অর্থনৈতিক রূপান্তর হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার ফলে একটি অর্থনৈতিক পদ্ধতি থেকে আরো উৎপাদনশীল পদ্ধতিতে পরিবর্তন ঘটে। উন্নয়ন ধারায় সাধারণত এ রূপান্তরের মাধ্যমে কৃষিপ্রধান অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে প্রথমে শিল্প ও ক্রমান্বয়ে সেবাভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিবর্তিত হয়। এর মাধ্যমে দুটি জিনিস ঘটে। একটি হলো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ। এ রূপান্তরের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রযুক্তির উদ্ভাবন, মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারি নীতি এবং বিশ্বায়নের ফলে উদ্ভূত বাড়তি প্রভাব অর্থনীতিকে গতিশীল করে। এর ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয় এবং মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের ফলে অনেক দেশ কৃষিপ্রধান থেকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক রূপান্তর বেশ জটিল সমন্বিত প্রক্রিয়া এবং এর সফলতা নির্ভর করে সমাজস্থিতির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পুঁজির সহজগম্যতা, মানব উন্নয়ন এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার ওপর। বাংলাদেশে বিশেষভাবে গত দেড় দশকে দ্রুত অর্থনৈতিক রূপান্তর সাধিত হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সত্তর দশকে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিল ৬০ শতাংশের ওপর। সেবা খাতের অবদান ছিল ৩৫ শতাংশের মতো আর শিল্পের অবদান ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। সেই থেকে বর্তমানে কৃষির অবদান মাত্র সাড়ে ১১ শতাংশ আর শিল্পের অবদান বেড়ে হয়েছে ৩৫ শতাংশের বেশি। এর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রতি দশকে ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০১০ দশকের শেষ পর্যায়ে তা ৮ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে এর সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য সরকার কমবেশি সচেষ্ট ছিল। দৃষ্টি এড়িয়ে গেলেও বাংলাদেশ উন্নয়ন মডেলের বড় শক্তি হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন মানে হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছে দেয়া, বিশেষ করে যারা ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা বরাবর উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সেসব নীতি, কৌশল ও কর্মসূচিকে উৎসাহিত করে যার ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, আর্থিক সেবা সবার কাছে সহজলভ্য হয়।
বাংলাদেশের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির মূল কারণ হলো, শাসন কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সরকারগুলো কিছুটা পরিমাণে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকে তাল মেলাতে সক্ষম হয়েছে। আশির দশক থেকে জন্মহার হ্রাস, এ দশকের কাঠামোগত সমন্বয় নীতি গ্রহণ, আমদানি বিকল্প নীতি গ্রহণ, তৈরি পোশাক খাতের প্রসারে বন্ডেড ওয়্যারহাউজসহ অন্যান্য নীতিগত ও আর্থিক সুবিধা প্রদান, নব্বই দশকের ওয়াশিংটন কনসেনসাসের (১৯৮৯) আদলে ঋণদাতা সংস্থার চাপিয়ে দেয়া বাজার উদারীকরণ, বেসরকারীকরণ, কর কাঠামো সংস্কার, ঋণ ব্যবস্থার সহজীকরণ, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানি বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে আশি ও নব্বই দশকের প্রথমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে উতল হাওয়া অর্থনীতিকে অনেক প্রভাবিত করেছে। অর্থনীতির বদলে সে সময়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার দিকেই শাসকরা অধিকতর মনোযোগী ছিলেন। সে কারণে প্রবৃদ্ধি যেভাবে হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হয়নি। তবে নব্বই দশকের শুরু থেকে এ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল তৈরি পোশাক রফতানি ও প্রবাসী আয় এবং নব্বই দশকের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু সেতু খুলে দেয়া। ২০১০ এর দশকে জিডিপির অনুপাতে রফতানি ও প্রবাসী আয়ের পরিমাণ তুলনামূলক কমে যায় যদিও রফতানি ও প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে গত দশকে বেড়েছে। এর মূল কারণ হতে পারে এ শতকের প্রথম দশকের শেষ ভাগে বিশ্বমন্দার ফলে বিশ্বব্যাপী চাহিদা কমে যায়। তাছাড়া গত দশকের প্রথম দিকে বৈশ্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় কাঁচামালের আমদানি খরচ বৃদ্ধি পায়। তবে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। গত দশকের জিডিপি প্রবৃদ্ধির বড় চালিকা ছিল