অভিমত

সার্কুলার ইকোনমি নিয়ে সুস্পষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা দরকার

টেকসই অর্থনীতিতে ‘‌সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতির প্রসার বাড়ছে। বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ‘‌সার্কুলারিটি মডেল’ রূপান্তরের যাত্রা হয়েছে। দেশে এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথাগত যে অর্থনীতি তা রৈখিকভাবে (লিনিয়ার মডেল) চলে। অর্থাৎ আমরা উৎপাদন করি, ভোগ করি এবং ছুড়ে ফেলি। এ কারণে লিনিয়ার ব্যবসায়িক মডেল টেকসই নয়।

টেকসই অর্থনীতিতে ‘‌সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতির প্রসার বাড়ছে। বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ‘‌সার্কুলারিটি মডেল’ রূপান্তরের যাত্রা হয়েছে। দেশে এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথাগত যে অর্থনীতি তা রৈখিকভাবে (লিনিয়ার মডেল) চলে। অর্থাৎ আমরা উৎপাদন করি, ভোগ করি এবং ছুড়ে ফেলি। এ কারণে লিনিয়ার ব্যবসায়িক মডেল টেকসই নয়। 

বিশ্বে তৈরি পোশাকের (আরএমজি) দ্বিতীয় বড় উৎপাদক হিসেবে বাংলাদেশের সার্কুলার ইকোনমিতে দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ আরএমজি বর্জ্য উৎপাদনেও বাংলাদেশ দ্বিতীয়। সার্কুলার ইকোনমির চাবিকাঠি হলো বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার ও রিসাইকেল। যাকে থ্রি-আর বলা হয়। এর লক্ষ্য সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে অধিক উপযোগিতা তৈরি করা। এতে উৎপাদক ও ক্রেতা উভয়ই লাভজনক হতে পারে। সেক্ষেত্রে শিল্পোত্তর বর্জ্যের সব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সংকট, পরিবেশগত ঝুঁকি, সুপেয় পানির অভাব ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো প্রতিবন্ধকতা বাড়ছে। এসব সংকটের একক সমাধান হতে পারে সার্কুলার ইকোনমি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরিবেশবান্ধব কারখানা প্রচলিত কারখানার তুলনায় ৪০ শতাংশ কম কার্বন নির্গত করে। পানি রিসাইকেলিং ও জীবাশ্ম জ্বালানি সাশ্রয়ের ব্যবস্থা থাকে। এখন বিশ্বের সেরা ১৫টি পরিবেশবান্ধব কারখানার ১৩টিই বাংলাদেশের। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) প্রত্যয়িত বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার সংখ্যা ২০০। যার মধ্যে ৭৩টি কারখানাই প্লাটিনামরেটেড। এ তালিকায় নাম লেখানোর অপেক্ষায় আরো ৫০০টি কারখানা। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) টেকসই রূপকল্পে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ কার্বন নির্গমন হ্রাসকরণ, ৫০ শতাংশ টেকসই কাঁচামালের ব্যবহার, ৫০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাসকরণ, ১০০ শতাংশ জেডডিএইচসি রাসায়নিক ব্যবহার, ৩০ শতাংশ জ্বালানি ব্যবহার হ্রাস, ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং ৩০ শতাংশ বন উজাড় হ্রাসকরণের কথা বলা হয়েছে। 

রূপকল্পটি অভ্যন্তরীণভাবে রিসাইকেলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি, পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের চাহিদা পূরণ, ফাইবার আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস, পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও বিদেশী ক্রেতাকে আকৃষ্ট করবে। এর ফলে বিদেশী বিনিয়োগ বেড়ে যাবে, উৎপাদন বাড়বে, রফতানি বাড়বে। বাংলাদেশে আরএমজি পণ্যের রফতানিমূল্য বছরে ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। আরএমজি উৎপাদনে সৃষ্ট বর্জ্যের (ঝুট) পরিমাণ বছরে চার-পাঁচ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে ২০-২২ হাজার প্রতিষ্ঠান ঝুট ব্যবসায় জড়িত। এসব ঝুটের বেশির ভাগই সরাসরি রফতানি করা হয়। আর মাত্র ৫ শতাংশ রিসাইকেল করে গার্মেন্ট ইউনিটগুলো। বিশ্ববাজারে গার্মেন্ট বর্জ্যের উচ্চ চাহিদা রয়েছে। বেশির ভাগ বর্জ্যই ভারত, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোয় রফতানি করা হয়। এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী ২০২৩ অর্থবছরে ১১ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার মূল্যের ঝুট রফতানি হয়েছে। প্রায় ৩০০ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান সস্তায় ঝুটগুলো বিভিন্ন দেশে রফতানি করে। বিদেশী ক্রেতারা আবার সেগুলো রিসাইকেল করে। দেশে ঝুট ব্যবসার সঙ্গে ছয় লাখ কর্মী কাজ করেন। যাদের মধ্যে অধিকাংশ নারী। আর এ ব্যবসায় আরো ১০ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে (ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ৮ আগস্ট, ২০২৩)। 

