যেকোনো অর্থনীতির স্বনির্ভরতার প্রশ্নে রাজস্ব আয়ের বিকল্প নেই। যে দেশ যত বেশি উন্নত, তাদের রাজস্ব আয়করণ প্রক্রিয়া তত বেশি বিস্তৃত এবং বর্ধনশীল। কারণ দেশ পরিচালনার জন্য সরকারকে নির্ভর করতে হয় রাজস্ব আয়ের ওপর। বাংলাদেশ সরকার মূলত কর ও কর-বহির্ভূত বিভিন্ন উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করে থাকে। বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস তিনটি। আমদানি ও রফতানি পর্যায়ে শুল্ক, পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে পণ্যের ওপর আহরিত মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও আয়কর এবং ভ্রমণ কর। এ তিন প্রধান উৎসের আওতায় পড়ে অন্য সব উৎস। এর মধ্যে রয়েছে আবগারি শুল্ক, বাণিজ্যিক শুল্ক, সম্পত্তি কর, রেজিস্ট্রেশন ও স্ট্যাম্প, বিনিয়োগ ও ঋণ, রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যাতায়াত, সমুদ্রবন্দর, প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব উৎস থেকে আহরিত হয় সরকারি রাজস্বের অধিকাংশ।
বর্তমানে বাংলাদেশে কর শনাক্তকরণ নম্বরধারীর (টিআইএন) সংখ্যা পৌনে এক কোটি ছাড়িয়েছে। দেশের মোট টিআইএনধারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৮ লাখ। তারা সবাই এনবিআরের নিবন্ধিত ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিআইএন গ্রহণের হার অনেক বেড়েছে। ২০২২ সালে দেশে টিআইএন নম্বরধারী নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৭৫ লাখ, ২০২০ সালেও এ সংখ্যা ছিল ৪০ লাখের কিছু বেশি। সর্বশেষ হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ২৬ লাখ টিআইএনধারী বার্ষিক আয়-ব্যয়ের বিবরণ জানিয়ে রিটার্ন জমা দেন। এক-তৃতীয়াংশ টিআইএনধারী রিটার্ন দেন। শুধু জমি কেনা ও ক্রেডিট কার্ডের জন্য টিআইএন নেয়া হয়েছে, এমন টিআইএনধারী ছাড়া সবার রিটার্ন জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। যদিও এখনো প্রায় অর্ধকোটি টিআইএনধারী বছর শেষে রিটার্ন জমা দেন না। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরই অবশ্য বাংলাদেশের করদাতারা বেশি রিটার্ন দেন। সংশ্লিষ্ট দেশের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, ভারতের দেড় কোটির বেশি করদাতা রিটার্ন দেন। অন্য দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে ২৫ লাখ, শ্রীলংকায় ১৫ লাখ, নেপালে ২২ লাখ ও ভুটানে ৮৮ হাজার করদাতা রিটার্ন দেন। তবে জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে রিটার্নদাতার সংখ্যা বেশ কম। এ সংখ্যাকে আরো বহুদূর বৃদ্ধি করার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে যে উন্নয়নের ধারা চলছে তার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে অবশ্যই রাজস্ব আহরণের হার বাড়াতে হবে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো রেকর্ড ৩ লাখ ১ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে এনবিআর। আগের অর্থবছরে তা ছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা।
বাজেট অর্থায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এনবিআর। মোট বাজেট বরাদ্দের ৮৬ শতাংশ অর্থ জোগান দেয় এ সংস্থা। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আমদানি শুল্ক—এ তিন উৎস থেকে রাজস্ব আহরণ করে এনবিআর। এর মধ্যে ভ্যাটের অংশ সবচেয়ে বেশি। পরিসংখানে দেখা যায়, গত বছর সবচেয়ে ভালো আদায় হয়েছে আয়কর বা প্রত্যক্ষ কর। এ সময় আয়কর আহরণ হয় ১ লাখ ২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। আর প্রবৃদ্ধি বা আয় বেড়েছে ২০ শতাংশ। গত বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি বাস্তবায়ন ভালো হওয়ায় আয়করে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ এডিপি বাস্তবায়ন ভালো হলে উৎসে কর আহরণ বাড়ে। আর উৎসে কর হচ্ছে আয়করের অন্যতম বড় খাত। গত বছর ৯৩ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশে বর্তমানে ২ লাখ ৫১ হাজার ৮২৯টি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় নিবন্ধন (বিআইএন) আছে। তাদের মধ্যে প্রতি মাসে গড়ে দেড় লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট রিটার্ন দেয়। তবে রাজস্ব আয় বাড়াতে নতুন নতুন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিআইএনের আওতায় আনতে হবে।