বিনিয়োগ। বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এর মূলে ছিল ডজনের বেশি মেগা প্রকল্প গ্রহণ এবং অর্ধশতকের বেশি অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টি। তাছাড়া মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য কমে যাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারের পরিধি বৃদ্ধি পায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সমার্থক বাংলাদেশ একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান টাইগার হিসেবে উত্থান ঘটে। তবে এর মাধ্যমে যে বিষয়টি ঢাকা পড়ে গেছে সেটি হলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সমান্তরালে কিংবা তার চেয়ে বেশি সামাজিক উন্নয়ন সংঘটিত হয়েছে। একটু ব্যাখ্যা করা যাক।
২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের মানদণ্ডে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার তিনটি শর্তই পূরণ করে। এরপর ২০২১ সালে একইভাবে সব শর্ত পূরণ করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি কর্তৃক বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার সুপারিশপ্রাপ্ত হয়। এখানে যে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয় তার মধ্যে শুধু প্রথমটি করা হয় আয়ের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটলাস ভিত্তিতে মাথাপিছু আয় হচ্ছে ১ হাজার ৮২৭ ডলার, যা উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার শর্ত পূরণ করে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে মানবসম্পদ সূচক। এতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মূল সূচকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেমন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এ সূচকগুলোর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মৃত্যুর হার, খর্বকায়ের ব্যাপকতা এবং মাতৃ মৃত্যুহার। শিক্ষাসংক্রান্ত সূচকগুলো হলো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট ভর্তির হার, প্রাপ্তবয়স্ক স্বাক্ষরতার হার এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লিঙ্গসমতা সূচক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সূচকটির মান (৭৫ দশমিক ৩) অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মানের (৭৮ দশমিক ১) খুব কাছাকাছি এবং নির্দিষ্ট মানের (৬৬) বেশ ওপরে। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনায় বরং সামাজিক সূচকগুলো অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে। এদিক থেকে বলা যায়, আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রয়াস ছাড়াও বরং এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেয়া উচিত যাতে আমরা উন্নয়নশীল দেশের গড় আয়ের (৬ হাজার ৬৬৬ ডলার) কাছাকাছি যেতে পারি। তৃতীয়টি হচ্ছে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক। বাংলাদেশের স্কোর (২৭ দশমিক ২) এক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর (৩৩ দশমিক ৬) থেকে অনেক এগিয়ে (নেতিবাচক তাই কম হলে ভালো)। উল্লিখিত জাতিসংঘের মূল্যায়ন থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বরং সামাজিক খাতের উন্নয়ন থেকে তুলনামূলক পিছিয়ে ছিল। অর্থাৎ সামাজিক খাতে সরকার তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ করেছে এবং গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন গত দশকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও এর ইতিহাস কিছুটা পুরনো। প্রথম দিকে শুধু খাদ্য সহায়তা থেকে ১৯৭৪ সালের খাদ্য সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), আশির দশকের ত্রাণ উন্নয়ন (ভিজিডি), রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি, নব্বই দশকের শর্তযুক্ত নগদ অর্থসহায়তা, মধ্য নব্বই থেকে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, একবিংশ শতকের প্রথম দশকে উত্তরণ কর্মসূচি, ভৌগোলিক নির্বাচন ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে বিবর্তিত হয়েছে। সরকার এখন সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি ক্রমোন্নতির দিকে ধাবিত হয়ে উত্তরণের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে মানব উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ, শিক্ষা উপবৃত্তি, আর্থিক সমৃদ্ধির জন্য সঞ্চয়, ক্ষুদ্র ঋণ এবং পরবর্তী সময়ে সরাসরি সম্পদ হস্তান্তরের (আশ্রয়ণ, একটি বাড়ি একটি খামার) মাধ্যমে জীবনচক্র ভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে যুগোপযোগী করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর প্রতিটি কর্মসূচি বিশেষ সময়ে ও বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে দৃশ্যমান যে অনেক কর্মসূচি দ্বৈধতা ও সংখ্যাধিক্যের পাশাপাশি একাধিক সংস্থার অধীন বাস্তবায়নাধীন।
বাংলাদেশ এখন অনেক পরিণত অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই সে বাস্তবতার আলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড জীবনচক্র ভিত্তিক কাঠামোর আওতায় আনার জন্য সরকার ২০১৫ সালে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র গ্রহণ করে। এর উদ্দেশ্য হলো প্রচলিত কর্মসূচিগুলোকে আরো কার্যকর ও ফলপ্রসূ করে তোলা। বাংলাদেশ সরকার যে সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য বদ্ধপরিকর তা বোঝা যাবে বাজেটে এর বরাদ্দের পরিসংখ্যান দেখে। ১৯৯৮ সালে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২১ সালে তা দাঁড়ায় ২ দশমিক ৩ শতাংশে। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা হয়েছে জিডিপির ৩ দশমিক ১১ শতাংশ, যা মোট বাজেট ব্যয়ের ১৮ শতাংশ।
দারিদ্র্য দূরীকরণ কিংবা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী একটা সামান্য উপায় মাত্র। শুধু সামাজিক নিরাপত্তা দিয়ে দারিদ্র্য জয় করা যায় না বা উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় না। তবে দারিদ্র্যের তীব্রতা খানিকটা ঠেকা দেয়া যায়। অন্তর্ভুক্তির জন্য দরকার সব নীতি, কৌশল, মানব উন্নয়ন কার্যক্রম ও উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সুষম উন্নয়ন ও বণ্টন অন্তর্ভুক্ত করা। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ধারাবাহিকভাবে সে প্রচেষ্টাই করে যাচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বৈদ্যুতিকায়ন, বাজারের বিকাশ ও ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। পার্বত্য এলাকা ও হাওর এলাকার কিছু অংশ বাদে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে এখন সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। সেই সঙ্গে সরকার শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করেছে। তাছাড়া সরকার এখন মানব উন্নয়নে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে গত দশকে বাংলাদেশে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সেই সঙ্গে সরকার এখন কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ তথা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সরকার এখন জনগণের দোরগোড়ায় সেবা দিতে বদ্ধপরিকর। ডিজিটাল আউটসোর্সিং সেবা প্রদানে সারা দেশে এখন প্রায় সাড়ে ছয় লাখ তরুণ জড়িত রয়েছে। তারা অর্জন করছে বছরে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের স্পর্শ যে সবাইকে ছুঁয়েছে তার দৃশ্যমান উদাহরণ হলো, গ্রামে কুঁড়ে ঘর উধাও হয়ে যাচ্ছে, গরিরের ঘরেও এখন রঙিন টেলিভিশন ও সবার হাতে মোবাইল। সবার ছেলেমেয়েই এখন গ্রামে ইউনিফর্ম পরে স্কুলে যায়। স্কুলে ঝরে পড়া দ্রুত কমে যাচ্ছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পাশাপাশি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনায় সরকার জোর দিয়েছে। এছাড়া আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা। সত্তর দশকে চালুর পর পরবর্তীতে আশি ও নব্বই দশকেও এ ধারা অব্যাহত থাকে। এ নীতির ফলে গ্রামাঞ্চলে নারীদের বিনামূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী প্রদান ও পরামর্শ প্রদান করা হয়। ফলে নারীপ্রতি জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে স্বাধীনতার সময়ে প্রায় ৭ থেকে ২০১৯ সালে তা ২ দশমিক শূন্য ১-এ চলে এসেছে যা উন্নত দেশের প্রতিস্থাপন হার ২ দশমিক ১-এর চেয়েও কম, পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ১৯৭৬ সালের ৮ শতাংশ থেকে ২০১৯ সালে তা ৬৩ শতাংশে চলে এসেছে। পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক সূচকের অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষত পরিবারে অর্থনৈতিক কর্মে নারীদের অংশগ্রহণের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রেখেছে। তাছাড়া নব্বই দশকে ব্যাপক হারে ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান স্কুলে মেয়েদের ভর্তির হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে। নব্বই দশকের শুরুর দিকে বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে সে সময়।
বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০০০ সালের পর থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ লোক দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। তার মধ্যে ২০১০ থেকে ২০১৬ এ সময়ে ৮০ লাখ লোক দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছে। অর্থনীতির সব খাত কমবেশি দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়তা করেছে। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সামাজিক সূচক ক্ষেত্র যেমন মানব পুঁজি, বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর হার, গড় প্রত্যাশিত আয়ুর বৃদ্ধি ও শিক্ষার ব্যাপকভিত্তিক সম্প্রসারণ এবং নারীর জন্মহার হ্রাস, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস দারিদ্র্য নিরসনে অবদান রেখেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০১০-এর পর থেকে গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্র্য হ্রাস মোট দারিদ্র্য হ্রাসের ৯০ শতাংশ ভূমিকা রেখেছে। সর্বশেষ জনশুমারি ২০২২ অনুসারে, এখনো ৬৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ লোক গ্রামে বাস করে। সরকার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ নীতি গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ গ্রামে শহরের সুবিধাদি নিশ্চিত করার মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের ব্যবধান কমিয়ে আনা হচ্ছে। সরকার যদি প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামো উন্নয়নকেই উন্নয়নের মূল সোপান মনে করত তাহলে কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে এত ভালো ফলাফল লাভ করতে পারতাম না। বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম কর্তৃক প্রণীত বৈশ্বিক জেন্ডার গ্যাপ সূচকে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। ২০২২ সালে এর র্যাংকিং ছিল ৭১তম, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যে সামাজিক পুঁজির উদ্ভব ঘটে তার মূল কারণ সরকারের দূরদর্শী নীতির ফলে দলভিত্তিক ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নারীদের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এখন দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।
অনেক বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ আমাদের দেশে বৈষম্য বেড়ে যাচ্ছে বলে হতাশা প্রকাশ করেন। ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত অক্সফার্মের কমিটমেন্ট টু রিডিউস ইনইকুয়ালিটি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৭তম, একমাত্র মালদ্বীপ বাদে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশই বাংলাদেশের উপরে নেই। ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ডাটাবেজ অনুসারে, ২০০৫ সালের পর থেকে বরং শীর্ষ ১০ শতাংশের আয়ের ভাগ কমেছে এবং নিম্ন ৫০ শতাংশের আয়ের ভাগ বেড়েছে। ২০০৫ সালে শীর্ষ ১০ শতাংশের আয়ের ভাগ ছিল ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২০ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪২ দশমিক ৪ শতাংশে। অন্যদিকে নিম্নের ৫০ শতাংশের আয় ২০০৫ সালে ছিল ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশে। অথচ এ সময়ে সবচেয়ে বেশি আয় বেড়েছে। পূর্ণবয়স্ক মানুষের গড় মাথাপিছু আয় এ সময়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জিনি সহগ হলো বৈষম্য পরিমাপের একটা পদ্ধতি। এটি শূন্য থেকে এক অথবা ১ থেকে ১০০—এই স্কেলে পরিমাপ করা হয়। ভোগের ক্ষেত্রে যে জিনি সহগ রয়েছে—বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বরং ২০০০ সালের পর থেকে তা কমছে। ২০০০ সালে তা ছিল ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৪ শতাংশে, যদিও ২০১০ সালে তা ছিল ৩২ দশমিক ১ শতাংশ।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর এখন বিশ্ব মিডিয়া ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের সমীহ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষত মানব উন্নয়ন, প্রত্যাশিত গড় আয়ু বৃদ্ধি, প্রজননহার হ্রাস, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা অর্জন, বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক এবং সর্বোপরি মাথাপিছু আয়ে ও সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ সূচকে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। সরকার চেয়েছে সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামগ্রিক রূপান্তর। জণগণের কার্যকর অংশগ্রহণ ব্যতীত এ রূপান্তর সম্ভব ছিল না। এটা বাংলাদেশের জণগণের ধারাবাহিক অদম্য শক্তি তথা সামাজিক পুঁজি ও বিশেষভাবে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে উন্নয়নের মূল হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ফসল।
ড. শামসুল আলম: প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য