সামষ্টিক অর্থনীতি

বাংলাদেশ: মেঘের আড়ালে সূর্য হাসে

টানা দুই বছরের অধিক সময় কভিড-১৯-এর ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময়ে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ গোটা বিশ্বে এক নতুন অভিঘাত নিয়ে এসেছে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা দিয়েছেন আপাতত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে সর্বাধিক অগ্রাধিকার। গত

টানা দুই বছরের অধিক সময় কভিড-১৯-এর ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময়ে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ গোটা বিশ্বে এক নতুন অভিঘাত নিয়ে এসেছে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা দিয়েছেন আপাতত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে সর্বাধিক অগ্রাধিকার। গত মার্চে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্য মূল্যসূচক গত ৬০ বছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড করে। বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস জুন, ২০২২-এর প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, চলমান সংকট অব্যাহত থাকলে তা গত শতাব্দীর ৭০ দশকের মতো অর্থনৈতিক স্থবিরতা (স্ট্যাগফ্লেশন) হতে পারে। উল্লেখ্য, এটি এমন একটি অবস্থা যা উচ্চমূল্যস্ফীতির সঙ্গে নিম্ন প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ বেকারত্ব সম্পৃক্ত। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) জুলাই, ২০২২-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক আপডেটে টানা তৃতীয়বারের মতো বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ কমানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অর্থনীতির নিকট ভবিষ্যৎ অন্ধকার ও অনিশ্চিত এবং শিগগিরই মন্দার দিকে ধাবিত হতে পারে। সব মিলিয়ে বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পূর্বাভাস এখনো সুখকর নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একসময় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকলেও শ্রীলংকা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এর জন্য বৈশ্বিক পরিস্থিতি দায়ী না থাকলেও অনেকে বাংলাদেশকে শ্রীলংকার সঙ্গে তুলনার চেষ্টা করেছেন। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাওয়ায় অনেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সংকটাপন্ন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশের ঋণ চাওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। বাংলাদেশের চলমান এ আমদানীকৃত মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটের কঠিন পরিস্থিতির উদ্ভব প্রায় পুরোটা বৈশ্বিকভাবে সৃষ্ট হলেও শ্রীলংকার সংকটের মূলে ছিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ জনবিচ্যুত রাজনীতি ও ভুল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের হিসাবে ২০২১ সালের শেষের দিকে শ্রীলংকার মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় জিডিপির ১১৯ শতাংশে আর শুধু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের ২০২১ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে মোট ঋণের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ আর বৈদেশিক ঋণের অংশ ১২ শতাংশ। ২০১০ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে ঋণের নিরাপদ সীমা হচ্ছে জিডিপির ৭৭ শতাংশ এবং উদীয়মান অর্থনীতির ক্ষেত্রে তা ৬৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ঋণ মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও বৈদেশিক এবং মোট ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি নিম্ন ঝুঁকির দেশ হিসেবে অবহিত করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের ডলার ব্যবস্থাপনার জন্য এবং অর্থনীতির উত্থানে আইএমএফের কাছে ঋণ চাওয়াকে অনেকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশে প্রবৃদ্ধি ও পুঁজি সঞ্চয়নের কথা বিবেচনায় রেখে।

