বিশ্ব অর্থনীতি

চীন প্রশ্নে ইউরোপের তৃতীয় পথ যেমন হতে পারে

এমন এক সময়ে চীনা উৎপাদকরা তুলনামূলক কম দামে গাড়ি দিচ্ছেন, যখন ইউরোপ ভোক্তাদের অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত গাড়ি ছেড়ে বৈদ্যুতিক গাড়িতে যেতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।

চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নে ইউরোপ এখন সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন তার সর্বশেষ ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে উল্লেখ করেছেন, চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ঘাটতি এখন প্রতিদিন ১০০ কোটি ইউরো বা ১১৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘সেকেন্ড চায়না শক’ এরই মধ্যে ইউরোপের শিল্পাঞ্চলগুলোয় শিল্প হ্রাসের প্রবণতায় ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও জোর দিয়ে বলেছেন যে ইউরোপের বাজারে প্রবেশাধিকার চীনের প্রয়োজন এবং সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষেরই স্বার্থ রয়েছে।

এ টানাপড়েন আসলে অর্থনীতির একটি মৌলিক দ্বিধাকে সামনে নিয়ে আসে। চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও বিরোধের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই বিস্তৃত পরিসরের বিধিনিষেধ আরোপের পথ নিয়েছে। এর মধ্যে এমন ব্যবস্থাও রয়েছে, যা কার্যত চীনের সব বৈদ্যুতিক গাড়িকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে দূরে রাখছে। প্রশ্ন হলো, ইউরোপেরও কি একই পথে যাওয়া উচিত? নাকি তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত নীতি যেটি কিনা দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের ভোক্তা ও রফতানিকারকদের সুফল দিয়েছে, সেটিই বজায় রাখা উচিত?

প্রশ্নটি হয়তো এভাবে তোলাই ঠিক নয়। কারণ সব খাতের জন্য সমানভাবে কার্যকর এমন একক কোনো চীননীতি নেই। কোনো কোনো বাজারে জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ অত্যন্ত জোরালো, আবার অন্য ক্ষেত্রে সেই উদ্বেগ অনেকটাই দুর্বল। একক কোনো সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কিছু উৎপাদকের জন্য সত্যিকারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, কিন্তু অন্যদের জন্য সস্তা আমদানি উল্লেখযোগ্য সুবিধাও এনে দেয়। তাই সংঘাতের পথ ও আগের মতো ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেয়ার বদলে ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের উচিত খাতভিত্তিকভাবে এসব লাভ-ক্ষতির হিসাব করা এবং কোথায় উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক সমঝোতার সুযোগ এখনো রয়েছে, তা খুঁজে দেখা।

এক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিশেষভাবে শিক্ষণীয় একটি উদাহরণ। চীন থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির পক্ষে অর্থনৈতিক যুক্তিটি খুবই সরল। এমন এক সময়ে চীনা উৎপাদকরা তুলনামূলক কম দামে গাড়ি দিচ্ছেন, যখন ইউরোপ ভোক্তাদের অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত গাড়ি ছেড়ে বৈদ্যুতিক গাড়িতে যেতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। কম দামের বৈদ্যুতিক গাড়ি ভোক্তাদের উপকার করে, প্রতিযোগিতা বাড়ায় এবং বিদ্যুতায়নের গতি ত্বরান্বিত করে। এ ধরনের সুফল বেশ বড় হতে পারে।

কিন্তু মুক্ত বাণিজ্যের প্রচলিত প্রতিক্রিয়া—অর্থাৎ সস্তা আমদানির সুবিধা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষা করে। ইউরোপে বিশাল একটি গাড়ি শিল্প রয়েছে, যার ওপর বহু প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক, সরবরাহকারী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্ভরশীল। দেশীয় উৎপাদন দ্রুত কমে গেলে অর্থনীতিকে মানিয়ে নিতে বড় ধরনের ব্যয় বহন করতে হতে পারে এবং একই সঙ্গে নতুন ধরনের নির্ভরতাও তৈরি হতে পারে। বাণিজ্যের সামগ্রিক সুফল নিয়ে অর্থনীতিবিদরা যা-ই বলুন না কেন, বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি অবাধ রাখার রাজনৈতিক পরিণতি একেবারে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

তবে সামগ্রিক ফলাফলকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়। অত্যধিক শুল্ক ও দেশীয় বিধিবিধানের মাধ্যমে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি ইউরোপের বাজার থেকে বাদ দিলে হয়তো বর্তমান উৎপাদকরা সুরক্ষা পাবেন, কিন্তু তার বিনিময়ে ইউরোপীয় ভোক্তারা কম দামের বিকল্প থেকে বঞ্চিত হবেন। ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রতিযোগিতার চাপও কমে যাবে এবং সবুজ রূপান্তরের গতি মন্থর হবে। আমাদের করা বিভিন্ন পরিস্থিতির অনুকরণভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউরোপীয় বাজার থেকে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি পুরোপুরি বাদ দিলে যে কল্যাণগত ক্ষতি হয়, তা ইউরোপের বর্তমানে আরোপিত ক্ষতিপূরণমূলক শুল্কের তুলনায় অনেক বেশি।

