শিক্ষাগত বিনিময়কে সেবা খাতের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি মূল উপাদান হিসেবে পরিকল্পনা করার জোরালো যুক্তি রয়েছে। এটি বাংলাদেশের রফতানি ভিত্তি বহুমুখীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং এশিয়াজুড়ে পারস্পরিক সুবিধাজনক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করতে সক্ষম। কম খরচে প্রস্তুতকৃত পণ্যের রফতানিকারক দেশ থেকে দক্ষ মানবসম্পদের প্রতিযোগিতামূলক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত এজেন্ডা হতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে তৈরি পোশাক খাত। মূলত এককভাবে এ খাতের ওপর অতি নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে শিক্ষা খাত কীভাবে আন্তর্জাতিক সেবা বাণিজ্যে গতিশীল ভূমিকা রাখতে পারে, তা অনুধাবন করা ক্রমেই জরুরি হয়ে উঠছে। বিষয়টি এখন আরো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উচ্চ শিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে যান এবং সেখানে টিউশন ফি ও অন্যান্য শিক্ষা ব্যয় পরিশোধ করেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাসেবা কিনছে। অর্থনীতির ভাষায় এটিই ‘শিক্ষাসেবা আমদানি’। তবে এ খাতে দেশের মোট ব্যয় এখনো বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ১ শতাংশেরও কম।
উচ্চ শিক্ষার সেবা আমদানির খাত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাশ্চাত্যের দেশগুলোর—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা—পেছনে মোট অর্থপ্রবাহের অংশ ৬৫-৭০ শতাংশ। ইউরোপীয় দেশগুলোর—যেমন জার্মানি, ফিনল্যান্ড, ইতালি ও সুইডেনের ক্ষেত্রে তা ১৫-২০ শতাংশ এবং এশিয়ার—যেমন জাপান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের ক্ষেত্রে ১০-১৫ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে শিক্ষার বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আরো গভীরভাবে আলোচনা করা প্রাসঙ্গিক, কারণ বর্তমানে এ অঞ্চল সবচেয়ে কম অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। এশিয়ার অভ্যন্তরে শিক্ষার জন্য সেবা আমদানি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য কোনো অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল বয়ে আনতে পারে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভৌগোলিক নৈকট্য, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের আঞ্চলিক সাদৃশ্য, বৈচিত্র্যময় ও পরিপূরক জনসংখ্যার কাঠামো, প্রযুক্তির ভিন্নমুখী সক্ষমতা এবং ব্যয়জনিত সুবিধাসহ নানা কারণে এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্যে পারস্পরিক লাভের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি দেশ দুটির জনমিতিক ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য। জাপানের জনসংখ্যা বয়োবৃদ্ধ এবং গড়ে প্রায় দশমিক ৫ শতাংশ হারে সংকুচিত হচ্ছে, যা দেশটির অভ্যন্তরে শ্রমঘাটতি তৈরি করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা তরুণ—গড় বয়স ৩০ বছরের নিচে ও ক্রমবর্ধমান। ফলে বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা খাত জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা ও ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্নাতকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জাপানের শ্রমশক্তিতে অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে রোবোটিকস, হাই-স্পিড রেল ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স ও গ্রিন টেকনোলজির মতো খাতে জাপানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও শিক্ষা বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। সংস্কৃতি ও ধর্মের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে মিল রয়েছে। মালয়েশিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় পশ্চিমা দেশের তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক উদ্যোগও রয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রিক্যাল পার্টস উৎপাদনে মালয়েশিয়ার সক্ষমতা বেশি; অন্যদিকে জুতা, চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত মিশ্রণ, সিরামিক ও আইটিইএস খাতে বাংলাদেশের তুলনামূলক সাশ্রয়ী শ্রমশক্তি রয়েছে। উভয় দেশই জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর, বায়োটেকনোলজি, আইসিটি ও হালাল ফার্মাসিউটিক্যাল স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের সমস্যা সমাধানে যৌথ আগ্রহ বজায় রাখছে।
উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো কীভাবে শিক্ষা-সংক্রান্ত বাণিজ্যকে গতিশীল করতে পারে, তার কিছু সফল উদাহরণ এরই মধ্যে দৃশ্যমান। ‘বাংলাদেশ-মিয়াজাকি আইসিটি ইঞ্জিনিয়ার্স এডুকেশনাল ট্রেনিং প্রজেক্ট’ (বি-মিট) প্রোগ্রামটিকে এর একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এ প্রোগ্রামে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহযোগিতায় জাপানের মিয়াজাকি ইউনিভার্সিটিকে সাহায্য করছে। এর মাধ্যমে প্রকৌশল বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের পাঁচ মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। এ প্রশিক্ষণে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মৌলিক ধারণা, জাপানি ব্যবসায়িক শিষ্টাচার ও ভাষা দক্ষতার ওপর জোর দেয়া হয়। জাপানে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ উৎসাহব্যঞ্জক সাফল্য পাচ্ছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ ও জাপান উভয়ের জন্য টেকসই অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনছে।
