আর যেকোনো অর্থনৈতিক কাঠামোয় নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাবান্ধব ও ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিনিয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের যদি বাণিজ্যের বিষয়ে আস্থাশীল করে তোলা না যায়, তাহলে এমনটি সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সেবা নিশ্চিত করতে গেলে প্রথমে জানতে হবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা কী। যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিষয়। এক্ষেত্রে বিনিয়োগই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। কারণ বিনিয়োগের মাধ্যমে সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এক্ষেত্রে জরুরি মানসম্মত কর্মসংস্থান। মানসম্মত কর্মসংস্থান ও মেধার মূল্যায়নের জন্য শিল্পায়ন এবং সেবা খাতের বিস্তার বেশি জরুরি। এ বিস্তার তখনই সম্ভব, যখন বিপুল পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠান সুসংহত হতে পারছে না।
দেশের অর্থনীতি দীর্ঘকাল ধরে নির্দিষ্ট কিছু খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ নির্ভরশীলতা কাটাতে হলে ওষুধ, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিনিয়োগ বাড়লে প্রযুক্তির আদান-প্রদান ঘটে, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং পণ্য বা সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়। দেশীয় তো বটেই, বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সফলতা নেই বললেই চলে। বিনিয়োগ আকর্ষণে নানামুখী নীতি প্রণীত হলেও এর ধারাবাহিকতা নেই। বিনিয়োগ উপযোগী হিসেবে আস্থা অর্জন থেকেও বারবার ছিটকে পড়তে হয়েছে দেশকে। আবার বিনিয়োগ ধরে রাখতে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা, তা অনেকাংশে দূর হয়নি। অথচ বাংলাদেশ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যাপক সম্ভাবনাময়। তবু দেশে বড় আকারে বিনিয়োগ আকৃষ্ট না হওয়ার কারণ অভ্যন্তরীণ। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ নীতির ধারাবাহিকতার অভাব অর্থাৎ বছর বছর বিনিয়োগ নীতির পরিবর্তন, বিনিয়োগে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর সক্ষমতার অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এছাড়া বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে যে উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো এখনো কোনো কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি।
বিনিয়োগের সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। প্রতি বছর শ্রমবাজারে যে বিপুলসংখ্যক নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে, তাদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শিল্পায়ন ও সেবা খাতের বিস্তার প্রয়োজন। এ বিস্তারের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বন্দরের আধুনিকায়নের মতো অবকাঠামোগত খাতে সরকারি বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ সরকারি বিনিয়োগ এখানে ‘অনুঘটক’ হিসেবে কাজ করে। সরকারি বিনিয়োগ যদি অনুঘটক হয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগকে এর চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যখন কোনো সংকট দেখা দেয়, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কেউ সেবা দিতে পারছে কিনা সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। দেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট নতুন কিছু নয়। কিছু দৃশ্যমান বাধা এখনো রয়ে গেছে। উচ্চ সুদহার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জমি প্রাপ্তিতে সমস্যা এবং নীতিমালার ধারাবাহিকতার অভাব অনেক সময় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। টেকসই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়তে হলে আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ সুবিধা পেতে পারেন।
বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধির উপায় হলো দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা হ্রাস। বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রধান উপাদান হলো সস্তা শ্রম। কিন্তু এখন শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে খুব বেশি বিনিয়োগ আনা যাবে না। সেজন্য তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরিতে সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা স্থাপনে প্রয়োজনীয় জমি, উন্নত অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। সেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, যেসব শিল্প বৃহৎ পুঁজি আকর্ষণ করে। বৃহৎ পুঁজি ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, আমাদের মতো জনবহুল দেশে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সুন্দর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রশস্ত সড়ক অবকাঠামো, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন, কানেক্টিভিটি বাড়ানো, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সম্পদের প্রাচুর্য, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত অথবা প্রশিক্ষণযোগ্য জনবল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। নানা পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছু শঙ্কাও কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, তার অন্যতম ছিল দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। পাশাপাশি ট্যাক্স, শুল্ক ছাড় ও মুনাফার প্রত্যাবাসন অন্যতম। দুঃখজনক হলেও সত্য এক্ষেত্রে অগ্রগতি খুব সামান্যই। এছাড়া দক্ষ জনশক্তির অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও জমির দুষ্প্রাপ্যতাকেও প্রতিবন্ধকতা মনে করা হয়। এদিকে সরকারের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য আমাদের শুধু একমুখী নীতি অনুসরণ করলে চলবে না। বিনিয়োগকারীরা সচরাচর বাণিজ্যের পরিবেশের অতীত, বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই করেন। তাই বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
এর বাইরে দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় প্রতিবন্ধকতা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। ক্ষমতার পালাবদল বা ভূরাজনৈতিক কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসা-সংক্রান্ত মৌলিক নীতিমালা বা কর কাঠামো হুট করে বদলে যায়। অথচ সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মতো রাষ্ট্র এক্ষেত্রে দৃশ্যমান সংস্কার দেখাতে পেরেছে। সংস্কারের জন্য শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ভিত শক্তিশালী হলেই চলবে না। শক্তিশালী আইনি কাঠামোও গড়ে তুলতে হবে। অবকাঠামোও যে বিনিয়োগের বড় আকর্ষণ হতে পারে সে নজির আমরা পাই আরব আমিরাত কিংবা সৌদি আরবের দিকে তাকালে। আবার শিল্পায়নের ক্ষেত্রে চীন ও ভিয়েতনামের মতো রাষ্ট্র উদাহরণ হিসেবে আমাদের সামনে রয়েছে। তবে আমাদের জন্য জনশক্তি বরাবরই একটি বড় সম্ভাবনা। এ জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে অনেক অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে ভারত রয়েছে। ভারত, ভিয়েতনাম ও মেক্সিকো নিজেদের সাপ্লাই চেইনের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য তারা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত যেমন মজবুত করেছে, তেমনি আইনি শাসনও নিশ্চিত করেছে। সে তুলনামূলক আলোচনার নিরিখে আমাদেরও বিনিয়োগ আকর্ষণ পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে।