জাতীয় শোক দিবসের ৪৮তম বার্ষিকীতে এসে আমাদের মনে রাখতে হবে—আগস্টের অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশ ও অসন্তুষ্ট রাজনীতিবিদদের একাংশ মিলে। তারা ঢাকার রাজপথ যেভাবে ধাপিয়ে বেড়িয়েছে—সেখানে ছিল না মানবিকতার ছোঁয়া। স্বচ্ছ কাচের মতো তাদের অভীষ্ট ছিল পরিষ্কার। স্বাধীনতার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয় তারাই, যাদের প্রশিক্ষিত করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে ও তার দেশের মানুষকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য। অথচ তারা বঙ্গবন্ধু, তার পরিবারের সদস্য এবং তার অনেক আত্মীয়-স্বজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত ঘৃণিত একটি কাজ। কিন্তু তার পরপর যা আসে তা আরো জঘন্য। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সরকারি এক গেজেটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫’ জারি করেন। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে বলা হয়, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।’ ক্ষমতার কী নিদারুণ অপব্যবহার! জবাবদিহিতার অভাব যে ভালো পরিণতি আনবে না তা-ই স্বাভাবিক। খুনিরা আরো একটি হত্যাযজ্ঞ চালাতে দ্বিধা করেনি। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর এমন ঘটনাই ঘটে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীসহ চারজন শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকে।
এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি ভারসাম্যপূর্ণ, উদ্যমী পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সমুন্নত করার চেষ্টা করছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা ছিলেন। বাংলাদেশের জন্য নিবেদিত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভূমিকা পালন করেছেন।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে যাওয়ার পর সেখান থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় আসার উদ্দেশে নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে পৌঁছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তার ফিরে আসাকে অভিহিত করেছিলেন, ‘এ অভিযাত্রা অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতায়, নিরাশা থেকে আশায় অভিযাত্রা।’
১০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাষ্ট্রনায়ক, বাঙ্ময় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের বিজয়ী জনতার সামনে বাস্তবসম্মত ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেন। তিনি সতর্ক করেন কেউ যেন অবাঙালিদের ওপর হাত না তোলে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে আটকে পড়া চার লাখ বাঙালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। যখন তিনি আশ্রিত পাকিস্তানিদের ক্ষতি না করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন, তিনি এও স্পষ্ট করেন, ‘যারা অন্যায়ভাবে আমাদের মানুষদের মেরেছে, তাদের অবশ্যই বিচার হবে।’
একই বক্তৃতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে তিনি মুসলিম বিশ্বের উদ্দেশে বলেন, ‘দুনিয়ার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পর বাংলাদেশই দ্বিতীয় মুসলিম দেশ’। তিনি এ বলে তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন, ‘পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী ইসলামের নামে এ দেশের মুসলমানদের হত্যা করেছে, আমাদের নারীদের বেইজ্জত করেছে। ইসলামের অবমাননা আমি চাই না।’ বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান, ‘পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশে যে নির্বিচার গণহত্যা করেছে, তার অনুসন্ধান ও ব্যাপকতা নির্ধারণের জন্য আমি জাতিসংঘের নিকট একটা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের আবেদন জানাচ্ছি।’
পরবর্তী সময়ে এটি স্মরণ করা যেতে পারে—১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের সংঘটিত অপরাধের তদন্ত শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ১৯৫ জন ব্যক্তি যারা গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং জেনেভা কনভেনশনের ৩ নং অনুচ্ছেদের আলোকে হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ী তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। এটিও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়—সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং যারা এসব অপরাধ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছিল তাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিচারিক মান অনুসারে বিচার করা হবে। এ যুক্তিতর্ক এবং এ সম্পর্কিত আইনগত প্রক্রিয়া ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার হত্যাকাণ্ডের প্রক্রিয়াটি পুরো বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোণঠাসা করে রাখা হয়। এটি পরে তার কন্যা শেখ হাসিনার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত হয়, তিনি এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনগত উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
