ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১১ দিনের ভয়াবহ সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় শুরু হওয়া এ যুদ্ধবিরতি আপাতত সংঘর্ষ থামিয়েছে বটে, কিন্তু এ যুদ্ধের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক অভিঘাত এখনো পরিপূর্ণভাবে বিশ্লেষণাধীন। কে এ সংঘাতের প্রকৃত বিজয়ী? ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে? ইরান কি কেবল প্রতিরোধ করেছে, নাকি কৌশলগতভাবে সফলও হয়েছে?
যুদ্ধের সূচনায়ই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছিলেন, ইসরায়েলের এ অভিযানের লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধ্বংস করা এবং একই সঙ্গে ইরানের শাসন ব্যবস্থার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়া। এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবে কতটা অর্জিত হয়েছে তা নিয়ে এখনই প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সমর্থনে ইরানের ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় বাংকার-বাস্টার বোমা ব্যবহার করলেও ইরান আগেই তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফিশনযোগ্য পদার্থ সরিয়ে ফেলেছিল। ফলে এ আক্রমণের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
আরেকটি ভুল হিসাব ছিল ইরানের জনগণের প্রতিক্রিয়া নিয়ে। ইসরায়েল ভেবেছিল, আইআরজিসি নেতাদের হত্যা করলে দেশের ভেতরে বিদ্রোহ দেখা দেবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। এমনকি যারা ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থার বিরোধী তারাও দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এ আগ্রাসন ইরানিদের মধ্যে জাতীয়তাবোধকে জাগ্রত করেছে এবং সরকারবিরোধীরাও এ মুহূর্তে রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে।
ইসরায়েল এমন কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যেমন এভিন কারাগারে হামলা কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির ওপর আক্রমণ। ইসরায়েল এসব লক্ষ্যবস্তুকে ‘প্রতীকী শাসন কাঠামো’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও এ হামলাগুলো রাজনৈতিক বন্দিদের অবস্থাকে আরো নাজুক করেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ইসরায়েলকেই আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন একদিকে ইরানে বোমা বর্ষণ করল, অন্যদিকে দ্রুত যুদ্ধবিরতির জন্যও চাপ তৈরি করল। এমনকি ইরানের পক্ষ থেকে কাতারে অবস্থিত মার্কিন আল-উদেইদ ঘাঁটিতে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারকে আগাম অবহিত করা হয়েছিল, যা এ হামলার প্রতিশোধমূলক ও প্রতীকী চরিত্রকে স্পষ্ট করে।
ইসরায়েল আশা করেছিল, এ যুদ্ধের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে এবং বিশ্ব ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ করতে চাপ দেবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অধিকাংশ বিশ্বনেতা ‘পারমাণবিক অস্ত্র নয়’—এ অবস্থানে ফিরে গেছেন, যেখানে ইরান আগেই সম্মত ছিল। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ ও কয়েকজন পশ্চিমা নেতা ইসরায়েলকে সমর্থন করলেও তারা কেউই ইসরায়েলের কঠোর দাবিগুলো পূর্ণরূপে সমর্থন করেননি।
যুদ্ধক্ষেত্রে ইসরায়েল শুরুতে এগিয়ে থাকলেও শেষদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে, তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে। ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করে এ হামলা দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে। এতে অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে এবং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে ইরান যদিও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে, তবু তাদের শাসন ব্যবস্থা ধসে যায়নি। বরং তারা আগাম হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রতিশোধমূলক হামলার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমিত করেছে। এটি কৌশলগতভাবে তাদের একটি বড় অর্জন।
এ সংঘাত একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যে এখন কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এখানে রাজনৈতিক কৌশল, কূটনৈতিক প্রস্তুতি এবং অভ্যন্তরীণ সংহতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইরান তার প্রতিরক্ষা, কৌশল ও বার্তা প্রচারে যে ধরনের আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছে, তা ইসরায়েলের জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
সংক্ষেপে বলা যায়, ইসরায়েল এ যুদ্ধে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে নেমেছিল, বাস্তবে তার সিংহভাগই পূরণ করতে পারেনি। তাদের কৌশলগত ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক সমর্থনের ঘাটতি এবং জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এটাই দেখায়। অন্যদিকে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভেঙে পড়েনি; বরং কূটনৈতিকভাবে স্থির, অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্যবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিকভাবে তুলনামূলকভাবে সহানুভূতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধপরবর্তী রাজনীতি এখন শুরু হচ্ছে।
মো. ওবায়দুল্লাহ: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকার একজন ভিজিটিং স্কলার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপিতে পলিটিক্যাল সায়েন্সে উচ্চশিক্ষারত