অভিমত

বাঙ্গলাবর্তে সর্বত্রই চলছে বাংলা ভাষার মর্যাদাহানি

বাঙ্গলাবর্তের দেশ ও রাজ্যগুলোয় বাংলা ভাষা এক কঠিন সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় নিপতিত রয়েছে। বাঙ্গলাবর্তের দেশ ও অঞ্চলগুলোয় (বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও ঝাড়খণ্ড) বাংলা ভাষার মর্যাদাকে বুঝতে হলে সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ইত্যাদি নিয়ামকের নিরিখে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে এসব নিয়ামকের মধ্যে সাংবিধানিক

বাঙ্গলাবর্তের দেশ ও রাজ্যগুলোয় বাংলা ভাষা এক কঠিন সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় নিপতিত রয়েছে। বাঙ্গলাবর্তের দেশ ও অঞ্চলগুলোয় (বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও ঝাড়খণ্ড) বাংলা ভাষার মর্যাদাকে বুঝতে হলে সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ইত্যাদি নিয়ামকের নিরিখে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে এসব নিয়ামকের মধ্যে সাংবিধানিক আইন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবিধানিক আইন কোনো ভাষার মর্যাদার প্রধান রক্ষাকবচ। সাংবিধানিক আইন দ্বারা কোনো ভাষার মর্যাদা স্বীকৃত না হলে অন্যান্য নিয়ামকের সাহায্যে কোনো ভাষার মর্যাদা টিকিয়ে রাখা যায় না।  

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের ফলে কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম নেয়। একেক দেশে একেক সংবিধান গৃহীত হয়। বাংলাদেশের সংবিধান জাতীয় সংসদে ও ভারতীয় রাজ্যগুলোর সংবিধান ভারত প্রজাতন্ত্রের লোকসভায় গৃহীত হয়। অর্থাৎ ভারত প্রজাতন্ত্রের রাজ্যগুলোয় বাংলা ভাষার মর্যাদা নিরূপণের কোনো আইনগত অধিকার নেই। বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত থাকার সময় বাংলাদেশের বাংলা ভাষার মর্যাদা নির্ধারণে কোনো আইনগত অধিকার ছিল না। 

কিন্তু পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতালাভের ফলে বাংলাদেশ বাংলা ভাষার মর্যাদা নির্ধারণের আইনগত অধিকার লাভ করে। বাংলাদেশে সংবিধানিকভাবে বাংলা ভাষাকে জাতীয় ভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের মাধ্যমে এ ভাষাকে ইংরেজিসহ অন্য সব ভাষার ওপর মর্যাদা দেয়া হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান করা হয়। এ মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭ (১৯৮৭ সালের ২ নং আইন) [৮ মার্চ, ১৯৮৭] আইন নামে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। এ আইন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদের বিধানকে পূর্ণরূপে কার্যকর করার উদ্দেশ্যে প্রণীত আইন৷ কিন্তু এ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭ বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা হয়নি। 

অন্যদিকে ভারতীয় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষার মর্যাদা বিধানসভা ও লোকসভা এ দুই স্তরবিশিষ্ট আইনসভায় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বভারতীয় লোকসভায় গৃহীত ভারত গণরাজ্যের সংবিধানে বাংলাসহ অন্যান্য রাজ্য ভাষাকে তৃতীয় পর্যায়ের ভাষা হিসেবে মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ ভারত প্রজাতন্ত্রে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষাকে বাংলা ভাষার চেয়ে অধিকতর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। তবে বাঙ্গলাবর্তের সব রাজ্যে বাংলা ভাষার মর্যাদা সমান নয়। কারণ রাজ্যগুলোর বিধানসভায় ভাষা-পরিস্থিতিভেদে বাংলা ভাষার মর্যাদা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যে বাংলা ভাষার প্রতিভূ রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় রয়েছে। এ দুই রাজ্যে রাজ্য ভাষা হলো বাংলা ভাষা। এ দুই রাজ্যে বাংলা ভাষার পক্ষে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐকমত্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বাংলাপক্ষ নামক এক সংগঠন হিন্দি ভাষার বিপরীতে বাংলা ভাষার পক্ষে এক ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলে। কিন্তু আসাম ও ঝাড়খণ্ড রাজ্যে বাংলা ভাষাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছে। রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করার প্রবণতা রয়েছে। কাছাড় অঞ্চলে বাংলা ভাষা অধিকার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আসামের রাজ্য সরকার বাংলা ভাষাকে রাজ্যের অতিরিক্ত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বৃহত্তর গোয়ালপাড়া অঞ্চলে বাংলা ভাষার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হচ্ছে। কিন্তু অসমীয়াকে রাজ্যের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের ফলে বাংলা ভাষা চতুর্থ স্থানের ভাষা হিসেবে মর্যাদা প্রাপ্তি ঘটেছে। অন্যদিকে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাজ্য সরকার বাংলা ভাষাকে অতিরিক্ত দাপ্তরিক ভাষা নয়, বরং দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে বাংলা ভাষার মর্যাদা নির্ধারণ হয়েছে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার পরে তৃতীয় স্থানের ভাষা হিসেবে। অন্যদিকে কেন্দ্রশাসিত আন্দামান-নিকোবর অঞ্চলে বাংলা ভাষা সবচেয়ে বেশিসংখ্যক অধিবাসী কর্তৃক কথিত হলেও সেখানে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার কোনো স্বীকৃতি নেই। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। 

ওপরের পর্যালোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলা ভাষাকে সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলা ভাষাকে সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান সম্ভব নয়, যে কারণে ভারতীয় রাজ্যগুলোয় বাংলা ভাষার মর্যাদা নির্ধারণ হয়েছে তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানের ভাষা হিসেবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও ভারতীয় রাজ্যগুলোর সংবিধানে বাংলা ভাষার যে মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটুকুও রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কারণে সংরক্ষণ হচ্ছে না। তার প্রধান কারণ এসব অঞ্চলের রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণী ইংরেজি ভাষাকে তাদের আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছে। সেজন্য বাঙ্গলাবর্তের সব অঞ্চলেই এ শ্রেণী বাংলা ভাষার ওপর ইংরেজি ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে তৎপর রয়েছে। তাছাড়া বিশ্বায়নের প্রভাবে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইংরেজি ভাষাকে শিক্ষা ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে মর্যাদার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চলছে।

এতসব রাজনৈতিক মতভেদের মধ্যেই বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্য বাংলা ভাষাকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে তৎপর রয়েছে। তার প্রমাণ বাংলা ভাষাকে একযোগে জাতিসংঘের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। উল্লেখ্য যে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে বাংলা ভাষাকে জাতিসঙ্ঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর ও ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ১১ জুন যথাক্রমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যের বিধান সভা বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের জন্য বাংলাদেশের দাবিকে সমর্থন জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং এ রাজ্য দুটি প্রস্তাবটি জাতিসংঘে উপস্থাপনের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করে। বাংলাদেশ ও ভারতের দুটি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা কর্তৃক একযোগে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে চালু করার দাবির বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে রাজনৈতিক বিভক্তির মধ্যেও বাংলা ভাষার প্রশ্নে বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলা ভাষাভাষী প্রধান রাজ্যগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। বাংলা ভাষার প্রশ্নে এ ঐতিহাসিক ঐকমত্য আরো একটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে যে বাংলা ভাষাভাষী ভারতীয় রাজ্যগুলো বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে হিন্দি ভাষার কাছে ছাড় দিতে রাজি নয়। 

ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: অধ্যাপক, সুলতান ইদ্রিস শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়া, এবং ভূতপূর্ব পরিচালক

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও