সময়ের ভাবনা

বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হতে পারে ডিজিটাল নোম্যাড ভিসা

বিশ্বে যখন করোনার হানা। মানুষ যখন ঘরবন্দি, অফিস বন্ধ। যখন কর্মীরা চাকরি হারাচ্ছিলেন, দেউলিয়া হচ্ছিল অফিস, সে সময় সুযোগ এল ঘরে বসেই অফিসের কাজ করার। বেশি দিন নয়, ২০২০ সালে কভিড-১৯-এর জোয়ারে কর্মীরা ব্যাপক হারে হোম অফিস শুরু করেন। এখন সেই প্রবণতা কমলেও বর্তমান প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগের কল্যাণে তা শেষ হয়ে যায়নি। বরং এটির চাহিদা যে রয়েছে এবং

বিশ্বে যখন করোনার হানা। মানুষ যখন ঘরবন্দি, অফিস বন্ধ। যখন কর্মীরা চাকরি হারাচ্ছিলেন, দেউলিয়া হচ্ছিল অফিস, সে সময় সুযোগ এল ঘরে বসেই অফিসের কাজ করার। বেশি দিন নয়, ২০২০ সালে কভিড-১৯-এর জোয়ারে কর্মীরা ব্যাপক হারে হোম অফিস শুরু করেন। এখন সেই প্রবণতা কমলেও বর্তমান প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগের কল্যাণে তা শেষ হয়ে যায়নি। বরং এটির চাহিদা যে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে যে বাড়বে তা স্পষ্ট। 

অনেকেই ভাবেন কর্মজীবনে ছুটি পেলে, টাকা জমিয়ে অন্য একটি দেশ ঘুরে আসবেন। সে দিন গেছে, এখন একটি দেশে কাজের মধ্যেই যাওয়া যায়, ঘোরা যায়, থাকাও যায়। আর সে সুযোগ দিচ্ছে ডিজিটাল নোম্যাড বা ডিজিটাল যাযাবর ভিসা। এ ভিসার কথা বেশ শোনা যাচ্ছে আজকাল। 

এটি এমন এক ধরনের ভিসা, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি ভিসা প্রদানকারী দেশে বসে পৃথিবীর যেকোনো জায়গার কাজ করার আইনি অধিকার রাখে। যারা দূর থেকে কাজ করতে চান তাদের জন্যই এ ধরনের ভিসা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। 

ইউরোপের দেশ এস্তোনিয়া ২০২০ সালে প্রথম নোম্যাড ভিসা চালু করে। পরবর্তী সময়ে উত্তর ও মধ্য আমেরিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে ডিজিটাল যাযাবর ভিসা চালু করে। বর্তমানে ৬৬টি দেশে এ ভিসা চালু রয়েছে এবং দিন দিন আরো নতুন নতুন দেশ এ তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। তবে এ তালিকায় এখনো বাংলাদেশের নাম আসেনি। 

ধরা যাক, আপনি কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় বাস করতে চান, কিন্তু সে দেশে আপনার চাকরি বা কাজ নেই। তা সত্ত্বেও নোম্যাড ভিসার মাধ্যমে আপনি সে দেশে থাকতে পারবেন। ডিজিটাল নোম্যাড ভিসাধারীরা এক দেশে গিয়ে আরেক দেশের কাজ করতে পারেন। যেমন লেখক, সফটওয়্যার প্রকৌশলী, গ্রাফিকস ডিজাইনার, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকসহ নানা পেশার মানুষ। তবে এ সুযোগ পেতে আবেদনকারীর থাকতে হবে বেশকিছু যোগ্যতা। এজন্য কিছু শর্ত মানতে হবে। এ ভিসা নিয়ে নির্ধারিত দেশে নির্দিষ্ট সময়ে বসবাস করতে হবে। তবে সেই দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করা যাবে না। অন্য দেশের প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিতে কাজ করা যাবে। ভিসার মেয়াদ শেষ হলে সেই দেশ থেকে ফেরত আসতে হবে। অথবা ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ থাকলে তা বাড়াতে হবে। 

ওয়ার্ল্ড ভিসা গাইডের তথ্যানুযায়ী, আবেদনকারীকে কিছু যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। প্রথমত, বয়স অবশ্যই ১৮ বছরের বেশি হতে হবে। দেশভেদে একটি নির্দিষ্ট মাসিক আয় থাকতে হবে। অবশ্যই এমন একটি কাজ থাকতে হবে, যা বিশ্বের যেকোনো জায়গায় বসে করা যাবে। এ ভিসা দীর্ঘস্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ দেয় না। এটি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সম্পৃক্ত কর্মীদের জন্য উপযুক্ত।

যেসব দেশ ও অঞ্চল নোম্যাড ভিসা অফার করছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইউরোপে পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া, জার্মানি, গ্রিস, মেক্সিকো ও পানামা; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইন্দোনেশিয়ার বালি ও থাইল্যান্ড; পূর্ব এশিয়ার জাপান; মধ্যপ্রাচ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই ও আবুধাবি; এশিয়ার দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম; দক্ষিণ আমেরিকায় কলম্বিয়া, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা; ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে বার্বাডোস, বারমুডা ও বাহামাস; আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকা, মরিশাস ও সেশেলস এবং ওশেনিয়ায় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। এসব দেশের ভিসার খরচ একেক দেশে একেক রকম। তবে পর্তুগাল, স্পেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সেন্ট লুসিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও ব্রাজিলে এ ভিসা পাওয়া কিছুটা সহজ। তবে নোম্যাড ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ দেশ হচ্ছে সেন্ট লুসিয়া। কারণ আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার জন্য তার আয়ের সীমা প্রমাণ করতে হয় না। 