মালয়েশিয়ার ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ’ (টিভিইটি) কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোর মানোন্নয়ন করা হচ্ছে। যেহেতু উভয় দেশই অভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তাই ইউনিভার্সিটি অব মালয় (ইউএম), ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালয়েশিয়া (ইউটিএম) এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ার (আইআইইউএম) মতো স্বনামধন্য মালয়েশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ডক্টরেট (পিএইচডি) করতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে। একইভাবে মালয়েশিয়ান টেকনিক্যাল কো-অপারেশন প্রোগ্রাম (এমটিসিপি) বাংলাদেশী গবেষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সম্পূর্ণ অর্থায়নে স্নাতকোত্তর স্কলারশিপ প্রদান করছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাযুক্ত খাতের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করছে। ফলে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে শিক্ষাগত বিনিময় বাণিজ্যিক রূপক হিসেবে কাজ করছে, যা উভয় দেশের বৃত্তিমূলক দক্ষতার ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করছে।
এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে শিক্ষা খাতে বৈদেশিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ পন্থা
উপরোক্ত তথ্য পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা দেয় যে বাংলাদেশ ও এশীয় দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষার বাণিজ্য পারস্পরিকভাবে লাভজনক। তাই বাংলাদেশের উচিত একটি সার্বিক কাঠামোর মাধ্যমে বাণিজ্যের সম্ভাব্য সব পথ উন্মোচন করে এ ক্ষেত্রকে আরো প্রসারিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা। এর মধ্যে রয়েছে ক) এক দেশ থেকে অন্য দেশে অনলাইন শিক্ষা ও দূরশিক্ষণ প্রদান; খ) সেবা গ্রহণের উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের বিদেশে গমন; গ) দেশীয় ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে ব্রাঞ্চ ক্যাম্পাস ও গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন এবং ঘ) এক দেশে প্রশিক্ষিত হয়ে অন্য দেশে পরিষেবা প্রদানের জন্য পেশাজীবীদের গমন, যেমন ভিজিটিং স্কলার, ট্রেইনার, গবেষক ও উচ্চশিক্ষিত স্নাতকরা।
এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে শিক্ষা বাণিজ্যে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর অন্যতম হলো শিক্ষার গুণগত মানের ধারণার দিক থেকে এশীয় দেশগুলো এখনো পশ্চিমা দেশগুলোর সমকক্ষে পৌঁছাতে পারেনি। বাংলাদেশ কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেবল সেসব এশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেই যৌথ অংশীদারত্ব করা উচিত, যেগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অ্যাক্রেডিটেশন মানদণ্ড—যেমন প্রকৌশলের জন্য ওয়াশিংটন অ্যাকর্ড এবং ব্যবসার জন্য এএসিএসবি—অনুসরণ করে। এ পদক্ষেপ বৈদেশিক শিক্ষা বাণিজ্যে শিক্ষার মান বজায় রাখা নিশ্চিত করবে এবং বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুবিধা পাবে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া কোনো সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে না; কারণ ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো এশীয় দেশগুলোতে ব্যবসায় ও প্রকৌশল বিষয়ে বিশ্বমানের অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত প্রায় ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
আরেকটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে আঞ্চলিক প্রয়োগভিত্তিক ও উচ্চ-প্রভাবশালী সংকটগুলোর ওপর যৌথ গবেষণায় জোর দেয়া। যেমন ব্যবস্থাপনায় সফট স্কিল উন্নয়ন, নৈতিক ও সামাজিক ব্যবসার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংযোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে নগর অভিযোজন। এটি কেবল গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা বৃদ্ধির বদলে সমাজে বাস্তবমুখী প্রভাব ফেলবে। পরিশেষে, বাণিজ্যের মূল নিয়ামক যে ব্যয় সুবিধা, তা মনে রেখে যৌথ ও দ্বৈত ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু করা অত্যন্ত বাস্তবিক পদক্ষেপ হতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক কোর্সগুলো দেশে সম্পন্ন করে চূড়ান্ত বিশেষায়িত অংশটি বিদেশের অংশীদার বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ করতে পারবে। এতে শিক্ষার মান বজায় রেখে পড়ার মোট খরচও কমে আসবে। নৈতিক ও সামাজিক ব্যবসায়িক চর্চার মতো আকর্ষণীয় দেশের তুলনামূলক সুবিধাজনক ক্ষেত্রগুলোকে কেন্দ্র করে ডিগ্রি প্রোগ্রাম গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ শিক্ষা খাত থেকে রফতানি আয় বাড়াতে পারে।
সংক্ষেপে আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে উচ্চ শিক্ষার বিনিময়কে সেবা বাণিজ্যের একটি মূল উপাদান হিসেবে পরিকল্পনা করার জোরালো ভিত্তি রয়েছে। এটি বাংলাদেশের রফতানি কাঠামো বহুমুখীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং এশিয়াজুড়ে পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো গভীর করতে সক্ষম। কম খরচে প্রস্তুতকৃত পণ্যের রফতানিকারক দেশ থেকে দক্ষ মানবসম্পদের প্রতিযোগিতামূলক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কার্যকর কৌশলগত পরিকল্পনা হতে পারে।
ড. নাজলী সিদ্দিকী: পরিচালক, এমবিএ ও ইএমবিএ প্রোগ্রামস, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ)
সৈয়দ মনসুর হাশিম: পরিচালক, জনসংযোগ কার্যালয়, এনএসইউ