বড় বাজেটে ব্যয়ের বিপুল চাপ সামলাতে রাজস্ব আয় বাড়াতে মনোযোগী সরকার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বজায় রাখার পরিকল্পনা করছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরও প্রত্যক্ষ করের ওপর নজর দেশের রাজস্ব আদায়ের প্রধান এ সংস্থা এনবিআরের। আগামী বাজেটের প্রস্তাবিত খসড়ায় এনবিআরের মাধ্যমে আদায় হওয়া মোট রাজস্বের প্রায় ৬৪ শতাংশই পরোক্ষ কর হিসেবে বিবেচিত ভ্যাট ও শুল্ক খাত থেকে আদায়ের পরিকল্পনা চলছে; নীতিনির্ধারকদের পরামর্শে যা কাটাছেঁড়া করে একটি আকার দেয়ার চেষ্টা করছেন বাজেটসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রত্যক্ষ করের মূল খাত আয়কর থেকে মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার ৩৬ শতাংশের বেশি আহরণের পরিকল্পনা করছে এনবিআর। সংস্কার কার্যক্রম, ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাপক প্রচারণারও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
রাজস্ব আদায়ে বেশকিছু পরিকল্পনা নেয় এনবিআর। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: আয়কর ও ভ্যাটের আওতা আরো বাড়ানো, ভ্যাট রিটার্ন শতভাগ অনলাইনে দাখিল করা, উৎসে কর কর্তনের অনলাইন ব্যবস্থা সর্বস্তরে প্রচলন, অনলাইনে কর প্রদানে সব ক্ষেত্রে এ চালান প্রচলন, ডিজিটাল আয়কর নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু, কর্মকর্তাদের কর আহরণে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর দেয়ার পদ্ধতি সহজ করা। কাঙ্ক্ষিত আয় বাড়াতে হলে রাজস্ব বিভাগে একটি কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচি নিতে হবে। এজন্য পুরো রাজস্ব বিভাগকে অটোমেশন করে আয়কর ও ভ্যাট বিভাগকে একীভূত করার পাশাপাশি মাঝারি পর্যায়ে আরো দুটি ট্যাক্স পেয়ার ইউনিট গঠন করতে হবে।
ভ্যাট ও করের ভিত্তি সম্প্রসারণেও নানা উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। বর্তমানে ৮২ লাখ লোক করের আওতায়। এ বছরের মধ্যে এ সংখ্যা ১ কোটিতে উন্নীত করতে চায় এনবিআর। বর্তমানে ১০০টি উপজেলায় কর অফিস আছে। দেশের সব উপজেলায় কর অফিস চালুর জন্য নতুন জনবল দরকার। এরই মধ্যে নতুন জনবল কাঠামো অনুমোদনের বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আছে। শিগগিরই এটি পাস হবে বলে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দেশে বর্তমানে সাড়ে তিন লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দেয়। চলতি অর্থবছরেই এটি শতভাগে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন নিশ্চিত করা গেলে হয়রানি কমে যাবে, সহজে ভ্যাট রিটার্ন দিতে পারবেন প্রতিষ্ঠান মালিকরা। ভ্যাট আদায়ে গতি আসবে।
কর বিভাগ প্রতি বছর যত কর আদায় করে থাকে, এর ৮০ শতাংশ উৎসে কিংবা অগ্রিম কর থেকে আদায় করা হয়। ঠিকাদারি, আমদানি পর্যায় ও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার থেকে উৎসে ও অগ্রিম কর বাবদ আসে প্রায় ২৩ শতাংশ। উৎসে কর আদায় ব্যবস্থাটি পুরোপুরি অনলাইন করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এটি করা হলে কর আহরণ বর্তমানের চেয়ে অনেক গুণ বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা যায়। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের অনলাইনে কর পরিশোধের ক্ষেত্রে ‘এ-চালান’ বাধ্যতামূলক করার কথাও ভাবছে সরকার। এখন ‘এ-চালানের’ জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ছাড় আছে। ঘরে বসে যাতে করদাতারা আয়কর রিটার্ন দিতে পারেন, সেজন্য একটি অনলাইন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এটি অনেকটা অ্যাপসের মতো হবে। নিবন্ধন নিয়ে ওই ওয়েবসাইটে ঢুকে ঘরে বসেই রিটার্ন জমা দেয়া যাবে। এমনকি আয়-ব্যয়সংক্রান্ত কিছু তথ্য দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্নও তৈরি করে দেবে কর বিভাগের ওই সিস্টেম।
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশের কর-জিডিপির অনুপাত অনেক কম। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ মোতাবেক কোনো দেশের আদর্শ কর-জিডিপি অনুপাত হওয়া উচিত ১৫ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে এটি ৮-৯ শতাংশ। এ অবস্থা উন্নয়নের জন্য খাতভিত্তিক কর এবং জিডিপিতে অবদানের একটি বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বৃহস্পতিবার (১ জুন) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন। ২৬ জুন সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পাস হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখার লক্ষ্যে এবারের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়বে ৬০ হাজার কোটি টাকা।
এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রার পাশাপাশি এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা আর কর-বহির্ভূত রাজস্ব (এনটিআর) আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক থেকে এ রাজস্ব আদায় হবে। নতুন বাজেটে দেড় লাখ কোটি টাকা আয়কর হিসেবে আদায়ের পরিকল্পনা করছে রাজস্ব বোর্ড। এরই ধারাবাহিকতা করমুক্ত আয়সীমা ও কর জাল বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমান কর জিডিপির অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। দেশে প্রদেয় করদাতার অধিকাংশই শহরকেন্দ্রিক। অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ নিয়েছে সরকার। শর্তস্বরূপ রাজস্ব খাতে বড় ধরনের সংস্কার করতে হবে, বাড়াতে হবে কর জিডিপি। আইএমএফের শর্ত পূরণে চলতি অর্থবছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তি কর আদায় করতে হবে। এজন্য বাজেটে বাড়তি কর আদায়ের নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গ্রামের মানুষকে করজালের আওতায় আনতে উন্নত দেশের মতো বিভিন্ন জেলায় কর এজেন্ট নিয়োগের প্রস্তাব করা হচ্ছে এবারের বাজেটে। নতুন কর এজেন্টরা নতুন করদাতাদের সাহায্য করবে। ই-টিআইএন থাকা সত্ত্বেও যারা এখনো রিটার্ন জমা দেননি, তাদের রিটার্ন প্রস্তুত করতেও সহায়তা করবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে বাজেটের অর্থ বিলে ‘ইনকাম ট্যাক্স প্রিপেয়ারার (আইটিপি)’ নামে একটি নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যার খসড়াও প্রস্তুত করা হয়েছে।
কোনো ব্যক্তি শূন্য আয় দেখিয়ে রিটার্ন জমা দিলে স্লিপ বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পেতে তাকে ন্যূনতম ২ হাজার টাকা কর দিতে হবে। অন্যদিকে আয় ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতাদের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে নির্ধারিত হারে আয়কর দিতে হবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে শূন্য রিটার্ন জমা দিলেও ২ হাজার টাকা আয়কর দেয়ার বিধান রাখছে রাজস্ব বোর্ড। রিটার্ন জমার স্লিপ না নিলে ৪৪ ধরনের সরকারি-বেসরকারি সেবা পাওয়া যাবে না। এমনকি ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে শূন্য রিটার্ন জমা (করযোগ্য আয় না দেখিয়ে রিটার্ন জমা) দিলেও ২ হাজার টাকা আয়কর দিতে হবে। কর আদায় বাড়াতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বিদ্যমান ৩৮ ধরনের সেবার বাইরে নতুন আরো ছয় ধরনের সেবা নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে রিটার্ন জমার রসিদ বা ‘প্রুফ অব সাবমিশন অব রিটার্ন’ বা পিএসআর বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। করের আওতা বাড়াতে মূলত অনেকটা বাধ্য হয়েই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। সেবা নিতে করদাতাদের রিটার্ন জমার রসিদ দেখানোর এ বিধান আরো কঠোর করা হচ্ছে। করযোগ্য আয় থাকুক আর না-ই থাকুক, ন্যূনতম ২ হাজার টাকা কর দিয়ে রিটার্ন জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ন্যূনতম এ কর না দিলে মিলবে না সরকারি-বেসরকারি এসব সেবা।
কোনো করদাতা ন্যূনতম কর না দিলে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এসব সেবা দিতে পারবে না। নতুন অর্থবছরের বাজেটে নতুন আয়কর আইনের মাধ্যমে এ বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া বাজেটে এ তালিকায় আরো যুক্ত হতে পারে দলিল লেখক হিসেবে নিবন্ধনে; স্ট্যাম্প এবং কোর্ট ফির ভেন্ডর হিসেবে নিবন্ধনে, পৌরসভায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের জমি বিক্রয় এবং লিজ রেজিস্ট্রেশনের সময়। ভূমি ও ভবন লিজ রেজিস্ট্রেশনের সময়ও পিএসআরের শর্ত দেয়া হয়েছে। এছাড়া যেকোনো ধরনের সোসাইটি, সমবায়, ট্রাস্ট, ফান্ড, ফাউন্ডেশন, এনজিও এবং মাইক্রোক্রেডিট অর্গানাইজেশনের ব্যাংক হিসাব খোলা ও চালু রাখতে এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়ি ভাড়া বা লিজ গ্রহণের সময় বাড়ির মালিকের পিএসআরের বাধ্যবাধকতা আসবে।
