বাংলাদেশ অর্থনীতির রাজস্ব আয়ে যথেষ্ট কমতি ও দুর্বলতা রয়েছে, কিন্তু তবু পুরো অর্থনীতিই ভারাক্রান্ত বিশাল ভর্তুকির ভারে। বর্তমান বাজেটে বলা হয়েছে যে ২০২৫-২৬ সালের অর্থবছরে অর্থনীতিতে মোট ১২৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেয়া হবে। রাজস্ব আয়ের ঘাটতি এবং বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নানা নাজুকতার পরিপ্রেক্ষিতে এ বিরাট অংকের ভর্তুকি অর্থনীতিতে একটা চাপ সৃষ্টি করবে। পাঁচ বছর আগে ২০১৯-২০ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার কোটি টাকা।
২০২৩-২৫ সালের বাজেটে আদি ভর্তুকি ছিল ১১৫ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন খাতে বেশির ভাগ বকেয়া পরিশোধের কারণে সে সংখ্যা ১৪১ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছিল। যেহেতু রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার নিচে, তাই ভর্তুকি বৃদ্ধির সুযোগ আগামী অর্থবছরে কম। তবু আগামী অর্থবছরে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১২৬ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের মূল বাজেটের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি। এ বর্ধিত ভর্তুকির বেশির ভাগ যাবে জ্বালানি, সার, কৃষি ও খাদ্য খাতে। জ্বালানি ভর্তুকি মোট ভর্তুকির সবচেয়ে বড় অংশ পেয়েছে—প্রায় ৩০ শতাংশ, এরপর রয়েছে কৃষি ভর্তুকি ২১ শতাংশ, খাদ্য ভর্তুকি ৮ শতাংশ ইত্যাদি।
কেন ভর্তুকির ভার অর্থনীতিতে এত বেশি? নানা কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে, অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির কারণে, খাদ্য সহায়তার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে, টাকার অবমূল্যায়নের ফলে ইত্যাদি। কারণ যাই হোক না কেন, প্রশ্ন হচ্ছে ভর্তুকির এ বর্ধিত ভার কি বাংলাদেশ অর্থনীতি বইতে পারবে? বিশেষত, প্রবৃদ্ধি যেখানে শ্লথ, মূল্যস্ফীতি যেখানে উচ্চ, রাজস্ব আয় যেখানে সীমিত, ব্যয় যেখানে ঊর্ধ্বমুখী বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে নাজুক।
ভর্তুকির ভার বাড়ল কেন? বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান ভর্তুকির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। সরকার এ খাতে ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রাখছে, কারণ আর্থিক দায়বদ্ধতা রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে জ্বালানি সরবরাহ সরকার স্থিতিশীল রাখতে চায়। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, পূর্ববর্তী সরকার পুরনো বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ না করে নতুন বিশাল বিশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। ফলে একদিকে যেমন পুরনো ক্ষয়িষ্ণুমান কেন্দ্রগুলো টিকিয়ে রাখতে বর্ধিত ভর্তুকি দিতে হয়েছে, অন্যদিকে তেমন বিশাল কেন্দ্রগুলোর পূর্ণক্ষমতা ব্যবহার না করাজনিত ব্যয়ের জন্যও অর্থ সাহায্য দিতে হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে যায়, যা টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আরো খারাপের দিকে যায়। সময়মতো ব্যয় পরিশোধে পূর্ববর্তী সরকারের ব্যর্থতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিপুল পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ খাতে বর্ধিত ভর্তুকি সেজন্যই জরুরি ছিল। বর্তমানে প্রতি একক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্রয় এবং বিক্রয়মূল্যের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ১৭ হাজার ৬৭৬ টাকা। প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে এ পার্থক্য মেটানো হয়।
আগামী অর্থবছরের জন্য কৃষি খাতে ২৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি বরাদ্দ করা হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করার জন্য সার এবং কৃষির যান্ত্রিকীকরণের জন্য এ ভর্তুকির ব্যবস্থা। আগামী বছর খাদ্য ভর্তুকি হবে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি। খাদ্য ভর্তুকির অন্তর্ভুক্ত খোলা বাজার বিক্রয় ব্যবস্থা এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ কর্মসূচির সুবিধাভোগী পরিবারের সংখ্যা বর্তমানের ৫০-৫৫ লাখ পরিবারে বাড়ানো হবে। অধিকন্তু প্রতিটি পরিবার ছয় মাস সময়কালে প্রতি মাসে প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে ৩০ কেজি চাল পাবেন। বর্তমান ব্যবস্থায় এ সময়কাল হচ্ছে পাঁচ মাস।
