত চিনির কল) ব্যক্তি খাতে হস্তান্তর করে কর্মরত জনবলের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করে সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি নিতে পারলে সরকারি আয় বাড়বে। পাঁচ. কয়েক বছর আগে স্বল্প শুল্কের মূলধনি মালামাল আমদানির নামে শত কোটি টাকার অতি উচ্চ মূল্যের মূলধন মালের চালান ধরতে গিয়ে কর্মকর্তাদের চাকরি যাওয়ার জোগাড়—এমন অবস্থায় কর থেকে উৎসারিত আয় বাড়ানোর সৎ উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
রিজার্ভের সমস্যা? একটি সূত্র বলছে এবং জাতিসংঘও এতে একমত যে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার পাচার হয়। তার মানে ৭ বিলিয়ন ডলার বা মোট প্রায় চার মাসের রেমিট্যান্স আয়ের সমান। ‘সরকার কেন নীরব ও নিষ্ক্রিয় তা বোধগম্য নয়’ বলে জানান বইটির লেখক। দুই. গত দুই বছরে (২০২২-২৩) লোমহর্ষক কয়েকটি মানি লন্ডারিং ঘটনা খবরের কাগজে এলে সরকারি কর্মকাণ্ড কেন ‘পুতিয়ে’ যাচ্ছে? তিন. বেগমপাড়া, সেকেন্ড হোম ইত্যাকার বিষয়ে দুর্বলকণ্ঠ বক্তৃতা-বিবৃতির বদলে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। চার. একজন সাবেক মন্ত্রীর বিদেশে ২৫০টি বাড়ির মালিকানা এবং ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড স্টারলিং (রিজার্ভের ১ শতাংশ) দেশান্তরিত হওয়ার যে খবর মার্কিন সংবাদপত্র ব্লুমবার্গে প্রকাশ হয়েছে তার সঙ্গে অন্যান্য মুদ্রা পাচার, করমুক্ত দ্বীপরাষ্ট্রে সম্পদের নোঙর করা বৈদেশিক মুদ্রা ফিরিয়ে আনতে পারলে রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাঁচ. বৈদেশিক রিজার্ভ থেকে জাতীয় সর্বোচ্চ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনোভাবে কোনো প্রকল্প নেয়া সমীচীন নয়। ছয়. একক বিনিময় হার প্রচলন, যার মধ্যে রেমিট্যান্স প্রণোদনা যুক্ত হয়ে প্রেরকের হাতে পৌঁছবে, করতে পারলে কার্ব মার্কেটের কেরামতি কমানো সম্ভব। বিদেশী বাণিজ্য সহযোগীদের সঙ্গে বিনিময় হারের আনুপাতিক ওজন নিয়ে প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার (রিয়েল ইফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট) এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে হারটি কার্ব মার্কেটের হারের কাছাকাছি থাকে। ছয়. রফতানি আয়ের শতকরা ১২ ভাগ বিদেশে থেকে যাচ্ছে বলে প্রকাশ। এটা মোটেও কাম্য নয়, বড়জোর তা ৫ শতাংশ হতে পারে। এক্ষেত্রেও বৈদেশিক মুদ্রা হাতছাড়া হচ্ছে। রফতানিকারক স্পষ্ট নীতিমালার আওতায় ভিন্ন ভিন্ন খাতে সুনির্দিষ্ট হারে রিটেনশন কোটা পেয়ে থাকেন, তার পরও কেন তারা বিদেশে রফতানি আয় পার্ক করবেন?
ওয়াসার স্বেচ্ছাচার ও কথিত দুর্নীতি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি তথা সমাজে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি নীতি তার লেন্সের বাইরে ছিল না। তিনি মনে করেন কুইক রেন্টাল বাতিল করলে দুর্নীতি কমবে। দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে ব্যাংকিং দক্ষতা দরকার।
চার
আগেই বলেছি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, কূটনীতি, বিভিন্ন খাতে সংস্কার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ মোট ১৪টি বিষয়ে কর্মপরিকল্পনার প্রস্তাব করেছেন যাতে আগামী সাত বছরের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছার পথটি নিষ্কণ্টক ও নির্বিঘ্ন হয়। আমরা মনে করতে পারি তার প্রস্তাবগুলো নীতিনির্ধারক, পেশাজীবী ও রাজনীতিবিদদের কাছে আলোচনার পথ প্রশস্ত করবে। বিদ্যমান ব্যবস্থাপনায় যে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হওয়া বেশ কঠিন কাজ, এমনকি অসম্ভব, সে কথা যেন ভুলে না যাই। বহিঃস্থ বৈরী উপাদানের পাশাপাশি দেশীয় ‘যে সকল অপূর্ণতা, উল্টো রথযাত্রা ও দুর্বলতা রয়েছে’, তা দূরীকরণে সুদৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই হবে স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রধান সোপান।
আব্দুল বায়েস: অর্থনীতির অধ্যাপক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য