টেকসই অর্থায়ন ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রসর হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মেয়াদি ঋণের ৫ শতাংশ পরিবেশবান্ধব খাতে বিতরণ করবে। আর মোট ঋণের ২০ শতাংশ টেকসই প্রকল্পে দেবে। চলতি বছরের মার্চে টেকসই প্রকল্পে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন বেড়ে হয়েছে ৩৬ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৩ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা ঋণ পরিবেশবান্ধব খাতে যা মোট মেয়াদি ঋণের ৫ দশমিক ৮ শতাংশ (প্রথম আলো, ২৮ আগস্ট, ২০২৩)। 

দেশকে উন্নত দেশে রূপান্তর করতে স্মার্ট ইকোনমি গড়ে তুলতে হবে। দেশে সার্কুলার অর্থনীতি আনয়ন করতে হবে। শুধু আরএমজিতে নয়, নির্মাণ, প্রযুক্তি, আসবাব, প্লাস্টিক, কৃষি ও খাদ্যপণ্যে রিসাইকেল করার সুযোগ রয়েছে। ‘‌টুওয়ার্ডস এ মাল্টিসেক্টোরাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫ সালে ঢাকার বাইরের শহরগুলোয় মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার ছিল মাত্র তিন কেজি। ২০২০ সালে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে নয় কেজি। আর ঢাকা শহরে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার হচ্ছে ২৪ কেজি। দেশে মোট বর্জ্যের প্রায় ১০ শতাংশই প্লাস্টিকজাত। প্লাস্টিক বর্জ্যের মাত্র ৩৭ শতাংশ রিসাইকেল করা হয় (ঢাকা ট্রিবিউন, ২৭ জুলাই, ২০২৩)। প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে দেশে একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা যেতে পারে। 

এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে ৩০ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। আগামী বছরগুলোয় ইলেকট্রনিক পণ্যের বর্জ্য আরো বাড়বে। শুধু স্মার্টফোন ও অন্যান্য ফোন থেকে বছরে ১০ কেজি টন বর্জ্য আসছে। আর টেলিভিশন সেট থেকে তৈরি হচ্ছে ১ লাখ ৭০ হাজার টন বর্জ্য। বর্তমানে ই-বর্জ্যের মাত্র ৩ শতাংশ রিসাইকেল হচ্ছে। দেশে ই-বর্জ্যের সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যবসা প্রায় ২২ কোটি ডলার। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ই-বর্জ্য রিসাইকেল করা সম্ভব। 

টেকসই উন্নয়নে বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া দরকার। যেসব বর্জ্য আমরা ফেলি দিচ্ছি বা রফতানি করছি, সেগুলো আমরাই রিসাইকেল করতে পারি এবং সাপ্লাই চেইনে এগিয়ে থাকতে পারি। নতুন করে আর অন্য দেশের রিসাইকেলিং করা পণ্য আনার প্রয়োজন পড়ে না। এতে দেশের ডলার রিজার্ভ বাঁচবে। সেক্ষেত্রে বর্জ্য সংগ্রহে আলাদা ডাম্পিং জোন ও রিসাইকেলিংয়ে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও কারখানা উন্নত করতে হবে। আবার বিদেশ থেকে বর্জ্য এনে রিসাইকেলিংয়ের কথা ভাবাও যাবে না। কারণ তাতে পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে। 

জাতিসংঘ ক্লাইমেট চেঞ্জ কনফারেন্সে (কপ২১) টেকসই সমাজ গঠনে কম্প্রিহেনসিভ অর্থনৈতিক মডেল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ইইউ, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান, চীন ও রাশিয়া এ মডেল ব্যবহার শুরু করেছে। ইইউর দেশ ফিনল্যান্ড সর্বপ্রথম সার্কুলার অর্থনীতি ব্যবসা মডেলের রোডম্যাপ ২০১৬-২৫ তৈরি করে। সার্কুলার অর্থনীতি উন্নয়নে দেশটি অনুসরণীয় হয়ে উঠেছে। দেশে সার্কুলার অর্থনীতির ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে এবং দক্ষ লোক তৈরিতে কাজ করে সার্কুলার ফ্যামিলি ইন বাংলাদেশ (সিএফবি) নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সেটির কার্যক্রমেও গতি নেই।

দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ছে। সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক ও পরিবেশ দূষণ-জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় কার্যকর উপায় হলো সার্কুলার ইকোনমি। ভবিষ্যতে সার্কুলার ইকোনমির প্রতিযোগিতা আরো বাড়বে। অভ্যন্তরীণভাবে বাংলাদেশ রিসাইক্লিং সক্ষমতা বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে। এজন্য সার্কুলার পদ্ধতির অর্থনৈতিক সুযোগ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ দরকার। দেশের শিল্প-কারখানাগুলোকে প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। সরকারি সংস্থা, বিদেশী অংশীদার, একাডেমিয়া ও এনজিওগুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তথা রিসাইকেল ইকোনমিতে ঋণের লক্ষ্য বেঁধে দেয়ার কথা ভাবতে হবে। সার্কুলারিটি নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে কার্যক্রম করার শুরুর সময় এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ-সম্পর্কিত নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া উচিত। প্রত্যাশা রাখি, পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন ও সামাজিক সুবিধা বিবেচনায় সার্কুলার অর্থনীতি নিয়ে সুস্পষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা ও এর যথাযথ বাস্তবায়ন হবে। 

পাপলু রহমান: সাংবাদিক

আরও