সম্প্রতি রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ডজনের অধিক দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে যারা শ্রীলংকার মতো গভীর সংকটে পতিত হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে শ্রীলংকা, লেবানন, সুরিনাম, জাম্বিয়া দেউলিয়ার খাতায় নাম লিখিয়েছে। প্রতিবেদনে আরো যে ১২টি দেশের নাম রয়েছে, সেগুলো হলো আর্জেন্টিনা, বেলারুশ, একুয়েডর, মিসর, এল সালভাদর, ইথিওপিয়া, ঘানা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, তিউনিসিয়া, ইউক্রেন। কিন্তু কিছু সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের আইএমএফের কাছে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চাওয়াকে ‘বেইলআউট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা মোটেই সঠিক নয়। বাংলাদেশ সংকটে দিশেহারা নয় বা কাদায় আটকে পড়েনি যে তাকে উদ্ধার করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলংকা ও পাকিস্তান বেইলআউট চেয়েছে। কারণ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেক কম। শ্রীলংকার রিজার্ভের পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলারের কম আর পাকিস্তানের বর্তমান (২২ জুলাই ২০২২) রিজার্ভ মাত্র ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, গত বছর আমাদের রিজার্ভ যখন ৪৬ বিলিয়ন ডলারের উপর চলে যায়, তখন অনেকে এই ডলার ব্যবস্থাপনা কঠিন হবে বলে মত দিয়েছিল। আমাদের পাশের দেশ ভারতেও এখন রিজার্ভ গত ২০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে চলে এসেছে। শুধু এ সপ্তাহেই রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার রিজার্ভ ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার কমেছে। বাংলাদেশ বরাবরই ঋণ পরিশোধে সক্ষমতা দেখিয়েছে। গত অর্থবছর এবং তার আগের অর্থবছরে গড়ে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের মতো ঋণ পরিশোধ করেছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো বৈদেশিক সহযোগিতা পেয়েছে, যার ৯৮ ভাগই ঋণ। তার মানে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বেড়েছে বলেই ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। কাজেই শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা অসম, তাই যথাযথ নয়। বাংলাদেশ বাজেট সহায়তার জন্য আইএমএফের কাছে ঋণ চেয়েছে। করোনার সময়েও বাংলাদেশ একইভাবে বাজেট সহায়তা চেয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত বলেই প্রকল্পে ঋণের পাশাপাশি সরাসরি বাজেট সহায়তার জন্য ঋণ দেয়া হচ্ছে। এর ফলে খরচের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে। মূলত বৈশ্বিকভাবে আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় চলতি হিসাবের ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ডলারের কিছুটা অপ্রতুলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য শুধু আইএমএফ নয়, অন্যান্য বহুপক্ষীয় সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের কাছেও ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে। বাংলাদেশের সক্ষমতা আছে বলেই এ ঋণ চেয়েছে সতর্কতা হিসেবে যদি রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় বা বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হয়, ‘বেইলআউট’-এর জন্য নয়। সে কারণেই সরকার এখন সতর্কতা হিসেবে খরচ কমানোর দিকে নজর দিয়েছে। কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। দেশের অর্থনীতির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির সহায়ক এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু ১০০ ভাগ ব্যয়ের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স। গত বছর আমরা স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি ৫২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি করতে সক্ষম হয়েছি। তৈরি পোশাক ও হোম টেক্সটাইল বাদেও রফতানি খাতের আরো কয়েকটিতে (পাট ও পাটজাতীয় পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাতীয় পণ্য, ইলেকট্রনিকস, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষিজাত পণ্য) এখন ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। এটা ঠিক যে, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসী আয় তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার (১৫ শতাংশ) কম হয়েছে। তবে মনে রাখা দরকার, ২০২০-২১ অর্থবছরে আমাদের বিদেশ গমনকারী শ্রমিকের সংখ্যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল, তিন লাখের কম। তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ঘুরে দাঁড়িয়ে গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল, যা প্রায় নয় লাখ। তার ফলও আমরা এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছি। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে প্রবাসী আয় গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগামীতে বড় ধরনের কোনো অভিঘাত না এলে এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে প্রতীয়মান হয়। এরই মধ্যে বিলাসবহুল পণ্যে আমদানির ওপর কঠোর পদক্ষেপের কারণে গত জুলাইয়ে আমদানি ব্যয় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার কমে এসেছে, যা আগের মাসের তুলনায় ৩১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে রফতানির ক্ষেত্রেও জুলাইয়ে ইতিবাচক ধারা লক্ষ করা গিয়েছে, রফতানি বেড়েছে ১৫ শতাংশ। জুলাইয়ে গত অর্থবছরের জুলাইয়ের তুলনায় রফতানি ১৫ শতাংশ বেড়েছে। গত অর্থবছরে রাজস্ব আয় বেড়েছে ১৪ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি বিশ্বব্যাপী এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মূল্যস্ফীতি বেশ কয়েকটি রেকর্ড গড়েছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বাইরে থেকে আসা মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অবশ্য গত জুনে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি যে বাড়বে তা সহজেই অনুমেয় ছিল। গত জুন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য উভয় দেশেই মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১ শতাংশ। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে এ হার যথাক্রমে ৭ ও ২১ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোর অবস্থাও বেশ শোচনীয়। ওইসিডিভুক্ত (অর্গানাইজেশন অব ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) দেশগুলোয় গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনায় মূল্যস্ফীতি ৬০ শতাংশের উপর চলে গেলে সে দেশের অর্থমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। তুরস্কে গত জুনে মূল্যস্ফীতি ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ৮০ শতাংশ ছুঁয়েছে। গত জুলাইয়ে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি ৬০ শতাংশের ওপর চলে গিয়েছে। কাজেই মূল্যস্ফীতি এখন ভীতিকর বৈশ্বিক সমস্যা। তাছাড়া জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি বরাবরই তুলনামূলক একটু বেশি থাকে। বিশেষত বন্যা ও বৃষ্টির কারণে সরবরাহে একটু ঘাটতি থাকে। শুকনো মৌসুম শুরু হলে বাজারে সবজির সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যায়। বিশ্ববাজারে এখন খাদ্য সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে খাদ্যপণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্য মূল্যসূচক জুনে টানা তিন মাস ধরে কমছে। তেলের বাজারেও দাম পড়তে শুরু করেছে। অপরিশোধিত তেল এখন ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে চলে এসেছে। কাজেই বলা যায়, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মূল্য কমতির দিকে।