অনেকে ট্যুরিস্ট ভিসার সঙ্গে ডিজিটাল নোম্যাড ভিসা মিলিয়ে ফেলেন। পার্থক্যটি হলো ট্যুরিস্ট ভিসা প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে, দেশভেদে এটি সাধারণত ৩০ দিনের জন্য বৈধ থাকে এবং এটি শুধু ভ্রমণের অনুমতি দেয়। অন্যদিকে নোম্যাড ভিসা প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস সময় লাগে, এই ভিসা ৯০ দিনের বেশি সময় ধরে বৈধ থাকে। এটি পেতে কাজ বা চাকরি বাধ্যতামূলক। 

মজার বিষয় হলো, নোম্যাড ভিসার মাধ্যমে আপনি ট্যুরিস্ট ভিসার স্বাদ পেতে পারেন। এ ভিসার মেয়াদ দেশভেদে ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত বাড়ানো যায়। রয়েছে কর সুবিধাও। এছাড়া নোম্যাড ভিসাকে ভিত্তি করে কাঙ্ক্ষিত দেশের সিটিজেনশিপ পাওয়ার পথও প্রশস্ত করে ফেলা যায়।

দক্ষিণ কোরিয়ায় চলতি বছর এ ভিসার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। ‘ওয়ার্কেশন’ ভিসা নামেও পরিচিত ভিসাটি কেউ পেলে তার স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া যেতে পারবেন। রিমোট কর্মজীবীরা এ ভিসার মাধ্যমে দুই বছর পর্যন্ত সময় দক্ষিণ কোরিয়ায় কাটাতে পারবেন এবং এ সময়সীমা আরো এক বছর বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে। এ বছর জাপানও এ ভিসা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। এ ভিসা পেলে ছয় মাস জাপানে রিমোটলি বসে কাজ করা যাবে। পরে ভিসা নবায়নের জন্য আরো ছয় মাস অপেক্ষা করতে হবে। আবার স্পেনে এ ভিসা পেতে হলে ব্যাচেলর বা মাস্টার্স ডিগ্রি বা নিজ পেশায় তিন বছরের কর্মদক্ষতা থাকতে হবে। অবশ্যই ইউরোপের দেশের নাগরিক হতে হবে।

এটা সত্য যে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বাংলাদেশীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। এ প্রবণতা দেশের শিক্ষিত (নিম্ন) মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেও বেড়েছে। যানজট, দূষণ, জীবনযাপনের ক্রমাগত ব্যয় বৃদ্ধি ও আবাসন সমস্যার কারণে অনেকে দেশ ত্যাগ করছেন। তাদের জন্য ডিজিটাল নোম্যাড ভিসাও একটি সুযোগ। যারা রিমোটলি কাজ করেন, এ ভিসার মাধ্যমে তারা অভিবাসনে যেতে পারেন। অনেকে সে সুযোগ নেবেনও। এতে বাংলাদেশের খুব একটা লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই। বরং যে দেশে এ ভিসা নিয়ে যাবেন, সে দেশ উপকৃত হবে বেশি। 

বাংলাদেশেও এখন নানা কারণে বিপুলসংখ্যক বিদেশী নাগরিক আসছেন। তাদের অনেকেই এখানে কর্মরত। তাদের মাধ্যমে দেশের টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। আবার কর ফাঁকি দেয়া এবং স্থানীয়দের কাজের সুযোগ কমছে। দেশে বর্তমানে ভারত, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, শ্রীলংকা, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, তাইওয়ান ও জাপানের উল্লেখযোগ্য কর্মী কাজ করছেন। 

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগের রিপোর্ট অনুসারে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত বৈধ বিদেশী নাগরিকদের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭। এর মধ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত ভিসায় এসেছেন ১০ হাজার ৪৮৫ জন, এমপ্লয়ি ভিসায় ১৪ হাজার ৩৯৯, স্টাডি ভিসায় ৬ হাজার ৮২৭ ও ট্যুরিস্ট ভিসায় এসেছেন ৭৫ হাজার ৪৫৬ জন (বণিক বার্তা, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪)। সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী জানিয়েছেন, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশী নাগরিকরা তাদের আয় থেকে সাড়ে ১৩ কোটি মার্কিন ডলার নিজ নিজ দেশে নিয়ে গেছেন (প্রথম আলো, ২৪ জুন, ২০২৪)।

বর্তমান সরকার যেভাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে, তাতে ডিজিটাল নোম্যাড ভিসা চালুর বিষয়েও ভাবতে পারে। এতে বিদেশীদের কাজ না দিয়েও দেশে আকর্ষণ করা যাবে। বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ডিজিটাল সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অর্থনীতি ও সুশাসনের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করা যাবে। দেশে এখন হাই-টেক পার্ক ও প্রচুর আইটি ফার্ম রয়েছে। যারা এ ভিসায় দেশে আসতে চান, তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জন্য আলাদা আবাসন জোনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

বিদেশী নাগরিকরা এলে বাংলাদেশই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। কারণ তারা এখানে এসে যে থাকবেন, চলবেন তাতে স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবেশ ঘটবে। আবাসন হাউজ, বিপণি কেন্দ্র ও হোটেল ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। তাছাড়া বিদেশীরা এলে দেশের চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটন সেবায় পরিবর্তন আসবে। 

সাময়িক এ অভিবাসনের জন্য বিদেশীদের আকৃষ্ট করতে উন্নততর আবাসন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা, নিরাপত্তা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যটন অবকাঠামোর ওপর নজর দিতে হবে। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি ঠিক রেখে সেবার মান বাড়াতে পারলে সময়োপযোগী নোম্যাড ভিসার সুফল ভোগ করতে পারে বাংলাদেশ। 

পাপলু রহমান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা

আরও