বঙ্গবন্ধু পররাষ্ট্রনীতিতে খুব আগ্রহের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকী পালন করার আগে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ৫৪টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় (তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আগে ১০টিরও কম ছিল)। যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেতে একটু সময়ের প্রয়োজন হয়, এটি ১৯৭২-এর মাঝামাঝি সময়ে পাওয়া যায়।
একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে মুসলিম বিশ্বের ভূমিকায় তিনি হতাশা বোধ করছিলেন। ইসরায়েলকে স্বীকৃতি প্রদানের পরোক্ষ প্রস্তাব ঢাকা ফিরিয়ে দিলেও বাংলাদেশকে তখনো স্বীকৃতি দেয়নি সৌদি আরব। যে কারণে বাংলাদেশীরা হজ পালন করতে পারছিলেন না। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়া দেশের মধ্যে ছিল সৌদি আরব, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন, ইরান, তুরস্ক ও লিবিয়া। অপ্রীতিকর বিষয় হলো, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে নৃশংস গণহত্যা চলার পরও নীরব ছিল মুসলিম বলয়টি। এদিকে চীনের বিরোধিতায় বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তি বিলম্বিত হয়।
যা-ই হোক, ১৯৭২ সালের শেষে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী রাষ্ট্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আমি বিশ্বাস করি, এটি বঙ্গবন্ধুর ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে সম্ভব হয়েছে এবং বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেনা প্রত্যাহারে ভারতকে রাজি করানোরও ভূমিকা রয়েছে। এরপর স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম), কমনওয়েলথ, আইএলও, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সদস্য হয় এবং কূটনৈতিক বলয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন শুরু করে। আমরা জাতিসংঘে পর্যবেক্ষক হওয়ার মর্যাদা অর্জন করি, কিন্তু চীনের ভেটো ক্ষমতার কারণে সদস্যপদ লাভে ব্যর্থ হই (পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ার কারণে)।
জাতিসংঘের সদস্য হতে না পারলেও ১৯৭২ সালের ২৭ নভেম্বর জাতিসংঘের মহাসচিব ড. কার্ট ওয়াল্ডহেইমের কাছে পাকিস্তানের বিভিন্ন শিবিরে আটকে পড়া নিরপরাধ বাঙালিদের প্রত্যাবাসনের জন্য মানবিক হস্তক্ষেপের দাবি থেকে নিবৃত্ত থাকেননি বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টার পাশাপাশি মিসর, সোভিয়েত ইউনিয়ন, আফগানিস্তান, ভারত, ইরাক ও জাপানের পরোক্ষ চাপের ফলে জাতিসংঘের মহাসচিব কার্ট ওয়াল্ডহেইম ১৯৭৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশে আসেন। এর ফলে ১৯৭৪ সালে আমরা জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার পর ইউনাইটেড নেশনস রিলিফ অপারেশনস, ঢাকা (ইউএনআরওডি) এবং পরবর্তী সময়ে ইউনাইটেড নেশনস রিলিফ অপারেশনস বাংলাদেশ (ইউএনআরওবি) গঠনে ভূমিকা রাখে। এসব প্রয়াস ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটির বেশি বাংলাদেশী শরণার্থীকে ত্রাণসহায়তা এবং পুনর্বাসনে সহায়তা করে। জাতিসংঘ শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশন বা ইউএনএইচসিআর এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এদিকে ১৯৭৩ সালের ৫-৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ায় জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ স্পষ্টভাবে ইসলামী বিশ্বের কাছে এ বার্তা দিয়েছিল যে বঙ্গবন্ধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে পরোয়া করেন না। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার দূরদৃষ্টি অনুসারে উপলব্ধি করেছিলেন যে বাংলাদেশের ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে অগ্রসর হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিস্থিতি দেখা দেয় ১৯৭৩ সালের মিসর-সিরিয়া-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বার্থে ইসরায়েলের বিপক্ষে মিসর ও সিরিয়াকে সমর্থন করার এ সুযোগ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের এ সাহসী পদক্ষেপ শুধু মিসর, সিরিয়া নয়; সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক ও জর্ডানেরও প্রশংসা পায়। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। ১৯৭৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু ও ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল (এর মধ্যে আমিও ছিলাম) পাকিস্তানের লাহোরে যায়। এক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বীকৃতির বিষয়টি সেখানে দ্রুত গতি পায় এবং বাংলাদেশ ওআইসির সদস্যপদ লাভ করে।
১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশনে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য হয় বাংলাদেশ। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর জাতিসংঘের ইতিহাসে সাধারণ অধিবেশনে প্রথমবার বাংলায় ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। ঐতিহাসিক ভাষণে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়—এ বিশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেন।
বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্ব বিশ্বমঞ্চে আমাদের দৃঢ় অবস্থান দেয়। কিন্তু এটা অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার যে ৪৮ বছর পরও বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের খুনিরা ফাঁসির আইনি প্রক্রিয়াকে ফাঁকি দিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো; পররাষ্ট্রনীতি, তথ্য অধিকার ও সুশাসন-সংক্রান্ত বিষয়াদির বিশ্লেষক