করের আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে কর আদায় বাড়াতে এনবিআর জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে গত কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন রেজিস্ট্রেশনের আওতায় এনেছে এনবিআর। তবে টিআইএনের আওতায় আনা হলেও রিটার্ন জমায় কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিলছিল না। এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত বছরের বাজেটে ৩৮টি খাতের সেবা নেয়ার সময় রিটার্ন জমার প্রমাণ বা পিএসআর বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু তাতেও রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি। এবার আগের ৩৮টির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে আরো ছয়টি সেবা খাত।
দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির বিকল্প নেই। মানুষকে আয় চক্রের মধ্যে আনতে হবে। দেশের প্রত্যেক এনআইডিধারীকেই ট্যাক্স রিটার্ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। যাদের সামর্থ্য নেই, প্রয়োজনে তারা শূন্য রিটার্ন জমা দেবেন। কিন্তু রিটার্ন জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু এ ৪৪ ধরনের নয়, সরকারি প্রত্যেক সেবার জন্যই, এমনকি শিশুদের স্কুলে ভর্তি বা টিকা দেয়ার সময়ও ট্যাক্স রিটার্ন স্লিপ শো করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড দেখিয়ে নাগরিকরা সব সেবা নিতে পারে, আমাদের এখানে সেরকম ট্যাক্স রিটার্ন স্লিপ দেখিয়ে সেবা নিতে পারবেন।
প্রত্যেক নাগরিক যারই জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, তাদের ট্যাক্স রিটার্ন দিতে হবে। তাহলে ট্যাক্স রিটার্ন রাতারাতি কয়েকগুণ বাড়বে। ২০ হাজার টাকার বেশি প্রত্যেক লেনদেন (বাড়ি ভাড়া, কনসালট্যান্সি, ফ্রি ল্যান্সিং, পার্টটাইম জব প্রভৃতি) ব্যাংক বা চেকের মাধ্যমে করতে হবে, তাহলে ট্যাক্সের পরিমাণ ও পরিধি বাড়বে। বঙ্গবন্ধু চীনে গিয়েছিলেন ১৯৫২ সালে। সেসব অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থের ৩১ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছিলেন, ‘টিকিট চেকার সাহেব মাঝে মাঝে ঘুরে যান। তবে যতদূর জানলাম, বিনা টিকিটে কেহ ভ্রমণ করে না। একজন টিকিট চেকার সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম আমার দোভাষীর মাধ্যমে—আপনি টিকিট ছাড়া লোক কতদিন দেখেন নাই? সে বলল, প্রায় দেড় বৎসর। তবে যদি গাড়ি ছাড়ার সময় তাড়াতাড়ি উঠতে হয়, তবে পরের স্টেশনে আমাকে খবর দেয় আমি টিকিট দিয়ে আসি। আজকাল আর আমাদের টিকিট চেক করতে হয় না, কারণ কেহই বিনা টিকিটে গাড়িতে ওঠে না। আর ফাঁকি দিতেও চেষ্টা করে না। তারা মনে করে, এ পয়সা তাদের নিজেদের, রাষ্ট্র তাদের, গাড়ি তাদের, নিজেকে ফাঁকি দিয়া লাভ কী? তবুও সে বললো, অন্যান্য লাইনে দুয়েকটা ঘটনা এখনো আছে, তবে ধরা পড়লে যাত্রীর দলই তাকে এমন শায়েস্তা করে, জীবনেও ভুলবে না। আর সরকারও ভীষণ শাস্তি দেয়।’
রিটার্ন জমা দেয়া মানেই যে কর জমা দিতে হবে, তা নয়। যাদের টাকা নেই, তারা শুধু রিটার্ন জমা দেবেন। শুধু মুখে বললে তো আর উন্নত দেশ হওয়া যাবে না। উন্নত দেশের মতো রাজস্ব আহরণ করতে হবে। তাদের মতো প্রত্যেক নাগরিককে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। প্রতি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এ খাতে জনবল বাড়াতে হবে। দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতে হবে রাজস্ব বোর্ডকে। তবে ট্যাক্স রিটার্ন পদ্ধতিটা যেন সহজ হয়, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের ভোগান্তি এড়াতে হবে। ট্যাক্স ভীতি দূর করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে নিজেদের ভালোর জন্যই ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে সবাইকে। নাগরিকদের বোঝাতে হবে, সরকারের নিজস্ব কোনো টাকা নেই। রাষ্ট্রের নাগরিকরাই মূলত রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ও অর্থের উৎস। বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে দিনকে দিন। বাড়ছে বাড়তি ব্যয়ের চাপ। এ চাপ সামলে উন্নয়নকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
ড. এ কে আব্দুল মোমেন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার