প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন। উপরিভাগে এটি অগ্রগতির চিত্র মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। কলেবরে প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মান বাড়েনি। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সীমিত উপস্থিতি, গবেষণায় দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে পশ্চাৎপদতা এবং শিল্প খাতের সঙ্গে একাডেমিক সংযোগ দুর্বল হওয়া সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনে। ফলে প্রকৌশল শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও তার প্রত্যাশিত জাতীয় সুফল এখনো পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রকৌশল শিক্ষা শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি। যে দেশ প্রকৌশল শিক্ষায় এগিয়েছে, সে দেশ শিল্প, প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও অগ্রগতি করেছে। অন্যদিকে যে দেশ প্রকৌশল শিক্ষায় পিছিয়ে থাকে, সে দেশ প্রযুক্তি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়, দক্ষ মানবসম্পদ বিদেশমুখী হয় এবং উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতি পায় না। তবে প্রায় একই কথা সব ধরনের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মূলত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে উচ্চশিক্ষা ভূমিকা রাখে। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এগুলো বর্তমানে শিক্ষিত বেকার তৈরির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কারণ শিক্ষার গুণগতমানের অভাব। এর পেছনেও একই ধরনের সংকট দায়ী—অবকাঠামো ও জনবল সংকট, অনাধুনিক পাঠ্যক্রম ইত্যাদি। এগুলোই মূলত প্রকৌশল শিক্ষাতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পরিকল্পনার অভাব।
দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু কোন খাতে কত দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন, কোন অঞ্চলে কী ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় দরকার, কোন প্রযুক্তি খাতে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য কী ধরনের দক্ষতা তৈরি করতে হবে, এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট, দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা নেই। ফলে কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বিভাগ খোলা হয়েছে, আবার কোথাও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি, যা শিক্ষা খাতে দ্বিতীয় বড় সমস্যা।
উন্নত ও উন্নয়নশীল বহু দেশ জাতীয় আয়ের বড় অংশ শিক্ষা ও গবেষণায় ব্যয় করে, কারণ তারা উপলদ্ধি করেছে মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ তুলনামূলক কম এবং এ কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান সীমিত সম্পদ নিয়ে টিকে আছে। আবার বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশ বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয় ও অবকাঠামোয় চলে যায়; গবেষণা, আধুনিক ল্যাবরেটরি, প্রযুক্তি সরঞ্জাম, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কিংবা উদ্ভাবনী কার্যক্রমে পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খায়, বিশ্বমানের পরিবেশ গড়ে তোলা দূরের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক, গবেষণা সুবিধা, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি বা স্থায়ী অবকাঠামো ছাড়াই বিভাগ চালু করা হয়েছে। এতে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু দক্ষ গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা সে অনুপাতে বাড়ছে না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যখন জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা তৈরি করা, তখন শুধু সনদ প্রদান দিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রকৌশল শিক্ষায় এ সমস্যা আরো প্রকট, কারণ এখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহার, ডিজাইন সক্ষমতা ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অপরিহার্য।
পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। এখনো বহু উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা, নম্বরকেন্দ্রিক মূল্যায়ন এবং তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। অথচ উচ্চশিক্ষা হওয়া উচিত সমস্যা সমাধানভিত্তিক, প্রকল্পনির্ভর, নকশাকেন্দ্রিক এবং বাস্তব শিল্প সমস্যার সঙ্গে সংযুক্ত। পাশাপাশি গবেষণা কার্যক্রমও সীমিত। স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বড় অংশ গবেষণায় যুক্ত হয় না, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যৌথ উদ্ভাবনী প্রকল্প কম, পেটেন্ট সংস্কৃতি দুর্বল এবং প্রোটোটাইপ তৈরির সুযোগ সীমিত। ফলে নতুন প্রযুক্তি তৈরির মানসিকতা গড়ে ওঠে না।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের দূরত্বও বড় সমস্যা। উন্নত দেশগুলোয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বিনিয়োগ করে, শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ দেয়, যৌথ গবেষণা চালায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনকে বাজারে নিয়ে যায়। বাংলাদেশে এ সংস্কৃতি এখনো দুর্বল। শিল্প খাতের বড় অংশ বিদেশী প্রযুক্তিনির্ভর, আর বিশ্ববিদ্যালয় অনেক সময় তাত্ত্বিক পাঠদানে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে জ্ঞান ও উৎপাদনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সেতুবন্ধ তৈরি হয় না। ফলে দেশীয় শিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাও বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে না।
আজকের বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অটোমেশন ও ডেটা অর্থনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। আগামী দশকের চাকরি, শিল্প ও অর্থনীতি এ প্রযুক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করবে। যদি এখনো বাংলাদেশ প্রকৌশল শিক্ষার আধুনিকায়ন না করে, তাহলে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান বিদেশী প্রযুক্তি ও বিদেশী দক্ষ জনশক্তির হাতে চলে যাবে। দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্প, জ্বালানি খাত, স্মার্ট সিটি, ডিজিটাল রূপান্তর, পরিবহন ব্যবস্থা ও উৎপাদন শিল্প—সবখানেই উচ্চমানের প্রকৌশলী প্রয়োজন। দুর্বল প্রকৌশল শিক্ষা মানে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, গুণগত ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে প্রথমেই শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষা ব্যয় নয়, এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির মূল বিনিয়োগ। জাতীয় আয়ের বড় অংশ শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যয় করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান যাচাই করতে হবে এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক, ল্যাব ও গবেষণা সুবিধা ছাড়া নতুন বিভাগ অনুমোদন বন্ধ করতে হবে। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। আধুনিক ল্যাবরেটরি, গবেষণা কেন্দ্র, উন্নত সফটওয়্যার, প্রযুক্তি প্লাটফর্ম এবং জাতীয় গবেষণা সুবিধা গড়ে তুলতে হবে।
দক্ষ শিক্ষক নিয়োগকেও গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চশিক্ষা, পোস্টডক্টরাল প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিল্প খাতে বাস্তব অভিজ্ঞতা, গবেষণা অনুদান এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে প্রণোদনা দিলে শিক্ষকতার পেশা আরো আকর্ষণীয় হবে। পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, রোবোটিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সাইবার নিরাপত্তা, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা শিক্ষা যুক্ত করতে হবে। মূলত ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কোন প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব দিতে চায়, কতটা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করবে, কোন শিল্প খাতে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেবে সেই অনুযায়ী উচ্চশিক্ষাকে সাজানো প্রয়োজন। এজন্য সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।