সৌভাগ্যবশত, এর মাঝামাঝি একটি পথ রয়েছে। সরকারগুলো চীনা বৈদ্যুতিক গাড়িকে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দিতে পারে, তবে একই সঙ্গে ১২ দশমিক ৫ থেকে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে মাঝারি মাত্রার শুল্ক আরোপ করতে পারে। সেই শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্ব ব্যবহার করা যেতে পারে দেশে উৎপাদিত বৈদ্যুতিক গাড়িকে সহায়তা দিতে। এ পদ্ধতিতে একই সঙ্গে দুটি লক্ষ্য অর্জন সম্ভব—একদিকে তুলনামূলক কম দামের আমদানির সুযোগ বজায় থাকবে, অন্যদিকে প্রতিযোগিতার আকস্মিক ধাক্কা থেকে ইউরোপীয় উৎপাদকদের কিছুটা সুরক্ষা দেয়া যাবে। আর যেহেতু শুল্ক থেকে পাওয়া অর্থই দেশীয় ভর্তুকির জোগান দেবে, তাই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়েরও প্রয়োজন হবে না।

এ ফলাফলের পেছনের অর্থনৈতিক যুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশী উৎপাদকরা শুল্কের পুরো বোঝা যে ইউরোপীয় ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেবেন, তা নিশ্চিত নয়। কারণ বাজারে প্রতিযোগিতা যখন পূর্ণাঙ্গ নয়, তখন নিজেদের মুনাফার হার কমিয়ে তারা শুল্কের একটি অংশ নিজেরাই বহন করতে পারেন। একই সময়ে দেশীয় বৈদ্যুতিক গাড়িতে ভর্তুকি দিলে সেগুলোর দাম কমবে এবং আমদানি করা গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বাড়বে। আমাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্ব ইউরোপীয় বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে ভর্তুকি হিসেবে ফিরিয়ে দেয়া হলে শুধু শুল্ক আরোপের তুলনায় ফল অনেক ভালো হয়। এ ব্যবস্থাকে যান্ত্রিকভাবে সব জায়গায় প্রয়োগ না করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপের বিভিন্ন বাজারের ক্ষেত্রে আমাদের হিসাবের ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। জার্মানিতে বড় দেশীয় গাড়ি শিল্প এবং কয়েক ডজন বৈদ্যুতিক গাড়ির মডেল রয়েছে। ফলে দেশীয় উৎপাদন রক্ষার মাধ্যমে দেশটি স্পেনের তুলনায় বেশি লাভবান হতে পারে। আমাদের উপাত্তে স্পেনে সদর দপ্তর থাকা কোনো বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদক নেই। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি আবার ভিন্ন। সেখানে দেশীয় বাজারের অংশটি তুলনামূলক ছোট হলেও মুনাফার হার বেশি। ফলে আমাদের মডেল অনুযায়ী এ তিন দেশের জন্য যে নীতিগত সমন্বয় সবচেয়ে কার্যকর বলে উঠে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। তবে সবার ক্ষেত্রেই একটি বিষয় অভিন্ন—সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার চেয়ে মাঝারি মাত্রার সুরক্ষা ভালো ফল দেয়।

এ ভিন্নতাই চীনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক নিয়ে আরো বিস্তৃত একটি শিক্ষা দেয়। ইউরোপের সামনে কেবল বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা অথবা চীনের সঙ্গে আমূল বিচ্ছিন্ন হওয়ার মধ্য থেকে একটি বেছে নেয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। একইভাবে একেবারে ভিন্ন অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে তৈরি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগুলোও ইউরোপের স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করা উচিত নয়। আরো বাস্তববাদী একটি পদ্ধতির সূচনা হতে পারে প্রতিটি বাজারে ইউরোপের মূল লক্ষ্য কী, সেটি নির্ধারণের মাধ্যমে। প্রধান উদ্বেগ কি জাতীয় নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা, নাকি সবুজ রূপান্তর? লক্ষ্য ভিন্ন হলে প্রয়োজনীয় নীতিগত উপকরণও ভিন্ন হবে। কখনো কখনো বাজার কতটা উন্মুক্ত থাকবে, তার মাত্রাও ভিন্ন হওয়া প্রয়োজন।

সব ক্ষেত্রে এ মধ্যপন্থা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না। কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল খাতগুলোয় ইউরোপ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে যে স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ব্যয়ও মেনে নিতে হবে। কিন্তু যেখানে মূল চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তার কোনো দুর্বলতা দূর করা নয়, বরং প্রতিযোগিতা সামলানো, সেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ির উদাহরণ আরেকটি সম্ভাবনার কথা বলে। সেটি হলো—বাণিজ্য থেকে পাওয়া সুফল অক্ষুণ্ন রাখা, বিদেশী উৎপাদকদের তৈরি মুনাফার একটি অংশ নিজেদের আয়ত্তে আনা এবং সেই অর্থ ব্যবহার করে দেশীয় শিল্পকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করা।

ইউরোপকে কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতেই হবে—এমন নয়। ক্রমেই আরো বৈরী হয়ে ওঠা বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশে বাস্তববাদই সবচেয়ে কার্যকর নীতি।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

পিনেলোপি কুজিয়ানু গোল্ডবার্গ: বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং ‘আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউ’-এর সাবেক প্রধান সম্পাদক। তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

আরও