এ সংকট মোটেও নতুন নয়। ২০২৪ সালে বিবিএসের পরিচালিত এক জরিপের তথ্যে দেখা যায়, সংস্থাটির তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ব্যবহারকারী। আর সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ সংস্থাটির মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান।
বিবিএসের প্রতি আস্থার অভাব তীব্র রূপ নিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের দীর্ঘ শাসন আমলে। সে সময় অর্থনীতির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচকের তথ্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, যার বেশির ভাগ এখনো অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে। দুঃখজনক হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বিবিএস সংস্কারের জোর দাবি ওঠে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি স্বাধীন টাস্কফোর্স গঠন হয়। এর পরও এ সরকারের শাসনকালে বিবিএসের দৃশ্যমান সংস্কার হয়নি। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সময়েও এক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি, বরং সম্প্রতি বিবিএসের মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য ঘিরে সেই পুরনো আস্থার সংকট আবারো সামনে এসেছে।
দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু খাদ্যপণ্য, ভোজ্যতেল, মাছ, সবজি এবং জ্বালানির দাম বেড়েছে। অথচ সরকারি মূল্যস্ফীতির হিসাবে সেটি প্রতিফলিত হচ্ছে না। একই সময়ে বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব আহরণে চাপ, কর্মসংস্থানের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যেও ৪ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাময়িক হিসাবও বিস্ময় তৈরি করেছে। অবশ্য বিবিএস বলছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করেই এসব হিসাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীও তথ্য একাধিকবার যাচাই করে প্রকাশের কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব ব্যাখ্যা বিবিএসের তথ্যকে গ্রহণযোগ্য করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকালে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বিবিএসকে স্বাধীন জনবল নিয়োগের ক্ষমতাসহ পূর্ণাঙ্গ ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান কমিশনে’ উন্নীত করার সুপারিশ করেছিল, যাতে পরিসংখ্যান তৈরির প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে অনেকটা মুক্ত হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা পর্যায় থেকেও বিবিএসের তথ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং প্রতিবেশী দেশের মতো পরিসংখ্যান সংস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি এড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিবিএস একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে, যারা ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) ও জিডিপি হিসাবের বর্তমান পদ্ধতি পর্যালোচনা করে সংস্কার সুপারিশ দেবে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কথাও বণিক বার্তার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখনো মূলত পর্যালোচনা ও আলোচনার মধ্যেই রয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত বিবিএসে এমন কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন আসেনি যা আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে, বরং বিবিএসের নতুন পরিসংখ্যান ঘিরে বিতর্কগুলোকে উসকে দিচ্ছে।
সংস্থাটির দেয়া মূল্যস্ফীতির মাসভিত্তিক ও বছরভিত্তিক হিসাবের কারিগরি ব্যাখ্যা যতই সঠিক হোক, একজন ভোক্তার কাছে সেটি সংগত হবে না যখন তিনি বাজারে গিয়ে ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হোন। উপরন্তু সিপিআই বাস্কেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় নয়, এমন পণ্যের সংখ্যা বাড়ানোয় জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ের চাপ যথাযথভাবে উঠে আসছে কিনা সে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মূল্যায়নেও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি পরিসংখ্যানের পরিধি ও পদ্ধতিগত দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে। একদিকে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচকে দুর্বলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অন্যদিকে বিবিএসের মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। এতে বরং কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যানের ওপর মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন একটি স্বাধীন, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বিবিএসকে রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য সংগ্রহ, নমুনা নির্বাচন, সূচক নির্ধারণ, তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রকাশ—প্রতিটি ধাপের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করা সমীচীন, যাতে গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞরা তা যাচাই করতে পারেন। একই সঙ্গে সিপিআই বাস্কেট ও এর ওজন নির্ধারণ নিয়মিত পর্যালোচনা করে মানুষের প্রকৃত ভোগ ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করাও জরুরি।
বর্তমান সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে অতীতের আস্থাহীনতা দূর করার। সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত সংস্কার টাস্কফোর্স ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের দিকে এগোনো প্রয়োজন। পাশাপাশি সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি নির্দিষ্ট সময় পরপর জনসম্মুখে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সরকারি পরিসংখ্যান জাতীয় নীতিনির্ধারণে অনেকটা পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে। এদিকে দেশের একমাত্র সরকারি পরিসংখ্যান প্রণয়নকারী সংস্থা হলো বিবিএস। মূল্যস্ফীতি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান কিংবা কৃষি উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই সরকারি নীতি নেয়া হয় বিবিএসের তথ্যের ওপর। ফলে এ প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তাই বিবিএসের প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয় নয়; এটি কার্যকর অর্থনৈতিক সুশাসন এবং নীতিনির্ধারণেরও পূর্বশর্ত।