দেশ, জাতি ও মানবতার কল্যাণে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং সময়ের সঙ্গে এর রূপান্তর অপরিহার্য। কেননা শিক্ষা যেকোনো জাতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে দ্রুত বদলে দিচ্ছে আজকের পৃথিবী। স্বাধীনতার ৫৩ বছরে দেশের সর্বস্তরে শিক্ষার সম্প্রসারণ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু ওই সময়ে গুণগত শিক্ষার বিষয়টি কতটুকু প্রাধান্য পেয়েছে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সার্টিফিকেটসর্বস্ব এ লেখাপড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এটা সত্য যে আর্থসামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অনেক উন্নয়নশীল দেশ থেকে এগিয়ে থাকলেও শিক্ষার মানে ক্রমাবনতি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। কেননা গুণগত মান ছাড়া শিক্ষার সংখ্যাত্মক বৃদ্ধি সামাজিক অস্থিরতার প্রেসক্রিপশন মাত্র। সংখ্যাগত বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এজন্য যেকোনো পর্যায়ের শিক্ষায়তনে পাঠদান, পঠন-পাঠন সর্বজনীনতা গ্রহণযোগ্য মানে রাখা অতীব জরুরি।
জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ একটি মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হলে মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই। তাছাড়া সরকার ঘোষিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে দক্ষ ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ উন্নয়ন অনস্বীকার্য। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার শিক্ষার সংস্কার ও রূপান্তরের নিমিত্তে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ‘অ্যাক্টিভিটি-বেজড লার্নিং সিস্টেম’ চালু করেছে। যদি উক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো ক্রটি থাকে তা বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কারপূর্বক আরো কীভাবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। কেননা নতুন এ শিক্ষা ব্যবস্থা আগামী প্রজন্মকে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে অনেকাংশে সহায়ক হবে। উপরন্তু আগামী প্রজন্ম চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, বিশ্বায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং মধ্য আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে রূপান্তরের জন্যও নিজেদের তৈরি করবে।
কেউ কেউ বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে খণ্ডিত মন্তব্য করছে যা কোনো ক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বলা হচ্ছে নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষা না থাকায় শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই করা সম্ভব নয়। বাস্তবে তা সত্য নয়; বরং বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর ও সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে প্রতিদিন একজন শিক্ষার্থী কী শিখছে, কেমন করে শিখছে, গ্রুপ ওয়ার্ক ও উপস্থাপনে শিক্ষার্থীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে কিনা সবকিছু মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের শৈশব-কৈশোর থেকে তারা সূক্ষ্ম চিন্তার দক্ষতা, সমস্যা নিরূপণ ও সমাধানের দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, যৌথ প্রচেষ্টার দক্ষতা ও দলগত কাজ করার দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হবে। এতে শিক্ষার্থীরা আরো দক্ষ ও যোগ্য হয়ে উঠবে, যা তাদের উচ্চ শিক্ষা ও কর্মজীবনের পথকে অনেকাংশে সুগম করবে।
বর্তমানে শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমে বাড়ছে। বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এতে স্বল্প সময়ে ও ব্যয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ইন্টারনেট সেবা/সংযোগ/ব্যান্ডউইথড দুর্বল সেখানে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তাই শিখন কোর্সটির অফ লাইন ভার্সন তৈরি করতে হবে, যাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনে ইন্টারনেট ছাড়াই শিক্ষা প্রশিক্ষণসংক্রান্ত কোর্সগুলো দেখতে ও নিজেরাই তা শিখে আয়ত্ত করতে পারে।
অন্যান্য পেশার তুলনায় শিক্ষকতা পেশায় তেমন কোনো আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় মেধাবীদের ওই পেশার প্রতি আকর্ষণ অনেকাংশে হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে শিক্ষকতা বাদে অধিকাংশ পেশায় নানারূপে-আকৃতিতে যেমন নামমাত্র মূল্যে প্লট, ফ্ল্যাট, স্বাস্থ্যসেবা, বিভিন্ন নামে ভাতা, উচ্চ হারে সিটিং অ্যালাউন্স, গাড়ি ক্রয়ের ঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা, নানা প্রান্তিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে অধিকাংশ বেসামরিক ও সামরিক পেশাকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষায় ক্রমহ্রাসমান বাজেট বরাদ্দ ও অনাদর অবস্থায় রেখে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ফসল কতটুকু ঘরে তোলা যাবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রসঙ্গক্রমে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ গণপরিষদে খসড়া শাসনতন্ত্র অনুমোদনের সময় প্রদত্ত বক্তৃতার কিছু অংশ নিম্নে উদ্বৃত্ত করছি:
‘মজদুর কৃষকদের টাকা দিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মাইনে, খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করা হয়। মজদুর-কৃষকদের যে অধিকার, সরকারি কর্মচারীদের সে অধিকার থাকবে। এর বেশি অধিকার তারা পেতে পারেন না। সরকারি কর্মচারীদের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে যে তারা শাসক নন, সেবক। সাম পিপল কেম টু মি অ্যান্ড ওয়ান্টেড প্রটেকশন ফ্রম মি। আই টোল্ড দেম, মাই পিপল ওয়ান্ট প্রটেকশন ফ্রম ইউ জেন্টলম্যান। সকলের বাঁচবার মতো অধিকার থাকতে হবে। একজন সবকিছু পাবে, আরেকজন পাবে না, তা হতে পারে না। সম্পদ ভাগ করে খেতে হবে।’