রফতানি এবং বিদেশ থেকে শ্রমিকদের প্রেরিত অর্থের ব্যাপারে প্রণোদনার জন্য ৪২ হাজার ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ভর্তুকি ব্যয়ের অধীনে বিশেষ বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে ১২ হাজার কোটি টাকা অর্থঋণ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে ভর্তুকির ভার কমানোর জন্য কী করণীয়? যেহেতু সে করভারের সিংহভাগ জ্বালানি, কৃষি ও খাদ্য ইত্যাদি কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে কেন্দ্রীভূত, তাই করণীয় ব্যবস্থাগুলোকেও সেসব জায়গাতেই মনোযোগ দিতে হবে।
এক. ব্যয়সাধ্য মূল্যে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে পুরনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর চলমান চুক্তি বাতিল করে তাদের বন্ধ করে দিতে হবে। রূপপুর পারমাণবিক এবং মাতারবাড়ী কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা জরুরি। যদিও পরামর্শগুলো পুরনো, তবু দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর জন্য বিকল্প উৎস জল ও সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। বিদ্যুতের অপব্যবহার কি রোধ করা যায় না? নৈশকালে দোকানপাটের ব্যবসার সময়কাল সীমিত করে, সামাজিক অনুষ্ঠানে বিজলি ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, ঘরে-বাইরে দায়িত্বশীল হয়ে বিজলি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সামষ্টিক পর্যায়ে বাণিজ্য নীতিমালাও বিদ্যুৎ ব্যয়ের ওপরে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। ফলে বিদ্যুতের ওপর ভর্তুকির ভার হ্রাস পাবে। সেই সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যের যথাযথভাবে পুনর্নির্ধারণ করা দরকার যাতে ভর্তুকির প্রয়োজন আর না থাকে।
দুই. কৃষি ভর্তুকির ক্ষেত্রে যে মৌলিক প্রশ্নটি বিবেচিত হতে হবে সেটা হলো, কৃষি ক্ষেত্রে ভর্তুকি কি উপকরণের ওপর দেয়া হবে, নাকি চূড়ান্ত পণ্যের ওপর দেয়া হবে? এ দুটো ব্যবস্থার অর্থনৈতিক, সাম্য ফলাফল এবং ভর্তুকির সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন হবে। সুতরাং কাদের কল্যাণ অভীষ্ট, সেই পরিপ্রেক্ষিতে ভর্তুকি ব্যবস্থা গড়তে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষি ভর্তুকি কৃষি উপকরণনির্ভর। এর উপযোগিতা ও কার্যকারিতা মূল্যায়িত হওয়া দরকার।
তিন. খাদ্য ও পুষ্টিনির্ভরতা ভিন্ন বাংলাদেশে খাদ্য ভর্তুকির মূল লক্ষ্য হচ্ছে দারিদ্র্যের আপাতন কমানো ও সমাজে অসমতা ও বৈষম্য কমানো। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করা। কিন্তু দারিদ্র্য বিমোচন এবং বৈষম্য হ্রাসের জন্য খাদ্য ভর্তুকি ছাড়াও অনেক পন্থা আছে। সুতরাং দারিদ্র্য বিমোচন ও অসমতা দূরীকরণের জন্য একদিকে যেমন খাদ্য ভর্তুকির আপেক্ষিক কার্যকারিতা মূল্যায়িত হওয়া প্রয়োজন, তেমনি উপর্যুক্ত লক্ষ্য দুটি অর্জনের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অন্য লভ্য পন্থাগুলো বিবেচিত হতে পারে। যেমন কর্মসাপেক্ষে অর্থদান একদিকে যেমন বেকারত্ব দূর করবে, তেমনি অন্যদিকে দারিদ্র্য দূরীকরণে সাহায্য করবে। এসব পন্থা ভর্তুকিনির্ভরতা কমিয়ে আনবে।
বাংলাদেশের রফতানির ওপর ভর্তুকি চিরদিন চলতে পারে না। তাই এ ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে হবে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের স্তর থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্তরে উন্নীত হবে, তাই রফতানির ওপর ভর্তুকি হ্রাস করতে হবে। একইভাবে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার হার বাজারভিত্তিক হওয়ায় বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থের ওপর প্রণোদনাও ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে হবে।
যেকোনো অর্থনীতিতেই কিছু কিছু ভর্তুকি সর্বদা থাকবে বিভিন্ন কারণে। কিন্তু ভর্তুকির বিস্তার ও গভীরতা এমন জায়গায় যাতে না পৌঁছে যেখানে ভর্তুকি একটা ভারে পরিণত হয়। সহনীয় ভর্তুকির ভারও একটা সময়ে অসহনীয় হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা, সব ভর্তুকিই যেন যৌক্তিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেটা যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়।
সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র