সরকার আগাম সতর্কতা হিসেবে কয়েক মাস আগে থেকেই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন প্রকল্প অনুমোদন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রাধান্য নির্ধারণ, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে কঠোর অবস্থান, গাড়ি ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা, আমদানির ক্ষেত্রে ৩ মিলিয়ন ডলারের উপর এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি, বিদ্যুৎ ব্যবহার সাশ্রয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, সরকারি অফিসে ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ কমানো, রাত ৮টার পর শপিং মল বন্ধ রাখা, পেট্রল পাম্পগুলোয় তেলের সরবরাহ সীমিত রাখা, সরকারি সভায় যথাসম্ভব শারীরিক উপস্থিতি পরিহার করে অনলাইনে সম্পন্ন করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বাজার তদারকি ও টিসিবির কার্যক্রম বাড়ানো, মানি চেঞ্জারগুলোকে সতর্ক পরিবীক্ষণে আনা। সরকার গত দেড় দশক ধরে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে। সে কারণে ২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব, ২০১১ সালের বৈশ্বিক উচ্চমূল্যস্ফীতি, কভিড-১৯ সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে। করোনার সময়ে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ যেখানে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির সম্মুখীন হয়েছিল সেখানে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম ছিল। ছিল ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। এ তো গেল অর্থনীতির হিসাব। সর্বশেষ ৩১ জুলাই, ২০২২-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ টিকাদানের ক্ষেত্রে প্রথম সারির দেশগুলোর (১৬তম) মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে কভিড ব্যবস্থাপনা ও টিকাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। তাতে সতর্কতামূলক কিছুটা সংকোচনমুখী নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষত বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপর জোর প্রদান করবে। বাজেটে জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা (১২ দশমিক ১ শতাংশ) তুলনামূলক কম ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি হার রেপো রেট ৫০ পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিক থেকে বোঝা যাচ্ছে, সরকার প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সেটা প্রধানমন্ত্রী বাজেট আলোচনায় স্পষ্টভাবে বলেছেন। বাজেটের আগে সরকার মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতির নীতি বিবৃতি দিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে কভিড-১৯ পুনরুদ্ধারের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়ন। কভিড-১৯ পুনরুদ্ধারের জন্য কৌশলগত দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাংকিং চ্যানেলে নিম্ন সুদের হার প্রচলন এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, গরিব, দুস্থ, বেকার ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিতদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তিমত্তা সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও অটুট রয়েছে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো, একদিকে প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হওয়া আর অন্যদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। তার জন্য যে চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বেশি সেটি হলো আমাদের জিডিপির অনুপাতে কর ও রাজস্ব বৃদ্ধি করা। ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোয় গড়ে এ হার ৩৩ শতাংশের (২০২০) উপর। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এ হার প্রায় ২৫ শতাংশ। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২৫ সালের মধ্যে এ হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা দেয়া আছে। সরকার অনুধাবন করেছে আমাদের কর জিডিপির হার বৃদ্ধি করতে না পারলে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব না। গত মাসের সচিব কমিটির সভায় তাই এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সব সচিব/মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে মধ্য মেয়াদি সামষ্টিক নীতিতে উল্লেখযোগ্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সেগুলো হলো—ভ্যাট আইন, ২০১২ কার্যকর করা, কাস্টমস আইন ও আয়কর আইন প্রণয়ন, ভ্যাট সিস্টেমস অটোমেশন, কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়করের ই-পেমেন্ট, স্বয়ংক্রিয় চালান প্রচলন, অনলাইনে আয়কর সাবমিশন প্রসারণ, ভ্যাট আদায়ে ইলেকট্রনিক ডিভাইস চালু করা, করের আওতাভুক্ত জনগোষ্ঠীর পরিধি বৃদ্ধি।

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে রয়েছে এবং সঠিক পথে ধাবিত হচ্ছে। অর্থনীতির বিভিন্ন ঝুঁকি আছে এবং অনেক সময় একীভূত বিশ্ব ব্যবস্থায় সেগুলো মোকাবেলা করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ অনেক কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। চলমান বৈশ্বিক সংকটও ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠবে। অর্থনীতি কখনো একই গতিতে এগোয় না। সেখানে সংকোচন ও প্রসারণ থাকে, বিভিন্ন ঝুঁকি থাকে। সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করে আমরা বিশ্বাস করি, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা আনা যায়। বাংলাদেশ সরকার গত দশকে সেসব ঝুঁকি কৃতিত্বের সঙ্গে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে। গত দেড় যুগ অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় আমরা পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছি। ইউক্রেন থেকে খাদ্য রফতানি শুরু হয়েছে, জার্মানিতে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। বিশ্ব পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক অস্বস্তির কারণগুলো দূরীভূত হতে চলেছে। আমাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকবে।

 

ড. শামসুল আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ

প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

আরও