স্বাধীনতা-পরবর্তী শিক্ষা খাতে বাজেটের ২১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল, বর্তমানে তা হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বেশির ভাগ শিক্ষক মানসম্মত নন। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মানসম্মত শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা আশা করা বাতুলতা মাত্র। বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষকদের এমন অবহেলার চোখে দেখা হয় যে মেধাবীরা বর্তমানে শিক্ষকতা পেশায় আশার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। সামাজিক অবস্থান, বেতন কাঠামোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অসামঞ্জস্যে কারণে যোগ্যতাসম্পন্নরা অন্যান্য পেশায় মনোযোগী হওয়ায় মেধাশূন্য হচ্ছে শিক্ষায়তনগুলো। মানসম্মত শিক্ষার জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষার পরিবেশসহ অন্যান্য পেশায় বিদ্যমান যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা। অন্যথায় অদূরভবিষ্যতে জাতিকে চরম মাশুল দিতে হবে।
বর্তমান শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে মানসম্মত শিক্ষা অনস্বীকার্য। গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হয়, কিন্ত দ্রুত পরিবর্তিত পৃথিবীর শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে যেসব জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা দরকার তা গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি অর্জিত শিক্ষার কোনো প্রয়োগ নেই বিধায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (বিমক) বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আউটকাম-বেজড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলামের ওপর সমধিক জোর দিচ্ছে। মূলত ওবিই হলো এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে একজন শিক্ষার্থী শিখন প্রক্রিয়া শেষে কী ধরনের জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে সমর্থ হবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। তাই এ শিক্ষা পদ্ধতি চালুর প্রাথমিক ধাপ হলো শিখন ফল নির্ধারণ এবং পরবর্তী ধাপ হলো শিখনফলের ওপর ভিত্তি করে কারিকুলাম, শিখন ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা।
মূলত ব্লুমের শ্রেণীবিন্যাসের উচ্চতার জ্ঞানীয় দক্ষতায় বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রোগ্রামের শিখনফল (পিএলও) নির্ধারণ করা হয়। উক্ত পিএলওতে একজন শিক্ষার্থী একাডেমিক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর কী কী দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করতে হবে আশা করা হয় তা নির্দিষ্ট থাকে। পরে কোর্সের শিখনফল (সিএলও) নির্ধারণ করতে ব্লুমের শ্রেণীবিন্যাসের নিম্নক্রম থেকে উচ্চক্রমের চিন্তা করার দক্ষতার ছয়টি স্তর: মনে রাখা, অনুধাবন বা বোঝাপড়া, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং সৃষ্টি করার সক্ষমতা বিবেচনায় নেয়া হয়। পিএলও লেখার জন্য বিভিন্ন কর্মক্রিয়া ব্যবহার এবং প্রত্যেক সিএলওর সঙ্গে পিএলওর ম্যাপিং করা আবশ্যক। উল্লেখ্য, ১৯৫৬ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালেয়ের শিক্ষা মনোবিশারদ বেঞ্জামিন ব্লুম শিখনের ছয়টি স্তর ব্যাখ্যা করেছিলেন যা ‘ব্লুমস ট্যাক্সোনমি’ হিসেবে পরিচিত।
এটা সত্য যে ওবিই ক্যারিকুলাম বাস্তবায়ন অনেক চ্যালেঞ্জিং। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রয়াস অপরিহার্য। শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ ওবিই কারিকুলাম বাস্তবায়নে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে আলোচনার জন্য সভা-সেমিনার, কনফারেন্স ইত্যাদি আয়োজন করতে হবে। যদি ওবিই কারিকুলাম যথাযথ বাস্তবায়ন করা না হয় তবে যেসব চাকরিতে উচ্চ স্তরীয় ও মধ্যম স্তরীয় দক্ষতা প্রয়োজন হয় তা ধীরে ধীরে বিদেশীদের হাতে চলে যাবে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে উক্ত স্তরের চাকরিগুলোয় প্রবেশের সুযোগ হাতছাড়া হতে থাকবে।
স্বাধীনতা-উত্তর শিক্ষার পরিধি, কাঠামো ও কলেবর অনেকাংশে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও বিদ্যমান মানব সম্পদ দিয়ে দেশের সার্বিক চাহিদা পূরণ এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবসহ একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। অথচ বিশ্বসভায় বাংলাদেশকে অধিকতর মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করতে হলে মানসম্মত শিক্ষা ও সময়ের সঙ্গে এর রূপান্তর এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ-অর্থনীতি বিনির্মাণের বিকল্প নেই। এরই মধ্যে সরকার শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়নে যুগোপযোগী কর্মসূচী [যেমন-ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ‘অ্যাক্টিভিটি-বেইজড লার্নিং সিস্টেম”; কলেজ পর্যায়ে National Strategic Plan for College Higher Education (2023-31) ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে Strategic Plan for Higher Education(2018-30)] গ্রহণপূর্বক দিপ্তগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। উপরন্তু বর্তমান সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, ২০৩০ এবং ভিশন, ২০৪১ সামনে রেখে শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তরুণ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে সরকার মানসম্মত শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং গবেষণা উদ্ভাবনের ওপর জোর দিচ্ছে। আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কতৃক গৃহীত বিভিন্ন কমসূচি ও কৌশলগত পরিকল্পনাগুলো যথাসময়ে ও সূচারুরূপে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শিক্ষায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সক্ষম হবে—ইনশাআল্লাহ।
অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের: সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন